দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ইব্রাহিম খালেদ
jugantor
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ইব্রাহিম খালেদ

  ড. আতিউর রহমান  

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আর্থিক খাতের অসঙ্গতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সদাসোচ্চার বরেণ্য নাগরিক হিসাবে দেশবাসীর কাছে সম্মানিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বুধবার ভোরে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। আমার কাছে তিনি ছিলেন আ ত্মার আ ত্মীয়, প্রিয় বড় ভাই। তাকে ধরে রাখা যাবে না সেটা আগে থেকে অনুমান করলেও, এভাবে না ফেরার দেশে তার চলে যাওয়াটা মানতে পারছি না। সত্যিই তাকে হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে ওঠাটা দুরূহ হবে আমাদের জন্য।

বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখে বড় হয়েছেন আমাদের খালেদ ভাই। তাই বঙ্গবন্ধুর সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম আর গণসংশ্লিষ্টতা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে সব সময়। এজন্যই যখন যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই তার দুর্নীতির প্রশ্নে আপসহীনতার ছাপ রেখেছেন, বাকিদের জন্য রেখে গিয়েছেন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। আর বঙ্গবন্ধুকে ভোলেননি কখনোই। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে যখন কাজ করছিলেন, তখন বাংলাদেশে এক অন্ধকার সময় চলছিল। অনেকে সে সময় বঙ্গবন্ধুর নাম নিতেও ভয় পেতেন। ওই সময়ও মাথার ওপর বঙ্গবন্ধুর ছবি টানিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন আমাদের খালেদ ভাই।

ঠিক এক বছর আগে এই ফেব্র“য়ারি মাসেই বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও কর্মের নান্দনিকতা নিয়ে তার একটি একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। তার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে তথ্য পেয়েছি তা আমার গবেষণাকে নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ করবে। বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছেন বলেই খালেদ ভাই নিজেও সব সময় দেশের স্বার্থে কাজ করেছেন নিঃশঙ্ক চিত্তে। সব সময় ভেবেছেন প্রান্তিক মানুষের কথা।

চরের মানুষের জীবন-জীবিকা উন্নয়নে কাজ করছে এমন অসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ মঞ্চ ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের সভাপতি হিসাবে তিনি কাজ করেছেন এক দশকেরও বেশি সময়। চরের পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

খালেদ ভাই শিশু-কিশোরদের জন্যও অনেক কাজ করেছেন। রোকনুজ্জামানের (দাদাভাই) মৃত্যুর পর কচি-কাঁচার মেলা পরিচালনার দায়িত্ব একনিষ্ঠতার সঙ্গে পালন করেছেন আজীবন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মননশীলতার চর্চা ও তাদের সার্বিক বিকাশে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

খালেদ ভাইয়ের সঙ্গে যারাই কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে সবাই এ কথা স্বীকার করবেন যে, নিজের নৈতিক শক্তি তিনি অন্যদের মাঝে সঞ্চারিত করতে সদা সচেষ্ট থেকেছেন। আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে আরও বেশিদিন তিনি এ দেশের আর্থিক খাতে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাননি।

আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে বহুবার আমরা দুজন একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে গিয়েছি সহজলভ্য কৃষিঋণ বিতরণের কর্মসূচি নিয়ে। সে সময় এ দেশের কৃষি খাত ও প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে তার একাগ্রতা নতুন করে অনুভব করেছি।

গত এক বছরে আমরা বেশ কয়েকজন অনুসরণীয় প্রাজ্ঞজনকে হারিয়েছি। সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হলেন ইব্রাহিম খালেদ ভাই। হারানোর এই বেদনা সইবার শক্তি আমাদের নেই। তবুও শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাব খালেদ ভাইয়ের চিন্তা ও কাজগুলো থেকেই। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হবে তার দেখানো পথে নিঃশঙ্ক চিত্তে এগিয়ে যাওয়া।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ইব্রাহিম খালেদ

 ড. আতিউর রহমান 
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আর্থিক খাতের অসঙ্গতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সদাসোচ্চার বরেণ্য নাগরিক হিসাবে দেশবাসীর কাছে সম্মানিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বুধবার ভোরে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। আমার কাছে তিনি ছিলেন আ ত্মার আ ত্মীয়, প্রিয় বড় ভাই। তাকে ধরে রাখা যাবে না সেটা আগে থেকে অনুমান করলেও, এভাবে না ফেরার দেশে তার চলে যাওয়াটা মানতে পারছি না। সত্যিই তাকে হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে ওঠাটা দুরূহ হবে আমাদের জন্য।

বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখে বড় হয়েছেন আমাদের খালেদ ভাই। তাই বঙ্গবন্ধুর সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম আর গণসংশ্লিষ্টতা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে সব সময়। এজন্যই যখন যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই তার দুর্নীতির প্রশ্নে আপসহীনতার ছাপ রেখেছেন, বাকিদের জন্য রেখে গিয়েছেন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। আর বঙ্গবন্ধুকে ভোলেননি কখনোই। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে যখন কাজ করছিলেন, তখন বাংলাদেশে এক অন্ধকার সময় চলছিল। অনেকে সে সময় বঙ্গবন্ধুর নাম নিতেও ভয় পেতেন। ওই সময়ও মাথার ওপর বঙ্গবন্ধুর ছবি টানিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন আমাদের খালেদ ভাই।

ঠিক এক বছর আগে এই ফেব্র“য়ারি মাসেই বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও কর্মের নান্দনিকতা নিয়ে তার একটি একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। তার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে তথ্য পেয়েছি তা আমার গবেষণাকে নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ করবে। বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছেন বলেই খালেদ ভাই নিজেও সব সময় দেশের স্বার্থে কাজ করেছেন নিঃশঙ্ক চিত্তে। সব সময় ভেবেছেন প্রান্তিক মানুষের কথা।

চরের মানুষের জীবন-জীবিকা উন্নয়নে কাজ করছে এমন অসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ মঞ্চ ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের সভাপতি হিসাবে তিনি কাজ করেছেন এক দশকেরও বেশি সময়। চরের পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

খালেদ ভাই শিশু-কিশোরদের জন্যও অনেক কাজ করেছেন। রোকনুজ্জামানের (দাদাভাই) মৃত্যুর পর কচি-কাঁচার মেলা পরিচালনার দায়িত্ব একনিষ্ঠতার সঙ্গে পালন করেছেন আজীবন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মননশীলতার চর্চা ও তাদের সার্বিক বিকাশে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

খালেদ ভাইয়ের সঙ্গে যারাই কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে সবাই এ কথা স্বীকার করবেন যে, নিজের নৈতিক শক্তি তিনি অন্যদের মাঝে সঞ্চারিত করতে সদা সচেষ্ট থেকেছেন। আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে আরও বেশিদিন তিনি এ দেশের আর্থিক খাতে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাননি।

আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে বহুবার আমরা দুজন একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে গিয়েছি সহজলভ্য কৃষিঋণ বিতরণের কর্মসূচি নিয়ে। সে সময় এ দেশের কৃষি খাত ও প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে তার একাগ্রতা নতুন করে অনুভব করেছি।

গত এক বছরে আমরা বেশ কয়েকজন অনুসরণীয় প্রাজ্ঞজনকে হারিয়েছি। সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হলেন ইব্রাহিম খালেদ ভাই। হারানোর এই বেদনা সইবার শক্তি আমাদের নেই। তবুও শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাব খালেদ ভাইয়ের চিন্তা ও কাজগুলো থেকেই। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হবে তার দেখানো পথে নিঃশঙ্ক চিত্তে এগিয়ে যাওয়া।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন