খুঁড়িয়ে চলছে দুই প্রকল্প
jugantor
ঢাকা-টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন
খুঁড়িয়ে চলছে দুই প্রকল্প
মেয়াদের সঙ্গে বাড়ছে জটিলতা ও অর্থ ব্যয় * সমাপ্ত প্রকল্পের সুফলও পাচ্ছেন না যাত্রীরা

  শিপন হাবীব  

২৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন

ঢাকা-টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ রেললাইনে প্রতি ৩ থেকে ৪ মিনিট পরপর ট্রেন পরিচালনার জন্য দুটি প্রকল্প (ঢাকা-টঙ্গী ৩য় ও ৪র্থ লেন এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ নির্মাণ) নেওয়া হয়েছিল প্রায় এক যুগ ও ৭ বছর আগে। ২-৩ বছরের মধ্যে প্রকল্প দুটি সম্পন্ন করার কথা থাকলেও আজও তা হয়নি।

বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে জটিলতা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে অর্থ ব্যয়ও। এ ছাড়া প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একই রুটে ইতোমধ্যে সমাপ্ত প্রকল্পের সুফলও পাচ্ছেন না যাত্রীরা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ওই রুটে শুধু লাইনের অভাবেই সিগন্যাল পেতে টঙ্গী এবং এর আশপাশে দু’অঞ্চল (পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল) থেকে আসা বিভিন্ন ট্রেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এ কারণে ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় এবং চতুর্থ লাইন নির্মাণ সমাপ্ত হলে রেলে আমূল পরিবর্তন আসত। বর্তমানে দুটি লাইনে (আপ অ্যান্ড ডাউন) প্রতিদিন ১৪৮টি ট্রেন চলাচল করে। যাত্রীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।

২০১১ সালের দিকে এ পথে নতুন করে চার লেন, সঙ্গে আরেকটি লুপ লাইন নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। শুরুতে এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮৪৮ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছে প্রায় এক হাজার ১০৭ কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৪১ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৩১.২২ শতাংশ।

ভারতীয় এলওসির অর্থায়নে নির্মিত এ প্রকল্পের বড় বাধা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ অবৈধ স্থাপনা। সেখানে অত্যাধুনিক মাল্টি মডার্ন হাব রেলওয়ে স্টেশন ভবন নির্মাণ হবে। আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে আন্ডারপাস হয়ে মিলবে এ স্টেশন। কিন্তু সম্প্রসারণে রেলের জায়গা না থাকায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বিমানবন্দর স্টেশনের দুই নাম্বার প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন পূর্ব পাশে যে পুকুরসহ জমি রয়েছে সেগুলোর মালিকানা সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। এ পুকুর ভরাট করে স্টেশন সম্প্রসারণ করতে হবে। বিষয়টি সমাধানে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রেলের বারবার বৈঠক ও চিঠি আদান-প্রদান হলেও এখনো এর সমাধান মেলেনি।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অফকানস-কপটল জেভি গত বছরের জানুয়ারি থেকে রাজধানীর বনানী-ক্যান্টনমেন্ট সেকশন এবং বিমানবন্দর-ক্যান্টনমেন্ট সেকশনে এমব্যাংকমেন্টের কাজ শুরু করলেও করোনা এবং যথাযথ জমি ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করা যায়নি। এদিকে টঙ্গী এলাকায় ৪২নং মেজর ও মাইনর সেতু এলাকায় নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বর্তমানে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স বিদ্যমান সেতু দুটির চেয়ে ২ মিটার বৃদ্ধিজনিত কারণে সেতুর পুনঃডিজাইন প্রয়োজন হওয়ায় এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। তবে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সেতু দুটির মোট ২৬১টি পাইলের মধ্যে ২২৪টি পাইল সম্পন্ন করা হয়েছে।

সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ যথাযথভাবে চালিয়ে রাখতে হলে ভূমির প্রয়োজন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) রেকর্ডভুক্ত ৫.৪৬৫০ একর ভূমি রেল চাচ্ছে। এ জমি দ্রুত সময়ের মধ্যে পেতে ইতোমধ্যে ৩ দফা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিওএইচএস এলাকায়ও জমি ব্যবহারে জটিলতা রয়েছে। মহাখালী ডিওএইচএস হতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন অভিমুখী তিনটি স্থানে তৃতীয় লেন নির্মাণের জন্য যে জমি প্রয়োজন তার ন্যূনতমও বর্তমানে নেই। এ এলাকায় প্রায় এক একর জমি প্রয়োজন-যা ব্যবহারে এখনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

এদিকে ঢাকা-বিমানবন্দর সেকশনে রেললাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ভবন-দোকানপাটসহ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। ড্রেন ভরাটসহ, রাস্তা, বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণেও জটিলতা রয়েছে।

খিলগাঁও থেকে মালিবাগ পর্যন্ত রেলপথের দক্ষিণ পাশে তৃতীয় এবং চতুর্থ লাইন স্থাপনে বিদ্যমান রাস্তা ভেঙে ফেলতে হবে। রাস্তা স্থানান্তর ছাড়া কাজ করা যাচ্ছে না। অপর দিকে টঙ্গী থেকে ধীরাশ্রম পর্যন্ত রেলপথে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন আরও একটি রাস্তা রয়েছে। এ রাস্তাটি অধিকাংশ রেলের জায়গায়-কিন্তু বর্তমানে রাস্তাটি স্থানান্তর না করায় ওই এলাকায়ও যথাযথ কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় ও চতুর্থ লেন সমাপ্ত হলে টঙ্গী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত কোনো লেভেলক্রসিংই খুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। ওই সময় এ পথে বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হবে। ৫-৭ মিনিটের মধ্যে গেট ফেলা-উঠানো সম্ভব হবে না। এ প্রকল্পের সঙ্গে এ পথে থাকা লেভেলক্রসিংগুলোয় আন্ডারপাস কিংবা উড়াল সেতু নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া জরুরি, তা না হলে এ প্রকল্পের সুফল মিলবে না।

গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের সঙ্গে আটকে আছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ প্রকল্পটিও। এ পথে বর্তমানে ২৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে এ পথে প্রায় ৪০ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। একই সঙ্গে ঢাকা-যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে এ প্রকল্পের জুড়ি নেই। গেণ্ডারিয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোরমুখী রেলপথটি নির্মিত হচ্ছে।

এ প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৪ সালের দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথটি সম্প্রসারণে প্রকল্প নেয় সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল ৩ বছরের মধ্যে। বর্তমানে এ প্রকল্পে মারাত্মক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ত্রুটি সমাধান না হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো উদ্দেশ্যই বাস্তবায়ন হবে না। ফলে এ প্রকল্পে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

একই সঙ্গে এ প্রকল্পের শুরুতেই যে ভুল পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তার মাসুল বাবদ দিতে হচ্ছে আরও ৪০৫ কোটি টাকা। শুরুতে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৬৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। বর্তমানে এটি বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭৭৮ কোটি ১৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।

জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল না। এখন জমি প্রয়োজন কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও সরে পড়েছে। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ও বিল্ডিংয়ের ক্ষতিপূরণ বাবদ গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। জমি অধিগ্রহণে নতুন নিয়মানুযায়ী বাজারমূল্যের তিনগুণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তা ছাড়া বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি এখন ডুয়েলগেজ করতে অতিরিক্ত ব্যয় ধরতে হচ্ছে।

২০১৪ সালের ১ জুলাই নেওয়া এ প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিল ২০১৭ সালের ৩০ জুন। এরপর আরও তিন দফায় মেয়াদ বেড়ে দাঁড়ায় ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। সম্প্রতি আরেক দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এ প্রকল্পের সর্বশেষ ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৬০ শতাংশ।

এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন যুগান্তরকে জানান, তিনি প্রকল্পের শুরু থেকে ছিলেন না। তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন কয়েক মাস হয়েছে। এখন জমি অধিগ্রহণসহ কিছু যৌক্তিক কারণে ব্যয় বাড়বে। আর বিদ্যমান রেললাইনটি মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজ করতে হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবে ২০২৩ পর্যন্ত সময় ধরা হয়েছে।

ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ লেন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৪১ শতাংশ। জমি অধিগ্রহণসহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ জরুরি। এজন্য কাজের অগ্রগতি কাক্সিক্ষতভাবে আসছে না। তবে আমরা সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।

ঢাকা-টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন

খুঁড়িয়ে চলছে দুই প্রকল্প

মেয়াদের সঙ্গে বাড়ছে জটিলতা ও অর্থ ব্যয় * সমাপ্ত প্রকল্পের সুফলও পাচ্ছেন না যাত্রীরা
 শিপন হাবীব 
২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা-টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন
প্রতীকী ছবি

ঢাকা-টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ রেললাইনে প্রতি ৩ থেকে ৪ মিনিট পরপর ট্রেন পরিচালনার জন্য দুটি প্রকল্প (ঢাকা-টঙ্গী ৩য় ও ৪র্থ লেন এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ নির্মাণ) নেওয়া হয়েছিল প্রায় এক যুগ ও ৭ বছর আগে। ২-৩ বছরের মধ্যে প্রকল্প দুটি সম্পন্ন করার কথা থাকলেও আজও তা হয়নি।

বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে জটিলতা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে অর্থ ব্যয়ও। এ ছাড়া প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একই রুটে ইতোমধ্যে সমাপ্ত প্রকল্পের সুফলও পাচ্ছেন না যাত্রীরা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ওই রুটে শুধু লাইনের অভাবেই সিগন্যাল পেতে টঙ্গী এবং এর আশপাশে দু’অঞ্চল (পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল) থেকে আসা বিভিন্ন ট্রেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এ কারণে ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় এবং চতুর্থ লাইন নির্মাণ সমাপ্ত হলে রেলে আমূল পরিবর্তন আসত। বর্তমানে দুটি লাইনে (আপ অ্যান্ড ডাউন) প্রতিদিন ১৪৮টি ট্রেন চলাচল করে। যাত্রীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।

২০১১ সালের দিকে এ পথে নতুন করে চার লেন, সঙ্গে আরেকটি লুপ লাইন নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। শুরুতে এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮৪৮ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছে প্রায় এক হাজার ১০৭ কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৪১ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৩১.২২ শতাংশ।

ভারতীয় এলওসির অর্থায়নে নির্মিত এ প্রকল্পের বড় বাধা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ অবৈধ স্থাপনা। সেখানে অত্যাধুনিক মাল্টি মডার্ন হাব রেলওয়ে স্টেশন ভবন নির্মাণ হবে। আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে আন্ডারপাস হয়ে মিলবে এ স্টেশন। কিন্তু সম্প্রসারণে রেলের জায়গা না থাকায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বিমানবন্দর স্টেশনের দুই নাম্বার প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন পূর্ব পাশে যে পুকুরসহ জমি রয়েছে সেগুলোর মালিকানা সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। এ পুকুর ভরাট করে স্টেশন সম্প্রসারণ করতে হবে। বিষয়টি সমাধানে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রেলের বারবার বৈঠক ও চিঠি আদান-প্রদান হলেও এখনো এর সমাধান মেলেনি।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অফকানস-কপটল জেভি গত বছরের জানুয়ারি থেকে রাজধানীর বনানী-ক্যান্টনমেন্ট সেকশন এবং বিমানবন্দর-ক্যান্টনমেন্ট সেকশনে এমব্যাংকমেন্টের কাজ শুরু করলেও করোনা এবং যথাযথ জমি ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করা যায়নি। এদিকে টঙ্গী এলাকায় ৪২নং মেজর ও মাইনর সেতু এলাকায় নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বর্তমানে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স বিদ্যমান সেতু দুটির চেয়ে ২ মিটার বৃদ্ধিজনিত কারণে সেতুর পুনঃডিজাইন প্রয়োজন হওয়ায় এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। তবে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সেতু দুটির মোট ২৬১টি পাইলের মধ্যে ২২৪টি পাইল সম্পন্ন করা হয়েছে।

সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ যথাযথভাবে চালিয়ে রাখতে হলে ভূমির প্রয়োজন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) রেকর্ডভুক্ত ৫.৪৬৫০ একর ভূমি রেল চাচ্ছে। এ জমি দ্রুত সময়ের মধ্যে পেতে ইতোমধ্যে ৩ দফা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিওএইচএস এলাকায়ও জমি ব্যবহারে জটিলতা রয়েছে। মহাখালী ডিওএইচএস হতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন অভিমুখী তিনটি স্থানে তৃতীয় লেন নির্মাণের জন্য যে জমি প্রয়োজন তার ন্যূনতমও বর্তমানে নেই। এ এলাকায় প্রায় এক একর জমি প্রয়োজন-যা ব্যবহারে এখনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

এদিকে ঢাকা-বিমানবন্দর সেকশনে রেললাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ভবন-দোকানপাটসহ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। ড্রেন ভরাটসহ, রাস্তা, বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণেও জটিলতা রয়েছে।

খিলগাঁও থেকে মালিবাগ পর্যন্ত রেলপথের দক্ষিণ পাশে তৃতীয় এবং চতুর্থ লাইন স্থাপনে বিদ্যমান রাস্তা ভেঙে ফেলতে হবে। রাস্তা স্থানান্তর ছাড়া কাজ করা যাচ্ছে না। অপর দিকে টঙ্গী থেকে ধীরাশ্রম পর্যন্ত রেলপথে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন আরও একটি রাস্তা রয়েছে। এ রাস্তাটি অধিকাংশ রেলের জায়গায়-কিন্তু বর্তমানে রাস্তাটি স্থানান্তর না করায় ওই এলাকায়ও যথাযথ কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় ও চতুর্থ লেন সমাপ্ত হলে টঙ্গী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত কোনো লেভেলক্রসিংই খুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। ওই সময় এ পথে বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হবে। ৫-৭ মিনিটের মধ্যে গেট ফেলা-উঠানো সম্ভব হবে না। এ প্রকল্পের সঙ্গে এ পথে থাকা লেভেলক্রসিংগুলোয় আন্ডারপাস কিংবা উড়াল সেতু নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া জরুরি, তা না হলে এ প্রকল্পের সুফল মিলবে না।

গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের সঙ্গে আটকে আছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ প্রকল্পটিও। এ পথে বর্তমানে ২৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে এ পথে প্রায় ৪০ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। একই সঙ্গে ঢাকা-যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে এ প্রকল্পের জুড়ি নেই। গেণ্ডারিয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোরমুখী রেলপথটি নির্মিত হচ্ছে।

এ প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৪ সালের দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথটি সম্প্রসারণে প্রকল্প নেয় সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল ৩ বছরের মধ্যে। বর্তমানে এ প্রকল্পে মারাত্মক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ত্রুটি সমাধান না হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো উদ্দেশ্যই বাস্তবায়ন হবে না। ফলে এ প্রকল্পে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

একই সঙ্গে এ প্রকল্পের শুরুতেই যে ভুল পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তার মাসুল বাবদ দিতে হচ্ছে আরও ৪০৫ কোটি টাকা। শুরুতে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৬৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। বর্তমানে এটি বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭৭৮ কোটি ১৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।

জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল না। এখন জমি প্রয়োজন কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও সরে পড়েছে। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ও বিল্ডিংয়ের ক্ষতিপূরণ বাবদ গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। জমি অধিগ্রহণে নতুন নিয়মানুযায়ী বাজারমূল্যের তিনগুণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তা ছাড়া বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি এখন ডুয়েলগেজ করতে অতিরিক্ত ব্যয় ধরতে হচ্ছে।

২০১৪ সালের ১ জুলাই নেওয়া এ প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিল ২০১৭ সালের ৩০ জুন। এরপর আরও তিন দফায় মেয়াদ বেড়ে দাঁড়ায় ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। সম্প্রতি আরেক দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এ প্রকল্পের সর্বশেষ ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৬০ শতাংশ।

এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন যুগান্তরকে জানান, তিনি প্রকল্পের শুরু থেকে ছিলেন না। তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন কয়েক মাস হয়েছে। এখন জমি অধিগ্রহণসহ কিছু যৌক্তিক কারণে ব্যয় বাড়বে। আর বিদ্যমান রেললাইনটি মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজ করতে হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবে ২০২৩ পর্যন্ত সময় ধরা হয়েছে।

ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ লেন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৪১ শতাংশ। জমি অধিগ্রহণসহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ জরুরি। এজন্য কাজের অগ্রগতি কাক্সিক্ষতভাবে আসছে না। তবে আমরা সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন