প্রথমদিনেই বাজিমাত জো বাইডেনের
jugantor
১৫ নির্বাহী আদেশে সই
প্রথমদিনেই বাজিমাত জো বাইডেনের
মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার * সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ স্থগিত * প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরা

  স্বপন কুমার কুণ্ডু  

২২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় এসেই বাজিমাত করেছেন। হোয়াইট হাউজে প্রথম কর্মদিবসে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১৫টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে তিনি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

বুধবার শপথ নেওয়ার কিছু সময় পর বাইডেন ওভাল অফিসে ছুটে যান। সেখানে সাংবাদিকদের সামনে তিনি সদ্য বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশকিছু নীতি পরিবর্তনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন।

এ ক্ষেত্রে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরার ওপর তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।

এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষেও তিনি জোরালো পদক্ষেপ নেন। খবর আল জাজিরা, সিএনএন, বিবিসি ও রয়টার্সের।

নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের পর জো বাইডেন বলেন, নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। আমি যেসব নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করছি তা কোভিড সংকটের গতি পরিবর্তনে সহায়ক হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এমন এক উপায়ে আমরা লড়াই করতে যাচ্ছি, যা এ পর্যন্ত করা হয়নি। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা তথা সমতা নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা জাতিগত সমতায় কাজ করব।

এ ছাড়া যেসব সম্প্রদায় অবহেলিত রয়েছে তাদের জন্যও কাজ করব। তিনি বলেন, এসবই হলো আমাদের সূচনামাত্র। এ সময় প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ওভাল অফিসে তার পাশে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও ছিলেন।

নতুন প্রশাসনের উদ্দেশে বাইডেন বলেন, আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমি অনেক ভুল করব। যখন ভুল করব, তখন তা আমি স্বীকার করব। ভুল সংশোধনে সাহায্য করার জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই।

নতুন প্রশাসনের কর্মীদের ভার্চুয়ালি শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আপনাদের কাছ থেকে সততা ও শালীনতা চাই। আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগণ আমাদের জন্য কাজ করে না, আমরা জনগণের জন্য কাজ করি।

জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি জানান, বেশকিছু নির্বাহী আদেশে দ্রুত সই করেছি। আমেরিকার মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছি।

নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেশকিছু নীতি, বিশেষ করে বিতর্কিত নীতি বাইডেন বদলে ফেলেছেন।

মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার : প্রথমদিনে স্বাক্ষর করা নির্বাহী আদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল মুসলিম নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া।

২০১৭ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর ট্রাম্প সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। পরে সেটি মুসলিম নিষেধাজ্ঞা হিসাবে পরিচিতি পায়।

বাইডেনের নির্বাহী আদেশের ফলে ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে আর কোনো বাধা রইল না।

নির্বাচনের আগে বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে প্রথমদিনই তিনি মুসলিম নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন। তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।

সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ স্থগিত : মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্ত দেওয়াল নির্মাণের বিষয়ে তহবিল সংগ্রহ নিয়ে ট্রাম্প যে জরুরি ঘোষণা দিয়েছিলেন তা বাতিল করেছেন বাইডেন।

অভিবাসীদের সমস্যা সমাধানেও একটি নির্দেশ দিয়েছেন। শপথ নেওয়ার পরপরই বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ভেঙে পড়া অভিবাসনব্যবস্থা সংস্কারে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানান।

অপ্রাপ্ত বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কয়েক লাখ অভিবাসীকে বিতাড়িত করা বন্ধ রাখতে নির্বাহী আদেশে তিনি সই করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চালু করা অভিবাসন কর্মসূচি বন্ধ করার নির্বাহী আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

এখন বাইডেনের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কর্মসূচিটি আবার চালু হলো। এতে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লাখ অভিবাসীর স্থায়ীভাবে বসবাস করার পথ উন্মুক্ত হলো।

মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণে তহবিলের জন্য ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ডিক্লারেশন বাতিল করেছেন বাইডেন। অর্থাৎ, সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণের কাজ স্থগিত করা হয়েছে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরা : প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আবার নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করার বিষয়ে নির্বাহী আদেশে বাইডেন স্বাক্ষর করেছেন।

দ্রুততার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলার আদেশ দিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে লড়াই করা হবে তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কাজ।

শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে চুক্তিটি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

বাইডেন বলেছেন, ১০০ দিনের মধ্যে জলবায়ু সম্মেলনের জন্য বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক দেশগুলোর নেতাদের তিনি আহ্বান জানাবেন।

প্যারিস চুক্তিতে পুনরায় ফেরার লক্ষ্যে ৩০ দিনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে বাইডেন প্রশাসন জাতিসংঘে চিঠি দিয়েছে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলা : বাইডেনের স্বাক্ষরিত ১৫টি নির্বাহী আদেশের তিনটিই করোনাভাইরাস মোকাবিলাবিষয়ক। সব ফেডারেল স্থাপনায় লোকজনকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে তিনি নির্বাহী আদেশও জারি করেছেন।

১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে চার লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এ পরিস্থিতিতে চরম স্বাস্থ্য সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রবাসী।

আগেই তিনি বলেছিলেন, করোনাভাইরাস মহামারির সংক্রমণ থেকে দেশবাসীকে বাঁচানোর উদ্যোগই হবে তার প্রথম কাজ।

করোনাভাইরাস মহামারিতে বিপদগ্রস্ত মার্কিনিদের সহায়তায় আলাদা অফিস স্থাপন করার পদক্ষেপ নিয়েছে বাইডেন প্রশাসন।

ডব্লিউএইচও থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া স্থগিত : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছেন বাইডেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। আরও সুসংগঠিত বিশ্বব্যবস্থার জন্য এটি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় বুধবার বিকাল ৪টার কিছু আগে প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেন বাইডেন।

হোয়াইট হাউজের কাছে ট্রেজারি বিভাগের অফিস ভবনের সামনে বাইডেন ও তার পরিবারের সদস্যদের মোটর শোভাযাত্রাসহকারে নিয়ে আসা হয়।

স্ত্রী জিল বাইডেনের হাত ধরে জো বাইডেন পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেন। এ সময় কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেও দূর থেকে লোকজনকে হাত নেড়ে তাদের অভিনন্দন জানাতে দেখা যায়।

বাইডেন ও জিলের পেছনে তখন হাঁটছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। হেঁটে যাওয়ার সময় বাইডেন এক মুহূর্তের জন্য থামেন। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমি বাড়িতেই ঢুকছি।’

প্রথমদিন জো বাইডেন তার পূর্বসূরি তিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বিল ক্লিনটন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আর্লিংটন জাতীয় সমাধিস্থানে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্যের ক্ষেত্রে অন্যতম এ স্থাপনায় দাঁড়িয়ে সামরিক বাহিনীর দেওয়া স্যালুট গ্রহণ করা ছাড়াও ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

ট্রাম্পের বার্তা পেয়েছেন বাইডেন : হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তা পাওয়ার কথা নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের। তবে ২০ জানুয়ারি বাইডেনের শপথ নেওয়া থেকে শুরু করে কোনো আনুষ্ঠানিকতায় ট্রাম্পের নাম উচ্চারিত হয়নি।

ট্রাম্প যেমন বাইডেনের নাম মুখে নেননি, বাইডেনও তার নাম মুখে আনেননি। ট্রাম্পের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রথা অনুযায়ী ওভাল অফিসের ড্রয়ারে উত্তরসূরি প্রেসিডেন্টের জন্য ট্রাম্প নোট লিখে গেছেন।

বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট সম্বোধন করে আদৌ কী লেখা হয়েছে, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল বিরাজ করছে।

সাংবাদিকদের বাইডেন বলেছেন, বিদায়ি প্রেসিডেন্ট একটি উদার চিঠি লিখে গেছেন। চিঠিটি ব্যক্তিগত ও ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার আগে তিনি এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে চান না।

হোয়াইট হাউসের প্রেস রুমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে : সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় হোয়াইট হাউজের প্রেস কনফারেন্স অনিয়মিত হয়ে ওঠে।

প্রেস সেক্রেটারির বদলে কখনো ট্রাম্প নিজেই পোডিয়ামে উপস্থিত হতেন। সংবাদমাধ্যমকে ‘ফেক মিডিয়া’ বলা ও নাম ধরে সাংবাদিকদের অপমান করা ট্রাম্পের কাছে নিয়মিত বিষয় ছিল।

কিন্তু বুধবারের সন্ধ্যা থেকে হোয়াইট হাউজের প্রেস অফিসের চেহারা বদলে গেছে। প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি বলেন, শনিবার ও রোববার ছাড়া অন্য দিনগুলোয় হোয়াইট হাউজের প্রেস কনফারেন্স হবে।

সংবাদ সম্মেলনে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে নানা বিষয় অবহিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজেও সক্রিয় থাকবেন।

প্রথমদিনের প্রেস কনফারেন্সে জেন সাকি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের নাগরিক প্রণোদনা আইন পাস করার জন্য ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দলের সহযোগিতা এবং সমঝোতা প্রত্যাশা করবেন।

যদি এমন সহযোগিতার কারণে প্রণোদনা আইন পাসে বিলম্ব হয়, তাহলে জরুরি আইন প্রণয়নের বিকল্প চিন্তাও মাথায় আছে বলে জেন সাকি জানিয়েছেন।

১৫ নির্বাহী আদেশে সই

প্রথমদিনেই বাজিমাত জো বাইডেনের

মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার * সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ স্থগিত * প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরা
 স্বপন কুমার কুণ্ডু 
২২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় এসেই বাজিমাত করেছেন। হোয়াইট হাউজে প্রথম কর্মদিবসে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১৫টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে তিনি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

বুধবার শপথ নেওয়ার কিছু সময় পর বাইডেন ওভাল অফিসে ছুটে যান। সেখানে সাংবাদিকদের সামনে তিনি সদ্য বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশকিছু নীতি পরিবর্তনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন।

এ ক্ষেত্রে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরার ওপর তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।

এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষেও তিনি জোরালো পদক্ষেপ নেন। খবর আল জাজিরা, সিএনএন, বিবিসি ও রয়টার্সের।

নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের পর জো বাইডেন বলেন, নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। আমি যেসব নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করছি তা কোভিড সংকটের গতি পরিবর্তনে সহায়ক হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এমন এক উপায়ে আমরা লড়াই করতে যাচ্ছি, যা এ পর্যন্ত করা হয়নি। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা তথা সমতা নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা জাতিগত সমতায় কাজ করব।

এ ছাড়া যেসব সম্প্রদায় অবহেলিত রয়েছে তাদের জন্যও কাজ করব। তিনি বলেন, এসবই হলো আমাদের সূচনামাত্র। এ সময় প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ওভাল অফিসে তার পাশে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও ছিলেন।

নতুন প্রশাসনের উদ্দেশে বাইডেন বলেন, আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমি অনেক ভুল করব। যখন ভুল করব, তখন তা আমি স্বীকার করব। ভুল সংশোধনে সাহায্য করার জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই।

নতুন প্রশাসনের কর্মীদের ভার্চুয়ালি শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আপনাদের কাছ থেকে সততা ও শালীনতা চাই। আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগণ আমাদের জন্য কাজ করে না, আমরা জনগণের জন্য কাজ করি।

জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি জানান, বেশকিছু নির্বাহী আদেশে দ্রুত সই করেছি। আমেরিকার মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছি।

নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেশকিছু নীতি, বিশেষ করে বিতর্কিত নীতি বাইডেন বদলে ফেলেছেন।

মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার : প্রথমদিনে স্বাক্ষর করা নির্বাহী আদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল মুসলিম নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া।

২০১৭ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর ট্রাম্প সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। পরে সেটি মুসলিম নিষেধাজ্ঞা হিসাবে পরিচিতি পায়।

বাইডেনের নির্বাহী আদেশের ফলে ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে আর কোনো বাধা রইল না।

নির্বাচনের আগে বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে প্রথমদিনই তিনি মুসলিম নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন। তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।

সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ স্থগিত : মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্ত দেওয়াল নির্মাণের বিষয়ে তহবিল সংগ্রহ নিয়ে ট্রাম্প যে জরুরি ঘোষণা দিয়েছিলেন তা বাতিল করেছেন বাইডেন।

অভিবাসীদের সমস্যা সমাধানেও একটি নির্দেশ দিয়েছেন। শপথ নেওয়ার পরপরই বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ভেঙে পড়া অভিবাসনব্যবস্থা সংস্কারে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানান।

অপ্রাপ্ত বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কয়েক লাখ অভিবাসীকে বিতাড়িত করা বন্ধ রাখতে নির্বাহী আদেশে তিনি সই করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চালু করা অভিবাসন কর্মসূচি বন্ধ করার নির্বাহী আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

এখন বাইডেনের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কর্মসূচিটি আবার চালু হলো। এতে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লাখ অভিবাসীর স্থায়ীভাবে বসবাস করার পথ উন্মুক্ত হলো।

মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণে তহবিলের জন্য ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ডিক্লারেশন বাতিল করেছেন বাইডেন। অর্থাৎ, সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণের কাজ স্থগিত করা হয়েছে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরা : প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আবার নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করার বিষয়ে নির্বাহী আদেশে বাইডেন স্বাক্ষর করেছেন।

দ্রুততার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলার আদেশ দিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে লড়াই করা হবে তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কাজ।

শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে চুক্তিটি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

বাইডেন বলেছেন, ১০০ দিনের মধ্যে জলবায়ু সম্মেলনের জন্য বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক দেশগুলোর নেতাদের তিনি আহ্বান জানাবেন।

প্যারিস চুক্তিতে পুনরায় ফেরার লক্ষ্যে ৩০ দিনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে বাইডেন প্রশাসন জাতিসংঘে চিঠি দিয়েছে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলা : বাইডেনের স্বাক্ষরিত ১৫টি নির্বাহী আদেশের তিনটিই করোনাভাইরাস মোকাবিলাবিষয়ক। সব ফেডারেল স্থাপনায় লোকজনকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে তিনি নির্বাহী আদেশও জারি করেছেন।

১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে চার লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এ পরিস্থিতিতে চরম স্বাস্থ্য সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রবাসী।

আগেই তিনি বলেছিলেন, করোনাভাইরাস মহামারির সংক্রমণ থেকে দেশবাসীকে বাঁচানোর উদ্যোগই হবে তার প্রথম কাজ।

করোনাভাইরাস মহামারিতে বিপদগ্রস্ত মার্কিনিদের সহায়তায় আলাদা অফিস স্থাপন করার পদক্ষেপ নিয়েছে বাইডেন প্রশাসন।

ডব্লিউএইচও থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া স্থগিত : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছেন বাইডেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। আরও সুসংগঠিত বিশ্বব্যবস্থার জন্য এটি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় বুধবার বিকাল ৪টার কিছু আগে প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেন বাইডেন।

হোয়াইট হাউজের কাছে ট্রেজারি বিভাগের অফিস ভবনের সামনে বাইডেন ও তার পরিবারের সদস্যদের মোটর শোভাযাত্রাসহকারে নিয়ে আসা হয়।

স্ত্রী জিল বাইডেনের হাত ধরে জো বাইডেন পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেন। এ সময় কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেও দূর থেকে লোকজনকে হাত নেড়ে তাদের অভিনন্দন জানাতে দেখা যায়।

বাইডেন ও জিলের পেছনে তখন হাঁটছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। হেঁটে যাওয়ার সময় বাইডেন এক মুহূর্তের জন্য থামেন। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমি বাড়িতেই ঢুকছি।’

প্রথমদিন জো বাইডেন তার পূর্বসূরি তিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বিল ক্লিনটন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আর্লিংটন জাতীয় সমাধিস্থানে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্যের ক্ষেত্রে অন্যতম এ স্থাপনায় দাঁড়িয়ে সামরিক বাহিনীর দেওয়া স্যালুট গ্রহণ করা ছাড়াও ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

ট্রাম্পের বার্তা পেয়েছেন বাইডেন : হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তা পাওয়ার কথা নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের। তবে ২০ জানুয়ারি বাইডেনের শপথ নেওয়া থেকে শুরু করে কোনো আনুষ্ঠানিকতায় ট্রাম্পের নাম উচ্চারিত হয়নি।

ট্রাম্প যেমন বাইডেনের নাম মুখে নেননি, বাইডেনও তার নাম মুখে আনেননি। ট্রাম্পের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রথা অনুযায়ী ওভাল অফিসের ড্রয়ারে উত্তরসূরি প্রেসিডেন্টের জন্য ট্রাম্প নোট লিখে গেছেন।

বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট সম্বোধন করে আদৌ কী লেখা হয়েছে, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল বিরাজ করছে।

সাংবাদিকদের বাইডেন বলেছেন, বিদায়ি প্রেসিডেন্ট একটি উদার চিঠি লিখে গেছেন। চিঠিটি ব্যক্তিগত ও ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার আগে তিনি এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে চান না।

হোয়াইট হাউসের প্রেস রুমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে : সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় হোয়াইট হাউজের প্রেস কনফারেন্স অনিয়মিত হয়ে ওঠে।

প্রেস সেক্রেটারির বদলে কখনো ট্রাম্প নিজেই পোডিয়ামে উপস্থিত হতেন। সংবাদমাধ্যমকে ‘ফেক মিডিয়া’ বলা ও নাম ধরে সাংবাদিকদের অপমান করা ট্রাম্পের কাছে নিয়মিত বিষয় ছিল।

কিন্তু বুধবারের সন্ধ্যা থেকে হোয়াইট হাউজের প্রেস অফিসের চেহারা বদলে গেছে। প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি বলেন, শনিবার ও রোববার ছাড়া অন্য দিনগুলোয় হোয়াইট হাউজের প্রেস কনফারেন্স হবে।

সংবাদ সম্মেলনে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে নানা বিষয় অবহিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজেও সক্রিয় থাকবেন।

প্রথমদিনের প্রেস কনফারেন্সে জেন সাকি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের নাগরিক প্রণোদনা আইন পাস করার জন্য ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দলের সহযোগিতা এবং সমঝোতা প্রত্যাশা করবেন।

যদি এমন সহযোগিতার কারণে প্রণোদনা আইন পাসে বিলম্ব হয়, তাহলে জরুরি আইন প্রণয়নের বিকল্প চিন্তাও মাথায় আছে বলে জেন সাকি জানিয়েছেন।