কোটা পদ্ধতি বাতিলের প্রজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেলেই ব্যবস্থা

প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় * প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে অভিনন্দন বিশেষজ্ঞদের

  উবায়দুল্লাহ বাদল ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোটাবিরোধি

সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রজ্ঞাপন জারি করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ নির্দেশনা আসার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার জাতীয় সংসদে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে বলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনো কোটারই দরকার নেই। যারা প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দেব।’

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এমন সাহসী ঘোষণাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা বলেছেন, সব ক্ষেত্রেই এখনই কোটা তুলে দেয়া ঠিক হবে না। কিছু ক্ষেত্রে কোটা রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কোটা তুলে না দিয়ে সংস্কার করলে ভালো হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অপেক্ষায় আছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে যেভাবে অগ্রসর হতে বলবেন, আমি সেভাবে বাকি কাজ করব।’ প্রজ্ঞাপন হবে কিনা এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হয়তো হবে কিন্তু সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমি বলছি, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী নির্দেশনার জন্য প্রস্তুত আছি।’

সব চাকরিতেই কি প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা কার্যকর হবে- উত্তরে সিনিয়র সচিব বলেন, ‘সেটি আমরা যখন প্রজ্ঞাপন জারি করব তখন হয়তো আরও বিশ্লেষণ করে পরিষ্কার করব। সেটি সরকার প্রধান থেকে সুস্পষ্ট পরামর্শ ও নির্দেশনা পাওয়ার পরই আমরা ব্যবস্থা নেব।’

কবে প্রজ্ঞাপন জারি হবে- এ বিষয়ে মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘এটা এখন জরুরি নয়, কারণ এখন কোনো নিয়োগ হচ্ছে না। কাজেই আমরা যদি একটু সময় নেই তাতে দেশের ক্ষতি হবে না।’ কোটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলা হয়েছিল- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা সব সময় পরীক্ষার কাজ করি।

সরকারি দফতর থেকে একটা কিছু বের হলে সেটা নিয়ে কেউ কথা বললে আরেকবার দেখি- কী কাজটা হল, কেন কথাটা উঠেছে। সেটা চলছে, এখনও আমরা দেখছি।’

তিনি বলেন, ‘আন্দোলন যেভাবে হয়েছিল, তাতে ৭ তারিখ (মে মাসের) পর্যন্ত আলটিমেটাম ছিল, তারপর আবার নতুন করে আন্দোলন হয়েছে। ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনে করেছেন ঘোষণাটা দেয়া জরুরি, তাই দিয়েছেন।

আমি মনে করি পরবর্তী কাজ হল, এখন আমাদের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করা। সেটা হলেই আমরা করে ফেলব।’ শুধু বিসিএসের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্ষেত্রে কোটা বাতিল হল কিনা- এ বিষয়ে সচিব বলেন, ‘এখানে টেকনিক্যাল অনেক ব্যাপার আছে। আপনাদের এগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর কোটা পদ্ধতি সংস্কারের বিষয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি এ বিষয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর সার্কুলার জারি করে কোটা সংস্কারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কমিটি পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাবে। এ কমিটির দায়িত্ব কী হবে তা কার্যপরিধিতে উল্লেখ থাকবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে, এরপর আমরা কাজ শুরু করব।’ জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে কমিটিতে জনপ্রশাসন সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব ছাড়াও কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও সাবেক আমলাকে রাখার চিন্তাভাবনা চলছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটা বাতিল সংক্রান্ত ঘোষণাকে অভিনন্দন জানিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান বলেন, ‘অনেক আগেই এ ঘোষণার প্রয়োজন ছিল। বিগত কোনো সরকারই সাহস পায়নি। বর্তমান সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপকে আমি অভিনন্দন জানাই।’

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য শিক্ষা বৃত্তিসহ এ খাতের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। সুতরাং শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো হলে কোটা সুবিধা কমালেও অসুবিধা হবে না। সংবিধানে মুক্তিযোদ্ধা কোটার কোনো বিধান নেই।

সংবিধানে আছে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে পঙ্গু হয়েছেন। এসব কারণে তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা তাদের যথাযথ পুনর্বাসন করতে পারিনি।

তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি থাকতে পারে। তবে কোটা পুরোপুরি তুলে দিলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমস্যা হবে। তারা প্রকৃত অর্থেই অনগ্রসর। তাদের জন্য কোটার দরকার আছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদেরও কোটা রাখতে হবে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রশাসন বিষয়ক কলামিস্ট আলী ইমাম মজুমদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী কোটা তুলে দেয়ার কথা বললেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের ব্যবস্থা করা হবে তাও উল্লেখ করেছেন।

তবে সব ক্ষেত্রে কোটা তুলে দিলে হবে না, কিছু ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। যেমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ৬০ শতাংশ মহিলা নিয়োগ হয়।

পরিবার পরিকল্পনা খাতের কিছু চাকরি আছে; যা মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। এগুলো যেমন আছে সেভাবেই হয়তো রাখতে হবে। এ মুহূর্তে এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা ঠিক হবে না। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

জনপ্রশাসনসংক্রান্ত একাধিক গ্রন্থের রচয়িতা সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘কোটা প্রথা একেবারে তুলে দেয়া যুক্তিযুক্ত নয়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে ২০ শতাংশ কোটা রাখা যেতে পারে।

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদগুলোর ক্ষেত্রে কোটা তুলে দেয়া ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে বর্তমানে কোটার যে হার রয়েছে তা সংস্কার করা দরকার। কারণ বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে শতভাগই কোটায় নিয়োগ হচ্ছে।

অনাথ ও প্রতিবন্ধী ১০ কোটা ছাড়া বাকি ৯০ শতাংশই জেলা কোটা। এ ৯০ শতাংশের মধ্যে আবার মুক্তিযোদ্ধা ৩০, মহিলা ১৫, আনসার ও ভিডিপি ১০ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫। সাধারণ প্রার্থীর জন্য মাত্র ৩০ শতাংশ।

সাধারণ প্রার্থীর কোটা ৩০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ শতাংশ করা যেতে পারে। এছাড়া রেলওয়ে ও প্রাথমিক শিক্ষায় পোষ্য কোটা রয়েছে। এসব কোটা নির্বাহী আদেশে তোলা যাবে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিধি বা আইন সংশোধন করতে হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter