সড়ক ও উন্মুক্ত স্থান বিবেচনায় নতুন ভবনের উচ্চতা
jugantor
রাজউকের ড্যাপ
সড়ক ও উন্মুক্ত স্থান বিবেচনায় নতুন ভবনের উচ্চতা

  মতিন আব্দুল্লাহ  

০৪ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক, উন্মুক্ত স্থান এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্যুয়ারেজসহ সেবা সরবরাহের সামর্থ্য বিবেচনায় নতুন ভবনের উচ্চতা নির্ধারণে কাজ করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংশোধিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) আওতায় জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করতেই মূলত এ কাজ শুরু হয়েছে।

এ ড্যাপের মেয়াদকাল ২০১৬-৩৫-এর পরিবর্তে ২০২১-৪১ পর্যন্ত করা হচ্ছে। ২০ বছর মেয়াদি এ মাস্টারপ্ল্যান প্রতি ৫ বছর অন্তর সংশোধন করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা যায়, রাজউকের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে জনঘনত্বের বিবেচনায় কেন্দ্রীয়, বহিস্থ ও অন্যান্য- এ তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হচ্ছে। পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও প্রকৌশলীদের মতামত নিয়ে জুনের মধ্যে সংশোধিত ড্যাপ গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে প্রত্যাশা রাজউক সংশ্লিষ্টদের।

ড্যাপ প্রকল্প সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় এলাকা বলতে রাজধানীর মূল এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। এ এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক জনঘনত্বের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা থাকবে। আর বহিস্থ এলাকা বলতে রাজধানী শহরের খুব কাছের এলাকাকে বোঝানো হয়েছে, যেসব এলাকা দ্রুততম সময়ে নগরায়ণ ঘটবে।

এসব এলাকা সিটি করপোরেশনভুক্ত হলে ওয়ার্ডভিত্তিক জনঘনত্ব নির্দেশনা থাকবে। আর ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা হলে ইউনিয়নভিত্তিক জনঘনত্ব এবং ভবনের উচ্চতার ব্যাপারে নির্দেশনা থাকবে।

আর ড্যাপে অন্যান্য এলাকা বলতে কেন্দ্রীয় ও বহিস্থ এলাকার বাইরের এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। এসব এলাকা মূলত রাজউকভুক্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা। এসব এলাকার ক্ষেত্রে ইউনিয়নভিত্তিক ভবনের উচ্চতা ও জনঘনত্বের ব্যাপারে নির্দেশনা থাকবে।

আরও জানা গেছে, এবার প্রথম ড্যাপের খসড়া বাংলায় প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাতেই ড্যাপ গেজেটভুক্ত হবে। বাংলাতে ড্যাপের খসড়া প্রকাশ করায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং পেশাজীবীরা সহজে মতামত ব্যক্ত করতে পেরেছেন। সবার মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে খসড়া ড্যাপের বিজ্ঞানভিত্তিক যৌক্তিক কিছু সংশোধন করছেন তারা।

এ ছাড়া ড্যাপের গেজেটভুক্ত করার পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধনেরও কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। ড্যাপ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেই দুটোকে গেজেটভুক্ত করা হবে। এ দুটি বিষয়ের সমন্বয় করে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) নির্ধারণ করা হবে। সেক্ষেত্রে আইনগত কোনো জটিলতা থাকবে না। সরকার যে উদ্দেশ্যে ড্যাপ সংশোধন করছে। সে উদ্দেশ্য পূরণ সহজ হবে।

এ প্রসঙ্গে স্থাপত্য অধিদফতরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের সংশোধিত ড্যাপের খসড়ার জনঘনত্ব বিষয়ের সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না। ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, ফ্লোর এরিয়া রেশিওর (এফএআর) কারণে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে।

এটা কোনোভাবে মানতে পারছি না। কেননা, রাজধানীতে এফএআরের সুযোগ নিয়ে যে ভবন তৈরি হয়েছে সেটা সর্বোচ্চ ৪ ভাগ। এ অল্পসংখ্যক ভবনের কারণে ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে এ কথা সত্য হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘রাজধানীর ভবনের এমন উদাহরণ আমার কাছে আছে যে, ১২ তলা ভবনে যত লোক বসবাস করে ৬ তলা ভবনে তার চেয়েও বেশি লোক বসবাস করে। এমন হয়ে থাকলে ভবনের উচ্চতা বেঁধে দিলেই জনঘনত্ব কমবে না। এজন্য এ বিষয়টি নিয়ে রাজউককে ভাবতে অনুরোধ করেছি।’

ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বরিশালে আমার মা অসুস্থ হলে ‘আইসিইউ’ সেবা গ্রহণের জন্য তাকে ঢাকায় আনতে হয়েছে। বরিশালের মতো একটি বিভাগীয় শহরে এ ধরনের সেবা না থাকায় ওই দিন আমার মাকে ঢাকায় আনতে বাধ্য হয়েছি। এমন বহুবিধ প্রয়োজনে ঢাকায় মানুষ আসছেন। ভবনের উচ্চতার কারণে আসছেন, এমন প্রচারণা কোনোভাবে মানতে পারি না।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ ভবনসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সে ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে, ভেবে চিন্তে করতে হবে। কোনো ভুল ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সেটা সামগ্রিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।’

এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) এজিএস প্রকৌশলী শেখ তাজুল ইসলাম তুহিন যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের খসড়া ড্যাপের ব্যাপারে আমরা লিখিত মতামত দিয়েছি। জনঘনত্ব বিষয়ে আমরা বলেছি-সড়ক, উন্মুক্ত স্থানসহ পরিষেবা সরবরাহের সক্ষমতা বিবেচনা করে ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করতে। কেননা, সড়ক ও অবকাঠামো থাকলেই যদি বহুতল ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়, সে ক্ষেত্রে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্যুয়ারেজ সেবা বিঘ্নিত হতে পারে। এজন্য সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করতে আইইবির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজউক সংশোধিত ড্যাপের খসড়া নিয়ে পেশাজীবীদের সঙ্গে সভা করেছেন। সেখানে বলেছে, সড়ক, উন্মুক্ত স্থান ও পরিষেবা বিবেচনা করেই ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক একটি ফর্মুলা প্রণয়ন করছে তারা। এটা হলে জনঘনত্বসংক্রান্ত একটি সুষ্ঠু সমাধান মিলবে বলে মনে করছি।’

তিনি বলেন, ‘ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধনের কাজ একত্রে চলছে। দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে গেজেট প্রকাশিত হলে এটার বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং কাঙ্ক্ষিত সুবিধা মিলবে। এটা নিয়ে ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। আশা করি এবার সবার সম্মিলিত প্রয়াতে একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত মাস্টার প্ল্যান উপহার দিতে পারবে রাজউক।’

এ প্রসঙ্গে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপ প্রকল্পের পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যৌক্তিক দাবিগুলো আমলে নেয়া হয়েছে। সেগুলোর নিখুঁত বিশ্লেষণ করে সংশোধিত ড্যাপের খসড়ায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ড্যাপ প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাসযোগ্য ও নিরাপদ শহর গড়ে তোলা। সেজন্য এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে কোনো আবেগ স্থান পাচ্ছে না। বাস্তবতার নিরিখে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে ড্যাপের মাস্টার প্ল্যান চূড়ান্ত করা হচ্ছে।’

বিদ্যমান ড্যাপের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার আগে রাজউক ২০১৬-৩৫ সাল পর্যন্ত বা ২০ বছরের জন্য নতুন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এ ড্যাপ প্রণয়নের আগে নতুন করে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ২০১৬-৩৫-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া নতুন ড্যাপ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে এটা শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পরে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নতুন ড্যাপ প্রণয়নের লক্ষ্যে ৬০ দিনের গণশুনানির সময় বেঁধে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ গণশুনানি চলে গত বছরের ৪ নভেম্বরে শেষ হয়েছে। এরপর ড্যাপ রিভিউ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গণশুনানির মেয়াদ আরও ২ মাস বাড়ায়।

গণশুনানি শেষে এখন রাজউক খসড়া চূড়ান্তকরণ কার্যক্রম করছে। এরই মধ্যে ড্যাপের মেয়াদকাল ২০২১-৪১ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জনঘনত্ব ইস্যুসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আসছে।

রাজউকের ড্যাপ

সড়ক ও উন্মুক্ত স্থান বিবেচনায় নতুন ভবনের উচ্চতা

 মতিন আব্দুল্লাহ 
০৪ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক, উন্মুক্ত স্থান এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্যুয়ারেজসহ সেবা সরবরাহের সামর্থ্য বিবেচনায় নতুন ভবনের উচ্চতা নির্ধারণে কাজ করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংশোধিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) আওতায় জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করতেই মূলত এ কাজ শুরু হয়েছে।

এ ড্যাপের মেয়াদকাল ২০১৬-৩৫-এর পরিবর্তে ২০২১-৪১ পর্যন্ত করা হচ্ছে। ২০ বছর মেয়াদি এ মাস্টারপ্ল্যান প্রতি ৫ বছর অন্তর সংশোধন করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা যায়, রাজউকের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে জনঘনত্বের বিবেচনায় কেন্দ্রীয়, বহিস্থ ও অন্যান্য- এ তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হচ্ছে। পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও প্রকৌশলীদের মতামত নিয়ে জুনের মধ্যে সংশোধিত ড্যাপ গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে প্রত্যাশা রাজউক সংশ্লিষ্টদের।

ড্যাপ প্রকল্প সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় এলাকা বলতে রাজধানীর মূল এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। এ এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক জনঘনত্বের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা থাকবে। আর বহিস্থ এলাকা বলতে রাজধানী শহরের খুব কাছের এলাকাকে বোঝানো হয়েছে, যেসব এলাকা দ্রুততম সময়ে নগরায়ণ ঘটবে।

এসব এলাকা সিটি করপোরেশনভুক্ত হলে ওয়ার্ডভিত্তিক জনঘনত্ব নির্দেশনা থাকবে। আর ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা হলে ইউনিয়নভিত্তিক জনঘনত্ব এবং ভবনের উচ্চতার ব্যাপারে নির্দেশনা থাকবে।

আর ড্যাপে অন্যান্য এলাকা বলতে কেন্দ্রীয় ও বহিস্থ এলাকার বাইরের এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। এসব এলাকা মূলত রাজউকভুক্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা। এসব এলাকার ক্ষেত্রে ইউনিয়নভিত্তিক ভবনের উচ্চতা ও জনঘনত্বের ব্যাপারে নির্দেশনা থাকবে।

আরও জানা গেছে, এবার প্রথম ড্যাপের খসড়া বাংলায় প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাতেই ড্যাপ গেজেটভুক্ত হবে। বাংলাতে ড্যাপের খসড়া প্রকাশ করায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং পেশাজীবীরা সহজে মতামত ব্যক্ত করতে পেরেছেন। সবার মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে খসড়া ড্যাপের বিজ্ঞানভিত্তিক যৌক্তিক কিছু সংশোধন করছেন তারা।

এ ছাড়া ড্যাপের গেজেটভুক্ত করার পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধনেরও কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। ড্যাপ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেই দুটোকে গেজেটভুক্ত করা হবে। এ দুটি বিষয়ের সমন্বয় করে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) নির্ধারণ করা হবে। সেক্ষেত্রে আইনগত কোনো জটিলতা থাকবে না। সরকার যে উদ্দেশ্যে ড্যাপ সংশোধন করছে। সে উদ্দেশ্য পূরণ সহজ হবে।

এ প্রসঙ্গে স্থাপত্য অধিদফতরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের সংশোধিত ড্যাপের খসড়ার জনঘনত্ব বিষয়ের সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না। ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, ফ্লোর এরিয়া রেশিওর (এফএআর) কারণে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে।

এটা কোনোভাবে মানতে পারছি না। কেননা, রাজধানীতে এফএআরের সুযোগ নিয়ে যে ভবন তৈরি হয়েছে সেটা সর্বোচ্চ ৪ ভাগ। এ অল্পসংখ্যক ভবনের কারণে ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে এ কথা সত্য হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘রাজধানীর ভবনের এমন উদাহরণ আমার কাছে আছে যে, ১২ তলা ভবনে যত লোক বসবাস করে ৬ তলা ভবনে তার চেয়েও বেশি লোক বসবাস করে। এমন হয়ে থাকলে ভবনের উচ্চতা বেঁধে দিলেই জনঘনত্ব কমবে না। এজন্য এ বিষয়টি নিয়ে রাজউককে ভাবতে অনুরোধ করেছি।’

ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বরিশালে আমার মা অসুস্থ হলে ‘আইসিইউ’ সেবা গ্রহণের জন্য তাকে ঢাকায় আনতে হয়েছে। বরিশালের মতো একটি বিভাগীয় শহরে এ ধরনের সেবা না থাকায় ওই দিন আমার মাকে ঢাকায় আনতে বাধ্য হয়েছি। এমন বহুবিধ প্রয়োজনে ঢাকায় মানুষ আসছেন। ভবনের উচ্চতার কারণে আসছেন, এমন প্রচারণা কোনোভাবে মানতে পারি না।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ ভবনসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সে ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে, ভেবে চিন্তে করতে হবে। কোনো ভুল ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সেটা সামগ্রিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।’

এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) এজিএস প্রকৌশলী শেখ তাজুল ইসলাম তুহিন যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের খসড়া ড্যাপের ব্যাপারে আমরা লিখিত মতামত দিয়েছি। জনঘনত্ব বিষয়ে আমরা বলেছি-সড়ক, উন্মুক্ত স্থানসহ পরিষেবা সরবরাহের সক্ষমতা বিবেচনা করে ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করতে। কেননা, সড়ক ও অবকাঠামো থাকলেই যদি বহুতল ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়, সে ক্ষেত্রে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্যুয়ারেজ সেবা বিঘ্নিত হতে পারে। এজন্য সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করতে আইইবির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজউক সংশোধিত ড্যাপের খসড়া নিয়ে পেশাজীবীদের সঙ্গে সভা করেছেন। সেখানে বলেছে, সড়ক, উন্মুক্ত স্থান ও পরিষেবা বিবেচনা করেই ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক একটি ফর্মুলা প্রণয়ন করছে তারা। এটা হলে জনঘনত্বসংক্রান্ত একটি সুষ্ঠু সমাধান মিলবে বলে মনে করছি।’

তিনি বলেন, ‘ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধনের কাজ একত্রে চলছে। দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে গেজেট প্রকাশিত হলে এটার বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং কাঙ্ক্ষিত সুবিধা মিলবে। এটা নিয়ে ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। আশা করি এবার সবার সম্মিলিত প্রয়াতে একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত মাস্টার প্ল্যান উপহার দিতে পারবে রাজউক।’

এ প্রসঙ্গে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপ প্রকল্পের পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যৌক্তিক দাবিগুলো আমলে নেয়া হয়েছে। সেগুলোর নিখুঁত বিশ্লেষণ করে সংশোধিত ড্যাপের খসড়ায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ড্যাপ প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাসযোগ্য ও নিরাপদ শহর গড়ে তোলা। সেজন্য এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে কোনো আবেগ স্থান পাচ্ছে না। বাস্তবতার নিরিখে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে ড্যাপের মাস্টার প্ল্যান চূড়ান্ত করা হচ্ছে।’

বিদ্যমান ড্যাপের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার আগে রাজউক ২০১৬-৩৫ সাল পর্যন্ত বা ২০ বছরের জন্য নতুন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এ ড্যাপ প্রণয়নের আগে নতুন করে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ২০১৬-৩৫-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া নতুন ড্যাপ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে এটা শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পরে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নতুন ড্যাপ প্রণয়নের লক্ষ্যে ৬০ দিনের গণশুনানির সময় বেঁধে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ গণশুনানি চলে গত বছরের ৪ নভেম্বরে শেষ হয়েছে। এরপর ড্যাপ রিভিউ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গণশুনানির মেয়াদ আরও ২ মাস বাড়ায়।

গণশুনানি শেষে এখন রাজউক খসড়া চূড়ান্তকরণ কার্যক্রম করছে। এরই মধ্যে ড্যাপের মেয়াদকাল ২০২১-৪১ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জনঘনত্ব ইস্যুসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আসছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন