প্রদীপের বিরুদ্ধে আরও মামলার প্রস্তুতি

  সিরাজুল ইসলাম ০৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজারের টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে আরও মামলার প্রস্তুতি চলছে। ওসির দায়িত্ব পালনকালে যেসব সাধারণ মানুষ বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, তারাই শিগগির মামলা করবেন। বিশেষ করে ‘ক্রসফায়ার’র ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, টাকা নেয়ার পরও ক্রসফায়ারে দেয়া, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে প্রদীপের বিরুদ্ধে।

র‌্যাব মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ আসামির মধ্যে ৭ জন আদালতের নির্দেশে কারাগারে আছেন। তাদের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাদের এরই মধ্যে পুলিশ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। র‌্যাব এখনও তাদের হেফাজতে নেয়নি। আশা করা যাচ্ছে আগামীকাল (আজ রোববার) তাদের র‌্যাব হেফাজতে নেয়া হবে। কারাগার থেকে পর্যায়ক্রমে র‌্যাব-১৫ (কক্সবাজার) অধীন রিমান্ডে এনে তাদের বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি জানান, র‌্যাব সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তকাজ পরিচালনা করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মামলার অন্য দুই আসামির (টুটুল ও মোস্তফা) বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।

সিনহা হত্যার ঘটনায় কক্সবাজারের এসপি এবিএম মাসুদ হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কিনা জানতে চাইলে র‌্যাব পরিচালক বলেন, টেকনাফ স্থানীয় পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারের এসপির যে ফোনালাপটি ফাঁস হয়েছে সেটি র‌্যাবের নজরে এসেছে। এটি যাচাই করা হচ্ছে। এটি যাচাই এবং আনুষঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি জানান, মেজর (অব.) সিনহার বোন যে মামলা করেছেন এই মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সিফাত। অপরদিকে পুলিশ যে মামলা করেছেন সে মামলায় সিফাত একজন আসামি। তাদের খোয়া যাওয়া ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক ইত্যাদি উদ্ধারে র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য কি ছিল- সে বিষয়টিতে প্রাধান্য দিয়েই তদন্ত চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব পরিচালক আশিক বিল্লাহ বলেন, কেবল হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিকে ঘিরেই তদন্ত চলবে। যেসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে তারা যদি অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে সেটি এই মামলার তদন্তে প্রতিফলিত হবে না। তবে অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে যদি কোনো ভিকটিম পৃথক মামলা করে, সেক্ষেত্রে আদালত র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দিলে র‌্যাব সেটিরও তদন্ত করবে।

গত ৩১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা রাশেদ খান। এ ঘটনায় ৫ আগস্ট তৎকালীন ওসি প্রদীপসহ ৯ জনকে আসামি করে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। প্রদীপ কুমার দাশ ছাড়াও অন্য যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন- গুলিবর্ষণকারী ইন্সপেক্টর লিয়াকত, এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন ও এএসআই লিটন মিয়া। এ মামলার পর থেকেই প্রদীপ কুমার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। তারা এখন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সিনহাকে হত্যার মাত্র ১ সপ্তাহ আগে আরেকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটায় সাবেক ওসি প্রদীপ। পাশের উখিয়া থানার ইউপি মেম্বার বখতিয়ারকে ধরে নিয়ে যান মধ্যরাতে। এ বিষয়ে বখতিয়ার মেম্বারের স্ত্রী শাহীনা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, স্বামীকে তুলে নেয়ার পরদিন উখিয়া থানায় গেলাম। বলল, এখানে আনা হয়নি। টেকনাফ থানায় যাই। কিন্তু আমাদের ঢুকতে দেয়নি পুলিশ।

ওইদিন আসরের সময় ওসি বলেন, কিছু হবে না, দেখি আমরা কি করতে পারি। এরপর সন্ধ্যায় আবারও বাড়িতে আসেন প্রদীপ কুমার দাশ ও মর্জিনা আক্তার। এ দফায় ভেঙে ফেলা হয় বাড়ির ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। তারপর চালানো হয় তল্লাশি। নিয়ে যায় নগদ ১৮ লাখ টাকাসহ মালামাল।

শাহীনা আক্তার জানান, রাত ১২টার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফের হ্নিলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে যোগাযোগ করে পরিবার জানতে পারে বখতিয়ার মেম্বার ও মোহাম্মদ তাহের নামের দু’জনের মৃত্যু হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। এ ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় আসামি করা হয় ১৫ জনকে। তারপর অস্ত্র মামলাসহ আরও একটি মামলা হয়। এতে আসামি করা হয় আমার তিন ছেলেকে। এখন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলারর প্রস্তুতি চলছে বলে জানান শাহীনা আক্তার।

এছাড়া কক্সবাজারের টেকনাফ গুচ্ছগ্রামের মগগুল আহমদ যুগান্তরকে বলেন, গত বছরের রমজান মাসের এক দুপুরে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি টিম আমাদের বাড়িতে যায়। কোনো কারণ ছাড়াই তারা আমার ভাই হাসান আহমদকে তুলে নিয়ে যায়। দু’দিন থানায় আটকে রেখে ১৬ লাখ টাকা দাবি করে। অন্যথায় ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়া হয়। ভাইকে ক্রসফায়ারের হাত থেকে বাঁচাতে আমি থানায় গিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে আসি। এ টাকাতে ওসির মন ভরেনি। তাই পরদিন ৫০০ পিস ইয়াবা দিয়ে আমার ভাইকে আদালতে চালান দেয়া হয়।

মগগুল আহমদ বলেন, ওসির ভয়ে এতদিন বিষয়টি কাউকে জানাতে পারিনি। সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপ গ্রেফতার হওয়ার পর আমি অনেকটা আশাবাদী হয়ে উঠি। হত্যা মামলার তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার টেকনাফে এলে আমি তাদের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম। বিষয়টি তাদের তদন্তের বিষয় নয় উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি আমার বক্তব্য শোনেনি। এছাড়া প্রদীপের বাহিনীর লোকজন এখনও এলাকায় আছে। তাই কিছুটা ভয়ে আছি। প্রশাসন যদি আমাকে আশ্বস্ত করে তাহলে আমি ওসি প্রদীপসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করব।

ঘটনাপ্রবাহ : ওসি প্রদীপ কুমার দাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত