ভারত থেকে আজ আসছে টিকা
jugantor
ভারত থেকে আজ আসছে টিকা

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারি মোকাবিলায় ভারত সরকারের সহায়তার দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ ডোজ টিকা আজ বাংলাদেশে পৌঁছবে। বেলা দেড়টায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ ফ্লাইটে এ টিকা আসছে। বুধবার আসার কথা থাকলেও ফ্লাইটের সময়সূচি জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে টিকা গ্রহণ করবেন।

এছাড়া ২৫ বা ২৬ জানুয়ারি আসবে ক্রয়চুক্তির ৩ কোটি ডোজের প্রথম চালানের ৫০ লাখ ডোজ। ২৭ জানুয়ারি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে দেশের বিভিন্ন পেশার ২০ থেকে ২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে টিকা দিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হতে পারে। এটি উদ্বোধন করবেন প্রথানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে কুর্মিটোলাসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৪ থেকে ৫শ স্বাস্থ্য কর্মীকে ‘ড্রাই রান’ হিসাবে টিকা দেয়া হবে। আর সব ঠিক থাকলে ৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে শুরু হবে টিকাদান কার্যক্রম। বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান এসব তথ্য জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি বিষয়ক) জুয়েনা আজিজের সভাপতিত্বে সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম পিএএ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম উপস্থিত ছিলেন। তারা টিকা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

মো. আবদুল মান্নান বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ ফ্লাইটে ভারত সরকারের সহায়তার ২০ লাখ ডোজ করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা বাংলাদেশে আসবে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক সেখানে উপস্থিত থেকে টিকা গ্রহণ করবেন। সেখান থেকে টিকা রাখা হবে তেজগাঁওয়ে ইপিআই-এর টিকা রাখার স্থানে (স্টোরেজ)।

আবদুল মান্নান বলেন, তৃপক্ষীয় চুক্তির অংশ হিসাবে যে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনা হচ্ছে তার প্রথম চালানও ২৫ তারিখে এসে পৌঁছবে বলে বেক্সিমকো আমাদের নিশ্চিত করছে। সহায়তার টিকা ও কেনা টিকা মিলিয়ে এ মাসেই আসবে ৭০ লাখ ডোজ টিকা। প্রতিদিন দুই লাখ ডোজ হিসাবে প্রথম মাসে ৬০ লাখ মানুষকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রথম মাসে যারা টিকা পাবেন তারা দ্বিতীয় ডোজ পাবেন তৃতীয় মাসে। অন্যদিকে দ্বিতীয় মাসে ৫০ লাখ মানুষকে টিকা দেয়া হবে। তারা দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাবেন চতুর্থ মাসে। টিকা হাতে আসার পর ২৭ অথবা ২৮ জানুয়ারি অথবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন সম্মতি দেবেন সেদিন নাগরিক সমাজের ২০ থেকে ২৫ জনকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে টিকা দেয়া হবে। সেখানে শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, পুলিশ, সামরিক সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়াল ভাবে সম্পৃক্ত থেকে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এরপর রাজধানীর চারটি হাসপাতালে শুরু হবে টিকার ড্রাই রান বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। ঢাকার চারটি হাসপাতাল- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে প্রাথমিকভাবে এ টিকা প্রয়োগ করা হবে। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে দেশে এ টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না হওয়ায় গণটিকাদান শুরু করার আগে এ সংক্ষিপ্ত পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে। তারপর এদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। যদি কোনো সমস্যা লক্ষ করা না যায় তাহলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী এক সপ্তাহ অপেক্ষা করা হবে। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হবে।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান জানান, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন যারা গ্রহণ করেছেন তাদের শারীরিকভাবে বড় কোনো সমস্যা এখনো দেখা দেয়নি। তবে ভ্যাকসিন পরবর্তী কারও শরীরে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যাকসিন গ্রহণকারী সবাইকেই টেলি মেডিসিন সেবা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে এসব সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে দেশের ৮ কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা সরকারের আছে। তবে এখন পর্যন্ত সেরাম ইনস্টিটিউট ছাড়া আর কারও সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়নি। অন্য কোনো টিকা বাংলাদেশে ব্যবহারের অনুমোদনও দেওয়া হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি বিষয়ক) জুয়েনা আজিজ বলেন, ভ্যাকসিন দেশে এলে সেটিকে যথাযথ নিরাপত্তার মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হবে। এয়ারপোর্ট থেকে ভ্যাকসিন ইপিআই স্টোর, জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানোর সময় পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এমনকি যেসব হাসপাতালে টিকা দেওয়া হবে সেখানেও কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। এই টিকা প্রদানে যেন কোনো প্রকার অনিয়ম না হয় সে ব্যাপারে সরকার কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা রাখবে বলেও জানান জুয়েনা আজিজ।

সংবাদ সম্মেলনে আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম পিএএ ভ্যাকসিন সংক্রান্ত ‘সুরক্ষা অ্যাপ’-এর খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্তে আইসিটি বিভাগ ও এটুআই টিকার জন্য নিবন্ধন হতে একটি অ্যাপস তৈরি করেছে। এ অ্যাপস তৈরিতে কোনো টাকা ব্যয় করতে হয়নি। তবে এটি রান করাতে কিছু টাকার প্রয়োজন হবে। পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় তিনি বলেন, যে অ্যাপের মাধ্যমে টিকার জন্য নিবন্ধিত হতে হবে সেটির নাম ‘সুরক্ষা’। এটি গুগল প্লেস্টোরস এবং আইফোন থেকে ডাউনলোড করা যাবে। ন্যাশনাল আইডি কার্ড দিয়ে এতে নিবন্ধিত হতে হবে। তারপর সব তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। তিনি বলেন, অ্যাপসের কাজ ২৩ তারিখের মধ্যে শেষ হবে। এরপর ডেমো পরীক্ষা করা হবে। ২৫ জানুয়ারি এটির উদ্বোধন করা হবে। এ অ্যাপসে নিবন্ধনের জন্য একটি মোবাইল নম্বর দিতে হবে। যেটাতে ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। ব্যবহারকারীর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী তাকে মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে জনিয়ে দেয়া হবে টিকা নিতে তাকে কবে, কোথায় যেতে হবে। তার পরবর্তী টিকা নেয়ার দিন কবে। নিবন্ধিত হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে একটি টিকার ফরম দেয়া হবে। সেটি নিয়ে নির্দিষ্ট হাসপাতালে গেলেই তিনি টিকা পাবেন। দুটি ডোজ সম্পন্ন হলে তাকে একটি সনদ দেয়া হবে। যেটা পৃথিবীর যে কোনো দেশে, এয়ারপোর্টে দেখানো যাবে। এতে তার বিদেশ ভ্রমণ সহজতর হবে। তিনি বলেন, এ অ্যাপস একটি নিবন্ধিত অ্যাপস হিসাবে অ্যান্ড্রয়েড এবং আইএসও সিসটেমে দেয়া হবে। এটি নকল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, করোনা টিকা দেয়া একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ আমরা এতদিন টিকা দিয়েছি শিশুদের। এবার দিতে হবে বড়দের। যে কোনো টিকারই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। এ টিকার ক্ষেত্রেও সেটি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সাধারণ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন টিকার স্থান ফুলে ওঠা, সেখানে ব্যথা হওয়া, শরীর গুলিয়ে ওঠা, মাথাব্যথা হওয়া ইত্যাদি হতে পারে। তিনি বলেন, এজন্য এবার টিকা দেয়া হবে শুধু হাসপাতালে। অন্য কোনো স্থানে টিকা দেয়া হবে না। যাদের টিকা দেয়া হবে তাদের টিকা দেয়ার পর কমপক্ষে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। যে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে টিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে গিয়ে ভিড় করা যাবে না। যিনি টিকা দেবেন শুধু তিনিই টিকাদান কেন্দ্রে যাবেন। টিকাদানে জনগণকে আকৃষ্ট করতে ইতোমধ্যে একটি ‘নাটিকা’ তৈরি করা হয়েছে। টিকা হাতে পেলেই সেগুলো প্রচার করা হবে। মহাপরিচালক বলেন, কোভিড বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে যেভাবে স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রচার করা হয়েছে, একইভাবে কোভিড ভ্যাকসিন প্রদানের সব তথ্য মানুষের কাছে দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে দিতে নিয়মিত ভ্যাকসিন বুলেটিন প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের ৩৭ ভাগ শিশু। যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তারা কেউ টিকা পাবেন না। যাদের ক্যান্সার আছে বা যারা ক্যান্সারের ওষুধ খেয়ে থাকেন, অথবা যারা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ নিয়ে থাকেন তারা ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না। এছাড়া যার বর্তমানে কোভিডে আক্রান্ত তারাও টিকা গ্রহণ করতে পারবেন না।

দেশে কোনো নকল ভ্যাকসিন প্রয়োগের সুযোগ আছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব জানান, দেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর এর কঠোর নিয়েমের মাধ্যমে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া এ ভ্যাকসিন প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই।

ভারত থেকে আজ আসছে টিকা

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২১ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারি মোকাবিলায় ভারত সরকারের সহায়তার দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ ডোজ টিকা আজ বাংলাদেশে পৌঁছবে। বেলা দেড়টায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ ফ্লাইটে এ টিকা আসছে। বুধবার আসার কথা থাকলেও ফ্লাইটের সময়সূচি জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে টিকা গ্রহণ করবেন।

এছাড়া ২৫ বা ২৬ জানুয়ারি আসবে ক্রয়চুক্তির ৩ কোটি ডোজের প্রথম চালানের ৫০ লাখ ডোজ। ২৭ জানুয়ারি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে দেশের বিভিন্ন পেশার ২০ থেকে ২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে টিকা দিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হতে পারে। এটি উদ্বোধন করবেন প্রথানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে কুর্মিটোলাসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৪ থেকে ৫শ স্বাস্থ্য কর্মীকে ‘ড্রাই রান’ হিসাবে টিকা দেয়া হবে। আর সব ঠিক থাকলে ৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে শুরু হবে টিকাদান কার্যক্রম। বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান এসব তথ্য জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি বিষয়ক) জুয়েনা আজিজের সভাপতিত্বে সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম পিএএ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম উপস্থিত ছিলেন। তারা টিকা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

মো. আবদুল মান্নান বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ ফ্লাইটে ভারত সরকারের সহায়তার ২০ লাখ ডোজ করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা বাংলাদেশে আসবে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক সেখানে উপস্থিত থেকে টিকা গ্রহণ করবেন। সেখান থেকে টিকা রাখা হবে তেজগাঁওয়ে ইপিআই-এর টিকা রাখার স্থানে (স্টোরেজ)।

আবদুল মান্নান বলেন, তৃপক্ষীয় চুক্তির অংশ হিসাবে যে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনা হচ্ছে তার প্রথম চালানও ২৫ তারিখে এসে পৌঁছবে বলে বেক্সিমকো আমাদের নিশ্চিত করছে। সহায়তার টিকা ও কেনা টিকা মিলিয়ে এ মাসেই আসবে ৭০ লাখ ডোজ টিকা। প্রতিদিন দুই লাখ ডোজ হিসাবে প্রথম মাসে ৬০ লাখ মানুষকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রথম মাসে যারা টিকা পাবেন তারা দ্বিতীয় ডোজ পাবেন তৃতীয় মাসে। অন্যদিকে দ্বিতীয় মাসে ৫০ লাখ মানুষকে টিকা দেয়া হবে। তারা দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাবেন চতুর্থ মাসে। টিকা হাতে আসার পর ২৭ অথবা ২৮ জানুয়ারি অথবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন সম্মতি দেবেন সেদিন নাগরিক সমাজের ২০ থেকে ২৫ জনকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে টিকা দেয়া হবে। সেখানে শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, পুলিশ, সামরিক সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়াল ভাবে সম্পৃক্ত থেকে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এরপর রাজধানীর চারটি হাসপাতালে শুরু হবে টিকার ড্রাই রান বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। ঢাকার চারটি হাসপাতাল- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে প্রাথমিকভাবে এ টিকা প্রয়োগ করা হবে। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে দেশে এ টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না হওয়ায় গণটিকাদান শুরু করার আগে এ সংক্ষিপ্ত পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে। তারপর এদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। যদি কোনো সমস্যা লক্ষ করা না যায় তাহলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী এক সপ্তাহ অপেক্ষা করা হবে। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হবে।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান জানান, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন যারা গ্রহণ করেছেন তাদের শারীরিকভাবে বড় কোনো সমস্যা এখনো দেখা দেয়নি। তবে ভ্যাকসিন পরবর্তী কারও শরীরে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যাকসিন গ্রহণকারী সবাইকেই টেলি মেডিসিন সেবা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে এসব সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে দেশের ৮ কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা সরকারের আছে। তবে এখন পর্যন্ত সেরাম ইনস্টিটিউট ছাড়া আর কারও সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়নি। অন্য কোনো টিকা বাংলাদেশে ব্যবহারের অনুমোদনও দেওয়া হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি বিষয়ক) জুয়েনা আজিজ বলেন, ভ্যাকসিন দেশে এলে সেটিকে যথাযথ নিরাপত্তার মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হবে। এয়ারপোর্ট থেকে ভ্যাকসিন ইপিআই স্টোর, জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানোর সময় পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এমনকি যেসব হাসপাতালে টিকা দেওয়া হবে সেখানেও কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। এই টিকা প্রদানে যেন কোনো প্রকার অনিয়ম না হয় সে ব্যাপারে সরকার কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা রাখবে বলেও জানান জুয়েনা আজিজ।

সংবাদ সম্মেলনে আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম পিএএ ভ্যাকসিন সংক্রান্ত ‘সুরক্ষা অ্যাপ’-এর খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্তে আইসিটি বিভাগ ও এটুআই টিকার জন্য নিবন্ধন হতে একটি অ্যাপস তৈরি করেছে। এ অ্যাপস তৈরিতে কোনো টাকা ব্যয় করতে হয়নি। তবে এটি রান করাতে কিছু টাকার প্রয়োজন হবে। পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় তিনি বলেন, যে অ্যাপের মাধ্যমে টিকার জন্য নিবন্ধিত হতে হবে সেটির নাম ‘সুরক্ষা’। এটি গুগল প্লেস্টোরস এবং আইফোন থেকে ডাউনলোড করা যাবে। ন্যাশনাল আইডি কার্ড দিয়ে এতে নিবন্ধিত হতে হবে। তারপর সব তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। তিনি বলেন, অ্যাপসের কাজ ২৩ তারিখের মধ্যে শেষ হবে। এরপর ডেমো পরীক্ষা করা হবে। ২৫ জানুয়ারি এটির উদ্বোধন করা হবে। এ অ্যাপসে নিবন্ধনের জন্য একটি মোবাইল নম্বর দিতে হবে। যেটাতে ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। ব্যবহারকারীর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী তাকে মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে জনিয়ে দেয়া হবে টিকা নিতে তাকে কবে, কোথায় যেতে হবে। তার পরবর্তী টিকা নেয়ার দিন কবে। নিবন্ধিত হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে একটি টিকার ফরম দেয়া হবে। সেটি নিয়ে নির্দিষ্ট হাসপাতালে গেলেই তিনি টিকা পাবেন। দুটি ডোজ সম্পন্ন হলে তাকে একটি সনদ দেয়া হবে। যেটা পৃথিবীর যে কোনো দেশে, এয়ারপোর্টে দেখানো যাবে। এতে তার বিদেশ ভ্রমণ সহজতর হবে। তিনি বলেন, এ অ্যাপস একটি নিবন্ধিত অ্যাপস হিসাবে অ্যান্ড্রয়েড এবং আইএসও সিসটেমে দেয়া হবে। এটি নকল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, করোনা টিকা দেয়া একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ আমরা এতদিন টিকা দিয়েছি শিশুদের। এবার দিতে হবে বড়দের। যে কোনো টিকারই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। এ টিকার ক্ষেত্রেও সেটি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সাধারণ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন টিকার স্থান ফুলে ওঠা, সেখানে ব্যথা হওয়া, শরীর গুলিয়ে ওঠা, মাথাব্যথা হওয়া ইত্যাদি হতে পারে। তিনি বলেন, এজন্য এবার টিকা দেয়া হবে শুধু হাসপাতালে। অন্য কোনো স্থানে টিকা দেয়া হবে না। যাদের টিকা দেয়া হবে তাদের টিকা দেয়ার পর কমপক্ষে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। যে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে টিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে গিয়ে ভিড় করা যাবে না। যিনি টিকা দেবেন শুধু তিনিই টিকাদান কেন্দ্রে যাবেন। টিকাদানে জনগণকে আকৃষ্ট করতে ইতোমধ্যে একটি ‘নাটিকা’ তৈরি করা হয়েছে। টিকা হাতে পেলেই সেগুলো প্রচার করা হবে। মহাপরিচালক বলেন, কোভিড বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে যেভাবে স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রচার করা হয়েছে, একইভাবে কোভিড ভ্যাকসিন প্রদানের সব তথ্য মানুষের কাছে দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে দিতে নিয়মিত ভ্যাকসিন বুলেটিন প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের ৩৭ ভাগ শিশু। যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তারা কেউ টিকা পাবেন না। যাদের ক্যান্সার আছে বা যারা ক্যান্সারের ওষুধ খেয়ে থাকেন, অথবা যারা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ নিয়ে থাকেন তারা ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না। এছাড়া যার বর্তমানে কোভিডে আক্রান্ত তারাও টিকা গ্রহণ করতে পারবেন না।

দেশে কোনো নকল ভ্যাকসিন প্রয়োগের সুযোগ আছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব জানান, দেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর এর কঠোর নিয়েমের মাধ্যমে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া এ ভ্যাকসিন প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই।