অর্থনীতিতে বিপর্যয় কাটেনি
jugantor
করোনার এক বছর
অর্থনীতিতে বিপর্যয় কাটেনি

  মনির হোসেন  

০৮ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বিশেষ করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে মানুষের আয় এখনও আগের জায়গায় ফিরে যায়নি। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় পুনরুদ্ধার পরিস্থিতি ভালো। স্বস্তির বিষয়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশে আসেনি। ফলে এখনও প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতসহ সুনির্দিষ্ট দশটি পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, গত কয়েক বছর পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব। করোনা এসে সেই সংকটকে মহাসংকটে রূপ দিয়েছিল। এখনও এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিনটি মৌলিক খাতের মধ্যে সেবা ও শিল্প খাত স্থবির হয়ে গিয়েছিল। জিডিপিতে ৮৩ শতাংশই এ দুই খাতের অবদান। বাকি কৃষি খাতে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও পরিবহণ সংকটে পণ্যের বিপণন স্বাভাবিক ছিল না। এ কারণে করোনার ধাক্কায় নড়বড়ে হয়েছিল দেশের অর্থনীতি। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল গতিহীন। নতুন করে ১০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর মধ্যে রেমিটেন্স ছাড়া সব নিুমুখী। এতকিছুর মধ্যেও আশার দিক হলো, যতবেশি খারাপের আশঙ্কা করা হয়েছিল, অর্থনীতি ওই পর্যায়ে যায়নি। ইতোমধ্যে করোনার টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এতে মানুষের মনোবল বেড়েছে। এছাড়াও করোনার ধাক্কা মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছে।

মির্জ্জা আজিজ বলেন, করোনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। এতে নতুন করে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, গত ১০ বছরে দেশে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক একটি ধারা ছিল, বর্তমানে সেই ধারাটি অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। ফলে ২০২০ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অনেকটা কমেছে। ইতোমধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে। সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, দারিদ্রবিমোচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছিল। করোনার কারণে সেখানে বিপর্যয় হয়েছে। ২০১৯ সালে দেশে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। কিন্তু বিভিন্ন হিসাব বলছে, ২০২০ সালে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ১০ শতাংশের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে আয় বৈষম্য ছিল। করোনার কারণে সেটি আরও বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। অনেকে শহর থেকে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অনেকের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চতুর্থ বিষয় হলো, করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছিল, সেগুলোর সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল, তার ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে। কিন্তু বড় শিল্পের ক্ষেত্রে এ হার বেশি। এছাড়াও সামাজিক নিরাপত্তার যে সব কর্মসূচি আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি রয়েছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেটে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এদিকে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এর বড় অংশ ব্যবসায়ীদের ঋণ। বৃহৎ, মাঝারি শিল্পে ঋণ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো এবং গার্মেন্ট খাতে কিছুটা নগদ দেয়া হয়েছে। তবে এ ঋণের বিতরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এখনও অধিকাংশ সুবিধাভোগী ঋণ পায়নি। এ প্রণোদনা প্যাকেজের বাইরেও বাজেটে আরও ১০টি পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ, শুধু করোনা মোকাবিলা জন্য স্বাস্থ্য খাতে ৫ হাজার ৫শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। টেস্টিং কিট, মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর কাঁচামাল সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত, চিকিৎসাসামগ্রী এবং জীবাণুমুক্তকরণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে কর রেয়াত দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা, জরুরিভিত্তিতে ৫২৯ কোটি টাকা এবং করোনায় দায়িত্ব পালনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ৮৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১ হাজার ১২৭ কোটি এবং এডিবির অর্থায়নে ১৩৬৬ কোটি টাকার প্রকল্প, করোনার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রফতানিতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া পল্লি সমাজসেবা কার্যক্রমের জন্য ১শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। মূলত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব পড়েছে। অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ২৫ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে যা ২৩ শতাংশ। এর মানে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা টাকা নিতে চান না। এ কারণে ব্যাংকে অসল টাকা জমে আছে। আমানতের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এছাড়া একমাত্র রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য সূচকেও ঘাটতি রয়েছে ব্যাপক। অর্থবছরে রফতানিতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল। কিন্তু ৬ মাসে ১৭ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে। এছাড়াও করোনার কারণে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিডিপি অনুসারে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির দশমিক ৮৭ শতাংশে কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দশমিক ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর এগুলোও অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের হোঁচট খায়। এ অবস্থায় বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম পড়ে যায়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেকে নেমে যায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে মারাত্মক ধস নামে। তেল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর আয় কমে যায়। ফলে অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে শিল্প উৎপাদনের গতি ছিল নিুমুখী। পরের প্রান্তিকে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে কিছুটা বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতির হার। তবে খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার কারণে ২০২০ সালে অর্থনীতিতে প্রাথমিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তা মোটামুটিভাবে সামাল দেয়া বা সামাল দেয়ার চেষ্টায় করা হচ্ছিল। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় হলো, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা কিছুটা সামাল দেয়া গেছে। যেমন রেমিটেন্স ও রফতানিতে ওইভাবে ধস নামেনি। কিন্তু ব্যক্তি অর্থনীতিতে এখনও এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে জিডিপির ৫৫ শতাংশ আসে সেবাখাত থেকে। এই সেবাখাত এখনও পুনরুদ্ধার হয়নি। তাদের জন্য কিছু বরাদ্দ দেয়া হলেও তা পৌঁছানো যায়নি।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনার কারণে অর্থনীতির অনেক খাতে সমস্যা হয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থবছরের প্রথম ৮ মাস শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়। এ রাজস্ব বাড়াতে না পারলে সমস্যা। এ অবস্থার উত্তরণে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত। সবার আগে ব্যাংকিং খাত ঠিক করতে হবে। এছাড়াও সরকারের রাজস্ব আয় এবং রফতানি বাড়ানো জরুরি।

করোনার এক বছর

অর্থনীতিতে বিপর্যয় কাটেনি

 মনির হোসেন 
০৮ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বিশেষ করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে মানুষের আয় এখনও আগের জায়গায় ফিরে যায়নি। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় পুনরুদ্ধার পরিস্থিতি ভালো। স্বস্তির বিষয়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশে আসেনি। ফলে এখনও প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতসহ সুনির্দিষ্ট দশটি পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, গত কয়েক বছর পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব। করোনা এসে সেই সংকটকে মহাসংকটে রূপ দিয়েছিল। এখনও এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিনটি মৌলিক খাতের মধ্যে সেবা ও শিল্প খাত স্থবির হয়ে গিয়েছিল। জিডিপিতে ৮৩ শতাংশই এ দুই খাতের অবদান। বাকি কৃষি খাতে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও পরিবহণ সংকটে পণ্যের বিপণন স্বাভাবিক ছিল না। এ কারণে করোনার ধাক্কায় নড়বড়ে হয়েছিল দেশের অর্থনীতি। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল গতিহীন। নতুন করে ১০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর মধ্যে রেমিটেন্স ছাড়া সব নিুমুখী। এতকিছুর মধ্যেও আশার দিক হলো, যতবেশি খারাপের আশঙ্কা করা হয়েছিল, অর্থনীতি ওই পর্যায়ে যায়নি। ইতোমধ্যে করোনার টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এতে মানুষের মনোবল বেড়েছে। এছাড়াও করোনার ধাক্কা মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছে।

মির্জ্জা আজিজ বলেন, করোনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। এতে নতুন করে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, গত ১০ বছরে দেশে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক একটি ধারা ছিল, বর্তমানে সেই ধারাটি অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। ফলে ২০২০ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অনেকটা কমেছে। ইতোমধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে। সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, দারিদ্রবিমোচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছিল। করোনার কারণে সেখানে বিপর্যয় হয়েছে। ২০১৯ সালে দেশে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। কিন্তু বিভিন্ন হিসাব বলছে, ২০২০ সালে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ১০ শতাংশের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে আয় বৈষম্য ছিল। করোনার কারণে সেটি আরও বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। অনেকে শহর থেকে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অনেকের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চতুর্থ বিষয় হলো, করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছিল, সেগুলোর সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল, তার ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে। কিন্তু বড় শিল্পের ক্ষেত্রে এ হার বেশি। এছাড়াও সামাজিক নিরাপত্তার যে সব কর্মসূচি আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি রয়েছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেটে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এদিকে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এর বড় অংশ ব্যবসায়ীদের ঋণ। বৃহৎ, মাঝারি শিল্পে ঋণ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো এবং গার্মেন্ট খাতে কিছুটা নগদ দেয়া হয়েছে। তবে এ ঋণের বিতরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এখনও অধিকাংশ সুবিধাভোগী ঋণ পায়নি। এ প্রণোদনা প্যাকেজের বাইরেও বাজেটে আরও ১০টি পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ, শুধু করোনা মোকাবিলা জন্য স্বাস্থ্য খাতে ৫ হাজার ৫শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। টেস্টিং কিট, মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর কাঁচামাল সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত, চিকিৎসাসামগ্রী এবং জীবাণুমুক্তকরণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে কর রেয়াত দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা, জরুরিভিত্তিতে ৫২৯ কোটি টাকা এবং করোনায় দায়িত্ব পালনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ৮৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১ হাজার ১২৭ কোটি এবং এডিবির অর্থায়নে ১৩৬৬ কোটি টাকার প্রকল্প, করোনার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রফতানিতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া পল্লি সমাজসেবা কার্যক্রমের জন্য ১শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। মূলত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব পড়েছে। অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ২৫ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে যা ২৩ শতাংশ। এর মানে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা টাকা নিতে চান না। এ কারণে ব্যাংকে অসল টাকা জমে আছে। আমানতের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এছাড়া একমাত্র রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য সূচকেও ঘাটতি রয়েছে ব্যাপক। অর্থবছরে রফতানিতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল। কিন্তু ৬ মাসে ১৭ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে। এছাড়াও করোনার কারণে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিডিপি অনুসারে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির দশমিক ৮৭ শতাংশে কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দশমিক ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর এগুলোও অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের হোঁচট খায়। এ অবস্থায় বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম পড়ে যায়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেকে নেমে যায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে মারাত্মক ধস নামে। তেল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর আয় কমে যায়। ফলে অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে শিল্প উৎপাদনের গতি ছিল নিুমুখী। পরের প্রান্তিকে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে কিছুটা বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতির হার। তবে খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার কারণে ২০২০ সালে অর্থনীতিতে প্রাথমিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তা মোটামুটিভাবে সামাল দেয়া বা সামাল দেয়ার চেষ্টায় করা হচ্ছিল। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় হলো, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা কিছুটা সামাল দেয়া গেছে। যেমন রেমিটেন্স ও রফতানিতে ওইভাবে ধস নামেনি। কিন্তু ব্যক্তি অর্থনীতিতে এখনও এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে জিডিপির ৫৫ শতাংশ আসে সেবাখাত থেকে। এই সেবাখাত এখনও পুনরুদ্ধার হয়নি। তাদের জন্য কিছু বরাদ্দ দেয়া হলেও তা পৌঁছানো যায়নি।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনার কারণে অর্থনীতির অনেক খাতে সমস্যা হয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থবছরের প্রথম ৮ মাস শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়। এ রাজস্ব বাড়াতে না পারলে সমস্যা। এ অবস্থার উত্তরণে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত। সবার আগে ব্যাংকিং খাত ঠিক করতে হবে। এছাড়াও সরকারের রাজস্ব আয় এবং রফতানি বাড়ানো জরুরি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস