উল্টোপথেই ১০৩ বছর
jugantor
ঢাকার উন্নয়নে ৯ মাস্টারপ্ল্যান
উল্টোপথেই ১০৩ বছর

  মতিন আব্দুল্লাহ  

২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালে প্রথম মাস্টারপ্ল্যান ধারণাপত্র তৈরি করেন স্যার প্যাট্রিক গেডিস। সে সময় ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ১০ লাখ। বিট্রিশদের উদ্যোগে প্রণীত প্রথম পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ পায়নি। এরপর থেকে ১০৩ বছর পার হয়েছে।

এর মধ্যে বড় পরিসরে ৯টি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটিও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। আলোর মুখই দেখেনি ৫টি। বাকি চারটি কাটছাঁট করে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব কারণে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছে। এখন হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছে না সরকার।

অথচ কাগুজে পরিকল্পনাগুলো খুবই সুন্দর ছিল। কিন্তু সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে উল্টো ফল মিলছে। নগরবিদদের মতে, ঢাকার উন্নয়নে সরকারগুলো ১৯১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১০৩ বছর ধরেই উল্টোপথে হাঁটছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল এখন অধরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনঘনত্ব, যানজট, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, জলজট, জলাবদ্ধতাসহ বহুবিধ নাগরিক সমস্যা সমাধানে সেই মাস্টারপ্ল্যানগুলোর সঠিক বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। কাজেই মেট্রোরেল, সাবওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভারের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুফল মিলবে না বলে তারা মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা শহর নিয়ে প্রথম পরিকল্পনার চিন্তা করা হয় ১৯১৭ সালে। এরপর তার সেই ধারণাপত্র নিয়ে আর কোনো কাজ হয়নি।

এরপর পূর্ব পাকিস্তানের সময় এবং পরে বাংলাদেশেও বেশকিছু পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু এগুলোর উল্টো বাস্তবায়ন হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানগুলোর দিকনির্দেশনা অনুসরণ না করে রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী মহলের ইচ্ছামতো পরিকল্পনা কাটছাঁট করা হয়েছে। যে কারণে কাগুজে পরিকল্পনাগুলো সুন্দর থাকলেও ঢাকা পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য হওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সালাহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, স্বাধীনতার পর ঢাকায় মানুষের সে াত বাড়তে থাকে। তাদের বাসস্থান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা করলেও গণপরিবহন নিয়ে তেমন কিছু হয়নি।

তিনি বলেন, পরে গণপরিবহন পরিকল্পনাপত্র তৈরি হয়। কিন্তু সেটা অনুসরণ না করেই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না করায় সমস্যা প্রকট হচ্ছে। এখন মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে গিয়ে সাবওয়ে (ভূগর্ভস্থ রেল) তৈরির চিন্তা করছে সরকার। যদি সেটাই করে সরকার তবে এত পরিকল্পনার দরকার কী বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকার যত পরিকল্পনা : ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালে নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিসকে দিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করে ব্রিটিশরা। এটাকে মাস্টারপ্ল্যানের ধারণাপত্র বলা হয়। এর নাম ছিল ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’। ঢাকা সমতল আর বৃষ্টিপ্রবণ শহর। এ দুটো বাস্তবতা ধরে বিশদ পরিকল্পনার সুপারিশ করে ওই নগর পরিকল্পনাবিদ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার চারদিকে চারটি নদী এবং ৫০টির মতো প্রাকৃতিক খাল ছিল। এ খালগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি নদীতে পড়ত। কোথাও পানি জমত না। শহর বড় হতে থাকলে ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিসকে দিয়ে ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’ তৈরি করায়। স্যার প্যাট্রিকের চিন্তার যৌক্তিকতা খুঁজে পান বর্তমান নগর পরিকল্পনাবিদরা।

এ প্রসঙ্গে নগরবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা টাউন প্ল্যানে বৃষ্টির পানি যেন জমে না যায় সেজন্য নদী, খাল ও জলাধারগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। ওটা ঠিক একশ’ বছর আগের কথা। কিন্তু এখনও আমাদের এসব নিয়েই কথা বলতে হচ্ছে।

১৯৫৮ ও ১৯৫৯ সালে তৎকালীন সরকার ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটির তত্ত্বাবধানে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে। সেই ডিআইটি বর্তমান রাজউক। ২০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনা শুরুতে কিছুটা বাস্তবায়ন হলেও পরে মুথ থুবড়ে পড়ে।

এছাড়া স্বাধীনতার পর ঢাকামুখী জনস্রোত বাড়ায় ওই পরিকল্পনার দিকনির্দেশনাও গুরুত্ব হারায়। পানি নিষ্কাশন ও বন্যার প্রসঙ্গটিও এ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায়। এতেও নদী-খাল সংরক্ষণের কথা বলা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা শহরের জন্য প্রথমে ১৯৭৯ ও ৮০ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। একটি খসড়া পরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হলেও সেটা আলোর মুখ দেখেনি। তৎকালীন সরকার ওই মাস্টারপ্ল্যানকে গেজেট আকারে প্রকাশ করেনি।

১৯৯৫ সালে রাজউক ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি) তৈরি করে। ১৯৯৭ সালে এটা পাস হয়। ডিএমডিপি’র আওতায় স্ট্রাকচার প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) করার কথা ছিল। সে সময় রাজউক প্রথম দুটি পরিকল্পনা করলেও ড্যাপ প্রণয়ন হয় ২০১০ সালে।

এর মেয়াদকাল ছিল ২০১৫ সাল পর্যন্ত। সে সময় ড্যাপ গেজেট আকারেও প্রকাশ করে। কিন্তু প্রভাবশালীদের চাপে ড্যাপ সংশোধনে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটি মাস্টারপ্ল্যানের দিকনির্দেশনা লঙ্ঘন করে জলাধার, কৃষিজমি, উন্মুক্ত স্থান দেখানো ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছে।

যে কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মাস্টারপ্ল্যান থেকে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা মেলেনি। উল্টো শহরে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রভাবশালীরা নিজেদের মতো করে ড্যাপ কাটছাঁট করলেও রাজউকের ভুলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। যে কারণে মাস্টারপ্ল্যানের ওপর মানুষের অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে।

রাজউক সর্বশেষ ২০১৬ সালে ২০ বছর মেয়াদের জন্য ড্যাপ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ড্যাপের সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত হবে। এতে ড্যাপের মাস্টারপ্ল্যান লঙ্ঘন করে ঢাকায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। জনঘনত্ব কমাতে ভবনের উচ্চতা কমানোর সুপারিশ রাখায় বিশেষজ্ঞ মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

দেশে প্রথমবারের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য ২০০৪ সালে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) প্রণয়ন করা হয়। গণপরিবহন প্রাধান্য দিয়ে প্রণীত এ পরিকল্পনা ২০২৪ সালে বাস্তবায়নের টার্গেট ছিল। শুরু থেকে এটা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়নি সরকার।

এসটিপি করা হলেও এটা পাশ কাটিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। ২০১৬ এসটিপি সংশোধন করা হয়। এখন এ পরিকল্পনাটি আরএসটিপি নামে পরিচিত। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী জেলাসহ সর্বমোট ৭ হাজার ২০০ বর্গমাইল এলাকার যানজট নিরসন ও টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

এসটিপি এবং আরএসটিপি করা হলেও সরকার এ গণপরিবহন মাস্টারপ্ল্যানের দিকনির্দেশনা উপেক্ষা করে বিভিন্ন সংস্থাকে দিয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এসটিপি বা আরএসটিপির নির্দেশনা অনুযায়ী, সেটা অনেক পরে শুরু হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সেদিকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। কোনো মাস্টারপ্ল্যানে ঢাকায় সাবওয়ে করার সুপারিশ নেই। কিন্তু সরকার ঢাকায় সাবওয়ে নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু করেছে। যা মাস্টারপ্ল্যানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের জ্বলন্ত উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার উন্নয়নে ৯ মাস্টারপ্ল্যান

উল্টোপথেই ১০৩ বছর

 মতিন আব্দুল্লাহ 
২৩ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালে প্রথম মাস্টারপ্ল্যান ধারণাপত্র তৈরি করেন স্যার প্যাট্রিক গেডিস। সে সময় ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ১০ লাখ। বিট্রিশদের উদ্যোগে প্রণীত প্রথম পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ পায়নি। এরপর থেকে ১০৩ বছর পার হয়েছে।

এর মধ্যে বড় পরিসরে ৯টি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটিও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। আলোর মুখই দেখেনি ৫টি। বাকি চারটি কাটছাঁট করে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব কারণে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছে। এখন হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছে না সরকার।

অথচ কাগুজে পরিকল্পনাগুলো খুবই সুন্দর ছিল। কিন্তু সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে উল্টো ফল মিলছে। নগরবিদদের মতে, ঢাকার উন্নয়নে সরকারগুলো ১৯১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১০৩ বছর ধরেই উল্টোপথে হাঁটছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল এখন অধরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনঘনত্ব, যানজট, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, জলজট, জলাবদ্ধতাসহ বহুবিধ নাগরিক সমস্যা সমাধানে সেই মাস্টারপ্ল্যানগুলোর সঠিক বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। কাজেই মেট্রোরেল, সাবওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভারের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুফল মিলবে না বলে তারা মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা শহর নিয়ে প্রথম পরিকল্পনার চিন্তা করা হয় ১৯১৭ সালে। এরপর তার সেই ধারণাপত্র নিয়ে আর কোনো কাজ হয়নি।

এরপর পূর্ব পাকিস্তানের সময় এবং পরে বাংলাদেশেও বেশকিছু পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু এগুলোর উল্টো বাস্তবায়ন হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানগুলোর দিকনির্দেশনা অনুসরণ না করে রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী মহলের ইচ্ছামতো পরিকল্পনা কাটছাঁট করা হয়েছে। যে কারণে কাগুজে পরিকল্পনাগুলো সুন্দর থাকলেও ঢাকা পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য হওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সালাহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, স্বাধীনতার পর ঢাকায় মানুষের সে াত বাড়তে থাকে। তাদের বাসস্থান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা করলেও গণপরিবহন নিয়ে তেমন কিছু হয়নি।

তিনি বলেন, পরে গণপরিবহন পরিকল্পনাপত্র তৈরি হয়। কিন্তু সেটা অনুসরণ না করেই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না করায় সমস্যা প্রকট হচ্ছে। এখন মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে গিয়ে সাবওয়ে (ভূগর্ভস্থ রেল) তৈরির চিন্তা করছে সরকার। যদি সেটাই করে সরকার তবে এত পরিকল্পনার দরকার কী বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকার যত পরিকল্পনা : ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালে নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিসকে দিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করে ব্রিটিশরা। এটাকে মাস্টারপ্ল্যানের ধারণাপত্র বলা হয়। এর নাম ছিল ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’। ঢাকা সমতল আর বৃষ্টিপ্রবণ শহর। এ দুটো বাস্তবতা ধরে বিশদ পরিকল্পনার সুপারিশ করে ওই নগর পরিকল্পনাবিদ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার চারদিকে চারটি নদী এবং ৫০টির মতো প্রাকৃতিক খাল ছিল। এ খালগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি নদীতে পড়ত। কোথাও পানি জমত না। শহর বড় হতে থাকলে ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিসকে দিয়ে ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’ তৈরি করায়। স্যার প্যাট্রিকের চিন্তার যৌক্তিকতা খুঁজে পান বর্তমান নগর পরিকল্পনাবিদরা।

এ প্রসঙ্গে নগরবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা টাউন প্ল্যানে বৃষ্টির পানি যেন জমে না যায় সেজন্য নদী, খাল ও জলাধারগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। ওটা ঠিক একশ’ বছর আগের কথা। কিন্তু এখনও আমাদের এসব নিয়েই কথা বলতে হচ্ছে।

১৯৫৮ ও ১৯৫৯ সালে তৎকালীন সরকার ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটির তত্ত্বাবধানে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে। সেই ডিআইটি বর্তমান রাজউক। ২০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনা শুরুতে কিছুটা বাস্তবায়ন হলেও পরে মুথ থুবড়ে পড়ে।

এছাড়া স্বাধীনতার পর ঢাকামুখী জনস্রোত বাড়ায় ওই পরিকল্পনার দিকনির্দেশনাও গুরুত্ব হারায়। পানি নিষ্কাশন ও বন্যার প্রসঙ্গটিও এ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায়। এতেও নদী-খাল সংরক্ষণের কথা বলা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা শহরের জন্য প্রথমে ১৯৭৯ ও ৮০ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। একটি খসড়া পরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হলেও সেটা আলোর মুখ দেখেনি। তৎকালীন সরকার ওই মাস্টারপ্ল্যানকে গেজেট আকারে প্রকাশ করেনি।

১৯৯৫ সালে রাজউক ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি) তৈরি করে। ১৯৯৭ সালে এটা পাস হয়। ডিএমডিপি’র আওতায় স্ট্রাকচার প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) করার কথা ছিল। সে সময় রাজউক প্রথম দুটি পরিকল্পনা করলেও ড্যাপ প্রণয়ন হয় ২০১০ সালে।

এর মেয়াদকাল ছিল ২০১৫ সাল পর্যন্ত। সে সময় ড্যাপ গেজেট আকারেও প্রকাশ করে। কিন্তু প্রভাবশালীদের চাপে ড্যাপ সংশোধনে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটি মাস্টারপ্ল্যানের দিকনির্দেশনা লঙ্ঘন করে জলাধার, কৃষিজমি, উন্মুক্ত স্থান দেখানো ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছে।

যে কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মাস্টারপ্ল্যান থেকে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা মেলেনি। উল্টো শহরে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রভাবশালীরা নিজেদের মতো করে ড্যাপ কাটছাঁট করলেও রাজউকের ভুলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। যে কারণে মাস্টারপ্ল্যানের ওপর মানুষের অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে।

রাজউক সর্বশেষ ২০১৬ সালে ২০ বছর মেয়াদের জন্য ড্যাপ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ড্যাপের সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত হবে। এতে ড্যাপের মাস্টারপ্ল্যান লঙ্ঘন করে ঢাকায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। জনঘনত্ব কমাতে ভবনের উচ্চতা কমানোর সুপারিশ রাখায় বিশেষজ্ঞ মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

দেশে প্রথমবারের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য ২০০৪ সালে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) প্রণয়ন করা হয়। গণপরিবহন প্রাধান্য দিয়ে প্রণীত এ পরিকল্পনা ২০২৪ সালে বাস্তবায়নের টার্গেট ছিল। শুরু থেকে এটা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়নি সরকার।

এসটিপি করা হলেও এটা পাশ কাটিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। ২০১৬ এসটিপি সংশোধন করা হয়। এখন এ পরিকল্পনাটি আরএসটিপি নামে পরিচিত। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী জেলাসহ সর্বমোট ৭ হাজার ২০০ বর্গমাইল এলাকার যানজট নিরসন ও টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

এসটিপি এবং আরএসটিপি করা হলেও সরকার এ গণপরিবহন মাস্টারপ্ল্যানের দিকনির্দেশনা উপেক্ষা করে বিভিন্ন সংস্থাকে দিয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এসটিপি বা আরএসটিপির নির্দেশনা অনুযায়ী, সেটা অনেক পরে শুরু হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সেদিকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। কোনো মাস্টারপ্ল্যানে ঢাকায় সাবওয়ে করার সুপারিশ নেই। কিন্তু সরকার ঢাকায় সাবওয়ে নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু করেছে। যা মাস্টারপ্ল্যানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের জ্বলন্ত উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।