স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উপহার
jugantor
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উপহার

  ফারুক মঈনউদ্দীন  

১৪ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ছাত্র হিসাবে উন্নয়ন অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক এবং উন্নয়ন কৌশলের বিভিন্ন তত্ত্বে এলডিসি কিংবা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় যখন বাংলাদেশের নাম আসত, তখন একধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগা ছিল আমাদের অবধারিত নিয়তি। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র এবং গাম্বিয়ার সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে শামিল হয়েছিল বাংলাদেশ। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭১ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো ২৪টি দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এগুলোর মধ্যে এশিয়ার ছয়টি এবং ওশেনিয়া মহাদেশের সামোয়া ছাড়া বাকি ১৭টি দেশই ছিল আফ্রিকার। ১৯৭১ সালের পর থেকে নতুন অন্তর্ভুক্তি এবং কিছু দেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে নির্দিষ্ট কিছু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা ও কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব দেশের মধ্যে নবশিল্পায়িত এশিয়ার ব্যাঘ্র চতুষ্টয়ের (হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান) উন্নয়নের চোখ ধাঁধানো উদাহরণ পড়ে শিক্ষার্থীদের কারও মনেও হয়তো স্বপ্নবিলাস জেগে উঠত। দেশগুলোয় ১৯৬০ থেকে পরবর্তী ৩০ বছরে দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্জন করা শনৈ শনৈ উন্নতির মাপকাঠি ছিল তাদের সাত শতাংশের ওপর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি। রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ফলে ষাটের দশকে এসব দেশের রপ্তানির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। কিন্তু তাদের প্রারম্ভিক অর্থনৈতিক অবস্থার তুলনায় বাংলাদেশ যে খুব বেশি পিছিয়ে ছিল, এ কথা বলা যায় না। যদিও পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের দৌড়ে দেশগুলো অনেকখানি এগিয়ে গেছে। যেমন: ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৯৪ ডলার, ১০ বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ারও ছিল ৯৪ ডলার; কিন্তু ১৯৭২ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩২৪ ডলার, আর ২০১৯ সালে দেশটির এ আয় ৩২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও জলবায়ুসম্পন্ন ভিয়েতনামের মাথাপিছু জিডিপি ১৯৭২ সালে ছিল আমাদের চেয়েও কম-৭১ ডলার, যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০০ ডলারে। ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের আরেকটি সাদৃশ্য হচ্ছে দেশটি দীর্ঘ সশস্ত্র গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে তারা শক্তিধর আমেরিকাকে সে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল ১৯৭৩ সালে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশটির সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমরাও গর্ববোধ করতাম। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কিংবা ভিয়েতনাম কখনোই এশিয়ার বাঘ বলে অভিহিত হয়নি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রাক্কালে আমাদের অর্থনীতির ইতিহাস, প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনা নিয়ে এরকম বহু তুলনা এসে হাজির হয়। বর্তমানে যে ভূখণ্ডটি বাংলাদেশ, ১৮২০ সালে সেটি ছিল ৩০০ কোটি ডলারের জাতীয় আয় এবং ১৯৯০ সালের মূল্যে ১৬০ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে বিশ্বের ষোড়শতম বৃহৎ অর্থনীতি। কেবল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ছাড়া আর সবকটি পশ্চিম ইউরোপের দেশ সেসময়ের হিসাবে জাতীয় আয়ের বিচারে ছিল বাংলাদেশের চেয়ে নিচে। তখন চীন এবং ভারতের অর্থনীতির আকার ছিল যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয়। অন্যদিকে জাপান আর যুক্তরাষ্ট্রের স্থান ছিল যথাক্রমে ষষ্ঠ ও নবম। (সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি, ভলিউম ১৭, সংখ্যা ২)।

এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর উন্নয়নের প্রবণতা ও কারণ নির্ধারণ করতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের মূল চালিকাশক্তি ছিল পুঁজি সঞ্চয়ন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি। এর সঙ্গে অবারিত ছিল আর্থসামাজিক পরিবেশের আনুকূল্য এবং সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আচরণ। অর্থাৎ, একটি অনুকূল সামাজিক সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে সেসব দেশ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করে সফল হয়েছিল।

ঠিক এই পথ অনুসরণ না করেও শত প্রতিকূলতা ও ঘাটতি মোকাবিলা করে সম্পূর্ণ নিজস্ব কায়দায় উন্নয়নের যে অভিযাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ, স্বাধীনতা লাভের ৫০ বছরের মাথায় তার একটা মর্যাদাপূর্ণ পরিণতিতে পৌঁছাতে পারা নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয়। এখন থেকে ৯ বছর আগে নিউইয়র্ক টাইমস (২৩ এপ্রিল, ২০১২) এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছিল-বাংলাদেশের ‘অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও পরিবহণ অবকাঠামো, রাজনৈতিক অন্তর্কলহ, আমলাতান্ত্রিকতা, দুর্নীতি এবং একটা দক্ষ জনশক্তির অভাব এখানে বিনিয়োগ পরিবেশকে দুরূহ করে তুলছে। এতৎসত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার গত দশকের বেশির ভাগ সময় ধরে ছয় শতাংশের ওপর অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।’ অথচ এই পত্রিকাটিই বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের ৯ মাসের মাথায় এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে মন্তব্য করেছিল, ‘বাংলাদেশ যে একটা আন্তর্জাতিক অপ্রতিকার্য অবস্থায় (বাস্কেট কেস) পতিত হবে, গত বছর একজন মার্কিন কূটনীতিবিদের এমন কথিত পূর্বাভাষ অন্ততপক্ষে আপাত সত্যে পরিণত হয়েছে।’

উল্লেখ্য, একটা ভুল তথ্য ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বলেছিলেন। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে-১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউজে অনুষ্ঠিত ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এক সভায় ইউএস এইডের উপপ্রশাসক উইলিয়ামের কাছে কিসিঞ্জার জানতে চেয়েছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হবে কি না। জবাবে উইলিয়াম জানান, নিকট ভবিষ্যতে না হলেও অদূর ভবিষ্যতে হবে, তখন দেশটির সব ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন হবে। কিসিঞ্জার এ পর্যায়ে জানতে চান, তখন তাদের উদ্ধার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হবে কি না। এর জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি জনসন মন্তব্য করেন, তারা একটা আন্তর্জাতিক ‘বাস্কেট কেস’ হবে। উল্লেখ্য, এই শব্দবন্ধের অর্থ হচ্ছে নৈরাশ্যজনক বা অকার্যকর কিংবা অপ্রতিকার্য অবস্থা, (সরকার বা প্রতিষ্ঠানের) খুব খারাপ অবস্থা বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি ইত্যাদি। সেসময় এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই ধারণা ছিল না যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসাবে টিকে থাকতে পারবে।

অথচ শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ অখণ্ড পাকিস্তানের দ্বিগুণ বয়সই কেবল লাভ করেনি, বহু বিষয়ে ছাড়িয়ে গেছে একদা পূর্ব বাংলাকে শোষণকারী দেশটিকে। আজ (২০১৯) বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৮৫৬ ডলার, আর পাকিস্তানের ১২৮৫ ডলার। পাকিস্তানের এক পদার্থবিদ ডন পত্রিকার (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯) এক নিবন্ধে লিখেছিলেন বাংলাদেশ হচ্ছে ‘দরিদ্র ও অতিরিক্ত জনবহুল, স্বল্পশিক্ষিত ও দুর্নীতিপরায়ণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ, মাঝে মাঝে জঙ্গি হামলার শিকার... কিন্তু লাইফ সাপোর্টে থাকা একটি দেশের আগেকার ব্যঙ্গচিত্রটি কয়েক বছর আগে উধাও হয়ে গেছে। আজ কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশটি হবে এশিয়ার পরবর্তী বাঘ। গত বছরের প্রবৃদ্ধির হার (৭.৮%) দেশটিকে ভারতের (৮%) সমকক্ষ এবং পাকিস্তানের (৫.৮%) অনেক ওপরে তুলে দিয়েছে।’ নিবন্ধের পরবর্তী অংশে পারভেজ হুদভয় নামের এই নিবন্ধকার ‘খর্বকায় ও প্রায়-কালো বাঙালি, যারা কেবল পাট আর চাল উৎপাদন এবং মাছ ধরায় পারদর্শী’, ‘অদ্ভুত ভাষায় কথা বলা’ জাতিটির বিভিন্ন সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে ধরতে গিয়ে নিজেদের আক্ষেপ লুকাতে পারেননি।

সরকারের যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা ও সঠিক কৌশল যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, তা বিগত বছরগুলোর মাথাপিছু আয়ের হার থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের বছর আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ২৭৮ ডলার, যা পরবর্তী ১০ বছরেও অতিক্রম করা যায়নি (১৯৮৫ সালে ২৪৫ ডলার)। পরবর্তী বছরগুলো বিবেচনা করলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন সরকারের দক্ষতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ মেয়াদের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৫২ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী পাঁচ বছরে এই প্রবৃদ্ধির হার এক লাফে বেড়ে গিয়ে হয়েছিল ২৭.০৫ শতাংশ। আবার সরকার পরিবর্তনের পর ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে এই হার নেমে দাঁড়ায় ১৯.৩৭ শতাংশে। ২০০৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী পাঁচ বছরে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬.৫১ শতাংশে, তারপর ২০১১ থেকে ২০১৫ সালে হয় ৫৯.৭৯ এবং ২০১৬ থেকে ২০১৯ শেষে ৪৮.৭১ শতাংশ।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে, সেটিই হবে আমাদের হেয়প্রতিপন্ন করার সব অতীত বঞ্চনার উপযুক্ত জবাব। কারণ, এই স্বীকৃতি দিচ্ছে বিশ্বসভা এবং আন্তর্জাতিক মহল। আমাদের কেবল মনে রাখতে হবে-এই অর্জনের আত্মতুষ্টিতে আমরা যাতে ভেসে না যাই, উপেক্ষা না করি এই অর্জন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জগুলোকে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও ব্যাংকার

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উপহার

 ফারুক মঈনউদ্দীন 
১৪ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ছাত্র হিসাবে উন্নয়ন অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক এবং উন্নয়ন কৌশলের বিভিন্ন তত্ত্বে এলডিসি কিংবা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় যখন বাংলাদেশের নাম আসত, তখন একধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগা ছিল আমাদের অবধারিত নিয়তি। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র এবং গাম্বিয়ার সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে শামিল হয়েছিল বাংলাদেশ। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭১ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো ২৪টি দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এগুলোর মধ্যে এশিয়ার ছয়টি এবং ওশেনিয়া মহাদেশের সামোয়া ছাড়া বাকি ১৭টি দেশই ছিল আফ্রিকার। ১৯৭১ সালের পর থেকে নতুন অন্তর্ভুক্তি এবং কিছু দেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে নির্দিষ্ট কিছু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা ও কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব দেশের মধ্যে নবশিল্পায়িত এশিয়ার ব্যাঘ্র চতুষ্টয়ের (হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান) উন্নয়নের চোখ ধাঁধানো উদাহরণ পড়ে শিক্ষার্থীদের কারও মনেও হয়তো স্বপ্নবিলাস জেগে উঠত। দেশগুলোয় ১৯৬০ থেকে পরবর্তী ৩০ বছরে দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্জন করা শনৈ শনৈ উন্নতির মাপকাঠি ছিল তাদের সাত শতাংশের ওপর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি। রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ফলে ষাটের দশকে এসব দেশের রপ্তানির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। কিন্তু তাদের প্রারম্ভিক অর্থনৈতিক অবস্থার তুলনায় বাংলাদেশ যে খুব বেশি পিছিয়ে ছিল, এ কথা বলা যায় না। যদিও পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের দৌড়ে দেশগুলো অনেকখানি এগিয়ে গেছে। যেমন: ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৯৪ ডলার, ১০ বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ারও ছিল ৯৪ ডলার; কিন্তু ১৯৭২ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩২৪ ডলার, আর ২০১৯ সালে দেশটির এ আয় ৩২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও জলবায়ুসম্পন্ন ভিয়েতনামের মাথাপিছু জিডিপি ১৯৭২ সালে ছিল আমাদের চেয়েও কম-৭১ ডলার, যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০০ ডলারে। ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের আরেকটি সাদৃশ্য হচ্ছে দেশটি দীর্ঘ সশস্ত্র গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে তারা শক্তিধর আমেরিকাকে সে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল ১৯৭৩ সালে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশটির সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমরাও গর্ববোধ করতাম। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কিংবা ভিয়েতনাম কখনোই এশিয়ার বাঘ বলে অভিহিত হয়নি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রাক্কালে আমাদের অর্থনীতির ইতিহাস, প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনা নিয়ে এরকম বহু তুলনা এসে হাজির হয়। বর্তমানে যে ভূখণ্ডটি বাংলাদেশ, ১৮২০ সালে সেটি ছিল ৩০০ কোটি ডলারের জাতীয় আয় এবং ১৯৯০ সালের মূল্যে ১৬০ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে বিশ্বের ষোড়শতম বৃহৎ অর্থনীতি। কেবল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ছাড়া আর সবকটি পশ্চিম ইউরোপের দেশ সেসময়ের হিসাবে জাতীয় আয়ের বিচারে ছিল বাংলাদেশের চেয়ে নিচে। তখন চীন এবং ভারতের অর্থনীতির আকার ছিল যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয়। অন্যদিকে জাপান আর যুক্তরাষ্ট্রের স্থান ছিল যথাক্রমে ষষ্ঠ ও নবম। (সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি, ভলিউম ১৭, সংখ্যা ২)।

এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর উন্নয়নের প্রবণতা ও কারণ নির্ধারণ করতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের মূল চালিকাশক্তি ছিল পুঁজি সঞ্চয়ন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি। এর সঙ্গে অবারিত ছিল আর্থসামাজিক পরিবেশের আনুকূল্য এবং সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আচরণ। অর্থাৎ, একটি অনুকূল সামাজিক সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে সেসব দেশ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করে সফল হয়েছিল।

ঠিক এই পথ অনুসরণ না করেও শত প্রতিকূলতা ও ঘাটতি মোকাবিলা করে সম্পূর্ণ নিজস্ব কায়দায় উন্নয়নের যে অভিযাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ, স্বাধীনতা লাভের ৫০ বছরের মাথায় তার একটা মর্যাদাপূর্ণ পরিণতিতে পৌঁছাতে পারা নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয়। এখন থেকে ৯ বছর আগে নিউইয়র্ক টাইমস (২৩ এপ্রিল, ২০১২) এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছিল-বাংলাদেশের ‘অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও পরিবহণ অবকাঠামো, রাজনৈতিক অন্তর্কলহ, আমলাতান্ত্রিকতা, দুর্নীতি এবং একটা দক্ষ জনশক্তির অভাব এখানে বিনিয়োগ পরিবেশকে দুরূহ করে তুলছে। এতৎসত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার গত দশকের বেশির ভাগ সময় ধরে ছয় শতাংশের ওপর অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।’ অথচ এই পত্রিকাটিই বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের ৯ মাসের মাথায় এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে মন্তব্য করেছিল, ‘বাংলাদেশ যে একটা আন্তর্জাতিক অপ্রতিকার্য অবস্থায় (বাস্কেট কেস) পতিত হবে, গত বছর একজন মার্কিন কূটনীতিবিদের এমন কথিত পূর্বাভাষ অন্ততপক্ষে আপাত সত্যে পরিণত হয়েছে।’

উল্লেখ্য, একটা ভুল তথ্য ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বলেছিলেন। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে-১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউজে অনুষ্ঠিত ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এক সভায় ইউএস এইডের উপপ্রশাসক উইলিয়ামের কাছে কিসিঞ্জার জানতে চেয়েছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হবে কি না। জবাবে উইলিয়াম জানান, নিকট ভবিষ্যতে না হলেও অদূর ভবিষ্যতে হবে, তখন দেশটির সব ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন হবে। কিসিঞ্জার এ পর্যায়ে জানতে চান, তখন তাদের উদ্ধার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হবে কি না। এর জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি জনসন মন্তব্য করেন, তারা একটা আন্তর্জাতিক ‘বাস্কেট কেস’ হবে। উল্লেখ্য, এই শব্দবন্ধের অর্থ হচ্ছে নৈরাশ্যজনক বা অকার্যকর কিংবা অপ্রতিকার্য অবস্থা, (সরকার বা প্রতিষ্ঠানের) খুব খারাপ অবস্থা বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি ইত্যাদি। সেসময় এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই ধারণা ছিল না যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসাবে টিকে থাকতে পারবে।

অথচ শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ অখণ্ড পাকিস্তানের দ্বিগুণ বয়সই কেবল লাভ করেনি, বহু বিষয়ে ছাড়িয়ে গেছে একদা পূর্ব বাংলাকে শোষণকারী দেশটিকে। আজ (২০১৯) বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৮৫৬ ডলার, আর পাকিস্তানের ১২৮৫ ডলার। পাকিস্তানের এক পদার্থবিদ ডন পত্রিকার (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯) এক নিবন্ধে লিখেছিলেন বাংলাদেশ হচ্ছে ‘দরিদ্র ও অতিরিক্ত জনবহুল, স্বল্পশিক্ষিত ও দুর্নীতিপরায়ণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ, মাঝে মাঝে জঙ্গি হামলার শিকার... কিন্তু লাইফ সাপোর্টে থাকা একটি দেশের আগেকার ব্যঙ্গচিত্রটি কয়েক বছর আগে উধাও হয়ে গেছে। আজ কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশটি হবে এশিয়ার পরবর্তী বাঘ। গত বছরের প্রবৃদ্ধির হার (৭.৮%) দেশটিকে ভারতের (৮%) সমকক্ষ এবং পাকিস্তানের (৫.৮%) অনেক ওপরে তুলে দিয়েছে।’ নিবন্ধের পরবর্তী অংশে পারভেজ হুদভয় নামের এই নিবন্ধকার ‘খর্বকায় ও প্রায়-কালো বাঙালি, যারা কেবল পাট আর চাল উৎপাদন এবং মাছ ধরায় পারদর্শী’, ‘অদ্ভুত ভাষায় কথা বলা’ জাতিটির বিভিন্ন সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে ধরতে গিয়ে নিজেদের আক্ষেপ লুকাতে পারেননি।

সরকারের যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা ও সঠিক কৌশল যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, তা বিগত বছরগুলোর মাথাপিছু আয়ের হার থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের বছর আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ২৭৮ ডলার, যা পরবর্তী ১০ বছরেও অতিক্রম করা যায়নি (১৯৮৫ সালে ২৪৫ ডলার)। পরবর্তী বছরগুলো বিবেচনা করলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন সরকারের দক্ষতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ মেয়াদের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৫২ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী পাঁচ বছরে এই প্রবৃদ্ধির হার এক লাফে বেড়ে গিয়ে হয়েছিল ২৭.০৫ শতাংশ। আবার সরকার পরিবর্তনের পর ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে এই হার নেমে দাঁড়ায় ১৯.৩৭ শতাংশে। ২০০৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী পাঁচ বছরে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬.৫১ শতাংশে, তারপর ২০১১ থেকে ২০১৫ সালে হয় ৫৯.৭৯ এবং ২০১৬ থেকে ২০১৯ শেষে ৪৮.৭১ শতাংশ।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে, সেটিই হবে আমাদের হেয়প্রতিপন্ন করার সব অতীত বঞ্চনার উপযুক্ত জবাব। কারণ, এই স্বীকৃতি দিচ্ছে বিশ্বসভা এবং আন্তর্জাতিক মহল। আমাদের কেবল মনে রাখতে হবে-এই অর্জনের আত্মতুষ্টিতে আমরা যাতে ভেসে না যাই, উপেক্ষা না করি এই অর্জন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জগুলোকে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও ব্যাংকার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অগ্নিঝরা মার্চ

২১ মার্চ, ২০২১
১৮ মার্চ, ২০২১