মুক্তিসংগ্রামে নতুন মাত্রা
jugantor
বিজয়ের ৪৯ বছর
মুক্তিসংগ্রামে নতুন মাত্রা

  যুগান্তর রিপোর্ট  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন: ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরও বলেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জাতির পিতার এই ভাষণের মধ্যেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা। আর সেই নির্দেশ মতোই যুদ্ধ করে বাঙালি দেশ স্বাধীন করে। ৯ মাসের এই যুদ্ধে শহীদ হন ৩০ লাখ মানুষ। সম্ভ্রম হারান দুই লাখ মা-বোন।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ভিন্ন মাত্রা পায়। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিটি দিন ছিল গুরুত্ববাহী। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩ ডিসেম্বর ছিল এক মোড়-ঘুরানো দিন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াই শুরুর নির্ধারক দিন।

এদিন পাকবাহিনী ভারতীয় বিমানঘাঁটিগুলোয় বোমাবর্ষণ ও পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ করে। আর এর মধ্যদিয়েই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেইসঙ্গে সূচিত হয় পূর্ব রণাঙ্গনে বাংলাদেশ-ভারত মিলিত মিত্রবাহিনীর যুদ্ধ-তৎপরতার চূড়ান্ত অধ্যায়।

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানোর জন্য ৩ ডিসেম্বর পাকবাহিনী ভারতে হামলা করে। এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। পাকিস্তানের হামলার খবরে তিনি দিল্লি ফিরে যান।

গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বলেন: ‘বাংলাদেশের যুদ্ধ এখন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের আক্রমণ ঐক্যবদ্ধভাবেই প্রতিহত করতে হবে।’

পাকিস্তানের ভারত আক্রমণের জের ধরেই গঠন করা হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে পূর্ব সীমান্তে অভিযান শুরু করে। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানকে ঘিরে ফেলার জন্য সাতটি এলাকা দিয়ে আক্রমণ পরিচালিত হয়। সেই রাতেই ঢাকা এবং আশপাশে পাক হানাদারদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে শুরু হয় বিমানহামলা।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সফল হামলায় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও চট্টগ্রামের ফুয়েল পাম্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একের পর এক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের কোণঠাসা করে ফেলে। এদিনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হল, বরগুনায় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণের মুখে পাকসেনারা পরাজয় বরণ করে। মুক্ত হয় বরগুনা জেলা।

৩ ডিসেম্বর ভারতে পাকবাহিনীর হামলার পরই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের সম্মিলিত সর্বাত্মক লড়াই শুরু হয়। পশ্চিম ও পূর্ব রণাঙ্গনে গর্জে ওঠে কামান। ভারতীয় বিমানবাহিনী হামলা চালাতে শুরু করে। এতদিন পাকবাহিনীর বোমার আওয়াজে মানুষ আতঙ্কে থাকলেও মুক্তিযোদ্ধারা বিমান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করায় আনন্দিত-উদ্বেলিত হন তারা। তাদের সামনে দেখা দেয় মুক্তির আলোকচ্ছটা।

এদিকে মুক্তি বাহিনীর সর্বাত্মক হামলায় পাকিস্তানি হানাদাররা দিশেহারা হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের বেশে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তারা একের পর এক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করে পাকসেনাদের ফাঁদে ফেলেন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে যায় বীর বাঙালি। কুমিল্লায় মুক্তিবাহিনী মিয়াবাজারে পাকসেনাদের ওপর হামলা চালায়।

ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা মিয়াবাজার দখল করে নেন। আখাউড়ার আজমপুর স্টেশনে দু’পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দিনভর যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সিলেটের ভানুগাছায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। নোয়াখালীতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল সোনাইমুড়ী মুক্ত করে। এরপর তারা চৌমুহনীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়।

রংপুরের পলাশবাড়ীতে ১২ জন পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে। সাতক্ষীরা থেকে পিছু হটে দৌলতপুরের দিকে যায় পাকবাহিনী। পাকিস্তান এয়ারলাইন্স পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে সব ফ্লাইট বাতিল করে। সামরিক কর্তৃপক্ষ সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত ঢাকায় সান্ধ্য আইন জারি ও নিষ্প্রদীপ ব্যবস্থা পালনের নির্দেশ দেয়।

বিজয়ের ৪৯ বছর

মুক্তিসংগ্রামে নতুন মাত্রা

 যুগান্তর রিপোর্ট 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন: ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরও বলেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জাতির পিতার এই ভাষণের মধ্যেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা। আর সেই নির্দেশ মতোই যুদ্ধ করে বাঙালি দেশ স্বাধীন করে। ৯ মাসের এই যুদ্ধে শহীদ হন ৩০ লাখ মানুষ। সম্ভ্রম হারান দুই লাখ মা-বোন।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ভিন্ন মাত্রা পায়। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিটি দিন ছিল গুরুত্ববাহী। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩ ডিসেম্বর ছিল এক মোড়-ঘুরানো দিন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াই শুরুর নির্ধারক দিন।

এদিন পাকবাহিনী ভারতীয় বিমানঘাঁটিগুলোয় বোমাবর্ষণ ও পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ করে। আর এর মধ্যদিয়েই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেইসঙ্গে সূচিত হয় পূর্ব রণাঙ্গনে বাংলাদেশ-ভারত মিলিত মিত্রবাহিনীর যুদ্ধ-তৎপরতার চূড়ান্ত অধ্যায়।

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানোর জন্য ৩ ডিসেম্বর পাকবাহিনী ভারতে হামলা করে। এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। পাকিস্তানের হামলার খবরে তিনি দিল্লি ফিরে যান।

গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বলেন: ‘বাংলাদেশের যুদ্ধ এখন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের আক্রমণ ঐক্যবদ্ধভাবেই প্রতিহত করতে হবে।’

পাকিস্তানের ভারত আক্রমণের জের ধরেই গঠন করা হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে পূর্ব সীমান্তে অভিযান শুরু করে। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানকে ঘিরে ফেলার জন্য সাতটি এলাকা দিয়ে আক্রমণ পরিচালিত হয়। সেই রাতেই ঢাকা এবং আশপাশে পাক হানাদারদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে শুরু হয় বিমানহামলা।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সফল হামলায় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও চট্টগ্রামের ফুয়েল পাম্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একের পর এক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের কোণঠাসা করে ফেলে। এদিনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হল, বরগুনায় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণের মুখে পাকসেনারা পরাজয় বরণ করে। মুক্ত হয় বরগুনা জেলা।

৩ ডিসেম্বর ভারতে পাকবাহিনীর হামলার পরই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের সম্মিলিত সর্বাত্মক লড়াই শুরু হয়। পশ্চিম ও পূর্ব রণাঙ্গনে গর্জে ওঠে কামান। ভারতীয় বিমানবাহিনী হামলা চালাতে শুরু করে। এতদিন পাকবাহিনীর বোমার আওয়াজে মানুষ আতঙ্কে থাকলেও মুক্তিযোদ্ধারা বিমান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করায় আনন্দিত-উদ্বেলিত হন তারা। তাদের সামনে দেখা দেয় মুক্তির আলোকচ্ছটা।

এদিকে মুক্তি বাহিনীর সর্বাত্মক হামলায় পাকিস্তানি হানাদাররা দিশেহারা হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের বেশে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তারা একের পর এক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করে পাকসেনাদের ফাঁদে ফেলেন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে যায় বীর বাঙালি। কুমিল্লায় মুক্তিবাহিনী মিয়াবাজারে পাকসেনাদের ওপর হামলা চালায়।

ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা মিয়াবাজার দখল করে নেন। আখাউড়ার আজমপুর স্টেশনে দু’পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দিনভর যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সিলেটের ভানুগাছায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। নোয়াখালীতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল সোনাইমুড়ী মুক্ত করে। এরপর তারা চৌমুহনীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়।

রংপুরের পলাশবাড়ীতে ১২ জন পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে। সাতক্ষীরা থেকে পিছু হটে দৌলতপুরের দিকে যায় পাকবাহিনী। পাকিস্তান এয়ারলাইন্স পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে সব ফ্লাইট বাতিল করে। সামরিক কর্তৃপক্ষ সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত ঢাকায় সান্ধ্য আইন জারি ও নিষ্প্রদীপ ব্যবস্থা পালনের নির্দেশ দেয়।

 

ঘটনাপ্রবাহ : বিজয়ের ৪৯ বছর

১৭ ডিসেম্বর, ২০২০