শুধু চিঠিই দিচ্ছে জনপ্রশাসন, শাস্তির ছিটেফোঁটাও নেই
jugantor
সরকারি গাড়ি অপব্যবহার
শুধু চিঠিই দিচ্ছে জনপ্রশাসন, শাস্তির ছিটেফোঁটাও নেই

  বিএম জাহাঙ্গীর  

২২ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গাড়ি অপব্যবহার রোধে একের পর এক চিঠি দিয়েই যাচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তিন বছরের ব্যবধানে পাঁচ দফায় চিঠি দিয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কে শোনে কার কথা। দিব্বি গাড়ি অপব্যবহার অব্যাহত আছে।

প্রাধিকারপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে গাড়ি নগদায়ন সুবিধা দেয়ার পরও পরিবহন পুলসহ বেশির ভাগ দফতরে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খাতে খরচ মোটেও কমেনি। বরং কোথাও কোথাও বেড়েছে। বাস্তবতা হল, উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে যারা সুদমুক্ত সুবিধায় ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন তাদের অনেকে বহাল-তবিয়তে আগের মতো মন্ত্রণালয়/দফতর/সংস্থার গাড়ি ব্যবহার করছেন। আবার নগদায়ন সুবিধায় কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে বেতনের সঙ্গে তুলে নিচ্ছেন ৫০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা।

প্রসঙ্গত, প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ সুবিধায় কেনা গাড়ির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সর্বশেষ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে চিঠি পাঠানো হয় গত ২৮ অক্টোবর। এর আগে এ বিষয়ে প্রথম চিঠি পাঠানো হয় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর, ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর, ২০২০ সালের ৮ মার্চ এবং গত ২৩ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে এ নিয়ে এক বছরের মধ্যে তিন দফা চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। শেষ দফার চিঠিতে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, যারা এহেন কাজ করবেন তারা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণ বলে গণ্য হবে। অসদাচরণ একটি গুরুদণ্ডের অপরাধ।

এদিকে নৈতিক কারণে যেসব কর্মকর্তা ঋণ সুবিধায় গাড়ি কেনার পর সরকারি গাড়ি ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছেন এমন কর্মকর্তার সংখ্যা খুবই কম। শতকরা ১০ জনের বেশি হবে না। এ অপব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে গাড়ি অপব্যবহার করেন না এমন কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রথম কথা হল- যারা ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন তাদের নৈতিক ও আইনগত কারণেই দফতরের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু যারা এখনও অবলীলায় নির্দেশনা অমান্য করে যাচ্ছেন তারা একই সঙ্গে দুটি অপরাধ করছেন। প্রথমত, এ বিষয়ে বিদ্যমান নীতিমালা অমান্য করে বিভাগীয় মামলার সম্মুখীন হওয়ার মতো অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন। অপরটি ৫০ হাজার টাকা গাড়ি ভাতা তুলে প্রকারান্তরে সরকারি অর্থ তসরুপের অপরাধ করছেন। যা দুর্নীতির শামিল। সম্ভবত এ বিষয়ে প্রথমদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকেও চিঠি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও সতর্ক করে চিঠি ইস্যু করেছে। তারা বলেন, এত বিধিনিষেধের পরও যারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছেন না তারা নিঃসন্দেহে খুবই প্রভাবশালী। এক প্রশ্নের জবাবে সাধারণ কর্মকর্তারা বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বিধিবিধান শক্ত হাতে প্রয়োগ করা হবে না, ততদিন এসব অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতি চলতেই থাকবে। বিশেষ করে রক্ষকরা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে কারও কিছু করার থাকবে না। তারা মনে করেন, এভাবে আর চিঠির সংখ্যা না বাড়িয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ মনিটরিং কমিটি গঠন করা উচিত। যার সদস্য হতে পারে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের যুগ্মসচিব (প্রশাসন)। গাড়ি অপব্যবহার রোধে এ কমিটি বিভিন্ন পন্থায় মনিটরিং করে তথ্য সংগ্রহ ছাড়াও প্রতি মাসে একবার বৈঠক করে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট উপস্থাপন করবে। সেখানে নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যেসব কর্মকর্তা গাড়ি প্রাধিকার সুবিধা নিয়েছেন তারা কেউই সরকারের অন্য কোনো গাড়ি ব্যবহার করছেন না। পাশাপাশি পরিবহন পুলসহ প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি খাতে আগের তুলনায় ব্যয় হ্রাস/বৃদ্ধি হয়েছে কিনা সে বিষয়েও পৃথক রিপোর্ট উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কেননা সুদমুক্ত এই ঋণ সুবিধা দেয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, সরকারের গাড়ি ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় কমিয়ে আনা। পাশাপাশি উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে চাকরিজীবনে যেন ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে কোনো বাড়তি দুশ্চিন্তা করতে না হয়।

সচিবালয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এ ধরনের শুদ্ধি অভিযান আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু হওয়া উচিত। এরপর অন্যান্য মন্ত্রণালয়েও এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তাদের মতে, একজন ক্যাডার কর্মকর্তা যদি গাড়ি অপব্যবহারের লোভ সামাল দিতে না পারেন তাহলে তার সামগ্রিক সেবা দেয়ার মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তিনি কতখানি পেশাদারিত্ব ও সততা বজায় রেখে সেবা দিতে পারছেন সেটি তখন জনমনে মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে। তাছাড়া এর সঙ্গে সরকারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয় তো থাকছেই। যা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি গাড়ি অপব্যবহার

শুধু চিঠিই দিচ্ছে জনপ্রশাসন, শাস্তির ছিটেফোঁটাও নেই

 বিএম জাহাঙ্গীর 
২২ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গাড়ি অপব্যবহার রোধে একের পর এক চিঠি দিয়েই যাচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তিন বছরের ব্যবধানে পাঁচ দফায় চিঠি দিয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কে শোনে কার কথা। দিব্বি গাড়ি অপব্যবহার অব্যাহত আছে।

প্রাধিকারপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে গাড়ি নগদায়ন সুবিধা দেয়ার পরও পরিবহন পুলসহ বেশির ভাগ দফতরে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খাতে খরচ মোটেও কমেনি। বরং কোথাও কোথাও বেড়েছে। বাস্তবতা হল, উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে যারা সুদমুক্ত সুবিধায় ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন তাদের অনেকে বহাল-তবিয়তে আগের মতো মন্ত্রণালয়/দফতর/সংস্থার গাড়ি ব্যবহার করছেন। আবার নগদায়ন সুবিধায় কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে বেতনের সঙ্গে তুলে নিচ্ছেন ৫০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা।

প্রসঙ্গত, প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ সুবিধায় কেনা গাড়ির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সর্বশেষ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে চিঠি পাঠানো হয় গত ২৮ অক্টোবর। এর আগে এ বিষয়ে প্রথম চিঠি পাঠানো হয় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর, ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর, ২০২০ সালের ৮ মার্চ এবং গত ২৩ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে এ নিয়ে এক বছরের মধ্যে তিন দফা চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। শেষ দফার চিঠিতে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, যারা এহেন কাজ করবেন তারা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণ বলে গণ্য হবে। অসদাচরণ একটি গুরুদণ্ডের অপরাধ।

এদিকে নৈতিক কারণে যেসব কর্মকর্তা ঋণ সুবিধায় গাড়ি কেনার পর সরকারি গাড়ি ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছেন এমন কর্মকর্তার সংখ্যা খুবই কম। শতকরা ১০ জনের বেশি হবে না। এ অপব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে গাড়ি অপব্যবহার করেন না এমন কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রথম কথা হল- যারা ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন তাদের নৈতিক ও আইনগত কারণেই দফতরের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু যারা এখনও অবলীলায় নির্দেশনা অমান্য করে যাচ্ছেন তারা একই সঙ্গে দুটি অপরাধ করছেন। প্রথমত, এ বিষয়ে বিদ্যমান নীতিমালা অমান্য করে বিভাগীয় মামলার সম্মুখীন হওয়ার মতো অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন। অপরটি ৫০ হাজার টাকা গাড়ি ভাতা তুলে প্রকারান্তরে সরকারি অর্থ তসরুপের অপরাধ করছেন। যা দুর্নীতির শামিল। সম্ভবত এ বিষয়ে প্রথমদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকেও চিঠি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও সতর্ক করে চিঠি ইস্যু করেছে। তারা বলেন, এত বিধিনিষেধের পরও যারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছেন না তারা নিঃসন্দেহে খুবই প্রভাবশালী। এক প্রশ্নের জবাবে সাধারণ কর্মকর্তারা বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বিধিবিধান শক্ত হাতে প্রয়োগ করা হবে না, ততদিন এসব অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতি চলতেই থাকবে। বিশেষ করে রক্ষকরা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে কারও কিছু করার থাকবে না। তারা মনে করেন, এভাবে আর চিঠির সংখ্যা না বাড়িয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ মনিটরিং কমিটি গঠন করা উচিত। যার সদস্য হতে পারে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের যুগ্মসচিব (প্রশাসন)। গাড়ি অপব্যবহার রোধে এ কমিটি বিভিন্ন পন্থায় মনিটরিং করে তথ্য সংগ্রহ ছাড়াও প্রতি মাসে একবার বৈঠক করে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট উপস্থাপন করবে। সেখানে নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যেসব কর্মকর্তা গাড়ি প্রাধিকার সুবিধা নিয়েছেন তারা কেউই সরকারের অন্য কোনো গাড়ি ব্যবহার করছেন না। পাশাপাশি পরিবহন পুলসহ প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি খাতে আগের তুলনায় ব্যয় হ্রাস/বৃদ্ধি হয়েছে কিনা সে বিষয়েও পৃথক রিপোর্ট উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কেননা সুদমুক্ত এই ঋণ সুবিধা দেয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, সরকারের গাড়ি ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় কমিয়ে আনা। পাশাপাশি উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে চাকরিজীবনে যেন ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে কোনো বাড়তি দুশ্চিন্তা করতে না হয়।

সচিবালয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এ ধরনের শুদ্ধি অভিযান আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু হওয়া উচিত। এরপর অন্যান্য মন্ত্রণালয়েও এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তাদের মতে, একজন ক্যাডার কর্মকর্তা যদি গাড়ি অপব্যবহারের লোভ সামাল দিতে না পারেন তাহলে তার সামগ্রিক সেবা দেয়ার মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তিনি কতখানি পেশাদারিত্ব ও সততা বজায় রেখে সেবা দিতে পারছেন সেটি তখন জনমনে মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে। তাছাড়া এর সঙ্গে সরকারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয় তো থাকছেই। যা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতেও উল্লেখ করা হয়েছে।