খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে এখনও বিভ্রান্তি

অসুস্থতার বিষয়ে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছে না * জামিন শুনানি এগিয়ে আনতে আজ আবেদন করা হতে পারে * ফখরুলকে দেখা করতে না দেয়ায় সন্দেহ বাড়ছে

  যুগান্তর রিপোর্ট ০১ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খালেদা

কারা অন্তরীণ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিভ্রান্তি কাটছে না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রয়োজনে খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিয়ে চিকিৎসা করানো হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, খালেদা জিয়া সুস্থ আছেন। তিনি কিছু ক্রনিক রোগে ভুগছেন।

২৮ মার্চ কারা কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে খালেদা জিয়া অসুস্থ। এরপর কারাগারের চিকিৎসক বলেছেন খালেদা জিয়া অসুস্থ নন। পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে বিএনপির এক নেতা দাবি করেছেন খালেদা জিয়া আগের চেয়ে কিছুটা অসুস্থ। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হোক। এ ধরনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বা সুস্থতা সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য পাচ্ছেন না দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। ফলে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে।

এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার প্রয়োজন- এমন কারণ দেখিয়ে তার জামিন আবেদনের শুনানি এগিয়ে আনা যায় কিনা এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন তার আইনজীবীরা। আজ খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার অসুস্থার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জামিন আবেদনের শুনানি এগিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, চেয়ারপারসনের অসুস্থতা নিয়ে সরকার ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে। সরকার বলছে, খালেদা জিয়া অসুস্থ, আদালতে ফাইল উত্থাপন করা হচ্ছে। আবার কারা চিকিৎসক বলছেন, তিনি অসুস্থ নন।

তিনি বলেন, আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি চাই, যাতে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দেশে হোক বিদেশে হোক, আমরা করতে পারি। যেহেতু খালেদা জিয়া এর আগে দেশের বাইরেও চিকিৎসা করিয়েছেন, সেহেতু মুক্তি পেলে তিনিই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা প্যারোলে মুক্তি দিয়ে সরকারকে তার চিকিৎসার কথা বলিনি। জামিন তার প্রাপ্য। সেটাই আমরা দাবি করছি।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুব হোসেন শনিবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের বলছে না তিনি কতটা অসুস্থ। সরকারও এ বিষয়ে কোনো কিছু জানাচ্ছে না। তার অসুস্থতার বিষয়ে কিছু জানানো হচ্ছে না। তার জামিনের পরবর্তী শুনানি ৮ মে। আমরা অসুস্থ খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি এগিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করছি। আজ তা আদালতের নজরে আনব। আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকনও একই তথ্য জানান।

জানা গেছে, খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনে তার অসুস্থতার বিষয়টিকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৮ মার্চ কারা কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে আদালতকে জানিয়েছে খালেদা জিয়া অসুস্থ বিধায় তাকে আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না। বিএনপির হাইকমান্ড মনে করছে তাদের জামিন আবেদনে উল্লিখিত একটি কারণের সঙ্গে (অসুস্থতা) কারা কর্তৃপক্ষের চিঠির মিল আছে। বিএনপির আইনজীবীরাও বলেছেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ, কারা কর্তৃপক্ষও বলেছে অসুস্থ। কাজেই তার জামিনের ক্ষেত্রে অসুস্থতার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে আশা করেন তারা।

সূত্র জানায়, ২৮ মার্চ জিয়া চ্যারিটেবল মামলার শুনানিতে খালেদা জিয়াকে হাজির করার জন্য আদালত কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই অসুস্থতার বিষয়টি সামনে আসে। ওই দিন বিএনপির চেয়ারপারসনকে হাজির না করে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানায় তিনি অসুস্থ। এরপর থেকেই তার অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একপর্যায়ে কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের সাক্ষাৎ স্থগিত করার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা ধরনের কথা উঠছে। বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে কথা বলে। শুক্রবার পরিবারের সদস্যরা কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতের পর বিএনপির অনেক নেতা তাদের কাছ থেকে চেয়ারপারসনের অসুস্থতার বিষয়টি জানার চেষ্টা করেন। পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, চেয়ারপারসন আগের চেয়ে কিছুটা অসুস্থ। তার পায়ের ব্যথা কিছুটা বেড়ে গেছে। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নয়।

কারাগারে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে কোনো পক্ষই স্পষ্ট করে কিছু না বলায় যে যার মতো করে বিষয়টি আলোচনা করছেন। এ অবস্থায় তিনি আসলে কতটা অসুস্থ তা জানার জন্য নানা মাধ্যমে চেষ্টা চালাচ্ছেন সাধারণ মানুষসহ দলের নেতাকর্মীরা। হঠাৎ করে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবর, দলের মহাসচিবের সাক্ষাৎ স্থগিত করে তার শারীরিক অবস্থা দেখতে সিভিল সার্জনকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় উদ্বিগ্ন দলের নেতাকর্মীরা। মহাসচিবকে দেখা করতে না দিলেও চেয়ারপারসনের পরিবারের সদস্যদের দেখা করতে দেয়ার বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না তারা। কৌশলের অংশ হিসেবে সরকার এ কাজ করছে বলে তারা সন্দেহ করছেন।

বিএনপির নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আসলে কী, তা বিএনপির কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানা কথাবার্তায় তাদের সন্দেহ হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে একেকজন একেক তথ্য দিচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষও সঠিক কোনো তথ্য জানাচ্ছে না। অসুস্থতার কারণে তাকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি বলে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানায়। আবার কারাগারে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিয়োজিত চিকিৎসক বলছেন তিনি সুস্থ আছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে বিদেশ পাঠানো হবে। শনিবার ওবায়দুল কাদের জানান, তিনি আগের মতোই আছেন। অসুস্থতা নিয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করছে। তারপরও তার শারীরিক অবস্থা জানতে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হবে। অপরদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, তিনি সুস্থ। তাদের এমন কথাবার্তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে সরকার নতুন কোনো কৌশল নিচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে সতর্ক দলটির নেতারা।

এদিকে কারাগারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা দেখার জন্য সরকার সিভিল সার্জনকে বৃহস্পতিবার পাঠিয়েছিল। সিভিল সার্জন কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দেননি। তিনি কারা কর্তৃপক্ষকে বলেছেন, খালেদা জিয়ার আগের যেসব সমস্যা ছিল, সেগুলো আছে। নতুন করে কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি।

একজন কারা চিকিৎসক শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, ‘উনি (খালেদা জিয়া) ভালো আছেন। ওনার হাঁটুতে সমস্যা ছিল, যে কারণে হাঁটতে কষ্ট হয়। এ সমস্যা আগে থেকেই ছিল। এটা ছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই। এছাড়া তার বয়স ৭৩ বছর। এ বয়সে যে সমস্যা থাকে তা রয়েছে। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো অবস্থা হয়নি।

বিএনপি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে মহাসচিবকে দেখা করতে না দেয়ার কারণও তারা বের করার চেষ্টা করছেন। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তার পরামর্শে দল পরিচালিত হচ্ছে। সামনে সিটি নির্বাচন। এ নির্বাচন নিয়ে তারা এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এ ব্যাপারে মতামত জানতে মহাসচিব কারাগারে চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার বিষয়টি বুঝতে পেরে অসুস্থতার কথা বলে দেখার সুযোগ দেয়নি। সিটি নির্বাচন ছাড়াও দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে চেয়ারপারসনের সঙ্গে কথা বলতেই মহাসচিব কারাগারে যাওয়ার অনুমতি চান।

৮ ফেব্র“য়ারি খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। ওই দিন থেকেই তিনি কারাগারে আছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : কারাগারে খালেদা জিয়া

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter