ফের ব্যয় বাড়ছে থার্ড টার্মিনালের
jugantor
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
ফের ব্যয় বাড়ছে থার্ড টার্মিনালের

  মুজিব মাসুদ  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফের ব্যয় বাড়ছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের। ২০১৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি ১৩ হাজার ৬১০ দশমিক ৪৭ কোটি টাকায় অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু কাজ শুরু হতে দেরি হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

এখন নির্মাণকাজের ৮ শতাংশ শেষ হতে না হতে ফের ব্যয় বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম। জানা গেছে, এ দফায় আরও ১ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় বাড়ানোর জন্য আবেদন করবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

এ নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। সিভিল এভিয়েশনকে দেয়া আবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখতে গিয়ে তাদের এই ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে জাপানের মিতসুবিশি কর্পোরেশন, ফুজিতা কর্পোরেশন ও স্যামসাং নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কাজ টার্মিনালের পাইলিংয়ে পরিবর্তন করা হয়। অত্যাধুনিক স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে সাধারণ বোরড পাইলিং যুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ পাইলিং পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেশি কমে যাওয়ার কথা থাকলেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি কর্পোরেশন, ফুজিতা কর্পোরেশন ও স্যামসাং নানা কৌশলে মাত্র ৭১১ কোটি টাকা সাশ্রয় দেখায়।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে সাধারণ বোরড পাইলিংয়ের আবেদন পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন তারা ব্যয় বাড়ানোর পাঁয়তারা শুরু করেছে। অর্থাৎ যে টাকা কমানো হয়েছিল, সেই টাকা আবারও নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছে।

জানা যায়, টার্মিনাল ভবনের পাইলিংয়ে সয়েল টেস্টের (মাটির পরীক্ষা) রিপোর্টে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং (এসএসপি) অনুপযুক্ত বলে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত পাইলিং পরিবর্তন করা হয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, যেহেতু মেট্রো রেল প্রকল্পে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং সয়েল টেস্ট রিপোর্টে অনুপযুক্ত হয়েছে সে কারণে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে বোরড পাইলিং অনুমোদন দেয়া হয়। এতে ৭১১ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। এই টাকা দিয়ে আমরা প্রকল্পের সঙ্গে একটি ভিভিআইপি টার্মিনালসহ আরও বেশকিছু কাজ নতুন করে যুক্ত করেছি।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মূলত পাইলিং পরিবর্তনের জন্যই কৌশলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭১১ কোটি টাকা কমিয়েছিল। এখন পরিবর্তনের আবেদনটি অনুমোদন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও সেই টাকা তুলে নেয়ার জন্য কৌশল শুরু করেছে। যার অংশ হিসেবে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দেয়ার আবেদন করেছে। তিনি বলেন, এটা একধরনের প্রতারণা। এর বিরুদ্ধে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকার চাইলে মামলাও করতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ ধরনের একটি মেগা প্রকল্পের মাঝপথে এসে হঠাৎ মূল কাঠামো অর্থাৎ টার্মিনাল ভবনের পাইলিংয়ের ধরন পরিবর্তন করায় পুরো প্রকল্পটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাছাড়া প্রকল্পটির ঠিকা চুক্তিতে স্ক্রুড স্টিল পাইল (এসএসপি) একটি সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া ছিল।

জানা গেছে, এই শর্ত বাতিল করার জন্য প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের আগে একটি আন্তর্জাতিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কোর্টে মামলাও দায়ের করেছিল। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ তখন স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের (এসএসপি) পক্ষে অবস্থান নেন। মামলা দায়েরকারী প্রতিষ্ঠানের যুক্তি ছিল গোটা বিশ্বে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের (এসএসপি) অভিজ্ঞতা ২/৩টি প্রতিষ্ঠানের বেশি নেই। কাজেই দরপত্রে এই অভিজ্ঞতা চাওয়া হলে একটির বেশি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারবে না। যদি এই অভিজ্ঞতা উন্মুক্ত রাখা হতো, তাহলে কমপক্ষে ২০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। তাতে প্রকল্পের ব্যয় আরও অনেক প্রতিযোগিতামূলক হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রকৌশলী যুগান্তরকে বলেন, যদি দরপত্রে এই শর্ত উন্মুক্ত রাখা হতো তাহলে এই প্রকল্পের ব্যয় অর্ধেক কমে যেত।

তবে এ প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা হবে কি না, সে বিষয়ে আইনি পরামর্শ দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ একটি ফার্মকে নিযুক্ত করেছিল। ফার্মটির নাম মেসার্স শেখ অ্যান্ড চৌধুরী ল’ ফার্ম।

কোম্পানিটি এ সংক্রান্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন যাচাই-বাছাই করে জানিয়েছে, ভেরিয়েশন অর্ডার জারির মাধ্যমে বর্ণিত স্ক্রুড স্টিল পাইলের পরিবর্তে বোরড পাইল কাজ সম্পাদন করতে আইনে কোনো বাধা নেই। ল’ ফার্ম নিযুক্তির পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিপিটিইউ’র (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট) মতামতও নেয়।

সিপিটিইউও এ সংক্রান্ত ভেরিয়েশন কাজে কোনো আইনি জটিলতা নেই বলে তাদের মতামতে জানায়। এছাড়া প্রকল্পের অর্থদাতা সংস্থা জাইকাও এ নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা নেই বলে জানিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে এ বিষয়ে আইনি পরামর্শ নেয়া হয়। তারাও ইতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল এভিয়েশনের শীর্ষ পর্যায়ের অপর এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্প শুরুর আগে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের সুপারিশ করা হয়েছিল প্রকল্প এলাকার মাটির ফিজিক্যাল কন্ডিশন (বাহ্যিক অবস্থা) দেখে।

সয়েল টেস্টের প্রকৃত রিপোর্টের ভিত্তিতে দেয়া হয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশের কোথাও এর আগে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং করা হয়নি। তিনি বলেন, বিষয়টির ওপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত চাওয়া হলে তারা সব কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে বোরড পাইলং করা যাবে বলে মত দিয়েছে।

বেবিচক সূত্রে আরও জানা যায়, এই প্রকল্পের ভেরিয়েশনজনিত কাজের জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যে টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা জানিয়েছে, সেটি নিয়েও তারা নানাভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখেছেন। এজন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ, বেবিচকের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ যাচাই-বাছাই করে ৮৪.৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৭১১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলী যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ঝুঁকির মধ্যেই এগিয়ে চলছে থার্ড টার্মিনালের কাজ। করোনার আঘাতেও থামেনি এই বিশাল নির্মাণযজ্ঞ। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সরকারের বড় বড় অনেক প্রকল্প বন্ধ থাকলেও থামেনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। প্রকল্পের কর্মীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রকল্প এলাকায় ৪০০ কর্মীর আবাসন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাছাড়া ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনেক ইকুইপমেন্ট বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে। এ অবস্থায় তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্পের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি এখনও অনুমোদন হয়নি। করোনাভাইরাসের কারণে যে ক্ষতি হবে, সেটি ‘নোট’ করে রাখার জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। এখনও টাকার অঙ্ক উল্লেখ করেনি। তবে তিনি ধারণা করছেন, এই টাকার পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার নিচে হবে না।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

ফের ব্যয় বাড়ছে থার্ড টার্মিনালের

 মুজিব মাসুদ 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফের ব্যয় বাড়ছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের। ২০১৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি ১৩ হাজার ৬১০ দশমিক ৪৭ কোটি টাকায় অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু কাজ শুরু হতে দেরি হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

এখন নির্মাণকাজের ৮ শতাংশ শেষ হতে না হতে ফের ব্যয় বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম। জানা গেছে, এ দফায় আরও ১ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় বাড়ানোর জন্য আবেদন করবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

এ নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। সিভিল এভিয়েশনকে দেয়া আবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখতে গিয়ে তাদের এই ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে জাপানের মিতসুবিশি কর্পোরেশন, ফুজিতা কর্পোরেশন ও স্যামসাং নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কাজ টার্মিনালের পাইলিংয়ে পরিবর্তন করা হয়। অত্যাধুনিক স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে সাধারণ বোরড পাইলিং যুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ পাইলিং পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেশি কমে যাওয়ার কথা থাকলেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি কর্পোরেশন, ফুজিতা কর্পোরেশন ও স্যামসাং নানা কৌশলে মাত্র ৭১১ কোটি টাকা সাশ্রয় দেখায়।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে সাধারণ বোরড পাইলিংয়ের আবেদন পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন তারা ব্যয় বাড়ানোর পাঁয়তারা শুরু করেছে। অর্থাৎ যে টাকা কমানো হয়েছিল, সেই টাকা আবারও নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছে।

জানা যায়, টার্মিনাল ভবনের পাইলিংয়ে সয়েল টেস্টের (মাটির পরীক্ষা) রিপোর্টে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং (এসএসপি) অনুপযুক্ত বলে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত পাইলিং পরিবর্তন করা হয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, যেহেতু মেট্রো রেল প্রকল্পে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং সয়েল টেস্ট রিপোর্টে অনুপযুক্ত হয়েছে সে কারণে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে বোরড পাইলিং অনুমোদন দেয়া হয়। এতে ৭১১ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। এই টাকা দিয়ে আমরা প্রকল্পের সঙ্গে একটি ভিভিআইপি টার্মিনালসহ আরও বেশকিছু কাজ নতুন করে যুক্ত করেছি।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মূলত পাইলিং পরিবর্তনের জন্যই কৌশলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭১১ কোটি টাকা কমিয়েছিল। এখন পরিবর্তনের আবেদনটি অনুমোদন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও সেই টাকা তুলে নেয়ার জন্য কৌশল শুরু করেছে। যার অংশ হিসেবে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দেয়ার আবেদন করেছে। তিনি বলেন, এটা একধরনের প্রতারণা। এর বিরুদ্ধে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকার চাইলে মামলাও করতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ ধরনের একটি মেগা প্রকল্পের মাঝপথে এসে হঠাৎ মূল কাঠামো অর্থাৎ টার্মিনাল ভবনের পাইলিংয়ের ধরন পরিবর্তন করায় পুরো প্রকল্পটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাছাড়া প্রকল্পটির ঠিকা চুক্তিতে স্ক্রুড স্টিল পাইল (এসএসপি) একটি সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া ছিল।

জানা গেছে, এই শর্ত বাতিল করার জন্য প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের আগে একটি আন্তর্জাতিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কোর্টে মামলাও দায়ের করেছিল। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ তখন স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের (এসএসপি) পক্ষে অবস্থান নেন। মামলা দায়েরকারী প্রতিষ্ঠানের যুক্তি ছিল গোটা বিশ্বে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের (এসএসপি) অভিজ্ঞতা ২/৩টি প্রতিষ্ঠানের বেশি নেই। কাজেই দরপত্রে এই অভিজ্ঞতা চাওয়া হলে একটির বেশি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারবে না। যদি এই অভিজ্ঞতা উন্মুক্ত রাখা হতো, তাহলে কমপক্ষে ২০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। তাতে প্রকল্পের ব্যয় আরও অনেক প্রতিযোগিতামূলক হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রকৌশলী যুগান্তরকে বলেন, যদি দরপত্রে এই শর্ত উন্মুক্ত রাখা হতো তাহলে এই প্রকল্পের ব্যয় অর্ধেক কমে যেত।

তবে এ প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা হবে কি না, সে বিষয়ে আইনি পরামর্শ দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ একটি ফার্মকে নিযুক্ত করেছিল। ফার্মটির নাম মেসার্স শেখ অ্যান্ড চৌধুরী ল’ ফার্ম।

কোম্পানিটি এ সংক্রান্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন যাচাই-বাছাই করে জানিয়েছে, ভেরিয়েশন অর্ডার জারির মাধ্যমে বর্ণিত স্ক্রুড স্টিল পাইলের পরিবর্তে বোরড পাইল কাজ সম্পাদন করতে আইনে কোনো বাধা নেই। ল’ ফার্ম নিযুক্তির পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিপিটিইউ’র (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট) মতামতও নেয়।

সিপিটিইউও এ সংক্রান্ত ভেরিয়েশন কাজে কোনো আইনি জটিলতা নেই বলে তাদের মতামতে জানায়। এছাড়া প্রকল্পের অর্থদাতা সংস্থা জাইকাও এ নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা নেই বলে জানিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে এ বিষয়ে আইনি পরামর্শ নেয়া হয়। তারাও ইতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল এভিয়েশনের শীর্ষ পর্যায়ের অপর এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্প শুরুর আগে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের সুপারিশ করা হয়েছিল প্রকল্প এলাকার মাটির ফিজিক্যাল কন্ডিশন (বাহ্যিক অবস্থা) দেখে।

সয়েল টেস্টের প্রকৃত রিপোর্টের ভিত্তিতে দেয়া হয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশের কোথাও এর আগে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং করা হয়নি। তিনি বলেন, বিষয়টির ওপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত চাওয়া হলে তারা সব কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে বোরড পাইলং করা যাবে বলে মত দিয়েছে।

বেবিচক সূত্রে আরও জানা যায়, এই প্রকল্পের ভেরিয়েশনজনিত কাজের জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যে টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা জানিয়েছে, সেটি নিয়েও তারা নানাভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখেছেন। এজন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ, বেবিচকের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ যাচাই-বাছাই করে ৮৪.৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৭১১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলী যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ঝুঁকির মধ্যেই এগিয়ে চলছে থার্ড টার্মিনালের কাজ। করোনার আঘাতেও থামেনি এই বিশাল নির্মাণযজ্ঞ। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সরকারের বড় বড় অনেক প্রকল্প বন্ধ থাকলেও থামেনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। প্রকল্পের কর্মীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রকল্প এলাকায় ৪০০ কর্মীর আবাসন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাছাড়া ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনেক ইকুইপমেন্ট বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে। এ অবস্থায় তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্পের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি এখনও অনুমোদন হয়নি। করোনাভাইরাসের কারণে যে ক্ষতি হবে, সেটি ‘নোট’ করে রাখার জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। এখনও টাকার অঙ্ক উল্লেখ করেনি। তবে তিনি ধারণা করছেন, এই টাকার পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার নিচে হবে না।