ঋণ শোধের সীমা আরও না বাড়ালে সুফল মিলবে না
jugantor
রফতানি শিল্পে বড় সংকটের শঙ্কা
ঋণ শোধের সীমা আরও না বাড়ালে সুফল মিলবে না

  যুগান্তর রিপোর্ট  

১৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক টু ব্যাক একক এলসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কার্যত ৬ মাসের বেশি বাড়ানো হয়নি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক দুই দফা প্রজ্ঞাপনে এই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ৬ মাস করে গড়ে এক বছর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে একক এলসির ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৬ মাস। উদ্যোক্তারা অনেকেই মনে করছেন, ঋণ শোধের সীমা দুই দফায় এক বছর বাড়ানো হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যায় এমন শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা যুগান্তরকে জানান, বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যে কোনো ব্যবসায়ী এখনও কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। এর মধ্যে আবার শোনা যাচ্ছে, বেশ জোরেশোরে শীতকালে আঘাত হানতে পারে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। তাই যদি হয়, তাহলে পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করে লাভ করা তো দূরের কথা, শিল্প টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে এ অবস্থায় কারও পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এ বিবেচনায় ব্যবসা-বাণিজ্য আগের অবস্থায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ঋণ পরিশোধে সরকারের পক্ষ থেকে সময়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা আসা জরুরি। না হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ইডিএফ থেকে নেয়া ঋণ শোধের সময়সীমা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। পরে সমস্যা হলে দেখা যাবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি এবং আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক এবং বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘করোনা মহামারীর সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাপক সহযোগিতা করছে। ইডিএফের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরপরও যদি সমস্যা হয় তা হলে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বসে সমস্যাটি তুলে ধরব। তাদের সহযোগিতা চাইব। আমরা আশা করি, তখন তারা আমাদের সমস্যার সমাধান করে দেবে।’

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, কোনো গ্রাহকের অসুবিধা হলে সময় চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে শর্ত হল, করসপনডেন্ট ব্যাংক বা বিদেশি মধ্যস্থতাকারী ব্যাংকের সম্মতিও লাগবে। তা ছাড়া সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার আঘাতে এখনও ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হতে পারেনি। আর্থিক লেনদেনও চালু হয়নি পুরোদমে। ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাও ফেরেনি স্বাভাবিক গতিতে। বর্তমানে যেসব পণ্য রফতানি হচ্ছে সেগুলোর বেশির ভাগ অর্থ ঠিকমতো দেশে আসছে না। যে কারণে উদ্যোক্তাদের কাছে টাকার প্রবাহ কমে গেছে। উদ্যোক্তারা সময়মতো ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছেন। এসব বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রফতানিকারকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ছাড় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ব্যাক টু ব্যাক এলসির কাঁচামাল আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) পরিশোধের সীমা একক এলসির ক্ষেত্রে ৬ মাস বাড়ানো হয়েছে। এ সুবিধা পাওয়া যাবে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত। অর্থাৎ এর পর আর এ সুবিধা মিলবে না। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রফতানি আদেশের বিপরীতে ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির পর পণ্য তৈরি করে বিদেশে রফতানি করা হয়। এর মূল্য দেশে আসার পর ইডিএফের ঋণ শোধ করা হয়। এর জন্য মেয়াদ থাকে ৬ মাস। রফতানিকারকদের সুবিধার্থে এ তহবিল থেকে ঋণ দেয়া হয় ২ শতাংশ সুদে। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় সময়মতো রফতানি বিল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ইডিএফের ঋণও শোধ করা সম্ভব হয় না। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ শোধের সময়সীমা আরও ৬ মাস বাড়িয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ সময় ৬ মাস ও করোনার কারণে বর্ধিত সময় আরও ৬ মাস, মোট এক বছর। তবে বর্ধিত সুবিধা একক এলসির ক্ষেত্রে ৬ মাসের বেশি পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে আগামী বছরের ৩১ মার্চের পরও এমন সুবিধা মিলবে না। অর্থাৎ চলতি অক্টোবরের শুরু থেকে এখন যেসব এলসি খোলা হচ্ছে সেগুলোতে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। কেননা এসব এলসির সাধারণ সময়সীমা ৬ মাস অতিক্রম করবে আগামী ৩১ মার্চের পর। যেহেতু ৩১ মার্চ পর্যন্তই বহাল, সেহেতু অক্টোবর থেকে খোলা এলসি এ সুবিধা পাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে যেসব ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে সেগুলো বর্ধিত সুবিধা পাবে মাত্র এক মাস। আগস্টে যেসব খোলা এলসি বাড়তি সুবিধা পাবে মাত্র ২ মাস। অথচ ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও স্বাভাবিক হয়নি। অর্থের লেনদেনেও স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। এ অবস্থায় এখন যেসব এলসি খোলা হচ্ছে তা পরিশোধে বাড়তি সুবিধা মিলছে না। তখন নিয়মিত এলসির পাশাপাশি আগের দেনা শোধ করতে হবে। অর্থাৎ একসঙ্গে দুটি দেনা শোধ করতে হবে। এছাড়া সাধারণ ঋণের কিস্তিও একসঙ্গে দুটি শোধ করতে হবে। ফলে উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। বলা যায়, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

এমনিতেই করোনার চাপে ‘চ্যাপ্টা’ হয়ে পড়েছে দেশের রফতানিমুখী শিল্প। এর মধ্যে আবার নতুন করে করোনার দ্বিতীয় হানা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ইতোমধ্যে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে ফের করোনার আঘাত এসে গেছে। এর প্রভাবে যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ ইউরোপের অনেক দেশ দ্বিতীয় দফায় সীমিত আকারে লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে। এতে রফতানি শিল্পে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনিতেই রফতানি আয় ঠিকমতো দেশে আসছে না। করোনার দ্বিতীয় আঘাতে রফতানি আয় দেশে আসা আরও বিলম্বিত হতে পারে। তখন রফতানি ঋণও সময়মতো পরিশোধ করা করোনার জালে আটকে যেতে পারে। সঙ্গতকারণে এ সময়সীমা বাড়ানো জরুরি। উদ্যোক্তারা বলেছেন, মেয়াদ বাড়ানো না হলে এসব এলসির বিপরীতে নিয়মিতভাবে ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। না করলে খেলাপি হতে হবে। তখন নতুন ঋণও পাওয়া যাবে না। ফলে নির্ঘাত ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হবে।

এ প্রসঙ্গে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও পুরো মাত্রায় স্বাভাবিক হয়নি। গত এপ্রিল-মে’র তুলনায় ৭০ শতাংশ সচল হয়েছে। আর ৩০ শতাংশ সচল হলে পুরো স্বাভাবিক হবে। এর মধ্যেই আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসছে। করোনার থাবা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি কবে মুক্ত হবে সে ব্যাপারে কোনো দেশ কোনো রোডম্যাপ করতে পারছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিনিয়োগও হচ্ছে না। একটা অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। এ অবস্থায় অর্থের চলাচলও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে উদ্যোক্তারা অর্থ সংকটে রয়েছেন। এই সময়ে রফতানিকারকদের বাড়তি সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আগামী মার্চের মধ্যে যে সব কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা প্রকট হলে তখন রফতানিতে আরও বড় ধাক্কা আসবে। এসব বিবেচনায় সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মোট রফতানির ৫৬ শতাংশ যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোতে। আমেরিকাতে ১৬ শতাংশ। বাকি ২৮ শতাংশ যাচ্ছে অন্যান্য দেশে। করোনায় আমেরিকা এখনও হাবুডুবু খাচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোতে দ্বিতীয় ধাক্কা আসতে শুরু করেছে। ফলে ৭২ শতাংশ রফতানি আয়ের দেশগুলো এখন প্রবল সংকটে। ওইসব দেশে রফতানি করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি পণ্য বিক্রি হবে কিনা তাও অনিশ্চিত। এসব মিলে রফতানি আয় আসাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে রফতানি খাতও আছে বড় ঝুঁকিতে।

সূত্র মতে, দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশই আসে টেক্সটাইল পণ্য ও তৈরি পোশাক থেকে। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোতে। আমেরিকাতে যাচ্ছে ১৯ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ যাচ্ছে অন্যান্য দেশে। ফলে টেক্সটাইল পণ্য ও তৈরি পোশাক রফতানিতে বড় ধরনের একটা ঝুঁকি রয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য দুই মাস বলতে গেলে একেবারে বন্ধ ছিল। ওখান থেকে এখন সচল হচ্ছে। এখনও পুরো স্বাভাবিক হয়নি। পুরো স্বাভাবিক হওয়ার পর তা আরও বাড়াতে হবে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। কেননা রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে কার্যক্রমও আগের চেয়ে বাড়াতে হবে। এটি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখন চলমান বাণিজ্যই ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আওয়াজ উঠেছে। ফলে সবাই সতর্ক। তিনি আরও বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা সামাল দিতে সরকারকে যেমন প্রস্তুতি নিতে হবে, তেমনি উদ্যোক্তাদেরও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। ব্যবসার গতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের প্রণোদনার সময়সীমাও বাড়াতে হবে।

এদিকে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পণ্য রফতানির ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে পণ্যের মূল্য দেশে আনার নিয়ম রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে মূল্য না এলে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকের বিল বকেয়া বলে গণ্য হবে। এর ফলে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দেনা পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংক গ্রাহকের নামে ফোর্স লোন ইস্যু করে এলসির দেনা শোধ করবে।

এই যখন অবস্থা তখন তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য রফতানিকারকরা ইতোমধ্যে যেসব পণ্য রফতানি করেছেন বা আগামীতে যেসব পণ্য রফতানি করবেন, সেগুলোর মূল্য আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশে আনতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাই সংকট নিরসনে ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

রফতানি শিল্পে বড় সংকটের শঙ্কা

ঋণ শোধের সীমা আরও না বাড়ালে সুফল মিলবে না

 যুগান্তর রিপোর্ট 
১৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক টু ব্যাক একক এলসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কার্যত ৬ মাসের বেশি বাড়ানো হয়নি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক দুই দফা প্রজ্ঞাপনে এই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ৬ মাস করে গড়ে এক বছর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে একক এলসির ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৬ মাস। উদ্যোক্তারা অনেকেই মনে করছেন, ঋণ শোধের সীমা দুই দফায় এক বছর বাড়ানো হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যায় এমন শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা যুগান্তরকে জানান, বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যে কোনো ব্যবসায়ী এখনও কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। এর মধ্যে আবার শোনা যাচ্ছে, বেশ জোরেশোরে শীতকালে আঘাত হানতে পারে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। তাই যদি হয়, তাহলে পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করে লাভ করা তো দূরের কথা, শিল্প টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে এ অবস্থায় কারও পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এ বিবেচনায় ব্যবসা-বাণিজ্য আগের অবস্থায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ঋণ পরিশোধে সরকারের পক্ষ থেকে সময়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা আসা জরুরি। না হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ইডিএফ থেকে নেয়া ঋণ শোধের সময়সীমা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। পরে সমস্যা হলে দেখা যাবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি এবং আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক এবং বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘করোনা মহামারীর সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাপক সহযোগিতা করছে। ইডিএফের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরপরও যদি সমস্যা হয় তা হলে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বসে সমস্যাটি তুলে ধরব। তাদের সহযোগিতা চাইব। আমরা আশা করি, তখন তারা আমাদের সমস্যার সমাধান করে দেবে।’

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, কোনো গ্রাহকের অসুবিধা হলে সময় চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে শর্ত হল, করসপনডেন্ট ব্যাংক বা বিদেশি মধ্যস্থতাকারী ব্যাংকের সম্মতিও লাগবে। তা ছাড়া সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার আঘাতে এখনও ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হতে পারেনি। আর্থিক লেনদেনও চালু হয়নি পুরোদমে। ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাও ফেরেনি স্বাভাবিক গতিতে। বর্তমানে যেসব পণ্য রফতানি হচ্ছে সেগুলোর বেশির ভাগ অর্থ ঠিকমতো দেশে আসছে না। যে কারণে উদ্যোক্তাদের কাছে টাকার প্রবাহ কমে গেছে। উদ্যোক্তারা সময়মতো ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছেন। এসব বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রফতানিকারকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ছাড় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ব্যাক টু ব্যাক এলসির কাঁচামাল আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) পরিশোধের সীমা একক এলসির ক্ষেত্রে ৬ মাস বাড়ানো হয়েছে। এ সুবিধা পাওয়া যাবে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত। অর্থাৎ এর পর আর এ সুবিধা মিলবে না। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রফতানি আদেশের বিপরীতে ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির পর পণ্য তৈরি করে বিদেশে রফতানি করা হয়। এর মূল্য দেশে আসার পর ইডিএফের ঋণ শোধ করা হয়। এর জন্য মেয়াদ থাকে ৬ মাস। রফতানিকারকদের সুবিধার্থে এ তহবিল থেকে ঋণ দেয়া হয় ২ শতাংশ সুদে। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় সময়মতো রফতানি বিল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ইডিএফের ঋণও শোধ করা সম্ভব হয় না। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ শোধের সময়সীমা আরও ৬ মাস বাড়িয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ সময় ৬ মাস ও করোনার কারণে বর্ধিত সময় আরও ৬ মাস, মোট এক বছর। তবে বর্ধিত সুবিধা একক এলসির ক্ষেত্রে ৬ মাসের বেশি পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে আগামী বছরের ৩১ মার্চের পরও এমন সুবিধা মিলবে না। অর্থাৎ চলতি অক্টোবরের শুরু থেকে এখন যেসব এলসি খোলা হচ্ছে সেগুলোতে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। কেননা এসব এলসির সাধারণ সময়সীমা ৬ মাস অতিক্রম করবে আগামী ৩১ মার্চের পর। যেহেতু ৩১ মার্চ পর্যন্তই বহাল, সেহেতু অক্টোবর থেকে খোলা এলসি এ সুবিধা পাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে যেসব ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে সেগুলো বর্ধিত সুবিধা পাবে মাত্র এক মাস। আগস্টে যেসব খোলা এলসি বাড়তি সুবিধা পাবে মাত্র ২ মাস। অথচ ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও স্বাভাবিক হয়নি। অর্থের লেনদেনেও স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। এ অবস্থায় এখন যেসব এলসি খোলা হচ্ছে তা পরিশোধে বাড়তি সুবিধা মিলছে না। তখন নিয়মিত এলসির পাশাপাশি আগের দেনা শোধ করতে হবে। অর্থাৎ একসঙ্গে দুটি দেনা শোধ করতে হবে। এছাড়া সাধারণ ঋণের কিস্তিও একসঙ্গে দুটি শোধ করতে হবে। ফলে উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। বলা যায়, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

এমনিতেই করোনার চাপে ‘চ্যাপ্টা’ হয়ে পড়েছে দেশের রফতানিমুখী শিল্প। এর মধ্যে আবার নতুন করে করোনার দ্বিতীয় হানা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ইতোমধ্যে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে ফের করোনার আঘাত এসে গেছে। এর প্রভাবে যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ ইউরোপের অনেক দেশ দ্বিতীয় দফায় সীমিত আকারে লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে। এতে রফতানি শিল্পে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনিতেই রফতানি আয় ঠিকমতো দেশে আসছে না। করোনার দ্বিতীয় আঘাতে রফতানি আয় দেশে আসা আরও বিলম্বিত হতে পারে। তখন রফতানি ঋণও সময়মতো পরিশোধ করা করোনার জালে আটকে যেতে পারে। সঙ্গতকারণে এ সময়সীমা বাড়ানো জরুরি। উদ্যোক্তারা বলেছেন, মেয়াদ বাড়ানো না হলে এসব এলসির বিপরীতে নিয়মিতভাবে ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। না করলে খেলাপি হতে হবে। তখন নতুন ঋণও পাওয়া যাবে না। ফলে নির্ঘাত ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হবে।

এ প্রসঙ্গে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও পুরো মাত্রায় স্বাভাবিক হয়নি। গত এপ্রিল-মে’র তুলনায় ৭০ শতাংশ সচল হয়েছে। আর ৩০ শতাংশ সচল হলে পুরো স্বাভাবিক হবে। এর মধ্যেই আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসছে। করোনার থাবা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি কবে মুক্ত হবে সে ব্যাপারে কোনো দেশ কোনো রোডম্যাপ করতে পারছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিনিয়োগও হচ্ছে না। একটা অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। এ অবস্থায় অর্থের চলাচলও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে উদ্যোক্তারা অর্থ সংকটে রয়েছেন। এই সময়ে রফতানিকারকদের বাড়তি সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আগামী মার্চের মধ্যে যে সব কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা প্রকট হলে তখন রফতানিতে আরও বড় ধাক্কা আসবে। এসব বিবেচনায় সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মোট রফতানির ৫৬ শতাংশ যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোতে। আমেরিকাতে ১৬ শতাংশ। বাকি ২৮ শতাংশ যাচ্ছে অন্যান্য দেশে। করোনায় আমেরিকা এখনও হাবুডুবু খাচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোতে দ্বিতীয় ধাক্কা আসতে শুরু করেছে। ফলে ৭২ শতাংশ রফতানি আয়ের দেশগুলো এখন প্রবল সংকটে। ওইসব দেশে রফতানি করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি পণ্য বিক্রি হবে কিনা তাও অনিশ্চিত। এসব মিলে রফতানি আয় আসাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে রফতানি খাতও আছে বড় ঝুঁকিতে।

সূত্র মতে, দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশই আসে টেক্সটাইল পণ্য ও তৈরি পোশাক থেকে। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোতে। আমেরিকাতে যাচ্ছে ১৯ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ যাচ্ছে অন্যান্য দেশে। ফলে টেক্সটাইল পণ্য ও তৈরি পোশাক রফতানিতে বড় ধরনের একটা ঝুঁকি রয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য দুই মাস বলতে গেলে একেবারে বন্ধ ছিল। ওখান থেকে এখন সচল হচ্ছে। এখনও পুরো স্বাভাবিক হয়নি। পুরো স্বাভাবিক হওয়ার পর তা আরও বাড়াতে হবে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। কেননা রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে কার্যক্রমও আগের চেয়ে বাড়াতে হবে। এটি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখন চলমান বাণিজ্যই ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আওয়াজ উঠেছে। ফলে সবাই সতর্ক। তিনি আরও বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা সামাল দিতে সরকারকে যেমন প্রস্তুতি নিতে হবে, তেমনি উদ্যোক্তাদেরও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। ব্যবসার গতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের প্রণোদনার সময়সীমাও বাড়াতে হবে।

এদিকে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পণ্য রফতানির ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে পণ্যের মূল্য দেশে আনার নিয়ম রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে মূল্য না এলে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকের বিল বকেয়া বলে গণ্য হবে। এর ফলে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দেনা পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংক গ্রাহকের নামে ফোর্স লোন ইস্যু করে এলসির দেনা শোধ করবে।

এই যখন অবস্থা তখন তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য রফতানিকারকরা ইতোমধ্যে যেসব পণ্য রফতানি করেছেন বা আগামীতে যেসব পণ্য রফতানি করবেন, সেগুলোর মূল্য আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশে আনতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাই সংকট নিরসনে ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।