বাস থেকে ফেলে দিয়ে কলেজছাত্র খুন

হত্যাকাণ্ড হয়ে গেল দুর্ঘটনা!

এজাহারে ঘটনার মিথ্যা বর্ণনা * কোনো কথাই শোনেনি পুলিশ : বাদী

  আহমদুল হাসান আসিক ০৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মহাখালী

তিতুমীর কলেজের ছাত্র শাকিল শেখকে আইসিডিডিআরবির স্টাফ বাস চালকের সহকারী ও চার যাত্রী ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ওই বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। আরেক ছাত্র রাইয়ান ইসলামকেও একইভাবে বাস থেকে ফেলে দেয়া হয়। এতে তার হাত ভেঙে যায়। আহত রাইয়ান ঘটনার এমন বর্ণনা দিলেও মামলার এজাহারে বলা হয়েছে ভিন্ন কথা। এতে বলা হয়, রাস্তা পার হওয়ার সময় বেপরোয়া গতির বাসের ধাক্কায় শাকিলের মৃত্যু হয়েছে এবং রাইয়ান আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর মহাখালীর আমতলীতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা করেন রাইয়ান।

এজাহারে ঘটনার ভিন্ন বর্ণনা সম্পর্কে রাইয়ান বলেন, পুলিশ তার কোনো কথাই শুনতে চায়নি। বনানী থানার এসআই আহসান হাবীব তাকে বলেছেন, ‘প্রকৃত ঘটনা এজাহারে উল্লেখ করা হলে মামলাটি আইনের কোনো ধারায় ফেলা যাবে না। ফলে মামলাটি দুর্বল হয়ে যাবে।’ এছাড়া বাসে উঠে আমরা গণ্ডগোল করার চেষ্টা করেছি। এতে আমরাও ফেঁসে যাব। রাইয়ান আরও বলেন, ‘এজাহার তিনিই (হাবীব) লিখে দিয়েছেন। আমি শুধু স্বাক্ষর করেছি।’ তিনি বলেন, আইনের কোনো ধারায় পড়ে না এমন যুক্তি দেয়ার কারণে এজাহারে মিথ্যা বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এটি একটি সাজানো মামলা। এজাহারে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে গুরুতর জখম, নিহত ও সহায়তা করার অপরাধে বাসচালক শহিদুল ইসলাম ফয়েজ ও চালকের সহকারী সুমন আলীকে আসামি করা হয়েছে। তবে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে যে চার যাত্রী সহায়তা করেছে তাদের বিষয়েও এজাহারে কোনো উল্লেখ নেই। ঘটনার পর বাসচালক শহিদুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বনানী থানার এসআই আহসান হাবীব যুগান্তরকে বলেন, ‘ওরা (মামলার বাদী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা) তেমন কিছু বোঝে না। ওরা আমাকে বলেছে, স্যার আপনি লিখে দেন। ওরা যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই আমি লিখে দিয়েছি। ঘটনাস্থলে তো আমি ছিলাম না।’ উত্তরার সিএনজিচালককে বাস চাপায় পিষ্ট করার ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছিল উল্লেখ করা হলে হাবীব আরও বলেন, তদন্তে হত্যার ঘটনা বেরিয়ে এলে হত্যা মামলা হবে।

২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরায় কথাকাটাকাটির জেরে বাস চাপায় সিএনজিচালক ফারুককে হত্যা করে এক বাসচালক। ওই ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় চালক আবদুল মজিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। ঘটনা একই প্রকৃতির হলেও মহাখালীতে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সাজানো মামলা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে অভিযোগপত্রে তাই উল্লেখ করা হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বনানী থানার ওসি বিএম ফরমান আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘বাদী যেভাবে এজাহার দিয়েছেন সেভাবেই তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তাছাড়া তারা কলেজশিক্ষার্থী, তাদের কিভাবে ভুল বোঝাবে? তাদের কেউ ভুল বোঝায়নি।’

যেভাবে শাকিলকে হত্যা করা হয় : প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে মহাখালীর আমতলীতে মোটরসাইকেল সারাতে যান শাকিল। কিছুক্ষণ পর কলেজের বড় ভাই রাইয়ান ও মো. তারেক সেখানে উপস্থিত হন। মোটরসাইকেল সারাতে দেরি হবে জেনে তারা কলেজের দিকে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। রাস্তার পশ্চিম পাশ থেকে তিতুমীর কলেজের দিকে যাওয়ার সময় তারা ইশারা দিয়ে রাস্তা পার হতে যান। কিন্তু আইসিডিডিআরবির একটি স্টাফ বাস রাইয়ানকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি সামান্য আহত হন। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে শাকিল ও রাইয়ান বাসে উঠে পড়েন। এরপর চালকের সহকারী সুমন আলী ও বাসের সামনের দিকে বসা চারজন তাদের ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে ফেলে দেয়। অন্য যাত্রীরাও তাদের ফেলে দিতে উৎসাহ দেয়।

এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও একই কলেজের শিক্ষার্থী মো. তারেক যুগান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশকে পুরো ঘটনা বলা হয়েছে। কিন্তু এজাহারে পুলিশ মিথ্যা ঘটনা লিখেছে। তিনি বলেন, গ্রেফতার বাসচালক শহিদুলও পুলিশকে প্রকৃত ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে বলে শুনেছি।

এজাহারে যা বলা হয়েছে : তিতুমীর কলেজে যাওয়ার উদ্দেশে শাকিল, রাইয়ানসহ চারজন মহাখালীর আমতলী মোড়ের পশ্চিম পাশ থেকে পূর্ব পাশে যাচ্ছিলেন। এ সময় মহাখালী আইসিডিডিআরবির একটি স্টাফ বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৩৭৯০) তাদের সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে রাইয়ান দূরে ছিটকে পড়ে ও তার হাত ভেঙে যায়। অপরদিকে, শাকিলের মাথার ওপর দিয়ে বাসের চাকা উঠে যাওয়ায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

কৃষক বাবার স্বপ্ন শেষ : তিতুমীর কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রথমবর্ষের ছাত্র শাকিলদের বাড়ি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির শামুকখোলা গ্রামে। তার বাবা আব্বাস আলী শেখ একজন কৃষক। তিন ছেলের মধ্যে শাকিল ছিলেন সবার ছোট। বাবার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের হাল ধরবে শাকিল। কিন্তু তার মৃত্যুতে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার রাতে শাকিলের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছেন স্বজনরা।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.