বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার প্রতি ঢাকার আস্থা
jugantor
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার প্রতি ঢাকার আস্থা

  মাসুদ করিম  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপটে পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে বিভক্তির কারণে সৃষ্টি হয় এ অচলাবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে হলেও চীন সেনা অভ্যুত্থানকে মিয়ানমারের পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে অভিহিত করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে বিভক্তির বিষয় স্পষ্ট হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্জারার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।

চীনকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে মনে করা হয়। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার প্রতি ঢাকার আস্থা রয়েছে। মিয়ানমারের সেনা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টির চেষ্টাও ঢাকার তরফে করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের চলমান কার্যক্রম পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে ঢাকায় মিয়ানমার ও চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মিয়ানমারের বিষয়ে চীনের নীতি সম্পর্কে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। তবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা ও কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে চীনের সহায়তা নিতে আমরা আগ্রহী। কারণ এ বিষয়ে চীনের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আমরা সবার কাছে গিয়েছি। শুধু লিপ সার্ভিস ছাড়া কেউ তেমন সহায়তা করতে পারেনি। চীন কিছুটা অগ্রসর হয়েছে।’

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট ভোলকান বোজকির এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের ফলে রোহিঙ্গাদের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে তিনি রাখাইন রাজ্যসহ দেশটির অন্যান্য স্থানে যাতে বাধাহীনভাবে মানবিক সাহায্য পৌঁছতে পারে তার ব্যবস্থা করার জন্য সামরিক জান্তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী এবং দশটি অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভেটো ক্ষমতা আছে। পরিষদের সভাপতির পদ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চক্রাকারে হয়ে থাকে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটেন সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত বারবারা উডওয়ার্ডের সভাপতিত্বে আজ (বৃহস্পতিবার) নিরাপত্তা পরিষদের সভা হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করায় নির্ধারিত দিনের দুই দিন আগেই মঙ্গলবার জরুরি সভা করা হয়। সদস্য দেশগুলোর জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে সদস্য দেশগুলো নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় অগ্রগতি কিছুই হয়নি।

বরং অচলাবস্থার কারণে রুদ্ধদ্বার ভার্চুয়াল বৈঠকটি দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। বৈঠকে জাতিসংঘে মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্জারারের বক্তব্য শোনা হয়। তিনি মিয়ানমারের পরিস্থিতির বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমারে সামরিক সরকারের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। দেশটির ইতিহাসের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় থাকার ইতিহাস আছে। এর আগে ১৯৭৮ সালে এবং ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে এসেছিল। মিয়ানমারে তদানীন্তন সামরিক সরকারই তাদের ফিরিয়ে নিয়েছে। এবারও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জন্য রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া একটা বিরাট সুযোগ। তারা তাদের সমালোচকদের দেখাতে পারবে যে, রোহিঙ্গাদের তারা ফেরত নিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা চলমান থাকবে।’

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাগত জানায় না। আমরা উপদেশ দিয়েছি। শাসনতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছি। আমরা মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাই। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে চাই।’

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, চীনের আপত্তির কারণে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর ন্যূনতম ঐক্য সৃষ্টির উদ্যোগ নেয় নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি ব্রিটেন। মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান সংবলিত একটি বিবৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিবৃতিতে অং সান সু চিসহ আটক নেতাদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে চীন ও রাশিয়ার এখনো সম্মতি পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী এই দুই সদস্য তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে আরও কিছু সময় চেয়েছে। যদিও ব্রিটেন বিবৃতিটির খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত করেছে। বৈঠক শেষে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত বারবারা রিপোর্টারদের বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের এক সুরে কথা বলার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে।

এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণে ব্যর্থ হলেও জি-৭ তথা কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ এক যুক্ত বিবৃতিতে সামরিক অভ্যুত্থানের নিন্দা করেছে। তারা জরুরি অবস্থা বাতিল করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে।

মিয়ানমারে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়েছে ১৯৪৯ সালে। তারপর থেকে বেশির ভাগ সময় দেশটি চলেছে সামরিক শাসনের অধীনে। ১৯৬২ সাল থেকে টানা ৫০ বছর সামরিক জান্তা দেশটি শাসন করেছে। গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি প্রায় ১৫ বছর কারাগারে ছিলেন।

২০১৫ সালের নির্বাচনে তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় গেলেও মিয়ানমারের ক্ষমতা অনেকখানি সামরিক বাহিনীর কাছে থেকে যায়। সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি রয়েছে।

বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্ত ও অভিবাসন মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে থাকে। পার্লামেন্টে এক-তৃতীয়াংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। সু চি ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে বেসামরিক সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে বিরোধ চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। সেনাবাহিনী বলেছে, সাড়ে তিন কোটি ভোটারের মধ্যে এক কোটির বেশি ভোটার ত্রুটিপূর্ণ। এই অভিযোগ তুলে ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে সেনাবাহিনী। তারা এক বছর ক্ষমতায় থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চলতি বছরের মাঝামাঝি সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। আন্তর্জাতিক আদালতে যদিও সু চি তার দেশের চিফ এজেন্ট হিসাবে সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু সেনাপ্রধান ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার পর তার অপকর্মের দায়িত্ব বেসামরিক সরকার নাও নিতে পারে।

বিশেষ করে সু চি এবং জেনারেল মিনের মধ্যে বিরোধের কারণে নিজের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন সেনাপ্রধান। যদিও সেনাবাহিনী এক বছর ক্ষমতায় থাকবে বলে উল্লেখ করছে। কিন্তু মিয়ানমারের ইতিহাসে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিয়ে কখনো এক বছর থাকেনি। তাই সেনাবাহিনী এক বছর পর ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস কেউ বিশ্বাস করছে না।

অনেকে মনে করেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার আগে চীনকে তার আস্থার মধ্যে নিয়েছে। কেননা কিছুদিন আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরকালে সু চি এবং জেনারেল মিন উভয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের অ্যাকশনে আপত্তি জানিয়ে চীন সেনা অভ্যুত্থানের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এটা ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে যে, মিয়ানমারের সেনা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে চীন। ভারত-জাপান যদিও সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের বিরোধিতা করেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে সরকারের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে সেনা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ। তবে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়েছে।

আগামী দিনে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত বৈঠকগুলো সময়মতো হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বুধবার সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার প্রতি ঢাকার আস্থা

 মাসুদ করিম 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপটে পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে বিভক্তির কারণে সৃষ্টি হয় এ অচলাবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে হলেও চীন সেনা অভ্যুত্থানকে মিয়ানমারের পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে অভিহিত করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে বিভক্তির বিষয় স্পষ্ট হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্জারার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।

চীনকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে মনে করা হয়। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার প্রতি ঢাকার আস্থা রয়েছে। মিয়ানমারের সেনা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টির চেষ্টাও ঢাকার তরফে করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের চলমান কার্যক্রম পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে ঢাকায় মিয়ানমার ও চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মিয়ানমারের বিষয়ে চীনের নীতি সম্পর্কে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। তবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা ও কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে চীনের সহায়তা নিতে আমরা আগ্রহী। কারণ এ বিষয়ে চীনের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আমরা সবার কাছে গিয়েছি। শুধু লিপ সার্ভিস ছাড়া কেউ তেমন সহায়তা করতে পারেনি। চীন কিছুটা অগ্রসর হয়েছে।’

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট ভোলকান বোজকির এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের ফলে রোহিঙ্গাদের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে তিনি রাখাইন রাজ্যসহ দেশটির অন্যান্য স্থানে যাতে বাধাহীনভাবে মানবিক সাহায্য পৌঁছতে পারে তার ব্যবস্থা করার জন্য সামরিক জান্তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী এবং দশটি অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভেটো ক্ষমতা আছে। পরিষদের সভাপতির পদ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চক্রাকারে হয়ে থাকে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটেন সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত বারবারা উডওয়ার্ডের সভাপতিত্বে আজ (বৃহস্পতিবার) নিরাপত্তা পরিষদের সভা হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করায় নির্ধারিত দিনের দুই দিন আগেই মঙ্গলবার জরুরি সভা করা হয়। সদস্য দেশগুলোর জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে সদস্য দেশগুলো নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় অগ্রগতি কিছুই হয়নি।

বরং অচলাবস্থার কারণে রুদ্ধদ্বার ভার্চুয়াল বৈঠকটি দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। বৈঠকে জাতিসংঘে মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্জারারের বক্তব্য শোনা হয়। তিনি মিয়ানমারের পরিস্থিতির বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমারে সামরিক সরকারের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। দেশটির ইতিহাসের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় থাকার ইতিহাস আছে। এর আগে ১৯৭৮ সালে এবং ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে এসেছিল। মিয়ানমারে তদানীন্তন সামরিক সরকারই তাদের ফিরিয়ে নিয়েছে। এবারও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জন্য রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া একটা বিরাট সুযোগ। তারা তাদের সমালোচকদের দেখাতে পারবে যে, রোহিঙ্গাদের তারা ফেরত নিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা চলমান থাকবে।’

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাগত জানায় না। আমরা উপদেশ দিয়েছি। শাসনতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছি। আমরা মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাই। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে চাই।’

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, চীনের আপত্তির কারণে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর ন্যূনতম ঐক্য সৃষ্টির উদ্যোগ নেয় নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি ব্রিটেন। মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান সংবলিত একটি বিবৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিবৃতিতে অং সান সু চিসহ আটক নেতাদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে চীন ও রাশিয়ার এখনো সম্মতি পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী এই দুই সদস্য তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে আরও কিছু সময় চেয়েছে। যদিও ব্রিটেন বিবৃতিটির খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত করেছে। বৈঠক শেষে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত বারবারা রিপোর্টারদের বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের এক সুরে কথা বলার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে।

এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণে ব্যর্থ হলেও জি-৭ তথা কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ এক যুক্ত বিবৃতিতে সামরিক অভ্যুত্থানের নিন্দা করেছে। তারা জরুরি অবস্থা বাতিল করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে।

মিয়ানমারে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়েছে ১৯৪৯ সালে। তারপর থেকে বেশির ভাগ সময় দেশটি চলেছে সামরিক শাসনের অধীনে। ১৯৬২ সাল থেকে টানা ৫০ বছর সামরিক জান্তা দেশটি শাসন করেছে। গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি প্রায় ১৫ বছর কারাগারে ছিলেন।

২০১৫ সালের নির্বাচনে তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় গেলেও মিয়ানমারের ক্ষমতা অনেকখানি সামরিক বাহিনীর কাছে থেকে যায়। সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি রয়েছে।

বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্ত ও অভিবাসন মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে থাকে। পার্লামেন্টে এক-তৃতীয়াংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। সু চি ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে বেসামরিক সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে বিরোধ চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। সেনাবাহিনী বলেছে, সাড়ে তিন কোটি ভোটারের মধ্যে এক কোটির বেশি ভোটার ত্রুটিপূর্ণ। এই অভিযোগ তুলে ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে সেনাবাহিনী। তারা এক বছর ক্ষমতায় থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চলতি বছরের মাঝামাঝি সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। আন্তর্জাতিক আদালতে যদিও সু চি তার দেশের চিফ এজেন্ট হিসাবে সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু সেনাপ্রধান ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার পর তার অপকর্মের দায়িত্ব বেসামরিক সরকার নাও নিতে পারে।

বিশেষ করে সু চি এবং জেনারেল মিনের মধ্যে বিরোধের কারণে নিজের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন সেনাপ্রধান। যদিও সেনাবাহিনী এক বছর ক্ষমতায় থাকবে বলে উল্লেখ করছে। কিন্তু মিয়ানমারের ইতিহাসে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিয়ে কখনো এক বছর থাকেনি। তাই সেনাবাহিনী এক বছর পর ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস কেউ বিশ্বাস করছে না।

অনেকে মনে করেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার আগে চীনকে তার আস্থার মধ্যে নিয়েছে। কেননা কিছুদিন আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরকালে সু চি এবং জেনারেল মিন উভয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের অ্যাকশনে আপত্তি জানিয়ে চীন সেনা অভ্যুত্থানের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এটা ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে যে, মিয়ানমারের সেনা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে চীন। ভারত-জাপান যদিও সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের বিরোধিতা করেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে সরকারের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে সেনা সরকারের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ। তবে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়েছে।

আগামী দিনে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত বৈঠকগুলো সময়মতো হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বুধবার সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা