হাজী সেলিমের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’র অবৈধ আড়ত উচ্ছেদ
jugantor
আদায় করা হতো মাসে কোটি টাকা
হাজী সেলিমের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’র অবৈধ আড়ত উচ্ছেদ

  পুরান ঢাকা প্রতিনিধি  

২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাজী সেলিম

রাজধানীর বাদামতলী ঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জায়গা দখল ও বুড়িগঙ্গা নদী ভরাট করে গড়ে তোলা শতাধিক ফলের আড়ত রোববার উচ্ছেদ করা হয়েছে।

এসব আড়তে আড়াইশ’র বেশি ফড়িয়ার কাছ থেকে প্রতি মাসে অন্তত কোটি টাকা আদায় করা হতো। হাজী আবদুল করিম শেখ ওরফে বট করিম নামে এক ব্যবসায়ী এসব আড়ত নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত।

সূত্রমতে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাবুবাজার সেতু ঘাট থেকে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত নদীর ভূমি ও রাস্তা দখল করে আড়ত, দোকানঘর ও ট্রাক স্ট্যান্ড গড়ে তোলেন প্রভাবশালী ফল ব্যবসায়ী বট করিম।

এর মধ্যে উল্লিখিত স্থানে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে বানানো আড়তগুলোতে আড়াইশ’র বেশি দোকানঘর ভাড়া দেয়া হয়েছিল। একেক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া অগ্রিম নেয়া হতো। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ রোববার অভিযান চালিয়ে ভেকু দিয়ে এসব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়।

ফড়িয়ারা অভিযোগ করেন, বিআইডব্লিউটিএর সাবেক বন্দর কর্মকর্তা একেএম আরিফ উদ্দিনের সহযোগিতায় ওই স্থানে এসব আড়ত তৈরি করা হয়েছিল।

এর বড় প্রমাণ, ওই কর্মকর্তা ঢাকা নদীবন্দরের দায়িত্বে থাকাকালে অন্যান্য স্থানে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও তার অফিস থেকে কয়েকশ’ গজ দূরে প্রায় ৫ একর জমি ভরাট করে গড়ে তোলা ওই মার্কেট কখনও তার চোখ পড়েনি। ২০১৪ সাল থেকে এখানে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি।

দোকান ভাড়া নেয়া কয়েকজন ফড়িয়া যুগান্তরকে বলেন, বট করিমের পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর লোকও টাকা নিত। সব সময় অ্যাডভান্স দিতে হয়। টাকা না দিলে তো ব্যবসা করা যাবে না। হাজী করিমের কথা অমান্য করলে মারধর তো খেতেই হবে, বাদামতলীও ছাড়তে হবে।

এমনকি মামলাও খেতে হতে পারে। পুলিশ তো তার কথাই শোনে। তা ছাড়া পুলিশও নিয়মিত টাকা নেয়।

ফড়িয়ারা আরও জানান, বটতলা মসজিদের একাংশে আগের অজুখানা ভেঙে ৫টি ফলের দোকান করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন ৫ লাখ টাকাসহ মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়া নেয়া হচ্ছে। এসব টাকা আদায় করছে বিআইডব্লিউটিএ ও করিম হাজীর লোকজন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাজী আবদুল করিম শেখ যুগান্তরকে বলেন, আমি কোনো চাঁদাবাজি করি না। কারা ওইসব ফড়িয়ার কাছ থেকে টাকা নেয় তাও জানি না। তবে ২৮৫ ফড়িয়া দোকান বাবদ ১৫ লাখ টাকা এককালীন বিআইডব্লিউটিএকে দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ২০০১ সালে এ জায়গা ইজারা দেয় বিআইডব্লিউটিএ। পরে ২০১৩ সালে ইজারা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এরপর কয়েক কোটি টাকা নিলেও কোনো ফয়সালা হয়নি।

হাজী করিমের বড় ভাই হাজী আফসার যুগান্তরকে বলেন, বিআইডব্লিউটিএর ওই স্থানে আমাদের তিন ভাইয়ের তিনটি দোকান ছিল। আমরা ব্যবসা করি। হাজী সেলিম বাদামতলীর মুরুব্বি। উনার সঙ্গে সম্পর্ক থাকাতো স্বাভাবিক ব্যাপার। এছাড়া আমার ভাই মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান মধ্যপাড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান। ঢাকা মহানগর ফল ব্যবসায়ী সমিতিতেও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করে ১৩ ভোটে ফেল করেছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা নৌবন্দরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, নদীর তীর সীমানায় দোকানপাট করার জন্য কোনো ইজারা দেয়া হয়নি। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক (বন্দর) মোহাম্মদ গুলজার আলী যুগান্তরকে বলেন, বাদামতলী ঘাটে একটি চক্র দীর্ঘদিন থেকে নদীর তীর অবৈধভাবে ভরাট করে ওই স্থানে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে ফলের আড়ত হিসেবে ভাড়া দিয়ে আসছিল।

নদী ও সরকারি জমি দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একশ’র বেশি দোকানপাট ও ছোট-বড় স্থাপনা উচ্ছেদ করে বাঁশের বেড়া দিয়ে সীমানা চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে নদীর জায়গায় স্ট্যান্ড ও দোকান তৈরি না করতে মাইকিং করা হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপসহ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সাবেক কর্মকর্তার কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে জানান।

এদিকে হঠাৎ উচ্ছেদের অভিযোগ করেন দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। তবে বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, আগে থেকে মাইকিং করে তাদের মালামাল সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল। সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে হাইকোর্টের নির্দেশ থাকায় এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আদায় করা হতো মাসে কোটি টাকা

হাজী সেলিমের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’র অবৈধ আড়ত উচ্ছেদ

 পুরান ঢাকা প্রতিনিধি 
২৩ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
হাজী সেলিম
ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম। ফাইল ছবি

রাজধানীর বাদামতলী ঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জায়গা দখল ও বুড়িগঙ্গা নদী ভরাট করে গড়ে তোলা শতাধিক ফলের আড়ত রোববার উচ্ছেদ করা হয়েছে।

এসব আড়তে আড়াইশ’র বেশি ফড়িয়ার কাছ থেকে প্রতি মাসে অন্তত কোটি টাকা আদায় করা হতো। হাজী আবদুল করিম শেখ ওরফে বট করিম নামে এক ব্যবসায়ী এসব আড়ত নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত।

সূত্রমতে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাবুবাজার সেতু ঘাট থেকে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত নদীর ভূমি ও রাস্তা দখল করে আড়ত, দোকানঘর ও ট্রাক স্ট্যান্ড গড়ে তোলেন প্রভাবশালী ফল ব্যবসায়ী বট করিম।

এর মধ্যে উল্লিখিত স্থানে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে বানানো আড়তগুলোতে আড়াইশ’র বেশি দোকানঘর ভাড়া দেয়া হয়েছিল। একেক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া অগ্রিম নেয়া হতো। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ রোববার অভিযান চালিয়ে ভেকু দিয়ে এসব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়।

ফড়িয়ারা অভিযোগ করেন, বিআইডব্লিউটিএর সাবেক বন্দর কর্মকর্তা একেএম আরিফ উদ্দিনের সহযোগিতায় ওই স্থানে এসব আড়ত তৈরি করা হয়েছিল।

এর বড় প্রমাণ, ওই কর্মকর্তা ঢাকা নদীবন্দরের দায়িত্বে থাকাকালে অন্যান্য স্থানে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও তার অফিস থেকে কয়েকশ’ গজ দূরে প্রায় ৫ একর জমি ভরাট করে গড়ে তোলা ওই মার্কেট কখনও তার চোখ পড়েনি। ২০১৪ সাল থেকে এখানে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি।

দোকান ভাড়া নেয়া কয়েকজন ফড়িয়া যুগান্তরকে বলেন, বট করিমের পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর লোকও টাকা নিত। সব সময় অ্যাডভান্স দিতে হয়। টাকা না দিলে তো ব্যবসা করা যাবে না। হাজী করিমের কথা অমান্য করলে মারধর তো খেতেই হবে, বাদামতলীও ছাড়তে হবে।

এমনকি মামলাও খেতে হতে পারে। পুলিশ তো তার কথাই শোনে। তা ছাড়া পুলিশও নিয়মিত টাকা নেয়।

ফড়িয়ারা আরও জানান, বটতলা মসজিদের একাংশে আগের অজুখানা ভেঙে ৫টি ফলের দোকান করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন ৫ লাখ টাকাসহ মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়া নেয়া হচ্ছে। এসব টাকা আদায় করছে বিআইডব্লিউটিএ ও করিম হাজীর লোকজন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাজী আবদুল করিম শেখ যুগান্তরকে বলেন, আমি কোনো চাঁদাবাজি করি না। কারা ওইসব ফড়িয়ার কাছ থেকে টাকা নেয় তাও জানি না। তবে ২৮৫ ফড়িয়া দোকান বাবদ ১৫ লাখ টাকা এককালীন বিআইডব্লিউটিএকে দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ২০০১ সালে এ জায়গা ইজারা দেয় বিআইডব্লিউটিএ। পরে ২০১৩ সালে ইজারা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এরপর কয়েক কোটি টাকা নিলেও কোনো ফয়সালা হয়নি।

হাজী করিমের বড় ভাই হাজী আফসার যুগান্তরকে বলেন, বিআইডব্লিউটিএর ওই স্থানে আমাদের তিন ভাইয়ের তিনটি দোকান ছিল। আমরা ব্যবসা করি। হাজী সেলিম বাদামতলীর মুরুব্বি। উনার সঙ্গে সম্পর্ক থাকাতো স্বাভাবিক ব্যাপার। এছাড়া আমার ভাই মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান মধ্যপাড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান। ঢাকা মহানগর ফল ব্যবসায়ী সমিতিতেও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করে ১৩ ভোটে ফেল করেছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা নৌবন্দরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, নদীর তীর সীমানায় দোকানপাট করার জন্য কোনো ইজারা দেয়া হয়নি। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক (বন্দর) মোহাম্মদ গুলজার আলী যুগান্তরকে বলেন, বাদামতলী ঘাটে একটি চক্র দীর্ঘদিন থেকে নদীর তীর অবৈধভাবে ভরাট করে ওই স্থানে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে ফলের আড়ত হিসেবে ভাড়া দিয়ে আসছিল।

নদী ও সরকারি জমি দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একশ’র বেশি দোকানপাট ও ছোট-বড় স্থাপনা উচ্ছেদ করে বাঁশের বেড়া দিয়ে সীমানা চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে নদীর জায়গায় স্ট্যান্ড ও দোকান তৈরি না করতে মাইকিং করা হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপসহ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সাবেক কর্মকর্তার কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে জানান।

এদিকে হঠাৎ উচ্ছেদের অভিযোগ করেন দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। তবে বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, আগে থেকে মাইকিং করে তাদের মালামাল সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল। সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে হাইকোর্টের নির্দেশ থাকায় এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।