শাহবাগে অবরোধ-বিক্ষোভ
jugantor
কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু
শাহবাগে অবরোধ-বিক্ষোভ
মশাল মিছিলে লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল * ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ * সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও

  ঢাবি প্রতিনিধি  

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাবন্দি অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রতিবাদে শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্র জোট। প্রায় দেড় ঘণ্টার অবরোধে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এখান থেকে সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বের করেন জোটের নেতাকর্মীরা। তবে এই মিছিল লাঠিপেটা ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন।

এর আগে বিকালে সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের উদ্যোগে শাহবাগে মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে ১৩ দেশের রাষ্ট্রদূত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি এ মৃত্যুর স্বচ্ছ এবং স্বতন্ত্র তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত-বিচার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার সবার মুক্তি ও আইনটি বাতিলের দাবিতে বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শাহবাগ ও পরীবাগ হয়ে ফের শাহবাগ মোরে এসে থেমে যায়। এরপরই রাস্তায় অবস্থান নিয়ে নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ছাত্রফ্রন্ট কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী জয় সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর তারা শাহবাগ মোড় ছেড়ে দেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা এ মৃত্যুকে ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’ হিসাবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি জানান।

জোটের নেতা ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন অভিযোগ করেন, গত বছর এপ্রিলে লেখনীর মাধ্যমে দুর্নীতি-লুটপাটের প্রতিবাদ করেছিলেন লেখক মুশতাক। তার অপরাধ ছিল-তিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে, অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তাই কারাগারে আটকে রেখে তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি ছয়বার জামিনের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আবেদন নাকচ করা হয়েছে। এটি নির্মম ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন বলেন, ‘লেখক মুশতাক ৯ মাস কারারুদ্ধ ছিলেন। মানুষের অধিকারকে অস্বীকার করার জায়গায় চলে গেছে বর্তমান সরকার।’

বিক্ষোভে আরও বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আরিফ মঈনুদ্দীন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের দপ্তর সম্পাদক রাজেন্দ্র চাকমা প্রমুখ।

মশাল মিছিলে পুলিশের লাঠিপেটা : সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে মশাল মিছিল বের করে প্রগতিশীল ছাত্র জোট। মিছিলটি শামসুন্নাহার হল হয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে হয়ে পাবলিক লাইব্রেরির সামনে পৌঁছালে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এ কারণে মিছিলকারীরা ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদের গেটের সামনে অবস্থান নেন এবং স্লোগান দিয়ে পুনরায় একত্রিত হয়ে শাহবাগ যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ফের লাঠিচার্জ এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সহ-সভাপতি ছায়েদুল হক নিশান বলেন, পুলিশের লাঠিপেটায় রাজেস্বর দাস গুপ্ত, এ্যানি চৌধুরী, নিতু ও সাদসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী জয় বলেন, ‘পুলিশ আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় নারীকর্মীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে।’

রমনার ডিসি সাজ্জাদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ লাঠিচার্জ করছে। তিনি আরও বলেন, এ সময় দু-একজনকে আটক করা হয়েছে। এদিকে এই হামলার প্রতিবাদে আজ দুপুর ১২টায় বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট।

গায়েবানা জানাজ : বিকাল ৪টায় ছাত্র অধিকার পরিষদের আয়োজনে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন-গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, রাষ্ট্রচিন্তার হাসনাত কাইয়ুম, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ, ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নূর, ছাত্র অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রাশেদ খানসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

জানাজার আগে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করলে হবে না, এ হত্যারও বিচার করতে হবে। এ হত্যায় যদি আপনি (শেখ হাসিনা) জড়িত থাকেন, আপনারও বিচার হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আপনি নিজেও বন্দি, তাই আপনি সত্যি কথা বলতে পারেন না। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে আটক হওয়া প্রত্যেকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেন। এই আইন বাতিল করুন। না হলে আপনাকেও একদিন এই আইনের মারপ্যাঁচে পড়তে হবে।’

জোনায়েদ সাকি বলেন, মুশতাক আহমেদকে বিনা বিচারে কারাগারে রাখা হয়েছিল। ছয়বার জামিনের আবেদন নাকচ করা হয়েছে। জেলে রেখেই এই সরকার তাকে হত্যা করেছে। ভোটারবিহীন সরকার থেকে আর কী আশা করা যায়? প্রধানমন্ত্রী আপনাকে পরিষ্কার করে বলতে চাই, বাংলাদেশে আজ যা অন্যায় হচ্ছে এর দায় আপনাকেই নিতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ যে দিন জেগে উঠবে, সেদিন কেউ পালানোর পথ পাবেন না। আপনাদের সবাইকে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘এটা কুখ্যাত আইন। আজকে শুধু ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকে দায়ী করলে হবে না। এই আইন যারা প্রণয়ন করছে তারাও দায়ী, যে রায় দিয়েছে সে ও আদালত দায়ী। এটার কারণে ভোগান্তি হচ্ছে। এই আইন বাতিল বা প্রত্যাহার আমি চাই না। আমি বলতে চাই, এই আইন যারা প্রণয়ন করেছে তাদের একদিন বিচার হবে।’ নূরুল হক নূর বলেন, ‘এই হত্যার দায় প্রধানমন্ত্রীকে নিতে হবে। আজ আমরা সবাই যদি আওয়াজ তুলতে না পারি, তাহলে আমাদের অবস্থাও লেখক মুশতাকের মতো হবে।’

সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কারণে দেশটা একটা উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। এটা একটা অসহনীয় দম বন্ধ করা আইন। যেভাবে হোক এ আইন ভাঙতে হবে।’

জানাজা শেষে ছাত্র অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আজ বেলা ১১টায় প্রেস ক্লাবে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

শহিদ মিনারে সমাবেশ : বিকালে ৫টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত এক সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার সমালোচনায় ভয় পায়। এ কারণে সরকার সব ধরনের কথা বলার অধিকারকে হরণ করতে চাচ্ছে। মুশতাকের মতো মানুষদের আটকে রেখে, পিটিয়ে হত্যা করে সরকার এবং আদালত একাকার হয়ে গেছে। তিনি বলেন, খুনের আসামি জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কথা বলার জন্য একজনকে আটক করা হলে তাকে জামিন দেওয়া হয় না।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীম উদ্দীন খান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা ফয়জুল হাকিম, গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর অনুবাদক ও লেখক গৌরাঙ্গ হালদার, রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য হাসনাত কাইয়ুম, মানবাধিকারকর্মী জাকির হোসেন প্রমুখ। সমাবেশ থেকে অবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল এবং এ আইনে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবি করা হয়।
মুশতাক আহমেদের দাফন : শুক্রবার বাদ এশা লালমাটিয়ার সি ব্লকের মিনার মসজিদে জানাজা হয়। এরপর রাতেই আজিমপুর গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের ময়নাতদন্ত দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেষ হয়। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তার ময়নাতদন্ত হয়। মৃত্যুর ঘটনায় কারাগারের পক্ষ থেকে জয়দেবপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করা হয়েছে।

সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন জয়দেবপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সৈয়দ বায়েজীদ জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মরদেহের সুরতহাল করা হয়। তার পিঠের মধ্যভাগে যে কোনো সময় ‘ঘা’ হয়েছে এমন দাগ পাওয়া গেছে। ডান হাতে হালকা লালচে কালো ছোট দাগ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে হাসপাতালে আনার সময় বা গাড়িতে উঠানোর সময় এ দাগ হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।

তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শাফী মোহাইমেন জানান, দৃশ্যত গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরির পর বিস্তারিত বলা যাবে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের ভেতরে মুশতাক আহমেদ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে কারা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার ছোট বালাপুর এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।

বড় ভাইয়ের দাবি-মুশতাকের শরীরের ভেতরে বা বাইরে আঘাতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি : মুশতাক আহমেদের বড় ভাই ডা. নাফিছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজে একজন ডাক্তার। মোশতাকের ময়নাতদন্তের সময় আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। তার শরীরের ভেতরে বা বাইরের আঘাতের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে আমি খেয়াল করেছি তা হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিকের তুলনায় বড়। এর কারণেও হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকতে পারে। আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমরা কোনো মামলাও করব না।’

যে কারণে গ্রেফতার হন মুশতাক : বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে গত বছর ৫ মে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে র‌্যাব-৩। ৬ মে র‌্যাব মুশতাক ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে গ্রেফতার করে। পরদিন ‘সরকারবিরোধী প্রচার ও গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, “মুশতাক ‘আই এম বাংলাদেশি’ পেজের এডিটর। তিনিও গুজব ছড়িয়েছেন। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক চ্যাটিংয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কার্টুনিস্ট কিশোর তার ‘আমি কিশোর’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনামূলক কার্টুন-পোস্টার পোস্ট করতেন। আর মুশতাক তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কিশোরের সেসব পোস্টের কয়েকটি শেয়ার করেন।

১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ : কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে ১৩ দেশের রাষ্ট্রদূত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশপাশি এ মৃত্যুর স্বচ্ছ এবং স্বতন্ত্র তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে রাষ্ট্রদূতরা বলেন, মুশতাক আহমেদ ডিজিটাল সুরক্ষা আইনের অধীনে ২০২০ সালের ৫ মে বিনাবিচারে কারাগারে আটকে ছিলেন। বেশ কয়েকবার তার জামিন আবেদন করা হলেও সেক্ষেত্রে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল এবং কারাবন্দি অবস্থায় তার চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

তারা আরও বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, মোশতাক আহমেদের মৃত্যুর বিষয়টি যেন অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করা হয়। পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিধান ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে আমাদের সরকারগুলোর উদ্বেগ জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের অধীনে বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে বিবেচনা করতে অনুরোধ জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন- কানাডার হাইকমিশনার বেনোইট প্রফন্টেইন, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত মিসেস উইনি এস্টরুপ পিটারসেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মিসেস রেনজে টেরিঙ্ক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জাঁ মেরিন শুহ, জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিটা, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত হ্যারি ভার্ভিজ, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার-সোভেনডেন, স্পেনের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিসকো ডি আসিস বেনিতেজ সালাস, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত মিসেস আলেকজান্দ্রা বার্গ ফন লিন্ডে, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত মিসেস নাথালি চুয়ার্ড, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার।

কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু

শাহবাগে অবরোধ-বিক্ষোভ

মশাল মিছিলে লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল * ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ * সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও
 ঢাবি প্রতিনিধি 
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাবন্দি অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রতিবাদে শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্র জোট। প্রায় দেড় ঘণ্টার অবরোধে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এখান থেকে সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বের করেন জোটের নেতাকর্মীরা। তবে এই মিছিল লাঠিপেটা ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন। 

এর আগে বিকালে সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের উদ্যোগে শাহবাগে মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে ১৩ দেশের রাষ্ট্রদূত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি এ মৃত্যুর স্বচ্ছ এবং স্বতন্ত্র তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত-বিচার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার সবার মুক্তি ও আইনটি বাতিলের দাবিতে বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শাহবাগ ও পরীবাগ হয়ে ফের শাহবাগ মোরে এসে থেমে যায়। এরপরই রাস্তায় অবস্থান নিয়ে নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ছাত্রফ্রন্ট কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী জয় সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর তারা শাহবাগ মোড় ছেড়ে দেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা এ মৃত্যুকে ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’ হিসাবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি জানান।

জোটের নেতা ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন অভিযোগ করেন, গত বছর এপ্রিলে লেখনীর মাধ্যমে দুর্নীতি-লুটপাটের প্রতিবাদ করেছিলেন লেখক মুশতাক। তার অপরাধ ছিল-তিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে, অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তাই কারাগারে আটকে রেখে তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি ছয়বার জামিনের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আবেদন নাকচ করা হয়েছে। এটি নির্মম ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন বলেন, ‘লেখক মুশতাক ৯ মাস কারারুদ্ধ ছিলেন। মানুষের অধিকারকে অস্বীকার করার জায়গায় চলে গেছে বর্তমান সরকার।’

বিক্ষোভে আরও বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আরিফ মঈনুদ্দীন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের দপ্তর সম্পাদক রাজেন্দ্র চাকমা প্রমুখ।

মশাল মিছিলে পুলিশের লাঠিপেটা : সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে মশাল মিছিল বের করে প্রগতিশীল ছাত্র জোট। মিছিলটি শামসুন্নাহার হল হয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে হয়ে পাবলিক লাইব্রেরির সামনে পৌঁছালে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এ কারণে মিছিলকারীরা ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদের গেটের সামনে অবস্থান নেন এবং স্লোগান দিয়ে পুনরায় একত্রিত হয়ে শাহবাগ যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ফের লাঠিচার্জ এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। 
গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সহ-সভাপতি ছায়েদুল হক নিশান বলেন, পুলিশের লাঠিপেটায় রাজেস্বর দাস গুপ্ত, এ্যানি চৌধুরী, নিতু ও সাদসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী জয় বলেন, ‘পুলিশ আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় নারীকর্মীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে।’

রমনার ডিসি সাজ্জাদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ লাঠিচার্জ করছে। তিনি আরও বলেন, এ সময় দু-একজনকে আটক করা হয়েছে। এদিকে এই হামলার প্রতিবাদে আজ দুপুর ১২টায় বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট।

গায়েবানা জানাজ : বিকাল ৪টায় ছাত্র অধিকার পরিষদের আয়োজনে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন-গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, রাষ্ট্রচিন্তার হাসনাত কাইয়ুম, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ, ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নূর, ছাত্র অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রাশেদ খানসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

জানাজার আগে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করলে হবে না, এ হত্যারও বিচার করতে হবে। এ হত্যায় যদি আপনি (শেখ হাসিনা) জড়িত থাকেন, আপনারও বিচার হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আপনি নিজেও বন্দি, তাই আপনি সত্যি কথা বলতে পারেন না। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে আটক হওয়া প্রত্যেকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেন। এই আইন বাতিল করুন। না হলে আপনাকেও একদিন এই আইনের মারপ্যাঁচে পড়তে হবে।’

জোনায়েদ সাকি বলেন, মুশতাক আহমেদকে বিনা বিচারে কারাগারে রাখা হয়েছিল। ছয়বার জামিনের আবেদন নাকচ করা হয়েছে। জেলে রেখেই এই সরকার তাকে হত্যা করেছে। ভোটারবিহীন সরকার থেকে আর কী আশা করা যায়? প্রধানমন্ত্রী আপনাকে পরিষ্কার করে বলতে চাই, বাংলাদেশে আজ যা অন্যায় হচ্ছে এর দায় আপনাকেই নিতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ যে দিন জেগে উঠবে, সেদিন কেউ পালানোর পথ পাবেন না। আপনাদের সবাইকে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘এটা কুখ্যাত আইন। আজকে শুধু ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকে দায়ী করলে হবে না। এই আইন যারা প্রণয়ন করছে তারাও দায়ী, যে রায় দিয়েছে সে ও আদালত দায়ী। এটার কারণে ভোগান্তি হচ্ছে। এই আইন বাতিল বা প্রত্যাহার আমি চাই না। আমি বলতে চাই, এই আইন যারা প্রণয়ন করেছে তাদের একদিন বিচার হবে।’ নূরুল হক নূর বলেন, ‘এই হত্যার দায় প্রধানমন্ত্রীকে নিতে হবে। আজ আমরা সবাই যদি আওয়াজ তুলতে না পারি, তাহলে আমাদের অবস্থাও লেখক মুশতাকের মতো হবে।’

সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কারণে দেশটা একটা উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। এটা একটা অসহনীয় দম বন্ধ করা আইন। যেভাবে হোক এ আইন ভাঙতে হবে।’

জানাজা শেষে ছাত্র অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আজ বেলা ১১টায় প্রেস ক্লাবে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

শহিদ মিনারে সমাবেশ : বিকালে ৫টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত এক সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার সমালোচনায় ভয় পায়। এ কারণে সরকার সব ধরনের কথা বলার অধিকারকে হরণ করতে চাচ্ছে। মুশতাকের মতো মানুষদের আটকে রেখে, পিটিয়ে হত্যা করে সরকার এবং আদালত একাকার হয়ে গেছে। তিনি বলেন, খুনের আসামি জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কথা বলার জন্য একজনকে আটক করা হলে তাকে জামিন দেওয়া হয় না।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীম উদ্দীন খান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা ফয়জুল হাকিম, গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর অনুবাদক ও লেখক গৌরাঙ্গ হালদার, রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য হাসনাত কাইয়ুম, মানবাধিকারকর্মী জাকির হোসেন প্রমুখ। সমাবেশ থেকে অবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল এবং এ আইনে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবি করা হয়।
মুশতাক আহমেদের দাফন : শুক্রবার বাদ এশা লালমাটিয়ার সি ব্লকের মিনার মসজিদে জানাজা হয়। এরপর রাতেই আজিমপুর গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের ময়নাতদন্ত দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেষ হয়। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তার ময়নাতদন্ত হয়। মৃত্যুর ঘটনায় কারাগারের পক্ষ থেকে জয়দেবপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করা হয়েছে।

সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন জয়দেবপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সৈয়দ বায়েজীদ জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মরদেহের সুরতহাল করা হয়। তার পিঠের মধ্যভাগে যে কোনো সময় ‘ঘা’ হয়েছে এমন দাগ পাওয়া গেছে। ডান হাতে হালকা লালচে কালো ছোট দাগ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে হাসপাতালে আনার সময় বা গাড়িতে উঠানোর সময় এ দাগ হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।

তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শাফী মোহাইমেন জানান, দৃশ্যত গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরির পর বিস্তারিত বলা যাবে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের ভেতরে মুশতাক আহমেদ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে কারা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার ছোট বালাপুর এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।

বড় ভাইয়ের দাবি-মুশতাকের শরীরের ভেতরে বা বাইরে আঘাতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি : মুশতাক আহমেদের বড় ভাই ডা. নাফিছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজে একজন ডাক্তার। মোশতাকের ময়নাতদন্তের সময় আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। তার শরীরের ভেতরে বা বাইরের আঘাতের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে আমি খেয়াল করেছি তা হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিকের তুলনায় বড়। এর কারণেও হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকতে পারে। আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমরা কোনো মামলাও করব না।’

যে কারণে গ্রেফতার হন মুশতাক : বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে গত বছর ৫ মে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে র‌্যাব-৩। ৬ মে র‌্যাব মুশতাক ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে গ্রেফতার করে। পরদিন ‘সরকারবিরোধী প্রচার ও গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, “মুশতাক ‘আই এম বাংলাদেশি’ পেজের এডিটর। তিনিও গুজব ছড়িয়েছেন। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক চ্যাটিংয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কার্টুনিস্ট কিশোর তার ‘আমি কিশোর’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনামূলক কার্টুন-পোস্টার পোস্ট করতেন। আর মুশতাক তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কিশোরের সেসব পোস্টের কয়েকটি শেয়ার করেন। 

১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ : কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে ১৩ দেশের রাষ্ট্রদূত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশপাশি এ মৃত্যুর স্বচ্ছ এবং স্বতন্ত্র তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে রাষ্ট্রদূতরা বলেন, মুশতাক আহমেদ ডিজিটাল সুরক্ষা আইনের অধীনে ২০২০ সালের ৫ মে বিনাবিচারে কারাগারে আটকে ছিলেন। বেশ কয়েকবার তার জামিন আবেদন করা হলেও সেক্ষেত্রে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল এবং কারাবন্দি অবস্থায় তার চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 

তারা আরও বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, মোশতাক আহমেদের মৃত্যুর বিষয়টি যেন অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করা হয়। পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিধান ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে আমাদের সরকারগুলোর উদ্বেগ জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের অধীনে বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে বিবেচনা করতে অনুরোধ জানাচ্ছি। 

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন- কানাডার হাইকমিশনার বেনোইট প্রফন্টেইন, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত মিসেস উইনি এস্টরুপ পিটারসেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মিসেস রেনজে টেরিঙ্ক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জাঁ মেরিন শুহ, জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিটা, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত হ্যারি ভার্ভিজ, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার-সোভেনডেন, স্পেনের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিসকো ডি আসিস বেনিতেজ সালাস, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত মিসেস আলেকজান্দ্রা বার্গ ফন লিন্ডে, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত মিসেস নাথালি চুয়ার্ড, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন