স্বজনদের চোখের সামনে ঝরছে দগ্ধদের প্রাণ
jugantor
স্বজনদের চোখের সামনে ঝরছে দগ্ধদের প্রাণ
বাঁচার আকুতি, ভাষা নেই সান্ত্বনার

  শিপন হাবীব  

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমার বাবাকে বাঁচান। বাবার নাকি কণ্ঠনালি, ফুসফুস, কলিজাও পুড়ে গেছে। আমার কলিজা, ফুসফুস কণ্ঠনালি নিয়ে বাবাকে লাগিয়ে দিন। হে, আল্লাহ তুমি বাবাকে সুস্থ করে দাও। আমাদের বাবা ২৫ বছর ধরে ইমামতি করছেন।’

চিকিৎসকদের মিনতি করছেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন ৯৬ শতাংশ দগ্ধ মাওলানা আবদুল মালেকের ছেলে ফাহিদুল ইসলাম।

চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার রাত ৯টা ৩ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ইমাম আবদুল মালেক। এ সময় আরেক দগ্ধ নিজান হোসেন নিজাম মারা যান।

নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের সময় নামাজ পড়াচ্ছিলেন মাওলানা আবদুল মালেক। মসজিদটিতে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি ইমামতি করছিলেন। হাফেজ ছেলে ফাহিদুল ইসলাম জানান, বাবার আদর্শেই দুই ভাই এক বোন মানুষ হচ্ছেন।

মা আসমা বেগম আর ছোট বোন তোবা আক্তার বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। বললেন, দুর্ঘটনার পরপর বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের। ওই সময় বাবা বলছিলেন, তাকে যেন হাসপাতালে না নেয়া হয়, মসজিদেই মরতে চান।

বার্ন ইউনিটে ভর্তি ২৭ বছর বয়সী নয়নের পাশে শুক্রবার রাত থেকেই ছোটভাই শুভ শামীম ছিলেন। শনিবার দুপুরে চোখের সামনেই ছটফট করে প্রাণ হারান নয়ন। ভাই হারানোর চিৎকারে বিদীর্ণ হাসপাতালের বাতাস।

লাশ জড়িয়ে ধরে বারবার বলছিল, আমি এখন মা-বাবাকে কী বলব। তার ভাই গার্মেন্টে কাজ করত। তাদের বাড়ি লালমনিরহাট সদরে। বাবা মেহের আলী কৃষক, মা বুলবুলী বেগম অসুস্থ, তারা গ্রামে থাকেন। মা বাবাকে বলা হয়েছে ভাই সুস্থ আছে। এখন ভাইয়ের লাশ নিয়ে যেতে হবে।

৫০ বছর বয়সী হুমায়ুন কবির দুপুর ১টার দিকে মারা যান। তার ৯৭ শতাংশ শরীর পুড়ে গিয়েছিল। ছেলে রনি শুধু বিলাপ করছিল। কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না।

একপর্যায়ে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে বারান্দায় গিয়ে বুক থাপড়িয়ে বিলাপ করছিল রনি। বারান্দায় রোগীদের স্বজনরাও চিৎকার শুরু করেন। সবাই আতঙ্কে- কখন যে তার স্বজন প্রাণ হারান। কেউ কাউকে শান্তনা দিতে পারছিলেন না।

১২ বছর বয়সী মাইনুদ্দিন শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মারা যায়। ১৮ বয়সী রিফাতের শরীর ৯৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। সকাল সাড়ে ১০টায় মারা যায় সে। বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রিফাতের লাশ ওয়ার্ডের এক কোনায় ছিল।

দুপুর ২টার দিকে কাঞ্চন হাওলাদার (৫০) মারা যান। আহতদের মধ্যে একের পর এক যখন মারা যাচ্ছিলেন, তখন ব্যাকুল হয়ে উঠছিলেন বেঁচে থাকা দগ্ধদের স্বজনরা।

পাশাপাশি বেডে শুইয়ে কাতরাচ্ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন এবং ৩০ বছরের ইমরান। তারা সম্পর্কে ভায়রা ভাই। আমজাদের ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে।

স্ত্রী তানজিলা শুধুই কাঁদছিলেন। আমজাদ বারবার বলছিলেন, একটিবারের জন্য মাকে দেখতে চান। চার বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে আমেনাকে একটিবার দেখতে চান।

তানজিলা জানান, তার মা (শাশুড়ি) অনেক অসুস্থ আর মেয়ে আমেনা ছোট। তাকে বাসায় রেখে এসেছেন। তানজিলা একবার স্বামীর কাছে আবার বোনের স্বামী ইমরানের কাছে দৌড়াচ্ছিলেন।

দু’হাত তুলে প্রার্থনা করছিলেন, তাদের যেন আল্লাহ সুস্থ করে দেন। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ব্যাকুল ইমরানের মা আলেয়া বেগম আসেন।

একজন আনসার সদস্য তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। ছেলের শরীর ৯৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। নিজের ছেলেকে চিনতে পারছিলেন না। ইমরানের ‘মা মা’ ডাকে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মা।

বলছিলেন, বাবা, তোমরা আমার ছেলেরে বাঁচাও। বিলাপ করছিলেন ইমরানের স্ত্রী মুক্তা আক্তার। তাদের ছেলে ইব্রাহিমকে (৮) কী বলবে।

সুমাইয়া ও শাহীন নামের দুই ভাইবোন দগ্ধ বাবাকে পানি খাওয়াচ্ছিলেন। বাবা শামীম হাসানের ৯৫ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে। যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন বাবা, সুমাইয়া আর শাহীন বলে ডেকেছিলেন।

সুমাইয়া জানান, মসজিদের পেছনের দ্বিতীয়তলা বাসাটিই তাদের। বাবা নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি করছেন। বাবা মসজিদে সবসময় নামাজ পড়েন। বাবার পায়ের কাছে মাথা রেখে প্রার্থনা করছিল ছেলে শাহীন।

৫৫ বছর বয়সী ফরিদ মিয়ার কোনো সাড়া নেই। পাশে থাকা ছোটভাই সুহেল মিয়া শুধুই কাঁদছেন। তাদের মা-বাবা মারা গেছেন। ভাই ফরিদ মিয়ার দুই মেয়ে দুই ছেলে।

কৃষিকাজ করতেন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন ময়মনসিংহে। বৃহস্পতিবার সুহেল মিয়ার বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। ফরিদ প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়তেন। জুলহাসের (৩০) ৮৮ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে।

বারবার একমাত্র ছেলে জুবায়েরকে ডাকছিলেন। বারবার এ প্রতিবেদককে অনুরোধ করছিলেন, একটিবারের জন্য যেন ছেলেকে তার কাছে এনে দেয়া হয়।

মৃত্যুর আগে ছেলেকে দেখে মরতে চান। ডাক্তার বললেন, জুলহাসের সঙ্গে তার সাত বছরের শিশুসন্তান জুবায়েরকেও বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল।

রাত ১টার দিকে শিশু জুবায়েরের মৃত্যু হয়। জুলহাস হয়তো সে খবর জানেন না। ছেলে জুবায়েরকে হারিয়ে মা ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। জুলহাস এ প্রতিবেদককে বলছিলেন, তাকে যেন এ হাসপাতাল থেকে যেতে দেয়া হয়।

ছেলেকে দেখেই আবার চলে আসবে। কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়েন জুলহাস। স্ত্রী রাহিমা জানান, ছেলের লাশ এখনও (দুপুর পৌনে ২টা) বুঝে পাননি। মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন রাহিমা।

ভোর রাতের দিকে মারা যান মোস্তফা কামাল। তার বাড়ি চাঁদপুর। ১৫ দিন আগে গ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ এসে টিউশনি শুরু করেন। বিয়ে করেছেন, স্ত্রী চাঁদপুর গ্রামের বাড়িতে থাকেন। চাকরি হলেই তাকে ঢাকায় নিয়ে আসবেন, পরিবারের সদস্যদের এ কথা বলে এসেছিলেন।

কথাগুলো বলছিলেন তার বাবা করিম মিঝি। বললেন, তার ছেলে স্নাতক পাস করে চাকরির খোঁজে নারায়ণগঞ্জ এসেছিল। শনিবার দুপুর পর্যন্ত ছেলের লাশ গ্রহণ করতে পারেননি তিনি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৯টার দিকে দুই ভাই সাব্বির (২১) ও জুবায়ের (১৮) মারা যান। মা-কুলসুম বেগম ও বাবা নূর উদ্দিন দুপুরে জানতে পারেন। বাবা জানান, তাদের সঙ্গে আরেক ছেলে ইয়াসিন ফরজ নামাজ আদায় শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। নূর উদ্দিন আর কুলসুম বেগমকে কেউ সান্ত্বনা

দিতে পারছিলেন না। দু’জনই বুক থাপড়িয়ে বিলাপ করছিলেন। বিকাল ৪টার দিকে ১০ নম্বর বেডে শুয়ে থাকা আলী মাস্টার ‘বাবা বাবা’ বলে বিলাপ করছিলেন। দু’হাত তুলে বলছিলেন, আল্লাহ, তুমি আমাকে বাঁচিয়ে দাও। আমার বাবার কাছে যেতে দাও। বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি।

হাসপাতালের পঞ্চমতলায় থাকা ওয়ার্ডটি দগ্ধ রোগীতে ভর্তি। হাসপাতালটি উদ্বোধনের পর একসঙ্গে এত দগ্ধ রোগী এই প্রথম। চিকিৎসকরা বলছেন, কিছুক্ষণ পরপরই দগ্ধরা মারা যাচ্ছেন। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট ও জাতীয় বার্ন ইউনিট সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় দগ্ধ রোগীদের মৃত্যু হচ্ছে। শনিবার রাত দেড়টা পর্যন্ত ৩৭ জনের মধ্যে ২১ জন মারা গেছেন।

১৬ জন ভর্তি আছেন। তাদের অবস্থা খুবই শঙ্কটাপন্ন। সবারই ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পোড়া রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে ফোন করেছেন। সর্বদা খোঁজখবর রাখছেন।

আমরা বিশ্বমানের চিকিৎসা দিয়েও তাদের বাঁচাতে পারছি না। তাদের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে।

যারা মারা গেছেন তারা হলেন- ইমাম মাওলানা আবদুল মালেক, নিজান হোসেন নিজাম, মোস্তফা কামাল, রিফাত, রাশেদ, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহীম, জুয়েল, সাব্বির, দেলোয়ার হোসেন, জামাল, জুনায়েদ, কুদ্দুস ব্যাপারী, মাইনুদ্দিন, জয়নাল, কাঞ্চন, নয়ন, সাত বছরের শিশু জুবায়ের, রাসেল ও বাহার উদ্দিন।

স্বজনদের চোখের সামনে ঝরছে দগ্ধদের প্রাণ

বাঁচার আকুতি, ভাষা নেই সান্ত্বনার
 শিপন হাবীব 
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমার বাবাকে বাঁচান। বাবার নাকি কণ্ঠনালি, ফুসফুস, কলিজাও পুড়ে গেছে। আমার কলিজা, ফুসফুস কণ্ঠনালি নিয়ে বাবাকে লাগিয়ে দিন। হে, আল্লাহ তুমি বাবাকে সুস্থ করে দাও। আমাদের বাবা ২৫ বছর ধরে ইমামতি করছেন।’

চিকিৎসকদের মিনতি করছেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন ৯৬ শতাংশ দগ্ধ মাওলানা আবদুল মালেকের ছেলে ফাহিদুল ইসলাম।

চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার রাত ৯টা ৩ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ইমাম আবদুল মালেক। এ সময় আরেক দগ্ধ নিজান হোসেন নিজাম মারা যান। 

নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের সময় নামাজ পড়াচ্ছিলেন মাওলানা আবদুল মালেক। মসজিদটিতে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি ইমামতি করছিলেন। হাফেজ ছেলে ফাহিদুল ইসলাম জানান, বাবার আদর্শেই দুই ভাই এক বোন মানুষ হচ্ছেন।

মা আসমা বেগম আর ছোট বোন তোবা আক্তার বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। বললেন, দুর্ঘটনার পরপর বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের। ওই সময় বাবা বলছিলেন, তাকে যেন হাসপাতালে না নেয়া হয়, মসজিদেই মরতে চান।

বার্ন ইউনিটে ভর্তি ২৭ বছর বয়সী নয়নের পাশে শুক্রবার রাত থেকেই ছোটভাই শুভ শামীম ছিলেন। শনিবার দুপুরে চোখের সামনেই ছটফট করে প্রাণ হারান নয়ন। ভাই হারানোর চিৎকারে বিদীর্ণ হাসপাতালের বাতাস।

লাশ জড়িয়ে ধরে বারবার বলছিল, আমি এখন মা-বাবাকে কী বলব। তার ভাই গার্মেন্টে কাজ করত। তাদের বাড়ি লালমনিরহাট সদরে। বাবা মেহের আলী কৃষক, মা বুলবুলী বেগম অসুস্থ, তারা গ্রামে থাকেন। মা বাবাকে বলা হয়েছে ভাই সুস্থ আছে। এখন ভাইয়ের লাশ নিয়ে যেতে হবে।

৫০ বছর বয়সী হুমায়ুন কবির দুপুর ১টার দিকে মারা যান। তার ৯৭ শতাংশ শরীর পুড়ে গিয়েছিল। ছেলে রনি শুধু বিলাপ করছিল। কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না।

একপর্যায়ে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে বারান্দায় গিয়ে বুক থাপড়িয়ে বিলাপ করছিল রনি। বারান্দায় রোগীদের স্বজনরাও চিৎকার শুরু করেন। সবাই আতঙ্কে- কখন যে তার স্বজন প্রাণ হারান। কেউ কাউকে শান্তনা দিতে পারছিলেন না।

১২ বছর বয়সী মাইনুদ্দিন শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মারা যায়। ১৮ বয়সী রিফাতের শরীর ৯৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। সকাল সাড়ে ১০টায় মারা যায় সে। বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রিফাতের লাশ ওয়ার্ডের এক কোনায় ছিল।

দুপুর ২টার দিকে কাঞ্চন হাওলাদার (৫০) মারা যান। আহতদের মধ্যে একের পর এক যখন মারা যাচ্ছিলেন, তখন ব্যাকুল হয়ে উঠছিলেন বেঁচে থাকা দগ্ধদের স্বজনরা।

পাশাপাশি বেডে শুইয়ে কাতরাচ্ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন এবং ৩০ বছরের ইমরান। তারা সম্পর্কে ভায়রা ভাই। আমজাদের ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে।

স্ত্রী তানজিলা শুধুই কাঁদছিলেন। আমজাদ বারবার বলছিলেন, একটিবারের জন্য মাকে দেখতে চান। চার বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে আমেনাকে একটিবার দেখতে চান।

তানজিলা জানান, তার মা (শাশুড়ি) অনেক অসুস্থ আর মেয়ে আমেনা ছোট। তাকে বাসায় রেখে এসেছেন। তানজিলা একবার স্বামীর কাছে আবার বোনের স্বামী ইমরানের কাছে দৌড়াচ্ছিলেন।

দু’হাত তুলে প্রার্থনা করছিলেন, তাদের যেন আল্লাহ সুস্থ করে দেন। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ব্যাকুল ইমরানের মা আলেয়া বেগম আসেন।

একজন আনসার সদস্য তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। ছেলের শরীর ৯৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। নিজের ছেলেকে চিনতে পারছিলেন না। ইমরানের ‘মা মা’ ডাকে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মা।

বলছিলেন, বাবা, তোমরা আমার ছেলেরে বাঁচাও। বিলাপ করছিলেন ইমরানের স্ত্রী মুক্তা আক্তার। তাদের ছেলে ইব্রাহিমকে (৮) কী বলবে। 

সুমাইয়া ও শাহীন নামের দুই ভাইবোন দগ্ধ বাবাকে পানি খাওয়াচ্ছিলেন। বাবা শামীম হাসানের ৯৫ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে। যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন বাবা, সুমাইয়া আর শাহীন বলে ডেকেছিলেন।

সুমাইয়া জানান, মসজিদের পেছনের দ্বিতীয়তলা বাসাটিই তাদের। বাবা নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি করছেন। বাবা মসজিদে সবসময় নামাজ পড়েন। বাবার পায়ের কাছে মাথা রেখে প্রার্থনা করছিল ছেলে শাহীন। 

৫৫ বছর বয়সী ফরিদ মিয়ার কোনো সাড়া নেই। পাশে থাকা ছোটভাই সুহেল মিয়া শুধুই কাঁদছেন। তাদের মা-বাবা মারা গেছেন। ভাই ফরিদ মিয়ার দুই মেয়ে দুই ছেলে।

কৃষিকাজ করতেন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন ময়মনসিংহে। বৃহস্পতিবার সুহেল মিয়ার বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। ফরিদ প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়তেন। জুলহাসের (৩০) ৮৮ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে।

বারবার একমাত্র ছেলে জুবায়েরকে ডাকছিলেন। বারবার এ প্রতিবেদককে অনুরোধ করছিলেন, একটিবারের জন্য যেন ছেলেকে তার কাছে এনে দেয়া হয়।

মৃত্যুর আগে ছেলেকে দেখে মরতে চান। ডাক্তার বললেন, জুলহাসের সঙ্গে তার সাত বছরের শিশুসন্তান জুবায়েরকেও বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল।

রাত ১টার দিকে শিশু জুবায়েরের মৃত্যু হয়। জুলহাস হয়তো সে খবর জানেন না। ছেলে জুবায়েরকে হারিয়ে মা ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। জুলহাস এ প্রতিবেদককে বলছিলেন, তাকে যেন এ হাসপাতাল থেকে যেতে দেয়া হয়।

ছেলেকে দেখেই আবার চলে আসবে। কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়েন জুলহাস। স্ত্রী রাহিমা জানান, ছেলের লাশ এখনও (দুপুর পৌনে ২টা) বুঝে পাননি। মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন রাহিমা। 

ভোর রাতের দিকে মারা যান মোস্তফা কামাল। তার বাড়ি চাঁদপুর। ১৫ দিন আগে গ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ এসে টিউশনি শুরু করেন। বিয়ে করেছেন, স্ত্রী চাঁদপুর গ্রামের বাড়িতে থাকেন। চাকরি হলেই তাকে ঢাকায় নিয়ে আসবেন, পরিবারের সদস্যদের এ কথা বলে এসেছিলেন।

কথাগুলো বলছিলেন তার বাবা করিম মিঝি। বললেন, তার ছেলে স্নাতক পাস করে চাকরির খোঁজে নারায়ণগঞ্জ এসেছিল। শনিবার দুপুর পর্যন্ত ছেলের লাশ গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। 

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৯টার দিকে দুই ভাই সাব্বির (২১) ও জুবায়ের (১৮) মারা যান। মা-কুলসুম বেগম ও বাবা নূর উদ্দিন দুপুরে জানতে পারেন। বাবা জানান, তাদের সঙ্গে আরেক ছেলে ইয়াসিন ফরজ নামাজ আদায় শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। নূর উদ্দিন আর কুলসুম বেগমকে কেউ সান্ত্বনা

দিতে পারছিলেন না। দু’জনই বুক থাপড়িয়ে বিলাপ করছিলেন। বিকাল ৪টার দিকে ১০ নম্বর বেডে শুয়ে থাকা আলী মাস্টার ‘বাবা বাবা’ বলে বিলাপ করছিলেন। দু’হাত তুলে বলছিলেন, আল্লাহ, তুমি আমাকে বাঁচিয়ে দাও। আমার বাবার কাছে যেতে দাও। বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। 

হাসপাতালের পঞ্চমতলায় থাকা ওয়ার্ডটি দগ্ধ রোগীতে ভর্তি। হাসপাতালটি উদ্বোধনের পর একসঙ্গে এত দগ্ধ রোগী এই প্রথম। চিকিৎসকরা বলছেন, কিছুক্ষণ পরপরই দগ্ধরা মারা যাচ্ছেন। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট ও জাতীয় বার্ন ইউনিট সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় দগ্ধ রোগীদের মৃত্যু হচ্ছে। শনিবার রাত দেড়টা পর্যন্ত ৩৭ জনের মধ্যে ২১ জন মারা গেছেন।

১৬ জন ভর্তি আছেন। তাদের অবস্থা খুবই শঙ্কটাপন্ন। সবারই ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পোড়া রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে ফোন করেছেন। সর্বদা খোঁজখবর রাখছেন।

আমরা বিশ্বমানের চিকিৎসা দিয়েও তাদের বাঁচাতে পারছি না। তাদের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে।

যারা মারা গেছেন তারা হলেন- ইমাম মাওলানা আবদুল মালেক, নিজান হোসেন নিজাম, মোস্তফা কামাল, রিফাত, রাশেদ, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহীম, জুয়েল, সাব্বির, দেলোয়ার হোসেন, জামাল, জুনায়েদ, কুদ্দুস ব্যাপারী, মাইনুদ্দিন, জয়নাল, কাঞ্চন, নয়ন, সাত বছরের শিশু জুবায়ের, রাসেল ও বাহার উদ্দিন।