ভ্যাকসিনের সংশয় কাটছে না
jugantor
করোনা থেকে রক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে
ভ্যাকসিনের সংশয় কাটছে না

  রাশেদ রাব্বি  

২৯ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারী থেকে মুক্তি পেতে আশার আলো ভ্যাকসিন। তবে ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে সংশয় শিগগিরই কাটছে না। মাত্র ৩ থেকে ৪ মাসে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর হবে তা নিয়েও শঙ্কায় দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীরা। হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে দেশের ৭০ ভাগ মানুষকে টিকা দেয়া প্রয়োজন।

অথচ বাংলাদেশ মাত্র ৩ কোটি টিকা কেনার চুক্তি করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এখানেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কিত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কার্যকর টিকা না আসা পর্যন্ত মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন পেতে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তবে সামান্য সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় তারা এখন গ্লোবাল ট্রায়ালে যাচ্ছে। এ ট্রায়ালে তারা টিকার এফিকেসির (সক্ষমতা) প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ইমিউনিটি সেনসিটিভিটি (কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) সংবেদনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেবে।

সেক্ষেত্রে কমপক্ষে আরও ৩ থেকে ৪ মাস লাগতে পারে। অর্থাৎ ট্রায়াল শেষে সব কিছু ঠিক থাকলেও টিকা পেতে এপ্রিল-মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে অত্যাধুনিক এমআরএনএ পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত কোনো টিকাই এখন পর্যন্ত মানবদেহে ব্যবহারের অনুমতি পায়নি। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজারের টিকা নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, সেখানেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

এসব টিকা কতদিন মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারবে তাও অনিশ্চিত। তাছাড়া ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো যতটা আশাবাদ প্রকাশ করছে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ততটা উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিকভাবে টিকাদানের ক্ষেত্রে প্রথম সারির হেলথ ওয়ার্কারদের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ফলে টিকা পেতে সাধারণ মানুষের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ মানুষকে টিকা দিতে হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ভিত্তিতে ১২ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হবে। কিন্তু সরকার অক্সফোর্ডের ৩ কোটি ভ্যাকসিন পেতে চুক্তি করেছে সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে।

অন্যদিকে কোভ্যাক্স সুবিধার মাধ্যমে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ করোনার ভ্যাকসিন পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। এ টিকাগুলো ডাবল ডোজ হওয়ায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে দেয়া সম্ভব হবে। অর্থাৎ বিভিন্ন উৎস থেকে যে পরিমাণ টিকা পাওয়া যাবে তাতে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষকে এর আওতায় আনা সম্ভব হবে। বাকিরা থেকে যাবেন টিকা সুবিধার বাইরে।

ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই বা গ্যাভি-টিকা বিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট) কাজ করছে। আর যখনই ভ্যাকসিন আসুক না কেন, পৃথিবীর মানুষ যেন একসঙ্গে পান সে বিষয়ে ৪ জুন গ্লোবাল ভ্যাকসিন সামিট হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ‘কোভ্যাক্স’ ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে পৃথিবীর সবাই যেন সমভাবে ভ্যাকসিন পান।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন কোনো ভ্যাকসিন নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেননি। তারা বলছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত এটি আমাদের হাতে আসে ততক্ষণ এটি নিয়ে কিছুই বলা যাবে না।

কারণ পৃথিবীতে এ প্রথম কোনো ভ্যাকসিন মাত্র ৩ মাসে উৎপাদনে গেছে। যদিও একটি সফল ভ্যাকসিন পেতে এর আগে ১০ থেকে ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। অধ্যাপক কামরুল বলেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন এলে আমরা পাব। কিন্তু এটি কবে আসবে সেটি অনিশ্চিত। বলা হচ্ছে সব ঠিক থাকলে এপ্রিল-মে নাগাদ এটি পাওয়া যেতে পারে।

যদিও আমাদের শীতকালীন যে আতঙ্ক ততদিন থাকবে না। তিনি বলেন, তাই ভ্যাকসিন নিয়ে উচ্চাশা করা ঠিক হবে না। একটি কার্যকর ভ্যাকসিন পেতে সময় লাগবে। তাই সুস্থ থাকতে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, নিয়মিত হাত জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খারশীদ আলম যুগান্তরকে বলেন, ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে যে ভ্যাকসিন কেনা হচ্ছে সেটি প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে তারা সরবরাহ করবে। তাই চাইলেও সবাইকে একসঙ্গে টিকা দেয়া সম্ভব হবে না। তবে এসব বিষয়ে কাজ করতে ‘কোভিড ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। এছাড়াও ‘বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অব ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট’ কাজ করছে। রয়েছে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রিপায়ের্ডনেস অ্যান্ড ডেপ্লয়মেন্ট কোর কমিটি।

জানা গেছে, জুলাইয়ে ফাইজার-বায়োএনটেক ছয়টি দেশের ৪৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে তাদের ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করে। দেশগুলো হল- যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেটিনা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও তুরস্ক। স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে অর্ধেককে প্রয়োগ করা হয় করোনা ভ্যাকসিন আর বাকি অর্ধেককে দেয়া হয় প্লোসেবো (লবণ-পানি)।

একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বোর্ড সব পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণে ৪৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর মধ্যে ৯৪ জন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ৯০ শতাংশের ওপরে ভ্যাকসিনটি নিরাপদ ও কার্যকর।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৫০ শতাংশ হলে তারা জরুরি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারবে বলে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এ বিবেচনায় ভ্যাকসিনটি অনেক বেশি কার্যকর। এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষায় ফাইজার-বায়োএনটেক তাদের ভ্যাকসিনটি প্রমাণের মাধ্যমে নিরাপদ দাবি করেছে। ফাইজার নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে জরুরি অনুমোদনের জন্য এফডিএর কাছে আবেদন করবে। এরপর ২ মাসের নিরাপদ পরিসংখ্যান এফডিএর কাছে জমা দিতে হবে। সব ঠিক থাকলে ভ্যাকসিনটি এ বছরের শেষ নাগাদ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ যেমন স্বাস্থ্যকর্মী ও বয়স্ক মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হতে পারে।

এ ভ্যাকসিনে জেনেটিক মলিকুলার এমআরএনএ ব্যবহার করা হয়েছে, যা শরীরের কোষ থেকে ভাইরাল প্রোটিন তৈরি করে। ভ্যাকসিনটি প্রত্যেকের জন্য দুই ডোজ করে দিতে হবে। তারা আশা করছে এ বছরে পাঁচ কোটি ডোজ তৈরি করতে পারবে। যা দিয়ে ২.৫ কোটি মানুষের প্রতিরোধের ব্যবস্থা সম্ভব হবে। এছাড়া ২০২১ সালের মধ্যে তারা ১৩০ কোটি ডোজ প্রস্তুত করতে পারবে।

এরই মধ্যে ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা ও জাপানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তবে ফাইজারের টিকা সংরক্ষণে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (মাইনাস ৯৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রার প্রয়োজন পড়ে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় শহরের হাসপাতালে এত কম তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণের সুবিধা নেই।

এদিকে কোভ্যাক্স সুবিধা থেকে বাংলাদেশের ৬৮ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ করোনার ভ্যাকসিন পাবে। যে ভ্যাকসনিগুলো ডাবল ডোজের। অর্থাৎ জনপ্রতি দুই ডোজ ভ্যাকসিন দিতে হবে।

মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০ শতাংশ হারে ধাপে ধাপে বাংলাদেশ এ ভ্যাকসিন পাবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. শামসুল হক। তিনি বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে এ ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। জুলাইয়ের শুরুর দিকে বাংলাদেশ কোভ্যাক্সে আবেদন করে এবং গ্যাভি সেটি গ্রহণ করে ১৪ জুলাই। বাংলাদেশ গ্যাভির কাছ থেকে ৬৮ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৮০ লাখ ভ্যাকসিন পাবে। তবে এজন্য বাংলাদেশকে কো ফিন্যান্সিং করতে হবে। এক্ষেত্রে ১ দশমিক ৬ থেকে ২ ডলার দাম দিতে হতে পারে।

তিনি বলেন, এছাড়া সরকার ইতোমধ্যে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অক্সফোর্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কিনতে পারবে চার ডলারের বিনিময়ে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পরিবহন খরচ সব মিলিয়ে এরসঙ্গে যোগ হবে আরও এক ডলার। সেখান থেকে বাংলাদেশ কিনবে ৩০ মিলিয়ন ডোজ।

এজন্য ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ থেকে প্রায় ৭৩৫ কোটি টাকা ছাড় করেছে। তবে এ ভ্যাকসিন অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রি কোয়ালিফায়েড হতে হবে। এ দুটি ভ্যাকসিনের সোর্স ছাড়াও চীনের সিনোভ্যাক, রাশিয়ার স্পুটনিক, জিএসকে, সানোফি এবং ফাইজারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানান ডা. শামসুল হক। তিনি জানান, সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে তিন কোটি ভ্যাকসিন পাবে। এরজন্য সরকারের ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৮৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

এদিকে ওষুধ কোম্পানিসহ বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যে বিতরণের জন্য ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে ১০ লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা আনার কথা ভাবছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।

জানা গেছে, বিজনেস সেক্টরের ফ্রন্ট লাইনার, বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্যাংক, অন্যান্য কর্পোরেট হাউসে যারা কাজ করছেন তাদের দিতে এ উদ্যোগ। প্রতি ডোজ টিকার জন্য ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটকে দিতে হবে ৮ ডলার। এর সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রতি ডোজ টিকার দাম ১১শ’ থেকে ১২শ’ টাকা হতে পারে।

করোনা থেকে রক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে

ভ্যাকসিনের সংশয় কাটছে না

 রাশেদ রাব্বি 
২৯ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারী থেকে মুক্তি পেতে আশার আলো ভ্যাকসিন। তবে ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে সংশয় শিগগিরই কাটছে না। মাত্র ৩ থেকে ৪ মাসে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর হবে তা নিয়েও শঙ্কায় দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীরা। হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে দেশের ৭০ ভাগ মানুষকে টিকা দেয়া প্রয়োজন।

অথচ বাংলাদেশ মাত্র ৩ কোটি টিকা কেনার চুক্তি করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এখানেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কিত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কার্যকর টিকা না আসা পর্যন্ত মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন পেতে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তবে সামান্য সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় তারা এখন গ্লোবাল ট্রায়ালে যাচ্ছে। এ ট্রায়ালে তারা টিকার এফিকেসির (সক্ষমতা) প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ইমিউনিটি সেনসিটিভিটি (কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) সংবেদনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেবে।

সেক্ষেত্রে কমপক্ষে আরও ৩ থেকে ৪ মাস লাগতে পারে। অর্থাৎ ট্রায়াল শেষে সব কিছু ঠিক থাকলেও টিকা পেতে এপ্রিল-মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে অত্যাধুনিক এমআরএনএ পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত কোনো টিকাই এখন পর্যন্ত মানবদেহে ব্যবহারের অনুমতি পায়নি। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজারের টিকা নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, সেখানেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

এসব টিকা কতদিন মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারবে তাও অনিশ্চিত। তাছাড়া ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো যতটা আশাবাদ প্রকাশ করছে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ততটা উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিকভাবে টিকাদানের ক্ষেত্রে প্রথম সারির হেলথ ওয়ার্কারদের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ফলে টিকা পেতে সাধারণ মানুষের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ মানুষকে টিকা দিতে হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ভিত্তিতে ১২ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হবে। কিন্তু সরকার অক্সফোর্ডের ৩ কোটি ভ্যাকসিন পেতে চুক্তি করেছে সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে।

অন্যদিকে কোভ্যাক্স সুবিধার মাধ্যমে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ করোনার ভ্যাকসিন পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। এ টিকাগুলো ডাবল ডোজ হওয়ায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে দেয়া সম্ভব হবে। অর্থাৎ বিভিন্ন উৎস থেকে যে পরিমাণ টিকা পাওয়া যাবে তাতে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষকে এর আওতায় আনা সম্ভব হবে। বাকিরা থেকে যাবেন টিকা সুবিধার বাইরে।

ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই বা গ্যাভি-টিকা বিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট) কাজ করছে। আর যখনই ভ্যাকসিন আসুক না কেন, পৃথিবীর মানুষ যেন একসঙ্গে পান সে বিষয়ে ৪ জুন গ্লোবাল ভ্যাকসিন সামিট হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ‘কোভ্যাক্স’ ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে পৃথিবীর সবাই যেন সমভাবে ভ্যাকসিন পান।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন কোনো ভ্যাকসিন নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেননি। তারা বলছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত এটি আমাদের হাতে আসে ততক্ষণ এটি নিয়ে কিছুই বলা যাবে না।

কারণ পৃথিবীতে এ প্রথম কোনো ভ্যাকসিন মাত্র ৩ মাসে উৎপাদনে গেছে। যদিও একটি সফল ভ্যাকসিন পেতে এর আগে ১০ থেকে ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। অধ্যাপক কামরুল বলেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন এলে আমরা পাব। কিন্তু এটি কবে আসবে সেটি অনিশ্চিত। বলা হচ্ছে সব ঠিক থাকলে এপ্রিল-মে নাগাদ এটি পাওয়া যেতে পারে।

যদিও আমাদের শীতকালীন যে আতঙ্ক ততদিন থাকবে না। তিনি বলেন, তাই ভ্যাকসিন নিয়ে উচ্চাশা করা ঠিক হবে না। একটি কার্যকর ভ্যাকসিন পেতে সময় লাগবে। তাই সুস্থ থাকতে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, নিয়মিত হাত জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খারশীদ আলম যুগান্তরকে বলেন, ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে যে ভ্যাকসিন কেনা হচ্ছে সেটি প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে তারা সরবরাহ করবে। তাই চাইলেও সবাইকে একসঙ্গে টিকা দেয়া সম্ভব হবে না। তবে এসব বিষয়ে কাজ করতে ‘কোভিড ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। এছাড়াও ‘বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অব ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট’ কাজ করছে। রয়েছে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রিপায়ের্ডনেস অ্যান্ড ডেপ্লয়মেন্ট কোর কমিটি।

জানা গেছে, জুলাইয়ে ফাইজার-বায়োএনটেক ছয়টি দেশের ৪৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে তাদের ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করে। দেশগুলো হল- যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেটিনা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও তুরস্ক। স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে অর্ধেককে প্রয়োগ করা হয় করোনা ভ্যাকসিন আর বাকি অর্ধেককে দেয়া হয় প্লোসেবো (লবণ-পানি)।

একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বোর্ড সব পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণে ৪৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর মধ্যে ৯৪ জন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ৯০ শতাংশের ওপরে ভ্যাকসিনটি নিরাপদ ও কার্যকর।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৫০ শতাংশ হলে তারা জরুরি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারবে বলে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এ বিবেচনায় ভ্যাকসিনটি অনেক বেশি কার্যকর। এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষায় ফাইজার-বায়োএনটেক তাদের ভ্যাকসিনটি প্রমাণের মাধ্যমে নিরাপদ দাবি করেছে। ফাইজার নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে জরুরি অনুমোদনের জন্য এফডিএর কাছে আবেদন করবে। এরপর ২ মাসের নিরাপদ পরিসংখ্যান এফডিএর কাছে জমা দিতে হবে। সব ঠিক থাকলে ভ্যাকসিনটি এ বছরের শেষ নাগাদ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ যেমন স্বাস্থ্যকর্মী ও বয়স্ক মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হতে পারে।

এ ভ্যাকসিনে জেনেটিক মলিকুলার এমআরএনএ ব্যবহার করা হয়েছে, যা শরীরের কোষ থেকে ভাইরাল প্রোটিন তৈরি করে। ভ্যাকসিনটি প্রত্যেকের জন্য দুই ডোজ করে দিতে হবে। তারা আশা করছে এ বছরে পাঁচ কোটি ডোজ তৈরি করতে পারবে। যা দিয়ে ২.৫ কোটি মানুষের প্রতিরোধের ব্যবস্থা সম্ভব হবে। এছাড়া ২০২১ সালের মধ্যে তারা ১৩০ কোটি ডোজ প্রস্তুত করতে পারবে।

এরই মধ্যে ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা ও জাপানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তবে ফাইজারের টিকা সংরক্ষণে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (মাইনাস ৯৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রার প্রয়োজন পড়ে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় শহরের হাসপাতালে এত কম তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণের সুবিধা নেই।

এদিকে কোভ্যাক্স সুবিধা থেকে বাংলাদেশের ৬৮ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ করোনার ভ্যাকসিন পাবে। যে ভ্যাকসনিগুলো ডাবল ডোজের। অর্থাৎ জনপ্রতি দুই ডোজ ভ্যাকসিন দিতে হবে।

মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০ শতাংশ হারে ধাপে ধাপে বাংলাদেশ এ ভ্যাকসিন পাবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. শামসুল হক। তিনি বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে এ ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। জুলাইয়ের শুরুর দিকে বাংলাদেশ কোভ্যাক্সে আবেদন করে এবং গ্যাভি সেটি গ্রহণ করে ১৪ জুলাই। বাংলাদেশ গ্যাভির কাছ থেকে ৬৮ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৮০ লাখ ভ্যাকসিন পাবে। তবে এজন্য বাংলাদেশকে কো ফিন্যান্সিং করতে হবে। এক্ষেত্রে ১ দশমিক ৬ থেকে ২ ডলার দাম দিতে হতে পারে।

তিনি বলেন, এছাড়া সরকার ইতোমধ্যে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অক্সফোর্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কিনতে পারবে চার ডলারের বিনিময়ে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পরিবহন খরচ সব মিলিয়ে এরসঙ্গে যোগ হবে আরও এক ডলার। সেখান থেকে বাংলাদেশ কিনবে ৩০ মিলিয়ন ডোজ।

এজন্য ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ থেকে প্রায় ৭৩৫ কোটি টাকা ছাড় করেছে। তবে এ ভ্যাকসিন অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রি কোয়ালিফায়েড হতে হবে। এ দুটি ভ্যাকসিনের সোর্স ছাড়াও চীনের সিনোভ্যাক, রাশিয়ার স্পুটনিক, জিএসকে, সানোফি এবং ফাইজারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানান ডা. শামসুল হক। তিনি জানান, সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে তিন কোটি ভ্যাকসিন পাবে। এরজন্য সরকারের ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৮৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

এদিকে ওষুধ কোম্পানিসহ বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যে বিতরণের জন্য ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে ১০ লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা আনার কথা ভাবছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।

জানা গেছে, বিজনেস সেক্টরের ফ্রন্ট লাইনার, বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্যাংক, অন্যান্য কর্পোরেট হাউসে যারা কাজ করছেন তাদের দিতে এ উদ্যোগ। প্রতি ডোজ টিকার জন্য ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটকে দিতে হবে ৮ ডলার। এর সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রতি ডোজ টিকার দাম ১১শ’ থেকে ১২শ’ টাকা হতে পারে।

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস