জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ব্যয় বেড়েছে ইভিএমে
jugantor
জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ব্যয় বেড়েছে ইভিএমে
বাড়তি ব্যয়ের সিংহভাগই প্রশিক্ষণ খাতে * আগামী ৬ মাসের জন্য নির্বাচন পরিচালনা ও প্রশিক্ষণ খাতে আরও ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা চায় ইসি

  কাজী জেবেল  

১০ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী ব্যয় বাড়িয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। এর মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হলে জাতীয় সংসদের একটি আসনের নির্বাচনী সম্ভাব্য ব্যয় বেড়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টাকা। কাগজের ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের খরচের চেয়ে এ ব্যয় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।

একটি পৌরসভা নির্বাচনে ব্যয় বাড়ছে ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩০০ টাকা; যা ব্যালটের চেয়ে ৭৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। একেবারে তৃণমূলের নির্বাচন হিসেবে খ্যাত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে খরচ বাড়ছে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা; যা কাগজের ব্যালটের চেয়ে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি।

একইভাবে সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যয় বেড়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ হিসেবে উঠে এসেছে বাড়তি খরচের এমন চিত্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা বন্ধ, কেন্দ্র দখলের মতো অনিয়ম এড়াতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বাড়াচ্ছে ইসি। যদিও নির্বাচনের নিরপেক্ষ পরিবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। তবুও চলমান পৌরসভা নির্বাচনে প্রথম ধাপে ২৫টি ও দ্বিতীয় ধাপে ২৯টিতে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।

তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে কতগুলো পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহার করা হবে- তা নির্ধারণের কাজ করছে ইসি সচিবালয়। কোনো নীতিমালা ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কয়েক কর্মকর্তার ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো পৌরসভা ব্যালট বা ইভিএম হবে সেই প্রস্তাব কমিশনে তোলা হচ্ছে।

এছাড়া আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রয়েছে কমিশনের। ইভিএম ব্যবহার বাড়ানোর কারণে গত নির্বাচনের চেয়ে এবার খরচও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি ৬ মাসের নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ খাতে আরও ১ হাজার ৪১৪ কোটি ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ চায় ইসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগসংক্রান্ত কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে রাখাসহ নির্বাচনী অনিয়ম বন্ধে ইভিএম ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। তবে এটা সত্য নির্বাচনে ব্যয় বেড়ে গেছে। প্রশিক্ষণ খাতে বেশি ব্যয় হচ্ছে। ধীরে ধীরে এ ব্যয়ের পরিমাণ কমে যাবে। তিনি বলেন, ব্যয় কমাতে শিক্ষক, বিএনসিসি ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তারাই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মানুষের ইভিএম সম্পর্কে তথ্য জানাবেন। এছাড়া নির্বাচনে মক ভোটিংয়ের সময়ও কমিয়ে আনা হয়েছে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ৩ দিন মক ভোটিং ও ডেমোনেস্ট্রেশন (ইভিএম প্রদর্শনী) করা হতো। ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে তা কমিয়ে ২ দিন করা হয়েছে। বর্তমানে একদিন মক ভোটিং করা হচ্ছে। এতে প্রতিটি নির্বাচনে অন্তত ৩ লাখ টাকা করে খরচ কমে আসছে বলে জানা গেছে।

ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কারণে বাড়তি এ খরচের সিংহভাগই প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর কাজে খরচ হচ্ছে। প্রশিক্ষক হিসেবে ওই টাকা যাচ্ছে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পকেটে। বাড়তি এ টাকা আয়ের আশায় অনেক কর্মকর্তাই নিজ দায়িত্ব পালনের চেয়ে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। বিগত বছরগুলোতে পছন্দের কর্মকর্তাদের বারবার প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ইভিএম প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম সংগ্রহ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিটি ইভিএমের দাম পড়েছে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা। প্রতিটি ইভিএমের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ১০ বছর।

কোন নির্বাচনে কত ব্যয় : সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্বাচনের ব্যয় প্রধানত দুই খাতে হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে নির্বাচন পরিচালনা ও অপরটি হচ্ছে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ। ইভিএম ব্যবহারের ফলে কাগজের ব্যালটের তুলনায় দুই খাতেই ব্যয় বেড়েছে। তুলনামূলক ব্যয় বেশি বেড়েছে প্রশিক্ষণ খাতে।

আরও দেখা গেছে, জাতীয় সংসদের একটি আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হলে সম্ভাব্য ব্যয় ৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা ধরেছে ইসি। এ নির্বাচন কাগজের ব্যালটে ভোটগ্রহণ করা হলে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।

এ হিসাবে ইভিএমে প্রতি আসনে বাড়তি খরচ ১ কোটি ৪৯ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টাকা; যা ব্যালটের তুলনায় ২৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। জাতীয় সংসদে কাগজের ব্যালটের নির্বাচনে শুধু প্রশিক্ষণ খাতে ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় হলেও ইভিএমে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা।

অপরদিকে নির্বাচন খাতে ব্যয় কাগজের ব্যালটে ৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ও ইভিএমে ব্যয় ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

কাগজের ব্যালটে একটি পৌরসভা নির্বাচনে খরচ ধরা হয়েছে ৩২ লাখ ৬৬ হাজার ৮০০ টাকা। ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হলে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ টাকা। পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএমে ভোট নেয়া হলে বাড়তি খরচ ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩০০ টাকা; যা ব্যালটের চেয়ে ৭৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি।

পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণে প্রশিক্ষণ খাতে খরচ ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ১০০ টাকা, যা কাগজের ব্যালটে খরচ হয় ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮০০ টাকা। অপরদিকে ইভিএমে নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় ৩৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ও কাগজের ব্যালটের ভোটে খরচ হয় ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ লাখ ৫৮ হাজার ২০০ টাকা ও কাগজের ব্যালটে ব্যয় ৩২ লাখ ৫ হাজার ৭০০ টাকা। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হলে ব্যয় বাড়ে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা। যা কাগজের ব্যালটের তুলনায় ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি।

এছাড়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরিচালনা খাতে ইভিএমে ২৭ কোটি ৭৪ লাখ ৮ হাজার টাকা ও কাগজের ব্যালটে ২৪ কোটি ৯১ লাখ ১১ হাজার ১৩৯ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ইভিএমে প্রশিক্ষণ খাতের ব্যয় ২ কোটি ১০ লাখ ৮২ হাজার টাকা। তবে কাগজের ব্যালটে ভোটের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের হিসাব পাওয়া যায়নি। একইভাবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ইভিএমে ২ কোটি ৫৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও কাগজের ব্যালটে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা পরিচালনা ব্যয় ধরা হয়েছে।

তবে ধীরে ধীরে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের খরচ কমে আসবে বলে জানিয়েছেন ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল মো. কামাল উদ্দিন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি, সেখানে প্রচারণা বেশি চালাতে হচ্ছে। যেসব এলাকায় একবার ইভিএম ব্যবহার হয়েছে সেখানে প্রচারণা কম চালালেও চলে। এভাবে এক সময় প্রচারণা কমে আসবে। তখন ইভিএম ব্যবহারের খরচও কমে আসবে।

গাইডলাইন ছাড়াই ইভিএম ব্যবহার : চলমান পৌরসভা নির্বাচনে প্রথম ধাপের ২৫টিতেই ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের ৬১টি পৌরসভার ২৯টিতে ইভিএম ও বাকি ৩২টিতে ব্যালটে ভোট নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো গাইডলাইন ছাড়াই দ্বিতীয় ধাপের ২৯টি পৌরসভায় ইভিএম ও ৩২টিতে ব্যালটে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তার পছন্দ অনুযায়ী এসব পৌরসভার নাম প্রস্তাব করা হয়।

আরও জানা গেছে, ইভিএম প্রকল্প ও ইসি সচিবালয়ের দু’জন কর্মকর্তা কোন পৌরসভাগুলোতে ব্যালট ও কোনগুলোতে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে সেই তালিকা তৈরি করেন। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে ওই তালিকা আমলে নেয়া হয়নি। ওই তালিকায় নারায়ণগঞ্জের তারাব, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, খাগড়াছড়ি, নীলফামারীর সৈয়দপুরসহ কয়েকটি পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহার না করার পক্ষে মত দেয়া হয়।

কিন্তু বাস্তবে ওইসব পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহার করে ভোটগ্রহণের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে অনেক পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহারের মত দেয়া হলেও সেখানে ব্যালটে ভোট নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেসব জেলার একাধিক পৌরসভায় ভোট হবে, সেসব জেলার অন্তত একটিতে ইভিএম ব্যবহারের কথা বললেও গাইবান্ধা ও হবিগঞ্জের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

হবিগঞ্জের মাধবপুর ও নবীগঞ্জ এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও সদর পৌরসভায় ব্যালটে ভোট হচ্ছে। একইভাবে আরও কয়েক পৌরসভার ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ব্যয় বেড়েছে ইভিএমে

বাড়তি ব্যয়ের সিংহভাগই প্রশিক্ষণ খাতে * আগামী ৬ মাসের জন্য নির্বাচন পরিচালনা ও প্রশিক্ষণ খাতে আরও ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা চায় ইসি
 কাজী জেবেল 
১০ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী ব্যয় বাড়িয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। এর মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হলে জাতীয় সংসদের একটি আসনের নির্বাচনী সম্ভাব্য ব্যয় বেড়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টাকা। কাগজের ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের খরচের চেয়ে এ ব্যয় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।

একটি পৌরসভা নির্বাচনে ব্যয় বাড়ছে ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩০০ টাকা; যা ব্যালটের চেয়ে ৭৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। একেবারে তৃণমূলের নির্বাচন হিসেবে খ্যাত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে খরচ বাড়ছে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা; যা কাগজের ব্যালটের চেয়ে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি।

একইভাবে সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যয় বেড়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ হিসেবে উঠে এসেছে বাড়তি খরচের এমন চিত্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা বন্ধ, কেন্দ্র দখলের মতো অনিয়ম এড়াতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বাড়াচ্ছে ইসি। যদিও নির্বাচনের নিরপেক্ষ পরিবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। তবুও চলমান পৌরসভা নির্বাচনে প্রথম ধাপে ২৫টি ও দ্বিতীয় ধাপে ২৯টিতে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।

তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে কতগুলো পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহার করা হবে- তা নির্ধারণের কাজ করছে ইসি সচিবালয়। কোনো নীতিমালা ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কয়েক কর্মকর্তার ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো পৌরসভা ব্যালট বা ইভিএম হবে সেই প্রস্তাব কমিশনে তোলা হচ্ছে।

এছাড়া আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রয়েছে কমিশনের। ইভিএম ব্যবহার বাড়ানোর কারণে গত নির্বাচনের চেয়ে এবার খরচও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি ৬ মাসের নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ খাতে আরও ১ হাজার ৪১৪ কোটি ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ চায় ইসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগসংক্রান্ত কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে রাখাসহ নির্বাচনী অনিয়ম বন্ধে ইভিএম ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। তবে এটা সত্য নির্বাচনে ব্যয় বেড়ে গেছে। প্রশিক্ষণ খাতে বেশি ব্যয় হচ্ছে। ধীরে ধীরে এ ব্যয়ের পরিমাণ কমে যাবে। তিনি বলেন, ব্যয় কমাতে শিক্ষক, বিএনসিসি ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তারাই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মানুষের ইভিএম সম্পর্কে তথ্য জানাবেন। এছাড়া নির্বাচনে মক ভোটিংয়ের সময়ও কমিয়ে আনা হয়েছে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ৩ দিন মক ভোটিং ও ডেমোনেস্ট্রেশন (ইভিএম প্রদর্শনী) করা হতো। ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে তা কমিয়ে ২ দিন করা হয়েছে। বর্তমানে একদিন মক ভোটিং করা হচ্ছে। এতে প্রতিটি নির্বাচনে অন্তত ৩ লাখ টাকা করে খরচ কমে আসছে বলে জানা গেছে।

ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কারণে বাড়তি এ খরচের সিংহভাগই প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর কাজে খরচ হচ্ছে। প্রশিক্ষক হিসেবে ওই টাকা যাচ্ছে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পকেটে। বাড়তি এ টাকা আয়ের আশায় অনেক কর্মকর্তাই নিজ দায়িত্ব পালনের চেয়ে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। বিগত বছরগুলোতে পছন্দের কর্মকর্তাদের বারবার প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ইভিএম প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম সংগ্রহ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিটি ইভিএমের দাম পড়েছে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা। প্রতিটি ইভিএমের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ১০ বছর।

কোন নির্বাচনে কত ব্যয় : সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্বাচনের ব্যয় প্রধানত দুই খাতে হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে নির্বাচন পরিচালনা ও অপরটি হচ্ছে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ। ইভিএম ব্যবহারের ফলে কাগজের ব্যালটের তুলনায় দুই খাতেই ব্যয় বেড়েছে। তুলনামূলক ব্যয় বেশি বেড়েছে প্রশিক্ষণ খাতে।

আরও দেখা গেছে, জাতীয় সংসদের একটি আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হলে সম্ভাব্য ব্যয় ৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা ধরেছে ইসি। এ নির্বাচন কাগজের ব্যালটে ভোটগ্রহণ করা হলে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।

এ হিসাবে ইভিএমে প্রতি আসনে বাড়তি খরচ ১ কোটি ৪৯ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টাকা; যা ব্যালটের তুলনায় ২৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। জাতীয় সংসদে কাগজের ব্যালটের নির্বাচনে শুধু প্রশিক্ষণ খাতে ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় হলেও ইভিএমে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা।

অপরদিকে নির্বাচন খাতে ব্যয় কাগজের ব্যালটে ৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ও ইভিএমে ব্যয় ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

কাগজের ব্যালটে একটি পৌরসভা নির্বাচনে খরচ ধরা হয়েছে ৩২ লাখ ৬৬ হাজার ৮০০ টাকা। ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হলে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ টাকা। পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএমে ভোট নেয়া হলে বাড়তি খরচ ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩০০ টাকা; যা ব্যালটের চেয়ে ৭৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি।

পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণে প্রশিক্ষণ খাতে খরচ ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ১০০ টাকা, যা কাগজের ব্যালটে খরচ হয় ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮০০ টাকা। অপরদিকে ইভিএমে নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় ৩৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ও কাগজের ব্যালটের ভোটে খরচ হয় ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ লাখ ৫৮ হাজার ২০০ টাকা ও কাগজের ব্যালটে ব্যয় ৩২ লাখ ৫ হাজার ৭০০ টাকা। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হলে ব্যয় বাড়ে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা। যা কাগজের ব্যালটের তুলনায় ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি।

এছাড়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরিচালনা খাতে ইভিএমে ২৭ কোটি ৭৪ লাখ ৮ হাজার টাকা ও কাগজের ব্যালটে ২৪ কোটি ৯১ লাখ ১১ হাজার ১৩৯ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ইভিএমে প্রশিক্ষণ খাতের ব্যয় ২ কোটি ১০ লাখ ৮২ হাজার টাকা। তবে কাগজের ব্যালটে ভোটের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের হিসাব পাওয়া যায়নি। একইভাবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ইভিএমে ২ কোটি ৫৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও কাগজের ব্যালটে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা পরিচালনা ব্যয় ধরা হয়েছে।

তবে ধীরে ধীরে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের খরচ কমে আসবে বলে জানিয়েছেন ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল মো. কামাল উদ্দিন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি, সেখানে প্রচারণা বেশি চালাতে হচ্ছে। যেসব এলাকায় একবার ইভিএম ব্যবহার হয়েছে সেখানে প্রচারণা কম চালালেও চলে। এভাবে এক সময় প্রচারণা কমে আসবে। তখন ইভিএম ব্যবহারের খরচও কমে আসবে।

গাইডলাইন ছাড়াই ইভিএম ব্যবহার : চলমান পৌরসভা নির্বাচনে প্রথম ধাপের ২৫টিতেই ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের ৬১টি পৌরসভার ২৯টিতে ইভিএম ও বাকি ৩২টিতে ব্যালটে ভোট নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো গাইডলাইন ছাড়াই দ্বিতীয় ধাপের ২৯টি পৌরসভায় ইভিএম ও ৩২টিতে ব্যালটে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তার পছন্দ অনুযায়ী এসব পৌরসভার নাম প্রস্তাব করা হয়।

আরও জানা গেছে, ইভিএম প্রকল্প ও ইসি সচিবালয়ের দু’জন কর্মকর্তা কোন পৌরসভাগুলোতে ব্যালট ও কোনগুলোতে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে সেই তালিকা তৈরি করেন। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে ওই তালিকা আমলে নেয়া হয়নি। ওই তালিকায় নারায়ণগঞ্জের তারাব, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, খাগড়াছড়ি, নীলফামারীর সৈয়দপুরসহ কয়েকটি পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহার না করার পক্ষে মত দেয়া হয়।

কিন্তু বাস্তবে ওইসব পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহার করে ভোটগ্রহণের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে অনেক পৌরসভায় ইভিএম ব্যবহারের মত দেয়া হলেও সেখানে ব্যালটে ভোট নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেসব জেলার একাধিক পৌরসভায় ভোট হবে, সেসব জেলার অন্তত একটিতে ইভিএম ব্যবহারের কথা বললেও গাইবান্ধা ও হবিগঞ্জের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

হবিগঞ্জের মাধবপুর ও নবীগঞ্জ এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও সদর পৌরসভায় ব্যালটে ভোট হচ্ছে। একইভাবে আরও কয়েক পৌরসভার ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন