পাচার ২২৬ কোটি টাকা!
jugantor
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে যন্ত্রপাতি আমদানি
পাচার ২২৬ কোটি টাকা!

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান  

২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পোলট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে ২২৬ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

কিন্তু ঘটনার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কিছু বলা হয়নি প্রতিবেদনে। এদিকে ওই ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক ও পণ্য খালাসে নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করতে অধিদফতরকে অনুমতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে পোলট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি ঘোষণায় দুটি প্রতিষ্ঠান ১২ কনটেইনার যন্ত্রপাতি আমদানি করে। এর মধ্যে ৬ কনটেইনার আমদানি করে খিলক্ষেতের হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এবং বাকি ৬টির আমদানিকারক কেরানীগঞ্জের অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি।

এসব পণ্য রফতানিকারক চীনের জমরাজ ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে শুল্ক গোয়েন্দা কনটেইনার আটক করে এবং ওই বছরের ৫ ও ৬ মার্চ বিভিন্ন সংস্থার উপস্থিতিতে ১২টি কনটেইনার কায়িক পরীক্ষার জন্য খোলা হয়।

দেখা যায়, পোলট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি ঘোষণা দেয়া হলেও আনা হয় সিগারেট, এলইডি টিভি, ফটোকপিয়ার মেশিন ও বিদেশি মদ। এই দুই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এর আগে একই ঘোষণায় মোট ৭৮ কনটেইনার খালাস নেয়। এ ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে।

এ ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ বেরিয়ে আসে। একই ঘোষণায় এর আগে ২০১৫ সালের বিভিন্ন সময়ে ২৫ কনটেইনার পশুখাদ্য তৈরির যন্ত্রপাতি আমদানি করে নারায়ণগঞ্জের পাগলার নন্দলালপুর এলাকার চায়না বিডিএল নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

এর রফতানিকারক সিঙ্গাপুরের ইস্তাম্বুল ট্রেডিং এবং চীনের রাপাতি এন্টারপ্রাইজ। পণ্যের আমদানিমূল্য ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৪ ডলার (১ কোটি ৪১ লাখ টাকা)।

সরেজমিন শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করে এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাননি। ওই ঠিকানায় শুধু চারদিকে বাউন্ডারির মধ্যে একটি কাঠামো ও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়।

তদন্তকারী একটি সূত্র জানায়, টাকা পাচারের দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়। ব্যাংক হিসাব থেকে শুরু করে বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন সবই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বানানো হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে যেসব কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়েছে তার সবই জাল।

আমদানিকারকের জাতীয় পরিচয়পত্র, মূসক নিবন্ধন, বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রথমে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এরপর শতভাগ মার্জিনে পণ্য আমদানিতে এলসি খোলেন। সচরাচর পণ্য আমদানিতে আমদানিকারকরা শতভাগ মার্জিন রাখেন না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এবং অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি নামের প্রতিষ্ঠান দুটির এবং চায়না বিডিএলের ব্যাংক শনাক্তকারী একই ব্যক্তি। শহিদুল আলম নামের ওই ব্যক্তি এই দুটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে টাকা পাচারের ছক আঁকা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের ওই প্রতিবেদনে, হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এবং অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপির আমদানিকৃত ৬ কনটেইনারের মতো চায়না বিডিএলের কনটেইনারে মদ, সিগারেট, টেলিভিশনসহ অন্য বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি করে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেয়া হতে পারে।

আগের ৬টি চালানের ইনভেন্ট্রিতে প্রাপ্ত ৫৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা হিসেবে ২৫ কনটেইনারে ২২৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

সব ক্ষেত্রেই জালিয়াতি : প্রতিবেদনে বলা হয়, চায়না বিডিএল ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন আলীগঞ্জ সার্কেল নিবন্ধিত হলেও রিটার্ন জমা দিত না। ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর নেয়া হয় সরবরাহকারী ও আমদানিকারক হিসেবে।

পরে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরে ‘উৎপাদনকারী’ শব্দযুক্ত করা হয় এবং সে অনুযায়ী অ্যাগ্রিম ট্রেড ভ্যাট (বর্তমানে আগাম কর) মওকুফের সুবিধা নেয় প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে এটিভি দিতে হয় না।

এতেও সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ নিবন্ধিত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) থেকে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটি জানায়, চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠান বিডা থেকে যৌথ বিনিয়োগ বা শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ শিল্প নিবন্ধন নেয়নি। অর্থাৎ জাল নিবন্ধন ব্যবহার করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরেজমিন পরিদর্শনেও নন্দলালপুর এলাকায় চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঠিকানায় শুধু চারদিকে বাউন্ডারির মধ্যে একটি কাঠামো ও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়।

পরে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য চাওয়া হয়। জবাবে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জানান, ঠিকানামতে প্রতিষ্ঠানটি ছিল। তবে বর্তমানে যাচাইকালে প্রতিষ্ঠানটির খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আর জমির মালিক জসিম উদ্দিন আহমেদ জানান, তারা সুরুজ মিয়া নামের কোনো ব্যক্তিকে চায়না বিডিএল নামে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য জমি কখনও ভাড়া দেননি। এমনকি তার জানামতে, নন্দলালপুর গ্রামে চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো সময়েই ছিল না বা এখনও নেই।

জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের তথ্যমতে, সুরুজ মিয়ার বাবার নাম ফজলু মিয়া। মায়ের নাম কুলসুম আক্তার। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : বাসা নং # ১৩, রোড নং # কেএম দাস লেন, ওয়ারী, সূত্রাপুর।

এদিকে শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদনে শুধু আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যাংক হিসাব শনাক্তকারী হিসেবে শহিদুল আলম বা চট্টগ্রাম কাস্টমসে পণ্য ছাড়ে জড়িত কাস্টমস কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

ব্যাংক কর্মকর্তারা শুধু শহিদুল আলমের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের ভিত্তিতে সুরুজ মিয়ার ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি দেন এবং শতভাগ মার্জিনের বিপরীতে এলসি খোলেন। এ ক্ষেত্রে কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। অন্যদিকে প্রতিবেদনে পণ্য খালাসে জড়িত শুল্ক কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়নি।

অথচ পণ্য আমদানির পর আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট পণ্য খালাসের যাবতীয় ডকুমেন্ট বন্দর ও কাস্টমসে জমা দেন। বন্দরের গেট দিয়ে মালামাল বের হওয়ার আগে স্ক্যানিং করা হয়। এরপর কনটেইনারের সিল খুলে মালামাল ছাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শুল্ক কর্মকর্তাকে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের উপস্থিতিতে পণ্য পরীক্ষা করতে হয়।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক গোয়েন্দা ভালো কাজ করছে।

তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে শুল্ক গোয়েন্দা আংশিক নজরদারি করেছে বলে মনে হয়। কারণ, অর্থ পাচার প্রতিরোধে কাস্টমস কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার কথা। এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কাস্টমসে একজন কর্মকর্তার আমদানিকৃত পণ্য চালানগুলো যাচাই-বাছাই করেছেন।

ওই কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করেছে কি না বা আমদানিকারকের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা নিরূপণ করা হয়নি। এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিষ্কার। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ও কাস্টমসের সহযোগিতা ছাড়া আমদানিকারকের একার পক্ষে অর্থ পাচার করা সম্ভব নয়। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আলোচ্য ঘটনা আরও গভীর অনুসন্ধান করে জড়িতদের চিহ্নিত করা জরুরি। এরপর তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অর্থ পাচাররোধ কঠিন হয়ে পড়বে।

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে যন্ত্রপাতি আমদানি

পাচার ২২৬ কোটি টাকা!

 সাদ্দাম হোসেন ইমরান 
২৩ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পোলট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে ২২৬ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

কিন্তু ঘটনার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কিছু বলা হয়নি প্রতিবেদনে। এদিকে ওই ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক ও পণ্য খালাসে নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করতে অধিদফতরকে অনুমতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে পোলট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি ঘোষণায় দুটি প্রতিষ্ঠান ১২ কনটেইনার যন্ত্রপাতি আমদানি করে। এর মধ্যে ৬ কনটেইনার আমদানি করে খিলক্ষেতের হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এবং বাকি ৬টির আমদানিকারক কেরানীগঞ্জের অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি।

এসব পণ্য রফতানিকারক চীনের জমরাজ ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে শুল্ক গোয়েন্দা কনটেইনার আটক করে এবং ওই বছরের ৫ ও ৬ মার্চ বিভিন্ন সংস্থার উপস্থিতিতে ১২টি কনটেইনার কায়িক পরীক্ষার জন্য খোলা হয়।

দেখা যায়, পোলট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি ঘোষণা দেয়া হলেও আনা হয় সিগারেট, এলইডি টিভি, ফটোকপিয়ার মেশিন ও বিদেশি মদ। এই দুই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এর আগে একই ঘোষণায় মোট ৭৮ কনটেইনার খালাস নেয়। এ ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে।

এ ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ বেরিয়ে আসে। একই ঘোষণায় এর আগে ২০১৫ সালের বিভিন্ন সময়ে ২৫ কনটেইনার পশুখাদ্য তৈরির যন্ত্রপাতি আমদানি করে নারায়ণগঞ্জের পাগলার নন্দলালপুর এলাকার চায়না বিডিএল নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

এর রফতানিকারক সিঙ্গাপুরের ইস্তাম্বুল ট্রেডিং এবং চীনের রাপাতি এন্টারপ্রাইজ। পণ্যের আমদানিমূল্য ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৪ ডলার (১ কোটি ৪১ লাখ টাকা)।

সরেজমিন শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করে এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাননি। ওই ঠিকানায় শুধু চারদিকে বাউন্ডারির মধ্যে একটি কাঠামো ও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়।

তদন্তকারী একটি সূত্র জানায়, টাকা পাচারের দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়। ব্যাংক হিসাব থেকে শুরু করে বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন সবই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বানানো হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে যেসব কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়েছে তার সবই জাল।

আমদানিকারকের জাতীয় পরিচয়পত্র, মূসক নিবন্ধন, বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রথমে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এরপর শতভাগ মার্জিনে পণ্য আমদানিতে এলসি খোলেন। সচরাচর পণ্য আমদানিতে আমদানিকারকরা শতভাগ মার্জিন রাখেন না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এবং অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি নামের প্রতিষ্ঠান দুটির এবং চায়না বিডিএলের ব্যাংক শনাক্তকারী একই ব্যক্তি। শহিদুল আলম নামের ওই ব্যক্তি এই দুটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে টাকা পাচারের ছক আঁকা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের ওই প্রতিবেদনে, হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এবং অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপির আমদানিকৃত ৬ কনটেইনারের মতো চায়না বিডিএলের কনটেইনারে মদ, সিগারেট, টেলিভিশনসহ অন্য বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি করে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেয়া হতে পারে।

আগের ৬টি চালানের ইনভেন্ট্রিতে প্রাপ্ত ৫৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা হিসেবে ২৫ কনটেইনারে ২২৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

সব ক্ষেত্রেই জালিয়াতি : প্রতিবেদনে বলা হয়, চায়না বিডিএল ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন আলীগঞ্জ সার্কেল নিবন্ধিত হলেও রিটার্ন জমা দিত না। ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর নেয়া হয় সরবরাহকারী ও আমদানিকারক হিসেবে।

পরে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরে ‘উৎপাদনকারী’ শব্দযুক্ত করা হয় এবং সে অনুযায়ী অ্যাগ্রিম ট্রেড ভ্যাট (বর্তমানে আগাম কর) মওকুফের সুবিধা নেয় প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে এটিভি দিতে হয় না।

এতেও সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ নিবন্ধিত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) থেকে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটি জানায়, চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠান বিডা থেকে যৌথ বিনিয়োগ বা শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ শিল্প নিবন্ধন নেয়নি। অর্থাৎ জাল নিবন্ধন ব্যবহার করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরেজমিন পরিদর্শনেও নন্দলালপুর এলাকায় চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঠিকানায় শুধু চারদিকে বাউন্ডারির মধ্যে একটি কাঠামো ও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়।

পরে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য চাওয়া হয়। জবাবে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জানান, ঠিকানামতে প্রতিষ্ঠানটি ছিল। তবে বর্তমানে যাচাইকালে প্রতিষ্ঠানটির খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আর জমির মালিক জসিম উদ্দিন আহমেদ জানান, তারা সুরুজ মিয়া নামের কোনো ব্যক্তিকে চায়না বিডিএল নামে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য জমি কখনও ভাড়া দেননি। এমনকি তার জানামতে, নন্দলালপুর গ্রামে চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো সময়েই ছিল না বা এখনও নেই।

জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের তথ্যমতে, সুরুজ মিয়ার বাবার নাম ফজলু মিয়া। মায়ের নাম কুলসুম আক্তার। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : বাসা নং # ১৩, রোড নং # কেএম দাস লেন, ওয়ারী, সূত্রাপুর।

এদিকে শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদনে শুধু আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যাংক হিসাব শনাক্তকারী হিসেবে শহিদুল আলম বা চট্টগ্রাম কাস্টমসে পণ্য ছাড়ে জড়িত কাস্টমস কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

ব্যাংক কর্মকর্তারা শুধু শহিদুল আলমের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের ভিত্তিতে সুরুজ মিয়ার ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি দেন এবং শতভাগ মার্জিনের বিপরীতে এলসি খোলেন। এ ক্ষেত্রে কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। অন্যদিকে প্রতিবেদনে পণ্য খালাসে জড়িত শুল্ক কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়নি।

অথচ পণ্য আমদানির পর আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট পণ্য খালাসের যাবতীয় ডকুমেন্ট বন্দর ও কাস্টমসে জমা দেন। বন্দরের গেট দিয়ে মালামাল বের হওয়ার আগে স্ক্যানিং করা হয়। এরপর কনটেইনারের সিল খুলে মালামাল ছাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শুল্ক কর্মকর্তাকে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের উপস্থিতিতে পণ্য পরীক্ষা করতে হয়।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক গোয়েন্দা ভালো কাজ করছে।

তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে শুল্ক গোয়েন্দা আংশিক নজরদারি করেছে বলে মনে হয়। কারণ, অর্থ পাচার প্রতিরোধে কাস্টমস কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার কথা। এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কাস্টমসে একজন কর্মকর্তার আমদানিকৃত পণ্য চালানগুলো যাচাই-বাছাই করেছেন।

ওই কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করেছে কি না বা আমদানিকারকের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা নিরূপণ করা হয়নি। এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিষ্কার। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ও কাস্টমসের সহযোগিতা ছাড়া আমদানিকারকের একার পক্ষে অর্থ পাচার করা সম্ভব নয়। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আলোচ্য ঘটনা আরও গভীর অনুসন্ধান করে জড়িতদের চিহ্নিত করা জরুরি। এরপর তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অর্থ পাচাররোধ কঠিন হয়ে পড়বে।