প্রধান আসামি সাইফুরসহ গ্রেফতার চার
jugantor
প্রধান আসামি সাইফুরসহ গ্রেফতার চার
গৃহবধূর জবানবন্দি, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি

  সিলেট ব্যুরো  

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গণধর্ষণ

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ গণধর্ষণ মামলায় চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হল- প্রধান আসামি ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, তিন নম্বর আসামি মাহবুবুর রহমান রনি, চার নম্বর আসামি অর্জুন লস্কর এবং পাঁচ নম্বর আসামি রবিউল ইসলাম।

রোববার সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সাইফুর, হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে অর্জুন, শায়েস্তাগঞ্জ থেকে রনি এবং নবীগঞ্জ থেকে রবিউলকে গ্রেফতার করা হয়। সিলেট মহানগর পুলিশ সাইফুর ও অর্জুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। এদিকে নির্যাতিত গৃহবধূ আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

গণধর্ষণের ঘটনায় কলেজ অধ্যক্ষ ও হল সুপারকে দায়ী করে তাদের পদত্যাগের দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারাসহ বিভিন্ন মহল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের পদত্যাগ ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।

রোববার সকাল ৮টার দিকে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা নোয়ারাই খেয়াঘাট থেকে সাইফুর রহমানকে (২৮) গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, দোয়ারাবাজার সীমান্ত হয়ে ভারত পালাতে চেয়েছিলেন সাইফুর।

ভোর ৬টার দিকে নোয়ারাইয়ে সুরমা নদীর খেয়াঘাটে যান সাইফুর। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান নিশ্চিত করে পুলিশ।

এরপর ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে।

এএসপি বিল্লাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সাইফুর দাড়ি কেটে মুখে মাস্ক লাগিয়ে খেয়াঘাটে যান। টি-শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত সাইফুরকে ভোর ৬টা থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা খেয়াঘাটে অপেক্ষা করতে দেখে সন্দেহ হয়।

কাছে গিয়ে ধর্ষক সাইফুরের ছবির সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়। নাম জিজ্ঞাসা করলে সাইফুর ভীত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাকে আটক করে থানায় নেয়া হয়। থানায় তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সোনাপুরের চান্দাইপাড়ার মো. তাহিদ মিয়ার ছেলে সাইফুর অস্ত্র মামলারও আসামি। ছাত্রাবাসে সাইফুর ২০৫ নম্বর কক্ষটি দখল করে থাকতেন।

শুক্রবার রাতে ধর্ষণ ঘটনার পর ভোররাতে ওই কক্ষ থেকে পাইপগান, চারটি রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

রোববার রাত ১০টার দিকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জের নিজগ্রাম থেকে মামলার পাঁচ নম্বর আসামি রবিউলকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। ডিবি কার্যালয়ে তাকে রাখা হয়েছে।

হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রাত ৯টার দিকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থেকে তিন নম্বর আসামি মাহবুবুর রহমান রনিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৯।

এর আগে রোববার ভোরে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা সীমান্তের দুর্লভপুর গ্রাম থেকে মামলার চার নম্বর আসামি অর্জুন লস্করকে গ্রেফতার করা হয়।

মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম দস্তগির জানান, মাধবপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে অর্জুনকে গ্রেফতার করে। জকিগঞ্জের আটগ্রাম গ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন।

শুক্রবার এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত আরও তিনজনকে আসামি করা হয়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ী গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫)।

আদালতে গৃহবধূর জবানবন্দি : এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। রোববার দুপুরে সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন খানম নিলার কাছে তিনি জবানবন্দি দেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) যুগান্তরকে বলেন, ওসমানী হাসপাতাল থেকে গৃহবধূকে আদালতে নেয়া হয়।

দুপুর দেড়টার দিকে তিনি আদালতে ওই রাতের ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ছাত্রাবাসে নিয়ে ছাত্রলীগের ছয় ক্যাডার তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে। তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন আদালত।

সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি : গণধর্ষণ মামলার আসামিদের গ্রেফতারে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় সতর্কবার্তা পাঠানোর পাশাপাশি জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশের আওতাধীন সব থানাকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া ধর্ষণ মামলার আসামিদের গ্রামের বাড়িতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশের একাধিক টিম।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার জানান, ধর্ষণকারীদের গ্রেফতারে মহানগর পুলিশের সাতটি টিম বিভিন্ন ধাপে কাজ করছে।

দু’জনকে সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতারের পর সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।

বিজিবির উপমহাপরিচালক (সেক্টর কমান্ডার) কর্নেল আমিরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, সীমান্ত এলাকা দিয়ে কেউ যাতে অবৈধভাবে দেশ ছাড়তে না পারে সেজন্য বিজিবি সব সময় সতর্ক রয়েছে।

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তরা যাতে কোনোভাবেই দেশ ছাড়তে না পারে সেজন্য বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অধ্যক্ষ ও তত্ত্বাবধায়কের পদত্যাগ দাবি : গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনায় কলেজ অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ ও ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক মো. জামাল উদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করেছে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. লুৎফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কতিপয় ছাত্রনামধারী দুর্বৃত্ত ঐতিহ্যবাহী কলেজকে কলুষিত করেছে।

এ ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেয়ার দাবি জানান তারা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা সিলেট এমসি কলেজের অদক্ষ, দায়িত্বহীন অধ্যক্ষ ও ছাত্রাবাসের সুপারের (তত্ত্বাবধায়ক) পদত্যাগ দাবি করছি। ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা কোনো দলের হতে পারে না।

ধর্ষকদের কোনো দল নেই। তাদের পরিচয় একটাই তারা ঘৃণ্য অপরাধী। গৃহবধূকে ধর্ষণের বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন।

রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নেতারা বলেন, ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। এ পাশবিক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।

বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, এ ন্যক্কারজনক ঘটনা গোটা সিলেটের মানুষকে লজ্জিত, ব্যথিত ও মর্মাহত করেছে এবং এমসি কলেজের ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে কলঙ্কিত ও কলুষিত করেছে।

একজন নারীর এমন চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনা সভ্য সমাজ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ রকম অপরাধ করতে সাহস না পায়।

বিবৃতিতে তারা বলেন, প্রকৃত মুজিব আদর্শের কর্মী সমাজবিরোধী কোনো অপকর্ম করতে পারেন না। কোনো অপরাধীর স্থান আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নেই।

তারা বলেন, দুর্বৃত্তায়ন-দস্যুপনা-দখলবাজি-সমাজ ও নীতি-নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ‘রাজনৈতিক’ অবস্থান ও অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে।

আসামি রবিউলের দাপটে এলাকার লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত থাকত : দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, গৃহবধূ গণধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি রবিউল ইসলামের দাপটে গ্রামের লোকজন সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকত।

গ্রাম্য আধিপত্য বিস্তার নিয়ে করোনাকালেও রবিউল প্রকাশ্যে গ্রামে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে। রবিউল ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তার বাবা দেলোয়ার হোসেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

জগদল ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন দেলোয়ার হোসেন। ১৫ আগস্ট শোক সভায় রবিউলের প্রভাবটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শোক সভায় প্রভাব খাটিয়ে মূল ধারার আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানিয়ে বিতর্কিতদের নিয়ে রবিউল সভা করেন। রবিউলের বিরুদ্ধে কলেজ হোস্টেল ভাংচুরসহ চুরি ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়, এলাকাতেই রবিউল আত্মগোপন করে থাকতে পারেন। ওসি আশরাফুল ইসলাম বলেন, তাকে ধরতে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।

শনিবার ভোররাতে দিরাই পৌরশহরের নতুন বাগবাড়ীর যুবলীগ নেতা আক্কাস মিয়ার বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। এর আগে র‌্যাব ও পুলিশ তার গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালায়।

উপজেলা যুবলীগ নেতা আক্কাস মিয়া জানান, রবিউলের বিষয়ে খোঁজ নিতে র‌্যাব সদস্যরা তার বাসায় এসেছিল।

প্রধান আসামি সাইফুরসহ গ্রেফতার চার

গৃহবধূর জবানবন্দি, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি
 সিলেট ব্যুরো 
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
গণধর্ষণ
সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার (বাঁ থেকে) সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম ও মাহবুবুর রহমান রনি -যুগান্তর

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ গণধর্ষণ মামলায় চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হল- প্রধান আসামি ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, তিন নম্বর আসামি মাহবুবুর রহমান রনি, চার নম্বর আসামি অর্জুন লস্কর এবং পাঁচ নম্বর আসামি রবিউল ইসলাম।

রোববার সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সাইফুর, হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে অর্জুন, শায়েস্তাগঞ্জ থেকে রনি এবং নবীগঞ্জ থেকে রবিউলকে গ্রেফতার করা হয়। সিলেট মহানগর পুলিশ সাইফুর ও অর্জুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। এদিকে নির্যাতিত গৃহবধূ আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

গণধর্ষণের ঘটনায় কলেজ অধ্যক্ষ ও হল সুপারকে দায়ী করে তাদের পদত্যাগের দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারাসহ বিভিন্ন মহল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের পদত্যাগ ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।

রোববার সকাল ৮টার দিকে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা নোয়ারাই খেয়াঘাট থেকে সাইফুর রহমানকে (২৮) গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, দোয়ারাবাজার সীমান্ত হয়ে ভারত পালাতে চেয়েছিলেন সাইফুর।

ভোর ৬টার দিকে নোয়ারাইয়ে সুরমা নদীর খেয়াঘাটে যান সাইফুর। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান নিশ্চিত করে পুলিশ।

এরপর ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে। 

এএসপি বিল্লাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সাইফুর দাড়ি কেটে মুখে মাস্ক লাগিয়ে খেয়াঘাটে যান। টি-শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত সাইফুরকে ভোর ৬টা থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা খেয়াঘাটে অপেক্ষা করতে দেখে সন্দেহ হয়।

কাছে গিয়ে ধর্ষক সাইফুরের ছবির সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়। নাম জিজ্ঞাসা করলে সাইফুর ভীত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাকে আটক করে থানায় নেয়া হয়। থানায় তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সোনাপুরের চান্দাইপাড়ার মো. তাহিদ মিয়ার ছেলে সাইফুর অস্ত্র মামলারও আসামি। ছাত্রাবাসে সাইফুর ২০৫ নম্বর কক্ষটি দখল করে থাকতেন।

শুক্রবার রাতে ধর্ষণ ঘটনার পর ভোররাতে ওই কক্ষ থেকে পাইপগান, চারটি রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। 

রোববার রাত ১০টার দিকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জের নিজগ্রাম থেকে মামলার পাঁচ নম্বর আসামি রবিউলকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। ডিবি কার্যালয়ে তাকে রাখা হয়েছে।

হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রাত ৯টার দিকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থেকে তিন নম্বর আসামি মাহবুবুর রহমান রনিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৯।

এর আগে রোববার ভোরে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা সীমান্তের দুর্লভপুর গ্রাম থেকে মামলার চার নম্বর আসামি অর্জুন লস্করকে গ্রেফতার করা হয়।

মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম দস্তগির জানান, মাধবপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে অর্জুনকে গ্রেফতার করে। জকিগঞ্জের আটগ্রাম গ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন। 

শুক্রবার এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত আরও তিনজনকে আসামি করা হয়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ী গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫)।

আদালতে গৃহবধূর জবানবন্দি : এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। রোববার দুপুরে সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন খানম নিলার কাছে তিনি জবানবন্দি দেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) যুগান্তরকে বলেন, ওসমানী হাসপাতাল থেকে গৃহবধূকে আদালতে নেয়া হয়।

দুপুর দেড়টার দিকে তিনি আদালতে ওই রাতের ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ছাত্রাবাসে নিয়ে ছাত্রলীগের ছয় ক্যাডার তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে। তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন আদালত। 

সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি : গণধর্ষণ মামলার আসামিদের গ্রেফতারে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় সতর্কবার্তা পাঠানোর পাশাপাশি জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশের আওতাধীন সব থানাকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া ধর্ষণ মামলার আসামিদের গ্রামের বাড়িতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশের একাধিক টিম।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার জানান, ধর্ষণকারীদের গ্রেফতারে মহানগর পুলিশের সাতটি টিম বিভিন্ন ধাপে কাজ করছে।

দু’জনকে সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতারের পর সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।

বিজিবির উপমহাপরিচালক (সেক্টর কমান্ডার) কর্নেল আমিরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, সীমান্ত এলাকা দিয়ে কেউ যাতে অবৈধভাবে দেশ ছাড়তে না পারে সেজন্য বিজিবি সব সময় সতর্ক রয়েছে।

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তরা যাতে কোনোভাবেই দেশ ছাড়তে না পারে সেজন্য বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অধ্যক্ষ ও তত্ত্বাবধায়কের পদত্যাগ দাবি : গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনায় কলেজ অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ ও ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক মো. জামাল উদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করেছে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. লুৎফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কতিপয় ছাত্রনামধারী দুর্বৃত্ত ঐতিহ্যবাহী কলেজকে কলুষিত করেছে।

এ ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেয়ার দাবি জানান তারা। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা সিলেট এমসি কলেজের অদক্ষ, দায়িত্বহীন অধ্যক্ষ ও ছাত্রাবাসের সুপারের (তত্ত্বাবধায়ক) পদত্যাগ দাবি করছি। ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা কোনো দলের হতে পারে না।

ধর্ষকদের কোনো দল নেই। তাদের পরিচয় একটাই তারা ঘৃণ্য অপরাধী। গৃহবধূকে ধর্ষণের বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন।

রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নেতারা বলেন, ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। এ পাশবিক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।

বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, এ ন্যক্কারজনক ঘটনা গোটা সিলেটের মানুষকে লজ্জিত, ব্যথিত ও মর্মাহত করেছে এবং এমসি কলেজের ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে কলঙ্কিত ও কলুষিত করেছে।

একজন নারীর এমন চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনা সভ্য সমাজ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ রকম অপরাধ করতে সাহস না পায়।

বিবৃতিতে তারা বলেন, প্রকৃত মুজিব আদর্শের কর্মী সমাজবিরোধী কোনো অপকর্ম করতে পারেন না। কোনো অপরাধীর স্থান আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নেই।

তারা বলেন, দুর্বৃত্তায়ন-দস্যুপনা-দখলবাজি-সমাজ ও নীতি-নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ‘রাজনৈতিক’ অবস্থান ও অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে। 

আসামি রবিউলের দাপটে এলাকার লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত থাকত : দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, গৃহবধূ গণধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি রবিউল ইসলামের দাপটে গ্রামের লোকজন সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকত।

গ্রাম্য আধিপত্য বিস্তার নিয়ে করোনাকালেও রবিউল প্রকাশ্যে গ্রামে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে। রবিউল ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তার বাবা দেলোয়ার হোসেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

জগদল ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন দেলোয়ার হোসেন। ১৫ আগস্ট শোক সভায় রবিউলের প্রভাবটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শোক সভায় প্রভাব খাটিয়ে মূল ধারার আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানিয়ে বিতর্কিতদের নিয়ে রবিউল সভা করেন। রবিউলের বিরুদ্ধে কলেজ হোস্টেল ভাংচুরসহ চুরি ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়, এলাকাতেই রবিউল আত্মগোপন করে থাকতে পারেন। ওসি আশরাফুল ইসলাম বলেন, তাকে ধরতে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।

শনিবার ভোররাতে দিরাই পৌরশহরের নতুন বাগবাড়ীর যুবলীগ নেতা আক্কাস মিয়ার বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। এর আগে র‌্যাব ও পুলিশ তার গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালায়।

উপজেলা যুবলীগ নেতা আক্কাস মিয়া জানান, রবিউলের বিষয়ে খোঁজ নিতে র‌্যাব সদস্যরা তার বাসায় এসেছিল।