শেবাচিমের সিনিয়র চিকিৎসক ও ইন্টার্নরা মুখোমুখি
jugantor
ডায়াগনস্টিক ল্যাবের কমিশন নিয়ে বিরোধ
শেবাচিমের সিনিয়র চিকিৎসক ও ইন্টার্নরা মুখোমুখি

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো  

২৪ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কমিশনের টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে বরিশালের শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার ও ইন্টার্নরা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একজন সিনিয়র চিকিৎসক লাঞ্ছিত হয়েছেন।

এ ঘটনায় লাঞ্ছনার শিকার চিকিৎসক এবং ইন্টার্নদের পক্ষে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পড়েছে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে। আর দু’পক্ষের এই বিরোধের মধ্যদিয়ে ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে শেবাচিম হাসপাতালের চিকিৎসকদের লাখ লাখ টাকার কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।

দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রশ্নে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সরকারি হাসপাতাল হল শেবাচিম হাসপাতাল। আউটডোর-ইনডোর মিলিয়ে এখানে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা পায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ। এই হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বহু আগে থেকেই ডায়াগনস্টিক ল্যাবে রোগী পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালের সামনে থাকা ৫০-৬০টি ডায়াগনস্টিক ল্যাবের সঙ্গে তাদের অলিখিত চুক্তি রয়েছে। রোগীর দরকার হোক বা না হোক, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেই তাদেরকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে সামনের ওসব ল্যাবে পাঠানো হয়। ডাক্তারদের এই কমিশন বাণিজ্যের কারণে শেবাচিমের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে হাসপাতালের সামনে থাকা বেশ কয়েকটি ডায়াগনস্টিক ল্যাবের মালিক যুগান্তরকে জানান, যে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রশ্নে ৪০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। যেসব ডাক্তার রোগী পাঠান তারা নেন কমিশন। আবার অন্য আরেকটি পদ্ধতিও আছে। বিষয়টি কমিশন হিসেবে না ধরে ডাক্তার-ইন্টার্নদের চা-নাশতার খরচ হিসেবেও দেখে অনেকে। হাসপাতালে থাকা মেডিসিন, সার্জারি, অর্থোপেডিকসসহ সব বিভাগের ক্ষেত্রেই চলে এই নিয়ম। নিয়মিত কমিশনের পাশাপাশি মাসে ৭০ হাজার টাকা করে দেয়া হয় প্রতিটি বিভাগকে। হাসপাতালের সামনে থাকা সব কটি ল্যাব থেকেই এই টাকা দেয়া হয়।

কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন-এমন একজন চিকিৎসক বলেন, প্রায় ৫০টি ল্যাবের প্রতিটি থেকে যদি মাসে ৭০ হাজার করে টাকা আসে তাহলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ৩৫ লাখ। এর সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কমিশন যোগ হলে টাকার অঙ্ক ৮০-৯০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই পুরো টাকাটাই ভাগ হয় চিকিৎসক এবং ইন্টার্নদের মধ্যে। কেননা রেজিস্ট্রার-সহকারী রেজিস্ট্রারের পাশাপাশি ইন্টার্নরাও পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্লিপ দিয়ে রোগীদের পাঠান ওইসব ডায়াগনস্টিক ল্যাবে। পুরো বিষয়টি এতদিন ওপেন সিক্রেট থাকলেও যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে বলা যায়নি। কিন্তু এবার কমিশনের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ইন্টার্নদের সঙ্গে এক সিনিয়র চিকিৎসকের বিরোধের জেরে ফাঁস হয়ে গেছে সবকিছুই।

১৯ অক্টোবর মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাসুদ খানকে তার হাসপাতালের কক্ষে আটকে লাঞ্ছিত করে কয়েকজন ইন্টার্ন। পরদিন হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন ডা. মাসুদ। এতে ইন্টার্ন ডা. সজল পাণ্ডে এবং তরিকুল ইসলামসহ ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনেন তিনি। যদিও লাঞ্ছিত করার কারণ হিসেবে কিছুই উল্লেখ করেননি মাসুদ।

এর পরদিন ডা. মাসুদ খানের বিরুদ্ধে পরিচালকের কাছে পাল্টা অভিযোগ দেন ইন্টার্ন। অভিযোগে ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে কমিশন নেয়ার পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও ইন্টার্নদের নাম করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগে ইন্টার্নরা বলেন, ‘নির্দিষ্ট কয়েকটি ল্যাবে রোগীদের পরীক্ষা পাঠান ডা. মাসুদ। সেইসব ল্যাব ছাড়া অন্য ল্যাবে পরীক্ষা করালে তার কাগজপত্র ছুড়ে ফেলে দেন তিনি। তাছাড়া ইন্টার্নদের নামে লাখ লাখ টাকা ওঠালেও তা তাদেরকে না দিয়ে তিনি আত্মসাৎ করেছেন।’

পরিচয় না প্রকাশের শর্তে মেডিসিন ওয়ার্ডের একজন চিকিৎসক বলেন, মূলত করোনাকালীন ডায়াগনস্টিক ল্যাবগুলো থেকে পাওয়া কমিশন এবং চা-নাশতার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। আর এই একটি ঘটনায় পুরো হাসপাতালের ডাক্তারদের কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ডা. মাসুদ খান। ইন্টার্নদের নেতা ডা. সজল পান্ডে বলেন, ‘ছাত্রলীগ এবং ইন্টার্নদের নামে ওঠানো লাখ লাখ টাকা না দিয়ে আত্মসাৎ করার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া তিনি যে অভিযোগ করেছেন, তা-ও সত্য নয়। আমাদের নামে ওঠানো টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চেয়েছি তার কাছে। এ সময় সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে। তাকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ সত্য নয়।’

জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, ‘ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

চাঁদাবাজি এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ দুঃখজনক। আশা করি, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে পুরো বিষয়টিই আসবে। এরপর অবশ্যই দাফতরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ডায়াগনস্টিক ল্যাবের কমিশন নিয়ে বিরোধ

শেবাচিমের সিনিয়র চিকিৎসক ও ইন্টার্নরা মুখোমুখি

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো 
২৪ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কমিশনের টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে বরিশালের শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার ও ইন্টার্নরা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একজন সিনিয়র চিকিৎসক লাঞ্ছিত হয়েছেন।

এ ঘটনায় লাঞ্ছনার শিকার চিকিৎসক এবং ইন্টার্নদের পক্ষে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পড়েছে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে। আর দু’পক্ষের এই বিরোধের মধ্যদিয়ে ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে শেবাচিম হাসপাতালের চিকিৎসকদের লাখ লাখ টাকার কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।

দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রশ্নে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সরকারি হাসপাতাল হল শেবাচিম হাসপাতাল। আউটডোর-ইনডোর মিলিয়ে এখানে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা পায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ। এই হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বহু আগে থেকেই ডায়াগনস্টিক ল্যাবে রোগী পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালের সামনে থাকা ৫০-৬০টি ডায়াগনস্টিক ল্যাবের সঙ্গে তাদের অলিখিত চুক্তি রয়েছে। রোগীর দরকার হোক বা না হোক, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেই তাদেরকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে সামনের ওসব ল্যাবে পাঠানো হয়। ডাক্তারদের এই কমিশন বাণিজ্যের কারণে শেবাচিমের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে হাসপাতালের সামনে থাকা বেশ কয়েকটি ডায়াগনস্টিক ল্যাবের মালিক যুগান্তরকে জানান, যে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রশ্নে ৪০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। যেসব ডাক্তার রোগী পাঠান তারা নেন কমিশন। আবার অন্য আরেকটি পদ্ধতিও আছে। বিষয়টি কমিশন হিসেবে না ধরে ডাক্তার-ইন্টার্নদের চা-নাশতার খরচ হিসেবেও দেখে অনেকে। হাসপাতালে থাকা মেডিসিন, সার্জারি, অর্থোপেডিকসসহ সব বিভাগের ক্ষেত্রেই চলে এই নিয়ম। নিয়মিত কমিশনের পাশাপাশি মাসে ৭০ হাজার টাকা করে দেয়া হয় প্রতিটি বিভাগকে। হাসপাতালের সামনে থাকা সব কটি ল্যাব থেকেই এই টাকা দেয়া হয়।

কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন-এমন একজন চিকিৎসক বলেন, প্রায় ৫০টি ল্যাবের প্রতিটি থেকে যদি মাসে ৭০ হাজার করে টাকা আসে তাহলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ৩৫ লাখ। এর সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কমিশন যোগ হলে টাকার অঙ্ক ৮০-৯০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই পুরো টাকাটাই ভাগ হয় চিকিৎসক এবং ইন্টার্নদের মধ্যে। কেননা রেজিস্ট্রার-সহকারী রেজিস্ট্রারের পাশাপাশি ইন্টার্নরাও পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্লিপ দিয়ে রোগীদের পাঠান ওইসব ডায়াগনস্টিক ল্যাবে। পুরো বিষয়টি এতদিন ওপেন সিক্রেট থাকলেও যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে বলা যায়নি। কিন্তু এবার কমিশনের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ইন্টার্নদের সঙ্গে এক সিনিয়র চিকিৎসকের বিরোধের জেরে ফাঁস হয়ে গেছে সবকিছুই।

১৯ অক্টোবর মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাসুদ খানকে তার হাসপাতালের কক্ষে আটকে লাঞ্ছিত করে কয়েকজন ইন্টার্ন। পরদিন হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন ডা. মাসুদ। এতে ইন্টার্ন ডা. সজল পাণ্ডে এবং তরিকুল ইসলামসহ ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনেন তিনি। যদিও লাঞ্ছিত করার কারণ হিসেবে কিছুই উল্লেখ করেননি মাসুদ।

এর পরদিন ডা. মাসুদ খানের বিরুদ্ধে পরিচালকের কাছে পাল্টা অভিযোগ দেন ইন্টার্ন। অভিযোগে ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে কমিশন নেয়ার পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও ইন্টার্নদের নাম করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগে ইন্টার্নরা বলেন, ‘নির্দিষ্ট কয়েকটি ল্যাবে রোগীদের পরীক্ষা পাঠান ডা. মাসুদ। সেইসব ল্যাব ছাড়া অন্য ল্যাবে পরীক্ষা করালে তার কাগজপত্র ছুড়ে ফেলে দেন তিনি। তাছাড়া ইন্টার্নদের নামে লাখ লাখ টাকা ওঠালেও তা তাদেরকে না দিয়ে তিনি আত্মসাৎ করেছেন।’

পরিচয় না প্রকাশের শর্তে মেডিসিন ওয়ার্ডের একজন চিকিৎসক বলেন, মূলত করোনাকালীন ডায়াগনস্টিক ল্যাবগুলো থেকে পাওয়া কমিশন এবং চা-নাশতার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। আর এই একটি ঘটনায় পুরো হাসপাতালের ডাক্তারদের কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ডা. মাসুদ খান। ইন্টার্নদের নেতা ডা. সজল পান্ডে বলেন, ‘ছাত্রলীগ এবং ইন্টার্নদের নামে ওঠানো লাখ লাখ টাকা না দিয়ে আত্মসাৎ করার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া তিনি যে অভিযোগ করেছেন, তা-ও সত্য নয়। আমাদের নামে ওঠানো টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চেয়েছি তার কাছে। এ সময় সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে। তাকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ সত্য নয়।’

জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, ‘ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

চাঁদাবাজি এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ দুঃখজনক। আশা করি, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে পুরো বিষয়টিই আসবে। এরপর অবশ্যই দাফতরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’