শতকোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া
jugantor
কার্যকর হয়নি একাধিক গাড়ির অগ্রিম আয়কর আদায়
শতকোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া
সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতেই এমন পরিস্থিতি * বিআরটিএ যে অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান, এটি তার আরেকটি দৃষ্টান্ত -ড. ইফতেখারুজ্জামান

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান  

২১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৫ বছরে বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ) সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে সরকারের প্রায় শতকোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া হয়েছে।

২০১৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি (মোটর কার, জিপ ও মাইক্রোবাস) রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গাড়ির জন্য নিয়মিত করের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করে। কিন্তু বিআরটিএ এখনো তা আদায় করতে পারেনি। সবেমাত্র সিস্টেম আপডেটের কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি।

গত ৬ ডিসেম্বর পরিচালক লোকমান হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে বিআরটিএ ভবনে ইনোভেশন টিমের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দ্বিতীয় গাড়ির ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত কর আদায়ের ব্যাপারে আলোচনা হয়। সভায় সহকারী প্রোগ্রামার বলেন, একই ব্যক্তির নামে একাধিক গাড়ি থাকলে নিয়মিত করের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে।

এজন্য গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এছাড়া গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার সময় মোটরযান মালিকের এনআইডি এন্ট্রি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

ইনোভেশন টিমের সদস্য এএইচএম আনোয়ার পারভেজ বলেন, বর্তমানে মোটরযান নিবন্ধনের সময় মালিকের এনআইডি গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়। এ ছাড়াও কিছু গাড়ির মালিকের এনআইডি কার্ড নেই। কিন্তু যেসব গাড়ির (মোটর কার, জিপ ও মাইক্রোবাস) ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর প্রযোজ্য, সেসব ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক এবং এই টিআইএনের বিপরীতে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়। কাজেই একই টিআইএনের বিপরীতে একাধিক গাড়ি থাকলে সেক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৫০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর গ্রহণ করা যেতে পারে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সভার সভাপতি লোকমান হোসেন মোল্লা বলেন, অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে এনআইডি ও টিআইএন উভয়ই চেক করতে হবে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় গাড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ আয়কর গ্রহণ করা যেতে পারে।

ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এনবিআরের প্রজ্ঞাপন একক এনআইডি বা টিআইএনের বিপরীতে একাধিক গাড়ি থাকলে দ্বিতীয় গাড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ আয়কর গ্রহণ করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিআরটিএ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি সিএনএস লিমিটেডকে।

সূত্র জানায়, বিআরটিএ’র কারিগরি সক্ষমতা না থাকায় এতদিন অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর আদায় করা সম্ভব হয়নি। এখন কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিআরটিএ’র দায়িত্বপ্রাপ্ত সফটওয়্যার কোম্পানি সিএনএসকে এ ব্যাপারে সিস্টেম আপডেট করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, বিআরটিএ’র সফটওয়্যারটি অনেক আগের বিধায় পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি আছে। এটি আপডেটের কাজ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কারও একাধিক গাড়ি থাকলে তা স্বীকার বা ঘোষণা না দিলে অতিরিক্ত আয়কর করা সম্ভব হতো না। এখন এনবিআরের সার্ভারের সঙ্গে বিআরটিএ’র সফটওয়্যার ইন্টিগ্রেশন করা হয়েছে। বিআরটিএ’র টিম এনবিআরের সঙ্গে কাজ করছে। ভবিষ্যতে টিআইএন যাচাইয়ের পাশাপাশি কারও একাধিক গাড়ি থাকলে তা সিস্টেমে দেখা যাবে।

বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, জিপ, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার মিলিয়ে সারা দেশে ব্যক্তিগত যানবাহন আছে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩০৫টি। এর মধ্যে জিপ আছে ৬৪ হাজার ৯৩৬টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ৩ হাজার ৪২৮টি এবং প্রাইভেট কার ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৪১টি। এর বাইরে ট্যাক্সি ক্যাব হিসাবে নিবন্ধন আছে ৩৬ হাজার ১০৭টি। আর বিআরটিএ’র রেজিস্ট্রেশন নেওয়া সব ধরনের গাড়ির সংখ্যা ৪৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৮টি।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্যক্তিগত ৫ লাখ ৩৪ হাজার গাড়ির মধ্যে কমপক্ষে ৫ শতাংশ গাড়ির মালিকের একাধিক গাড়ি রয়েছে। সেই হিসাবে, প্রতিটি গাড়ি ১৫ শ সিসির ধরা হলে গাড়িপ্রতি সরকার সাড়ে ৭ হাজার টাকা কম রাজস্ব পেয়েছে। অর্থাৎ গত ৫ বছরে প্রায় শতকোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।

এনবিআরের আয়কর নীতির সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে কর আদায়ে বিআরটিএ ও এনবিআর যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে। আগে অনেকে ভুয়া টিআইএনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন নিয়েছেন। এখন বিআরটিএ’র সঙ্গে টিআইএন ডেটাবেজ শেয়ারিং করা হয়েছে। ফলে ভুয়া টিআইএন গাড়ি নিবন্ধন করা যাবে না। তাছাড়া অনেকের একাধিক গাড়ি থাকলেও রিটার্নে তা উল্লেখ করেনি। সেগুলোও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কেস পাওয়া গেলে ওই করদাতার ট্যাক্স ফাইল পুনঃউন্মোচন করে অডিট করা হবে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৭ মে এনবিআরের আয়কর বিভাগ একই মালিনাধীন একাধিক গাড়ি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গাড়ির অগ্রিম কর নিয়মিত আয়করের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ ধার্য করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

পরে এটি আয়কর অধ্যাদেশে যুক্ত করা হয়। তখন ১৫ শ সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির অগ্রিম কর ছিল ১৫ হাজার টাকা। ১৫ শ থেকে ২ হাজার সিসি পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকা, ২০০১ থেকে ২৫০০ সিসি পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা, ২৫০১ থেকে ৩ হাজার সিসি পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা, ৩০০১ থেকে সাড়ে ৩ হাজার সিসির গাড়ির ১ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৩ হাজার সিসি বেশি গাড়ির অগ্রিম কর ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিল।

চলতি বাজেটে এই করহার বাড়ানো হয়েছে। ১৫ শ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির অগ্রিম আয়কর করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। ২ হাজার সিসি পর্যন্ত ৫০ হাজার, ২৫০০ সিসি পর্যন্ত ৭৫ হাজার, ৩ হাজার সিসি পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার, সাড়ে ৩ হাজার সিসির গাড়ির ১ লাখ ৫০ হাজার এবং সাড়ে ৩ হাজার সিসি বেশি গাড়ির অগ্রিম কর নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ টাকা। এছাড়া মাইক্রোবাসের অগ্রিম কর ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

অবশ্য সরকারি গাড়ি, প্রকল্পের গাড়ি, বিদেশি কূটনীতিক, জাতিসংঘ এবং এর অঙ্গসংগঠনের গাড়ি, বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার গাড়ি, এমপিও সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাড়ি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের গাড়ির ক্ষেত্রে এ আইন শিথিল করা আছে।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিআরটিএ যে অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান, এটি তার আরেকটি দৃষ্টান্ত। এনবিআর ২০১৫ সালে আইন করে দেওয়ার পরও কেন বিআরটিএ ট্যাক্স আদায় করতে পারল না। এতে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। এর মধ্যে অনিয়ম থাকতে পারে। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অদক্ষতা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান।

তিনি আরও বলেন, বিআরটিএ’র মনিটরিং এজেন্সি হিসাবে সড়ক ও পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের উচিত এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা। কী কারণে বিআরটিএ’র উদাসীনতায় সরকারের এত রাজস্ব হারাল, এর পেছনে কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করে জড়িতদের শাস্তি দেওয়া উচিত।

এর আগে কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল বিআরটিএ থেকে ১ হাজার ৮২১টি বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল। এর মধ্যে ৮৯১টি গাড়ির টিআইএন যাচাই করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১২৬টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে জাল টিআইএন ব্যবহার করে।

গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে বিএমডব্লিউ, ভলভো, মার্সিডিজ বেঞ্জ, আউডি, লেক্সাস, জাগুয়ার, হ্যামার, প্রাডো ও হ্যারিয়ার। এসব গাড়ির মালিকরা আয়কর বিভাগে নিবন্ধিত করদাতা নন। অনিবন্ধিত ও জাল টিআইএনধারী গাড়ির মালিকদের আয়কর নথি না থাকায় বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে।

কার্যকর হয়নি একাধিক গাড়ির অগ্রিম আয়কর আদায়

শতকোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া

সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতেই এমন পরিস্থিতি * বিআরটিএ যে অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান, এটি তার আরেকটি দৃষ্টান্ত -ড. ইফতেখারুজ্জামান
 সাদ্দাম হোসেন ইমরান 
২১ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৫ বছরে বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ) সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে সরকারের প্রায় শতকোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া হয়েছে।

২০১৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি (মোটর কার, জিপ ও মাইক্রোবাস) রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গাড়ির জন্য নিয়মিত করের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করে। কিন্তু বিআরটিএ এখনো তা আদায় করতে পারেনি। সবেমাত্র সিস্টেম আপডেটের কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি।

গত ৬ ডিসেম্বর পরিচালক লোকমান হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে বিআরটিএ ভবনে ইনোভেশন টিমের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দ্বিতীয় গাড়ির ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত কর আদায়ের ব্যাপারে আলোচনা হয়। সভায় সহকারী প্রোগ্রামার বলেন, একই ব্যক্তির নামে একাধিক গাড়ি থাকলে নিয়মিত করের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে।

এজন্য গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এছাড়া গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার সময় মোটরযান মালিকের এনআইডি এন্ট্রি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

ইনোভেশন টিমের সদস্য এএইচএম আনোয়ার পারভেজ বলেন, বর্তমানে মোটরযান নিবন্ধনের সময় মালিকের এনআইডি গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়। এ ছাড়াও কিছু গাড়ির মালিকের এনআইডি কার্ড নেই। কিন্তু যেসব গাড়ির (মোটর কার, জিপ ও মাইক্রোবাস) ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর প্রযোজ্য, সেসব ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক এবং এই টিআইএনের বিপরীতে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়। কাজেই একই টিআইএনের বিপরীতে একাধিক গাড়ি থাকলে সেক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৫০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর গ্রহণ করা যেতে পারে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সভার সভাপতি লোকমান হোসেন মোল্লা বলেন, অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে এনআইডি ও টিআইএন উভয়ই চেক করতে হবে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় গাড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ আয়কর গ্রহণ করা যেতে পারে।

ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এনবিআরের প্রজ্ঞাপন একক এনআইডি বা টিআইএনের বিপরীতে একাধিক গাড়ি থাকলে দ্বিতীয় গাড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ আয়কর গ্রহণ করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিআরটিএ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি সিএনএস লিমিটেডকে।

সূত্র জানায়, বিআরটিএ’র কারিগরি সক্ষমতা না থাকায় এতদিন অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর আদায় করা সম্ভব হয়নি। এখন কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিআরটিএ’র দায়িত্বপ্রাপ্ত সফটওয়্যার কোম্পানি সিএনএসকে এ ব্যাপারে সিস্টেম আপডেট করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, বিআরটিএ’র সফটওয়্যারটি অনেক আগের বিধায় পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি আছে। এটি আপডেটের কাজ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কারও একাধিক গাড়ি থাকলে তা স্বীকার বা ঘোষণা না দিলে অতিরিক্ত আয়কর করা সম্ভব হতো না। এখন এনবিআরের সার্ভারের সঙ্গে বিআরটিএ’র সফটওয়্যার ইন্টিগ্রেশন করা হয়েছে। বিআরটিএ’র টিম এনবিআরের সঙ্গে কাজ করছে। ভবিষ্যতে টিআইএন যাচাইয়ের পাশাপাশি কারও একাধিক গাড়ি থাকলে তা সিস্টেমে দেখা যাবে।

বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, জিপ, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার মিলিয়ে সারা দেশে ব্যক্তিগত যানবাহন আছে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩০৫টি। এর মধ্যে জিপ আছে ৬৪ হাজার ৯৩৬টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ৩ হাজার ৪২৮টি এবং প্রাইভেট কার ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৪১টি। এর বাইরে ট্যাক্সি ক্যাব হিসাবে নিবন্ধন আছে ৩৬ হাজার ১০৭টি। আর বিআরটিএ’র রেজিস্ট্রেশন নেওয়া সব ধরনের গাড়ির সংখ্যা ৪৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৮টি।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্যক্তিগত ৫ লাখ ৩৪ হাজার গাড়ির মধ্যে কমপক্ষে ৫ শতাংশ গাড়ির মালিকের একাধিক গাড়ি রয়েছে। সেই হিসাবে, প্রতিটি গাড়ি ১৫ শ সিসির ধরা হলে গাড়িপ্রতি সরকার সাড়ে ৭ হাজার টাকা কম রাজস্ব পেয়েছে। অর্থাৎ গত ৫ বছরে প্রায় শতকোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।

এনবিআরের আয়কর নীতির সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে কর আদায়ে বিআরটিএ ও এনবিআর যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে। আগে অনেকে ভুয়া টিআইএনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন নিয়েছেন। এখন বিআরটিএ’র সঙ্গে টিআইএন ডেটাবেজ শেয়ারিং করা হয়েছে। ফলে ভুয়া টিআইএন গাড়ি নিবন্ধন করা যাবে না। তাছাড়া অনেকের একাধিক গাড়ি থাকলেও রিটার্নে তা উল্লেখ করেনি। সেগুলোও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কেস পাওয়া গেলে ওই করদাতার ট্যাক্স ফাইল পুনঃউন্মোচন করে অডিট করা হবে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৭ মে এনবিআরের আয়কর বিভাগ একই মালিনাধীন একাধিক গাড়ি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গাড়ির অগ্রিম কর নিয়মিত আয়করের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ ধার্য করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

পরে এটি আয়কর অধ্যাদেশে যুক্ত করা হয়। তখন ১৫ শ সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির অগ্রিম কর ছিল ১৫ হাজার টাকা। ১৫ শ থেকে ২ হাজার সিসি পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকা, ২০০১ থেকে ২৫০০ সিসি পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা, ২৫০১ থেকে ৩ হাজার সিসি পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা, ৩০০১ থেকে সাড়ে ৩ হাজার সিসির গাড়ির ১ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৩ হাজার সিসি বেশি গাড়ির অগ্রিম কর ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিল।

চলতি বাজেটে এই করহার বাড়ানো হয়েছে। ১৫ শ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির অগ্রিম আয়কর করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। ২ হাজার সিসি পর্যন্ত ৫০ হাজার, ২৫০০ সিসি পর্যন্ত ৭৫ হাজার, ৩ হাজার সিসি পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার, সাড়ে ৩ হাজার সিসির গাড়ির ১ লাখ ৫০ হাজার এবং সাড়ে ৩ হাজার সিসি বেশি গাড়ির অগ্রিম কর নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ টাকা। এছাড়া মাইক্রোবাসের অগ্রিম কর ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

অবশ্য সরকারি গাড়ি, প্রকল্পের গাড়ি, বিদেশি কূটনীতিক, জাতিসংঘ এবং এর অঙ্গসংগঠনের গাড়ি, বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার গাড়ি, এমপিও সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাড়ি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের গাড়ির ক্ষেত্রে এ আইন শিথিল করা আছে।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিআরটিএ যে অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান, এটি তার আরেকটি দৃষ্টান্ত। এনবিআর ২০১৫ সালে আইন করে দেওয়ার পরও কেন বিআরটিএ ট্যাক্স আদায় করতে পারল না। এতে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। এর মধ্যে অনিয়ম থাকতে পারে। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অদক্ষতা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান।

তিনি আরও বলেন, বিআরটিএ’র মনিটরিং এজেন্সি হিসাবে সড়ক ও পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের উচিত এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা। কী কারণে বিআরটিএ’র উদাসীনতায় সরকারের এত রাজস্ব হারাল, এর পেছনে কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করে জড়িতদের শাস্তি দেওয়া উচিত।

এর আগে কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল বিআরটিএ থেকে ১ হাজার ৮২১টি বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল। এর মধ্যে ৮৯১টি গাড়ির টিআইএন যাচাই করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১২৬টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে জাল টিআইএন ব্যবহার করে।

গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে বিএমডব্লিউ, ভলভো, মার্সিডিজ বেঞ্জ, আউডি, লেক্সাস, জাগুয়ার, হ্যামার, প্রাডো ও হ্যারিয়ার। এসব গাড়ির মালিকরা আয়কর বিভাগে নিবন্ধিত করদাতা নন। অনিবন্ধিত ও জাল টিআইএনধারী গাড়ির মালিকদের আয়কর নথি না থাকায় বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে।