ব্যাংকিং খাতে অরাজকতা

প্রতি বছর ক্ষতি হচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা

সানেম’র অর্থনৈতিক প্রতিবেদন : সরকারি আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখার বিধান এবং সিআরআর ১ শতাংশ কমানোয় বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা * কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার অভাব ও অক্ষমতা দায়ী * আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখতে বিশ্বাস পাচ্ছেন না

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৫ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক

ব্যাংকিং খাতে অদক্ষতায় বছরে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের সমান। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেম’র (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) ত্রৈমাসিক অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। সেখানে আরও বলা হয়, আর্থিক খাতে চলমান অরাজকতার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার অভাব ও অক্ষমতাকে দায়ী করা হয়েছে।

সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার বিধান এবং সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা নগদ জমার হার) ১ শতাংশ কমিয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ করায় ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে।

সংবাদ সম্মেলনে সানেম’র নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ব্যাংক খাতে অনাদায়ি ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, ব্যাংকিং সেক্টরে একটার পর একটা ‘স্ক্যাম’ হচ্ছে, আমানতকারীরা এখন ব্যাংকে টাকা রাখতে বিশ্বাস পাচ্ছেন না। ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, অনাদায়ী ঋণ সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে। এটার বড় কারণ হচ্ছে, ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং যারা ঋণখেলাপি হচ্ছে তাদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার অভাব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা নেই; বর্তমান সময়ে অনেক ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে আমরা দেখছি, বাংলাদেশ ব্যাংককে বাইপাস করে। এটা কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংককে একটা সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে যে তার ভূমিকাটা কি? ব্যাংকিং সেক্টরের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের হওয়া উচিত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখছি সেটা হচ্ছে না।’

নীতিগত বিষয়ে বড় ধরনের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি ‘ভুল’ এবং তা ‘রং সিগনাল’ দিচ্ছে মন্তব্য করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এ দুটি সিদ্ধান্তই (সরকারি আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখা ও সিআরআর ১ শতাংশ কমানো) সঠিক উপায়ে নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি মেকিংয়ের ইউনিট আছে, তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে, এখানে আমরা কিন্তু তা দেখিনি। এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকে বসে তা হয়নি, যা আশ্চর্যের বিষয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোর দাবির মুখে।

ড. সেলিম রায়হান আরও বলেন, ‘যে ব্যাংকগুলো এখন খারাপ পারফর্ম করছে, তাদের কাছে যদি আবার টাকা দেয়া হয়, সেই টাকারও অপব্যবহার হবে কিনা- তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে সিআরআর আমানতকারীদের সেইফটি হিসেবে কাজ করে, সেখানে বড় ধরনের রেশিও কমানো সুবিবেচিত হয়নি।

সানেম’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতের এ অবস্থা অনেক দিনের চলমান কাঠামোগত সমস্যার ফলন। ব্যাংকিং খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারি প্রায়ই প্রমাণ হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি বেসরকারি কিছু ব্যাংক অতিমাত্রায় ঋণ দেয়ার কারণে এডিআর (অ্যাডভান্স ডিপোজিট রেশিও বা ঋণ আমানতের হার) বা রেশিও ৯০ ভাগের উপরে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের অধিক ঋণ দেয়ার কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমেছে। এখন উদ্বেগের বিষয় এ ঋণের বড় একটি অংশ অপচয় হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ ব্যাংকিং খাতে একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা সমর্থিত অনিয়মের কোনো দৃশ্যমান শাস্তি হচ্ছে না। এছাড়া স্বাধীনভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করতে না পারায় এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক, বেসিক ও ফারমার্স ব্যাংকের কেলেঙ্কারির তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের অনেক গল্প জেনেছে বাংলাদেশ। লোকসানি সরকারি ব্যাংকে মূলধন জোগান কিংবা সুদ হার নিয়ে বিতর্ক চলেছে অহরহ। এক্ষেত্রে এডহক ভিত্তিতে কিছু নির্দেশনা ও গণমাধ্যমের বক্তব্য দিয়ে দায় সারছেন নীতিনির্ধারকরা।

সংবাদ সম্মেলনে সেলিম রায়হান আরও বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভুল বোঝানো হচ্ছে। সাড়ে ৭ ভাগের বেশি অর্জনের পেছনে শিল্প অগ্রগতির কথা বলা হলেও, তৈরি পোশাক বাদে অন্য খাতের বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। প্রশ্ন আছে, বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়েও। সংস্থাটির মতে, শুধু নামে নয়, আচরণেও উন্নয়নশীল দেশ হতে হবে বাংলাদেশকে। এজন্য সুশাসনে মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে।

সংবাদ সম্মেলনে সানেম’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. সায়েমা হক বিদিশা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter