করোনায় আমদানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব
jugantor
সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ
করোনায় আমদানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব
প্রধান ৬ খাতের মধ্যে একমাত্র ভোগ্যপণ্যে বেড়েছে, বাকি ৫ খাতে কমেছে * গত মার্চ থেকে আমদানি নিম্নমুখী * ধারাবাহিকভাবে আমদানি কমলে অর্থনীতি আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট  

২৯ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার প্রভাবে দেশে প্রায় সব খাতের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে আমদানি বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়েছে বেশি। গত মার্চ থেকেই এলসি খোলার হার যেমন কমেছে, তেমনি হ্রাস পেয়েছে আমদানিও। চলতি অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত।

প্রধান ছয়টি খাতের মধ্যে একমাত্র ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলা বেড়েছে। বাকি পাঁচ খাতেই কমেছে। গত অক্টোবরেও আমদানির এলসি খোলার গতি নিম্নমুখী ছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আগামীতে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে ভোগ্যপণ্য আমদানির এলসি খোলার হার বেড়েছে ১৯ শতাংশের বেশি। আমদানি বেড়েছে পৌনে ২৯ শতাংশ। শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, জ্বালানি তেল ও অন্যান্য খাতে এলসি খোলার হার যেমন কমেছে, তেমনি হ্রাস পেয়েছে আমদানিও।

এর মধ্যে শিল্পের যন্ত্রপাতির এলসি সাড়ে ১৫ শতাংশ ও আমদানি ৩৯ শতাংশ কমেছে। শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা প্রায় ৭ শতাংশ এবং আমদানি সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। মধ্যবর্তী শিল্পপণ্যের এলসি সাড়ে ১৪ শতাংশ ও আমদানি কমেছে সাড়ে ২৩ শতাংশের বেশি।

জ্বালানি তেলের এলসি প্রায় ৫০ শতাংশ ও আমদানি ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম পড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় কমেছে। তবে দেশে চাহিদা অনুযায়ী তেলের মজুদ ও সরবরাহ রয়েছে। অন্যান্য পণ্যের এলসি প্রায় ৩ শতাংশ ও আমদানি কমেছে সোয়া ১৯ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত আমদানিনির্ভর। ভোগ্যপণ্য যেমন আমদানি করতে হয়, তেমনি সব শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের চাহিদাও মেটাতে হয় আমদানি করে। এর বাইরে জ্বালানি তেল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। নিত্যপণ্যের মধ্যে সব ধরনের মসলা, পেঁয়াজ, চাল, ডাল, গম, ভোজ্যতেল এগুলোও আমদানি করতে হয়।

এসব পণ্য ঘিরে দেশে গড়ে উঠেছে বহুমুখী ব্যবসা কেন্দ্র। আমদানি কমার কারণে শিল্প খাতে পণ্যের উৎপাদন যেমন কম হচ্ছে, তেমনি পণ্যের সরবরাহ, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনীতি এখন বহুমুখী সংকটে। এই সংকট মোকাবেলা করতে খুব কৌশলী হতে হবে। প্রণোদনা দিয়ে টাকার জোগান বাড়ালে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। তখন স্বল্প আয়ের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, এই প্রণোদনা শুধু অর্থ দিয়ে নয়, নীতি সহায়তা, বিভিন্ন খাতে ছাড় দিয়ে প্রণোদনা দিতে হবে। নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে সেগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৃষ্টি করতে হবে চাহিদাও। তাহলেই সবকিছুতে ভারসাম্য রক্ষা হবে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা জানান, এক-দুই মাস আমদানি কমতে পারে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কমার লক্ষণটা ভালো নয়। কয়েক মাস ধরে আমদানি কমার মানে হচ্ছে অর্থনীতিতে চাহিদা কমে গেছে। যে কারণে পণ্যের আমদানিও কম হচ্ছে। এই অবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব আরও প্রকট হবে। এর নেতিবাচক প্রভাব তখন রফতানিতেও পড়বে। এ সংকট মোকাবেলায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, দেশের মোট রফতানির ৮২ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। এর বিপরীতে মূল্য সংযোজন হচ্ছে ৫৬ শতাংশ। বাকি ৪৪ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে এ খাতের কাঁচামালের আমদানি কম হওয়ায় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সূত্র জানায়, করোনার প্রভাবে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কারখানাগুলোর যে উৎপাদন সক্ষমতা আছে তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। রফতানির কার্যাদেশও কমে গেছে ২৫ শতাংশের মতো। এ কারণে এ খাতের উদ্যোক্তারা এখন কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শীতের আগে পোশাক রফতানির চাপ যেমন বেশি থাকত, তেমনি অর্ডারও বেশি থাকত। করোনার কারণে এখন তেমনটা নেই।

গত অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে রফতানি আয় কমেছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে প্রায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আগামীতে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা আছে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের হানা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান রফতানির বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা ইতোমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় কাবুল হয়ে পড়েছে। ওইসব দেশে সীমিত আকারে লকডাউনও চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে চাল আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে সাড়ে ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি কমেছে সাড়ে ৪৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে সরকার চাল আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গমের এলসি বেড়েছে সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি, একই সঙ্গে আমদানিও বেড়েছে সাড়ে ৭০ শতাংশ।

চিনির এলসির সোয়া ১৬ শতাংশ, আমদানি কমেছে প্রায় দেড় শতাংশ। পেঁয়াজের এলসি বেড়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশ, আমদানি কমেছে সোয়া ১২ শতাংশ।

তাজা ও শুকনা ফলের এলসি ৩৪ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে সোয়া ১২ শতাংশ। সব ধরনের ডাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে সোয়া ১৮ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে পৌনে ১৮ শতাংশ। দুগ্ধজাত পণ্যের এলসি কমেছে সাড়ে ২০ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে সাড়ে ৯ শতাংশ। ভোজ্যতেলের এলসি ৩৪ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে পৌনে ৪৩ শতাংশ। ওষুধের এলসি খোলা বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সোয়া ৪৪ শতাংশ। সুতা ও সিনথেটিক ফাইবার আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ১৫ শতাংশের বেশি। আমদানি কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি।

বীজ আমদানির এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ৮ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সোয়া ২১ শতাংশ। ইয়ার্ন কটন ও সিনথেটিক এলসি খোলা কমেছে ৯ শতাংশ, আমদানি কমেছে সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি। বস্ত্রশিল্পের কাপড় ও গার্মেন্টের এক্সেসরিজ আমদানির এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ২০ শতাংশ, আমদানি কমেছে পৌনে ১৭ শতাংশ। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে পৌনে ৬ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ২৯ শতাংশ।

রাসায়নিক পদার্থ ও রাসায়নিক পণ্য আমদানির এলসি কমেছে ১০ শতাংশের বেশি, আমদানি কমেছে সাড়ে ৮ শতাংশ। এর মধ্যে রাসায়নিক সারের এলসি কমেছে সাড়ে ১৯ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে ৬ শতাংশের বেশি।

বৈদেশিক বিশেষ সহায়তার আওতায় খাদ্য আমদানির এলসি পৌনে ৬১ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ৫৭ শতাংশের বেশি।

কয়লা ও পোড়া কয়লা বা কোক আমদানির এলসি খোলা কমেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশ। সিমেন্ট আমদানির এলসি খোলা কমেছে সোয়া ৩ শতাংশের বেশি। আমদানি কমেছে ৩৩ শতাংশ। ক্লিকার বা ঝামা ও চুনাপাথর আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ, আমদানি কমেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ। এদিকে করোনায় নির্মাণ খাতে স্থবিরতার কারণে সিমেন্টের চাহিদা কমে গেছে।

বিভিন্ন ধরনের গ্যাস আমদানির এলসি খোলা সাড়ে ৩২ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে সাড়ে ৩৪ শতাংশ। পুরনো জাহাজ আমদানির এলসি কমেছে সাড়ে ৪১ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে ৩২ শতাংশ। পেপার ও পেপার বোর্ড আমদানির এলসি সোয়া ২৩ শতাংশ ও আমদানি কমেছে সোয়া ১০ শতাংশ।

অন্যান্য যন্ত্রপাতির এলসি বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ, আমদানি কমেছে সাড়ে ১৫ শতাংশের বেশি। অন্যান্য পণ্যের এলসি বেড়েছে সোয়া ৪ শতাংশ, আমদানির কমেছে সোয়া ৫ শতাংশ।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ

করোনায় আমদানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব

প্রধান ৬ খাতের মধ্যে একমাত্র ভোগ্যপণ্যে বেড়েছে, বাকি ৫ খাতে কমেছে * গত মার্চ থেকে আমদানি নিম্নমুখী * ধারাবাহিকভাবে আমদানি কমলে অর্থনীতি আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
 যুগান্তর রিপোর্ট 
২৯ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার প্রভাবে দেশে প্রায় সব খাতের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে আমদানি বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়েছে বেশি। গত মার্চ থেকেই এলসি খোলার হার যেমন কমেছে, তেমনি হ্রাস পেয়েছে আমদানিও। চলতি অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত।

প্রধান ছয়টি খাতের মধ্যে একমাত্র ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলা বেড়েছে। বাকি পাঁচ খাতেই কমেছে। গত অক্টোবরেও আমদানির এলসি খোলার গতি নিম্নমুখী ছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আগামীতে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে ভোগ্যপণ্য আমদানির এলসি খোলার হার বেড়েছে ১৯ শতাংশের বেশি। আমদানি বেড়েছে পৌনে ২৯ শতাংশ। শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, জ্বালানি তেল ও অন্যান্য খাতে এলসি খোলার হার যেমন কমেছে, তেমনি হ্রাস পেয়েছে আমদানিও।

এর মধ্যে শিল্পের যন্ত্রপাতির এলসি সাড়ে ১৫ শতাংশ ও আমদানি ৩৯ শতাংশ কমেছে। শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা প্রায় ৭ শতাংশ এবং আমদানি সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। মধ্যবর্তী শিল্পপণ্যের এলসি সাড়ে ১৪ শতাংশ ও আমদানি কমেছে সাড়ে ২৩ শতাংশের বেশি।

জ্বালানি তেলের এলসি প্রায় ৫০ শতাংশ ও আমদানি ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম পড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় কমেছে। তবে দেশে চাহিদা অনুযায়ী তেলের মজুদ ও সরবরাহ রয়েছে। অন্যান্য পণ্যের এলসি প্রায় ৩ শতাংশ ও আমদানি কমেছে সোয়া ১৯ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত আমদানিনির্ভর। ভোগ্যপণ্য যেমন আমদানি করতে হয়, তেমনি সব শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের চাহিদাও মেটাতে হয় আমদানি করে। এর বাইরে জ্বালানি তেল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। নিত্যপণ্যের মধ্যে সব ধরনের মসলা, পেঁয়াজ, চাল, ডাল, গম, ভোজ্যতেল এগুলোও আমদানি করতে হয়।

এসব পণ্য ঘিরে দেশে গড়ে উঠেছে বহুমুখী ব্যবসা কেন্দ্র। আমদানি কমার কারণে শিল্প খাতে পণ্যের উৎপাদন যেমন কম হচ্ছে, তেমনি পণ্যের সরবরাহ, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনীতি এখন বহুমুখী সংকটে। এই সংকট মোকাবেলা করতে খুব কৌশলী হতে হবে। প্রণোদনা দিয়ে টাকার জোগান বাড়ালে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। তখন স্বল্প আয়ের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, এই প্রণোদনা শুধু অর্থ দিয়ে নয়, নীতি সহায়তা, বিভিন্ন খাতে ছাড় দিয়ে প্রণোদনা দিতে হবে। নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে সেগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৃষ্টি করতে হবে চাহিদাও। তাহলেই সবকিছুতে ভারসাম্য রক্ষা হবে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা জানান, এক-দুই মাস আমদানি কমতে পারে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কমার লক্ষণটা ভালো নয়। কয়েক মাস ধরে আমদানি কমার মানে হচ্ছে অর্থনীতিতে চাহিদা কমে গেছে। যে কারণে পণ্যের আমদানিও কম হচ্ছে। এই অবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব আরও প্রকট হবে। এর নেতিবাচক প্রভাব তখন রফতানিতেও পড়বে। এ সংকট মোকাবেলায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, দেশের মোট রফতানির ৮২ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। এর বিপরীতে মূল্য সংযোজন হচ্ছে ৫৬ শতাংশ। বাকি ৪৪ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে এ খাতের কাঁচামালের আমদানি কম হওয়ায় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সূত্র জানায়, করোনার প্রভাবে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কারখানাগুলোর যে উৎপাদন সক্ষমতা আছে তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। রফতানির কার্যাদেশও কমে গেছে ২৫ শতাংশের মতো। এ কারণে এ খাতের উদ্যোক্তারা এখন কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শীতের আগে পোশাক রফতানির চাপ যেমন বেশি থাকত, তেমনি অর্ডারও বেশি থাকত। করোনার কারণে এখন তেমনটা নেই।

গত অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে রফতানি আয় কমেছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে প্রায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আগামীতে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা আছে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের হানা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান রফতানির বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা ইতোমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় কাবুল হয়ে পড়েছে। ওইসব দেশে সীমিত আকারে লকডাউনও চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে চাল আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে সাড়ে ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি কমেছে সাড়ে ৪৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে সরকার চাল আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গমের এলসি বেড়েছে সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি, একই সঙ্গে আমদানিও বেড়েছে সাড়ে ৭০ শতাংশ।

চিনির এলসির সোয়া ১৬ শতাংশ, আমদানি কমেছে প্রায় দেড় শতাংশ। পেঁয়াজের এলসি বেড়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশ, আমদানি কমেছে সোয়া ১২ শতাংশ।

তাজা ও শুকনা ফলের এলসি ৩৪ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে সোয়া ১২ শতাংশ। সব ধরনের ডাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে সোয়া ১৮ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে পৌনে ১৮ শতাংশ। দুগ্ধজাত পণ্যের এলসি কমেছে সাড়ে ২০ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে সাড়ে ৯ শতাংশ। ভোজ্যতেলের এলসি ৩৪ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে পৌনে ৪৩ শতাংশ। ওষুধের এলসি খোলা বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সোয়া ৪৪ শতাংশ। সুতা ও সিনথেটিক ফাইবার আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ১৫ শতাংশের বেশি। আমদানি কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি।

বীজ আমদানির এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ৮ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সোয়া ২১ শতাংশ। ইয়ার্ন কটন ও সিনথেটিক এলসি খোলা কমেছে ৯ শতাংশ, আমদানি কমেছে সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি। বস্ত্রশিল্পের কাপড় ও গার্মেন্টের এক্সেসরিজ আমদানির এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ২০ শতাংশ, আমদানি কমেছে পৌনে ১৭ শতাংশ। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে পৌনে ৬ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ২৯ শতাংশ।

রাসায়নিক পদার্থ ও রাসায়নিক পণ্য আমদানির এলসি কমেছে ১০ শতাংশের বেশি, আমদানি কমেছে সাড়ে ৮ শতাংশ। এর মধ্যে রাসায়নিক সারের এলসি কমেছে সাড়ে ১৯ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে ৬ শতাংশের বেশি।

বৈদেশিক বিশেষ সহায়তার আওতায় খাদ্য আমদানির এলসি পৌনে ৬১ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ৫৭ শতাংশের বেশি।

কয়লা ও পোড়া কয়লা বা কোক আমদানির এলসি খোলা কমেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশ। সিমেন্ট আমদানির এলসি খোলা কমেছে সোয়া ৩ শতাংশের বেশি। আমদানি কমেছে ৩৩ শতাংশ। ক্লিকার বা ঝামা ও চুনাপাথর আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ, আমদানি কমেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ। এদিকে করোনায় নির্মাণ খাতে স্থবিরতার কারণে সিমেন্টের চাহিদা কমে গেছে।

বিভিন্ন ধরনের গ্যাস আমদানির এলসি খোলা সাড়ে ৩২ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে সাড়ে ৩৪ শতাংশ। পুরনো জাহাজ আমদানির এলসি কমেছে সাড়ে ৪১ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে ৩২ শতাংশ। পেপার ও পেপার বোর্ড আমদানির এলসি সোয়া ২৩ শতাংশ ও আমদানি কমেছে সোয়া ১০ শতাংশ।

অন্যান্য যন্ত্রপাতির এলসি বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ, আমদানি কমেছে সাড়ে ১৫ শতাংশের বেশি। অন্যান্য পণ্যের এলসি বেড়েছে সোয়া ৪ শতাংশ, আমদানির কমেছে সোয়া ৫ শতাংশ।

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস