ইতিহাসের অনন্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমান
jugantor
ইতিহাসের অনন্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমান

  ড. মো. আলাউদ্দিন  

১৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবি

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই প্রথম বাঙালি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর মুক্তির পেছনেই কোনো না কোনো সম্মোহনী নেতৃত্বের বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকে। তেমনি বাঙালি জাতির মুক্তির পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রয়েছে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। বাঙালি জাতির নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু কখনই দ্বিধান্বিত ছিলেন না। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ত্রাসস্বরূপ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধে।

ছাত্রনেতা থাকাকালীনই বঙ্গবন্ধু পাক জান্তার বিশেষ নজরদারিতে ছিলেন। পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করতে থাকলে বঙ্গবন্ধুর অংশগ্রহণে তা যেন প্রাণ পায়। সমসাময়িক কোনো ছাত্রনেতাকে পাকিস্তান ইনটেলিজেন্স এতটা গুরুত্ব দেয়নি। বিশেষ করে ছয় দফা উত্থাপনের পর শেখ মুজিব বাংলার মানুষের কাছে মুক্তিদাতা রূপে আবির্ভূত হন। ছয় দফা হল বাঙালির মুক্তির সনদ। স্বাধিকার আন্দোলনের ধারা কীভাবে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হয়েছে তা স্পষ্ট হয় ছয় দফার মাধ্যমে। প্রাদেশিক সরকারের হাতে ক্ষমতা প্রদান, ভিন্ন মুদ্রানীতি প্রচলন, বিশেষত আধা সামরিক বাহিনী গঠনের জোরালো প্রস্তাবে পূর্ণ স্বাধিকারের বিষয়টিই ঘোষিত হয়। উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তান বরাবরই ছিল অবহেলিত, শোষিত ও বঞ্চিত। এখানকার কাঁচামাল ও পুঁজিতে পশ্চিম পাকিস্তানে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন বাঙালির জন্য বয়ে আনে এক অশুভ ইঙ্গিত। বাংলার মেহনতি মানুষের টাকায় অস্ত্র কেনা হলেও এখানকার মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি সবসময় উপেক্ষিত থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি তাই ছয় দফায় অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে। অতি দ্রুতই তার ভুল ভাঙে। বালির বাঁধসদৃশ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র। পাকিস্তান রাষ্ট্র যে টিকবে না, প্রতিষ্ঠার পরপরই তা বলেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা। উপমহাদেশের রাজনীতির এ হাওয়াবদল ছাত্রনেতা শেখ মুজিবও আঁচ করতে পেরেছিলেন সহজেই। প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানকে একটি নিপীড়ক রাষ্ট্রের ভূমিকায় দেখা যায়। ন্যায় ও সুশাসন থেকে বিচ্যুত হয়ে শোষকের সংহারক মূর্তি ধারণ করে পাকিস্তানের স্বৈরাচার শাসকগোষ্ঠী। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিলেও কখনও সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিলেন না তিনি। ব্রিটিশের কূটচালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী- মানবতার এ মহান মন্ত্র জীবনের প্রারম্ভেই আয়ত্ত করেছিলেন শেখ মুজিব। বাঙালি জাতির এ আবহমান মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণ অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তি।

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান বাঙালির মুক্তির স্মারক হয়ে উঠতে পারেনি। ছদ্মবেশধারী পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিরা নতুন করে শোষণের শৃঙ্খলে বন্দি হলে তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিব সেটি শুরুতেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। বেকার হোস্টেলে সহকর্মীদের নিয়ে নতুন করে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশভাগের পর শেখ মুজিব কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের হাল ধরেন। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবুল হাশিম-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল গ্রুপে বঙ্গবন্ধুকে দেখা যায়। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক বোধের পরিচয় শেখ মুজিব দিলেন, তা-ই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ রূপে স্থান পেল। স্বাধীনতার মন্ত্রে ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে সবার সমান মর্যাদা-অধিকার নিশ্চিত করলেন তিনি।

ভোরের সূর্যোদয় : নেতৃত্বগুণ যেন শেখ মুজিবের সহজাত। স্কুলজীবনে ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের সৈনিক হামিদ মাস্টারের হাতে দীক্ষা নেন তিনি। প্রিয় শিক্ষক হামিদ মাস্টারের সঙ্গে ধর্মগোলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ছেলেবেলায়ই শেখ মুজিবের ভেতর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার সূত্রপাত হয়। গ্রামে ফুটবল দলের নেতৃত্ব দিতেও পটু ছিলেন শেখ মুজিব। দু’গ্রামের লোকের মধ্যে বিদ্যমান হানাহানি ও মারামারি মীমাংসা করেছেন। জন্মগতভাবেই শেখ মুজিবের ছিল দুঃখী ও মেহনতি মানুষের প্রতি একটি অতি সংবেদনশীল হৃদয়। শোষিত মানুষের এ দুঃখ-বঞ্চনা তাকে গভীরভাবে পীড়া দিত। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র একটি অংশ থেকে যার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যায়-

“আমার মনে আছে খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল, ‘বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমায় একটু বসতে হবে।’ আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই। অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল, ‘খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছুই নাই।’ আমার চোখে পানি এল। আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না।’ টাকা সে নিল না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘গরিবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা।’ নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল, যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। সেই দিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।”

ভয়-লোভহীন ব্যক্তিত্ব : বাংলার বড় বড় নেতার মধ্যে দ্বিচারিতা বাঙালির শোষণ মুক্তির পথকে দীর্ঘায়িত করেছে। কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা, ফারসি ভাষা শিক্ষা, ওই কায়দায় পাগড়ি পরা ইত্যাদি নানা চেষ্টায় বাঙালি নেতারাই ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তিকে দৃঢ় করেছেন। বঙ্গীয় রেনেসাঁ পুরুষরা কেউই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পূর্ণ প্রচেষ্টা চালাননি। মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় বাঙালির তৃতীয় জাগরণ। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিই মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি। বাঙালির এ মুক্তির পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। উল্লেখ্য, তখন বিশ্ব ছিল দু’ব্লকে বিভক্ত- সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী। উপনিবেশ ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো স্বাধিকারের আন্দোলন শুরু করলে সমাজতান্ত্রিক ব্লক তাদের সহযোগিতা করে। এর পেছনে সঙ্গত কারণ ছিল স্বাধীনতাকামী রাষ্ট্রগুলোর সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্নতা। অপরদিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তখন ভূমি দখলভিত্তিক প্রচলিত সাম্রাজ্যবাদের ধরন পাল্টে বাজার ও মস্তিষ্ক দখল করে সাম্রাজ্যবাদের এক অভিনব রূপ প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ মোটেও সহজসাধ্য ছিল না।

এমন স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির হাল ধরেন শক্ত হাতে। বঙ্গবন্ধুকে একই জেলে বেশি দিন আটকে রাখতেও ভয় পেত শাসকগোষ্ঠী। তিনি যে কতটা নির্ভয় ও নির্লোভ ছিলেন তা একটি ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন ও নেতৃত্ব দেয়ায় শেখ মুজিবসহ কয়েকজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। শেখ মুজিব ছাড়া সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব বহাল রাখেন। শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অন্যায় সিদ্ধান্তে মুচলেকা দিতে অস্বীকার করেন। ফলে ওই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনের অবসান ঘটে। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তিনি বলে যান, ‘আমি আবার একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসবই, তবে হয়তো ছাত্র হিসেবে নয়।’ বাবা শেখ লুৎফর রহমানের পুত্রকে আইনজীবী বানানোর আশায় গুড়ে বালি পড়ে। তবু শেখ মুজিবের চিত্ত একবিন্দুও টলেনি। তিনি ব্যস্ত ছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে সংগঠিত করতে, সঠিক পথে পরিচালিত করতে। মিথ্যা মামলা সাজিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার চেষ্টাও কম করা হয়নি। পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রেখে কবর খোঁড়া হয়েছে- তবুও বিচলিত হননি শেখ মুজিব। বাঙালির মুক্তিই ছিল তার একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান।

সম্মোহনী গুণেই মুজিব শ্রেষ্ঠ : ক্যারিশমা শব্দের আভিধানিক অর্থ- ‘অলৌকিক ক্ষমতা’। সমাজবিজ্ঞানে অলৌকিক ক্ষমতা বা অলৌকিকত্ব টার্ম ব্যবহার করা হয় না। সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় ক্যারিশমা বলতে অলৌকিক ক্ষমতা না বলে অসাধারণ কিছু করার ক্ষমতাকে বোঝায়। এ ক্ষমতাই হচ্ছে সম্মোহনী শক্তি। নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সম্মোহন। বাঙালি জাতির সামনে মুক্তিদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন টুঙ্গিপাড়ার খোকা। এ খোকা পরবর্তীকালে বাঙালি জাতির পিতা হিসেবে এক অনন্য উচ্চতায় নিজকে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. জিল্লুর রহমান খান তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অন্যায়ভাবে স্থগিত ঘোষণার পর তিনি একটি কার্যকর সরকার পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন বিশ্বের একমাত্র নেতা, যিনি অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি লোকের জন্য একটি কার্যকর সরকার গঠন করেছিলেন। তিনি এমন এক অনুপম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার মাধ্যমে আমরা দেখছি এমন এক ক্যারিশমেটিক নেতার অভ্যুদয়- যিনি একান্তই স্বদেশীয় একজন। তার মতো বিশিষ্ট প্রায় সব নেতা- যেমন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও বন্দরনায়েকে- এদের সবাই পাশ্চাত্যে পড়াশোনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু তার স্বীয় গুণেই এমন এক নেতায় পরিণত হয়েছিলেন- তিনি যা চাইতেন জনগণ সেটাই করত।’

আমরা সচরাচর দেখি, বেশিরভাগ নেতার কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। এ সংকটটি এদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে প্রকটভাবে লক্ষ করা যায়। তারা মানুষের মুক্তির কথাই বলে; কিন্তু মানুষ তাদের কথা বোঝে না। অনেকেই ‘পুঁজিবাদ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘বুর্জোয়া’, ‘পেটিবুর্জোয়া’ ও ‘প্রোলেটারিয়েট’ ধরনের কিছু গৎবাঁধা শব্দ ছাড়া সাধারণ মানুষের ভাষায় যেন কথাই বলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করতেন না। কৃষক-শ্রমিক-রাজনীতিক-শিক্ষক সবাই তার কথা বুঝতে পারত। তন্ময় হয়ে শুনত। চুম্বকের মতো তিনি শ্রোতাদের টানতেন।

তৎকালীন বৈশ্বিক টালমাটাল প্রেক্ষাপটে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতার প্রয়োজন ও ভূমিকা ছিল অপরিহার্য, যিনি একইসঙ্গে মানবিক ও আপসহীন। তৎকালীন অনেক বাঘা বাঘা নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে শেখ মুজিব সবার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন তার সাহস ও স্বকীয়তায়। তার সামগ্রিক ত্যাগ ও সাহসী নেতৃত্বের ফলেই বাঙালি পেয়েছে হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

অধ্যাপক ড. মো. আলাউদ্দিন : উপাচার্য, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল

(আগামীকাল প্রকাশিত হবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের লেখা)

ইতিহাসের অনন্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমান

 ড. মো. আলাউদ্দিন 
১৫ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবি

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই প্রথম বাঙালি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর মুক্তির পেছনেই কোনো না কোনো সম্মোহনী নেতৃত্বের বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকে। তেমনি বাঙালি জাতির মুক্তির পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রয়েছে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। বাঙালি জাতির নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু কখনই দ্বিধান্বিত ছিলেন না। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ত্রাসস্বরূপ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধে।

ছাত্রনেতা থাকাকালীনই বঙ্গবন্ধু পাক জান্তার বিশেষ নজরদারিতে ছিলেন। পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করতে থাকলে বঙ্গবন্ধুর অংশগ্রহণে তা যেন প্রাণ পায়। সমসাময়িক কোনো ছাত্রনেতাকে পাকিস্তান ইনটেলিজেন্স এতটা গুরুত্ব দেয়নি। বিশেষ করে ছয় দফা উত্থাপনের পর শেখ মুজিব বাংলার মানুষের কাছে মুক্তিদাতা রূপে আবির্ভূত হন। ছয় দফা হল বাঙালির মুক্তির সনদ। স্বাধিকার আন্দোলনের ধারা কীভাবে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হয়েছে তা স্পষ্ট হয় ছয় দফার মাধ্যমে। প্রাদেশিক সরকারের হাতে ক্ষমতা প্রদান, ভিন্ন মুদ্রানীতি প্রচলন, বিশেষত আধা সামরিক বাহিনী গঠনের জোরালো প্রস্তাবে পূর্ণ স্বাধিকারের বিষয়টিই ঘোষিত হয়। উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তান বরাবরই ছিল অবহেলিত, শোষিত ও বঞ্চিত। এখানকার কাঁচামাল ও পুঁজিতে পশ্চিম পাকিস্তানে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন বাঙালির জন্য বয়ে আনে এক অশুভ ইঙ্গিত। বাংলার মেহনতি মানুষের টাকায় অস্ত্র কেনা হলেও এখানকার মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি সবসময় উপেক্ষিত থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি তাই ছয় দফায় অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে। অতি দ্রুতই তার ভুল ভাঙে। বালির বাঁধসদৃশ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র। পাকিস্তান রাষ্ট্র যে টিকবে না, প্রতিষ্ঠার পরপরই তা বলেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা। উপমহাদেশের রাজনীতির এ হাওয়াবদল ছাত্রনেতা শেখ মুজিবও আঁচ করতে পেরেছিলেন সহজেই। প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানকে একটি নিপীড়ক রাষ্ট্রের ভূমিকায় দেখা যায়। ন্যায় ও সুশাসন থেকে বিচ্যুত হয়ে শোষকের সংহারক মূর্তি ধারণ করে পাকিস্তানের স্বৈরাচার শাসকগোষ্ঠী। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিলেও কখনও সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিলেন না তিনি। ব্রিটিশের কূটচালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী- মানবতার এ মহান মন্ত্র জীবনের প্রারম্ভেই আয়ত্ত করেছিলেন শেখ মুজিব। বাঙালি জাতির এ আবহমান মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণ অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তি।

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান বাঙালির মুক্তির স্মারক হয়ে উঠতে পারেনি। ছদ্মবেশধারী পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিরা নতুন করে শোষণের শৃঙ্খলে বন্দি হলে তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিব সেটি শুরুতেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। বেকার হোস্টেলে সহকর্মীদের নিয়ে নতুন করে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশভাগের পর শেখ মুজিব কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের হাল ধরেন। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবুল হাশিম-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল গ্রুপে বঙ্গবন্ধুকে দেখা যায়। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক বোধের পরিচয় শেখ মুজিব দিলেন, তা-ই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ রূপে স্থান পেল। স্বাধীনতার মন্ত্রে ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে সবার সমান মর্যাদা-অধিকার নিশ্চিত করলেন তিনি।

ভোরের সূর্যোদয় : নেতৃত্বগুণ যেন শেখ মুজিবের সহজাত। স্কুলজীবনে ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের সৈনিক হামিদ মাস্টারের হাতে দীক্ষা নেন তিনি। প্রিয় শিক্ষক হামিদ মাস্টারের সঙ্গে ধর্মগোলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ছেলেবেলায়ই শেখ মুজিবের ভেতর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার সূত্রপাত হয়। গ্রামে ফুটবল দলের নেতৃত্ব দিতেও পটু ছিলেন শেখ মুজিব। দু’গ্রামের লোকের মধ্যে বিদ্যমান হানাহানি ও মারামারি মীমাংসা করেছেন। জন্মগতভাবেই শেখ মুজিবের ছিল দুঃখী ও মেহনতি মানুষের প্রতি একটি অতি সংবেদনশীল হৃদয়। শোষিত মানুষের এ দুঃখ-বঞ্চনা তাকে গভীরভাবে পীড়া দিত। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র একটি অংশ থেকে যার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যায়-

“আমার মনে আছে খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল, ‘বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমায় একটু বসতে হবে।’ আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই। অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল, ‘খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছুই নাই।’ আমার চোখে পানি এল। আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না।’ টাকা সে নিল না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘গরিবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা।’ নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল, যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। সেই দিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।”

ভয়-লোভহীন ব্যক্তিত্ব : বাংলার বড় বড় নেতার মধ্যে দ্বিচারিতা বাঙালির শোষণ মুক্তির পথকে দীর্ঘায়িত করেছে। কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা, ফারসি ভাষা শিক্ষা, ওই কায়দায় পাগড়ি পরা ইত্যাদি নানা চেষ্টায় বাঙালি নেতারাই ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তিকে দৃঢ় করেছেন। বঙ্গীয় রেনেসাঁ পুরুষরা কেউই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পূর্ণ প্রচেষ্টা চালাননি। মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় বাঙালির তৃতীয় জাগরণ। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিই মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি। বাঙালির এ মুক্তির পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। উল্লেখ্য, তখন বিশ্ব ছিল দু’ব্লকে বিভক্ত- সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী। উপনিবেশ ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো স্বাধিকারের আন্দোলন শুরু করলে সমাজতান্ত্রিক ব্লক তাদের সহযোগিতা করে। এর পেছনে সঙ্গত কারণ ছিল স্বাধীনতাকামী রাষ্ট্রগুলোর সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্নতা। অপরদিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তখন ভূমি দখলভিত্তিক প্রচলিত সাম্রাজ্যবাদের ধরন পাল্টে বাজার ও মস্তিষ্ক দখল করে সাম্রাজ্যবাদের এক অভিনব রূপ প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ মোটেও সহজসাধ্য ছিল না।

এমন স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির হাল ধরেন শক্ত হাতে। বঙ্গবন্ধুকে একই জেলে বেশি দিন আটকে রাখতেও ভয় পেত শাসকগোষ্ঠী। তিনি যে কতটা নির্ভয় ও নির্লোভ ছিলেন তা একটি ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন ও নেতৃত্ব দেয়ায় শেখ মুজিবসহ কয়েকজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। শেখ মুজিব ছাড়া সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব বহাল রাখেন। শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অন্যায় সিদ্ধান্তে মুচলেকা দিতে অস্বীকার করেন। ফলে ওই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনের অবসান ঘটে। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তিনি বলে যান, ‘আমি আবার একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসবই, তবে হয়তো ছাত্র হিসেবে নয়।’ বাবা শেখ লুৎফর রহমানের পুত্রকে আইনজীবী বানানোর আশায় গুড়ে বালি পড়ে। তবু শেখ মুজিবের চিত্ত একবিন্দুও টলেনি। তিনি ব্যস্ত ছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে সংগঠিত করতে, সঠিক পথে পরিচালিত করতে। মিথ্যা মামলা সাজিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার চেষ্টাও কম করা হয়নি। পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রেখে কবর খোঁড়া হয়েছে- তবুও বিচলিত হননি শেখ মুজিব। বাঙালির মুক্তিই ছিল তার একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান।

সম্মোহনী গুণেই মুজিব শ্রেষ্ঠ : ক্যারিশমা শব্দের আভিধানিক অর্থ- ‘অলৌকিক ক্ষমতা’। সমাজবিজ্ঞানে অলৌকিক ক্ষমতা বা অলৌকিকত্ব টার্ম ব্যবহার করা হয় না। সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় ক্যারিশমা বলতে অলৌকিক ক্ষমতা না বলে অসাধারণ কিছু করার ক্ষমতাকে বোঝায়। এ ক্ষমতাই হচ্ছে সম্মোহনী শক্তি। নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সম্মোহন। বাঙালি জাতির সামনে মুক্তিদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন টুঙ্গিপাড়ার খোকা। এ খোকা পরবর্তীকালে বাঙালি জাতির পিতা হিসেবে এক অনন্য উচ্চতায় নিজকে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. জিল্লুর রহমান খান তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অন্যায়ভাবে স্থগিত ঘোষণার পর তিনি একটি কার্যকর সরকার পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন বিশ্বের একমাত্র নেতা, যিনি অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি লোকের জন্য একটি কার্যকর সরকার গঠন করেছিলেন। তিনি এমন এক অনুপম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার মাধ্যমে আমরা দেখছি এমন এক ক্যারিশমেটিক নেতার অভ্যুদয়- যিনি একান্তই স্বদেশীয় একজন। তার মতো বিশিষ্ট প্রায় সব নেতা- যেমন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও বন্দরনায়েকে- এদের সবাই পাশ্চাত্যে পড়াশোনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু তার স্বীয় গুণেই এমন এক নেতায় পরিণত হয়েছিলেন- তিনি যা চাইতেন জনগণ সেটাই করত।’

আমরা সচরাচর দেখি, বেশিরভাগ নেতার কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। এ সংকটটি এদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে প্রকটভাবে লক্ষ করা যায়। তারা মানুষের মুক্তির কথাই বলে; কিন্তু মানুষ তাদের কথা বোঝে না। অনেকেই ‘পুঁজিবাদ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘বুর্জোয়া’, ‘পেটিবুর্জোয়া’ ও ‘প্রোলেটারিয়েট’ ধরনের কিছু গৎবাঁধা শব্দ ছাড়া সাধারণ মানুষের ভাষায় যেন কথাই বলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করতেন না। কৃষক-শ্রমিক-রাজনীতিক-শিক্ষক সবাই তার কথা বুঝতে পারত। তন্ময় হয়ে শুনত। চুম্বকের মতো তিনি শ্রোতাদের টানতেন।

তৎকালীন বৈশ্বিক টালমাটাল প্রেক্ষাপটে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতার প্রয়োজন ও ভূমিকা ছিল অপরিহার্য, যিনি একইসঙ্গে মানবিক ও আপসহীন। তৎকালীন অনেক বাঘা বাঘা নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে শেখ মুজিব সবার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন তার সাহস ও স্বকীয়তায়। তার সামগ্রিক ত্যাগ ও সাহসী নেতৃত্বের ফলেই বাঙালি পেয়েছে হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

অধ্যাপক ড. মো. আলাউদ্দিন : উপাচার্য, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল

(আগামীকাল প্রকাশিত হবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের লেখা)

 

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট