শিক্ষা সহায়তায় বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান
jugantor
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা সহায়তায় বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০১ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের শিক্ষা সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে সারা দেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আমরা বদ্ধপরিকর। এক্ষেত্রে আপনারা বিত্তবানরাও এগিয়ে আসুন। আমাদের শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ডে বা নিজ নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তা করতে পারেন। নিজ এলাকা বা নিজ নিজ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যে যেখানে পড়াশোনা করেছেন সেগুলোর উন্নয়নে সবাই মনোযোগী হবেন। যেখান থেকে লেখাপড়া শিখে আজ বিত্তশালী হয়েছেন, সেই জায়গাগুলোর প্রতি যদি সবাই যত্নবান হয়, তাহলে আমার মনে হয় কোনো অসুবিধা হবে না। আধুনিক যুগের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে বিজ্ঞান প্রযুক্তি শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষায় জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

রোববার প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তি, টিউশন ফি, ভর্তি সহায়তা ও আর্থিক অনুদান বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন। এ সময় এক কোটি ৬৩ লাখ ৮০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার শিক্ষা সহায়তা প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে এই ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিই। ২০১২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করি। এর মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি, টিউশন ফি, ভর্তি সহায়তা ও চিকিৎসা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় ফেলোশিপ দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের ১২ লাখ ১৯ হাজার ৭২৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ৯০০ টাকা হারে ৬৬১ কোটি ছয় লাখ ২১ হাজার ৫৮০ টাকার উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের মোট উপবৃত্তির শতকরা ৭৫ ভাগ দেওয়া হয়েছে।

দক্ষ নাগরিক গড়তে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা যে স্বীকৃতি পেয়েছি, সেটা আমাদের ধরে রাখতে হবে। এ জন্যই দরকার শিক্ষার প্রসার এবং উপযুক্ত দক্ষ কারিগর এবং নাগরিক। সেই দক্ষ ও উপযুক্ত নাগরিক আমরা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘বহুমাত্রিক’ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিটি বিভাগে একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। ফ্যাশন ডিজাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে যে ধরনের বিষয় লাগে, সেদিকে লক্ষ রেখেই আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, ‘আমরা মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় করেছি অর্থাৎ বিষয় নির্বাচন করে বাংলাদেশের যেসব এলাকায় যে ধরনের শিক্ষার গুরুত্ব বেশি আমরা সেভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করে দিচ্ছি। যাতে সবাই শিক্ষাটা যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি শিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষাটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এটা দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।’

তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষার প্রসারে প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপন করা হচ্ছে এবং প্রতিটি বিভাগীয় সদরে ১টি করে মহিলা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি জেলায় একটি করে সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করা হচ্ছে। সরকার জেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছে যেন ছেলে-মেয়েরা ঘরের খেয়ে মা-বাবার চোখের সামনে থেকে পড়ালেখা করতে পারে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকসহ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে ছাত্র-ছাত্রী উভয়ের জন্য বর্ধিত হারে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গসমতা অর্জন করায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, মেয়েদের সংখ্যাই বেশি এবং ছেলেদের সংখ্যাটা কমে যাচ্ছে। সেটা যেন না হয় সেদিকে একটু নজর দেবেন। আমি মনে করি অভিভাবক, শিক্ষক সবাইকেই এটা দেখতে হবে।

মহামারি করোনার মধ্যেও যথাসময়ে বই বিতরণ করায় তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এ বছরের প্রথম দিন চার কোটি ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ২২৬ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৩৯৪টি বই বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৬৬ কোটি বই বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। কোভিড-১৯-এর কারণে দেশের সব স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামী ৩০ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে সক্ষম হব। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী যারা রয়েছেন সবাইকেই টিকা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও টিকা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রী দেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে তার সরকারের সাফল্য প্রসঙ্গে বলেন, ’৯৬ সালে সরকারে আসার পর তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ‘নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ শীর্ষক’ একটি প্রকল্প হাতে নেয়। সেখানে আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক, মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এবং বয়স্ক শিক্ষার ব্যাপক পদক্ষেপ ছিল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনকে কাজে লাগানো হয় বয়স্ক শিক্ষার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিটি জেলাকে নিরক্ষরমুক্ত ঘোষণা করা এবং এর ফলও পাওয়া শুরু হয়। সবার সহযোগিতায় খুব অল্প সময়েই কয়েকটি জেলাকে নিরক্ষরমুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হয়। সেজন্য ওই সময় ইউনিসেফ থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার বাবদ প্রায় ১০ হাজার ডলার প্রাপ্তি এবং সেটি দিয়ে একটি বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। ৪৫ থেকে শিক্ষার হার ৬৫ শতাংশে উন্নীত করি। তবে পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সেটি বন্ধ করে দেয়। সে সময় পিএইচডি বা উচ্চশিক্ষার্থে যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে গমন করে তাদেরকে কোর্স কারিকুলাম বাদ রেখেই দেশে ফিরিয়ে আনে, বলেন তিনি। এ ধরনের সরকারি কর্মসূচিগুলো সরকার পরিবর্তন হলেই যেন বন্ধ হতে না পারে সেজন্যই আওয়ামী লীগ সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, তারা ’৯৬-পরবর্তী সরকারে থাকার সময় দেশের বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে ১২টি নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শুরু করেছিল। সে সময় কম্পিউটার যন্ত্রাংশের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে সরকার প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করে। তিনি অভিযোগ করেন, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেই বিএনপি-পরবর্তী ৫ বছরে দেশে সাক্ষরতার হার ফের ৬৫ থেকে ৪৪ ভাগে নামিয়ে এনেছিল।

তার সরকারের প্রচেষ্টায় জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণীত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাসহ শিক্ষক নিয়োগ ও নিবন্ধন পরীক্ষার ফলাফল ওয়েবসাইটে, মোবাইল ফোনের এসএমএস-এর মাধ্যমে অতিদ্রুত প্রকাশ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন এবং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া অনলাইনে করা হচ্ছে। পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার মান বেড়েছে এবং সব পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফলও ভালো হচ্ছে। পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে আইসিটি বিষয় আবশ্যিক করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ডিজিটাল কনটেন্ট ও অন্যান্য বিষয়ে ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান এবং শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষা সম্প্রসারণে আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ সম্পর্কে সরকারপ্রধান বলেন, বর্তমানে শিক্ষার হার ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ দাঁড়িয়েছে।

তার সরকার যে একশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে, সেখানেও অনেক ‘টেকনিক্যাল হ্যান্ডস’ প্রয়োজন পড়বে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করতে পারলে তারা আমাদের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখতে পারবে।’

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানের সঙ্গে পটুয়াখালীর গলাচিপা, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্বরপুর উপজেলা এবং বান্দরবান সদর উপজেলা সংযুক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রী পরে উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

শিক্ষা সহায়তায় বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০১ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের শিক্ষা সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে সারা দেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আমরা বদ্ধপরিকর। এক্ষেত্রে আপনারা বিত্তবানরাও এগিয়ে আসুন। আমাদের শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ডে বা নিজ নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তা করতে পারেন। নিজ এলাকা বা নিজ নিজ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যে যেখানে পড়াশোনা করেছেন সেগুলোর উন্নয়নে সবাই মনোযোগী হবেন। যেখান থেকে লেখাপড়া শিখে আজ বিত্তশালী হয়েছেন, সেই জায়গাগুলোর প্রতি যদি সবাই যত্নবান হয়, তাহলে আমার মনে হয় কোনো অসুবিধা হবে না। আধুনিক যুগের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে বিজ্ঞান প্রযুক্তি শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষায় জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

রোববার প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তি, টিউশন ফি, ভর্তি সহায়তা ও আর্থিক অনুদান বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন। এ সময় এক কোটি ৬৩ লাখ ৮০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার শিক্ষা সহায়তা প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে এই ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিই। ২০১২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করি। এর মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি, টিউশন ফি, ভর্তি সহায়তা ও চিকিৎসা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় ফেলোশিপ দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের ১২ লাখ ১৯ হাজার ৭২৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ৯০০ টাকা হারে ৬৬১ কোটি ছয় লাখ ২১ হাজার ৫৮০ টাকার উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের মোট উপবৃত্তির শতকরা ৭৫ ভাগ দেওয়া হয়েছে।

দক্ষ নাগরিক গড়তে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা যে স্বীকৃতি পেয়েছি, সেটা আমাদের ধরে রাখতে হবে। এ জন্যই দরকার শিক্ষার প্রসার এবং উপযুক্ত দক্ষ কারিগর এবং নাগরিক। সেই দক্ষ ও উপযুক্ত নাগরিক আমরা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘বহুমাত্রিক’ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিটি বিভাগে একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। ফ্যাশন ডিজাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে যে ধরনের বিষয় লাগে, সেদিকে লক্ষ রেখেই আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, ‘আমরা মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় করেছি অর্থাৎ বিষয় নির্বাচন করে বাংলাদেশের যেসব এলাকায় যে ধরনের শিক্ষার গুরুত্ব বেশি আমরা সেভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করে দিচ্ছি। যাতে সবাই শিক্ষাটা যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি শিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষাটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এটা দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।’

তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষার প্রসারে প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপন করা হচ্ছে এবং প্রতিটি বিভাগীয় সদরে ১টি করে মহিলা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি জেলায় একটি করে সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করা হচ্ছে। সরকার জেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছে যেন ছেলে-মেয়েরা ঘরের খেয়ে মা-বাবার চোখের সামনে থেকে পড়ালেখা করতে পারে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকসহ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে ছাত্র-ছাত্রী উভয়ের জন্য বর্ধিত হারে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গসমতা অর্জন করায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, মেয়েদের সংখ্যাই বেশি এবং ছেলেদের সংখ্যাটা কমে যাচ্ছে। সেটা যেন না হয় সেদিকে একটু নজর দেবেন। আমি মনে করি অভিভাবক, শিক্ষক সবাইকেই এটা দেখতে হবে।

মহামারি করোনার মধ্যেও যথাসময়ে বই বিতরণ করায় তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এ বছরের প্রথম দিন চার কোটি ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ২২৬ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৩৯৪টি বই বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৬৬ কোটি বই বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। কোভিড-১৯-এর কারণে দেশের সব স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামী ৩০ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে সক্ষম হব। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী যারা রয়েছেন সবাইকেই টিকা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও টিকা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রী দেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে তার সরকারের সাফল্য প্রসঙ্গে বলেন, ’৯৬ সালে সরকারে আসার পর তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ‘নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ শীর্ষক’ একটি প্রকল্প হাতে নেয়। সেখানে আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক, মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এবং বয়স্ক শিক্ষার ব্যাপক পদক্ষেপ ছিল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনকে কাজে লাগানো হয় বয়স্ক শিক্ষার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিটি জেলাকে নিরক্ষরমুক্ত ঘোষণা করা এবং এর ফলও পাওয়া শুরু হয়। সবার সহযোগিতায় খুব অল্প সময়েই কয়েকটি জেলাকে নিরক্ষরমুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হয়। সেজন্য ওই সময় ইউনিসেফ থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার বাবদ প্রায় ১০ হাজার ডলার প্রাপ্তি এবং সেটি দিয়ে একটি বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। ৪৫ থেকে শিক্ষার হার ৬৫ শতাংশে উন্নীত করি। তবে পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সেটি বন্ধ করে দেয়। সে সময় পিএইচডি বা উচ্চশিক্ষার্থে যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে গমন করে তাদেরকে কোর্স কারিকুলাম বাদ রেখেই দেশে ফিরিয়ে আনে, বলেন তিনি। এ ধরনের সরকারি কর্মসূচিগুলো সরকার পরিবর্তন হলেই যেন বন্ধ হতে না পারে সেজন্যই আওয়ামী লীগ সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, তারা ’৯৬-পরবর্তী সরকারে থাকার সময় দেশের বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে ১২টি নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শুরু করেছিল। সে সময় কম্পিউটার যন্ত্রাংশের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে সরকার প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করে। তিনি অভিযোগ করেন, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেই বিএনপি-পরবর্তী ৫ বছরে দেশে সাক্ষরতার হার ফের ৬৫ থেকে ৪৪ ভাগে নামিয়ে এনেছিল।

তার সরকারের প্রচেষ্টায় জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণীত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাসহ শিক্ষক নিয়োগ ও নিবন্ধন পরীক্ষার ফলাফল ওয়েবসাইটে, মোবাইল ফোনের এসএমএস-এর মাধ্যমে অতিদ্রুত প্রকাশ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন এবং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া অনলাইনে করা হচ্ছে। পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার মান বেড়েছে এবং সব পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফলও ভালো হচ্ছে। পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে আইসিটি বিষয় আবশ্যিক করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ডিজিটাল কনটেন্ট ও অন্যান্য বিষয়ে ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান এবং শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষা সম্প্রসারণে আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ সম্পর্কে সরকারপ্রধান বলেন, বর্তমানে শিক্ষার হার ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ দাঁড়িয়েছে।

তার সরকার যে একশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে, সেখানেও অনেক ‘টেকনিক্যাল হ্যান্ডস’ প্রয়োজন পড়বে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করতে পারলে তারা আমাদের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখতে পারবে।’

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানের সঙ্গে পটুয়াখালীর গলাচিপা, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্বরপুর উপজেলা এবং বান্দরবান সদর উপজেলা সংযুক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রী পরে উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন