বৈষম্যবিলোপের চেতনাপুষ্ট মানবিক মূল্যবোধ দরকার
jugantor
বৈষম্যবিলোপের চেতনাপুষ্ট মানবিক মূল্যবোধ দরকার

  নিরঞ্জন অধিকারী  

২৪ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারী হিসাবে নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করি। আরও সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসরদের কালো হাত এড়িয়ে আজও বেঁচে আছি এবং দেশের জনগণের সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছি।

শুধু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীই নয়, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষ পূর্তিও উদ্যাপন করছি। আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে, ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ, যাকে জাতিসংঘ একটি কালজয়ী এবং বিশেষ স্বীকৃতি দিয়ে তালিকাভুক্ত করেছে- তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে স্বকর্ণে শুনেছি। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি আরও একটি কারণে। তা হলো : আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন শব্দসৈনিক হিসেবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি।

১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেন। দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু সুকৌশলে স্বাধীনতার ডাকটা দিয়েই দেন। এ থেকে বুঝতে হবে- আলোচনা ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাই ২৬-এ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। সে ঘোষণা টেলেক্সের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। আলোচনার টেবিল থেকে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে আটক রাখা হয়।

রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঘোষিত হয় স্বাধীনতা। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের যে চার নীতি ঘোষণা করেন, সেগুলো হলো ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র।

কিন্তু স্বৈরাচারী শোষকগোষ্ঠী ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী বিশ্বমোড়লরা থেমে থাকে না। তারা সুকৌশলে মধ্যম পর্যায়ে কিছু সামরিক কর্মকর্তাদের নানা অজুহাতে উত্তেজিত করে এবং কাজে লাগায়। তারা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্য ও অন্যদের হত্যা করে। জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন বলে বেঁচে যান।

পরে আবার সামরিক শাসন, আবার প্রহসনমূলক গণতন্ত্র- এভাবেই চলতে থাকে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় চার নীতি থেকে বাদ পড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী অবাধে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, এটাই ধর্মনিরপেক্ষতা। সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গৃহীত হয় অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার।

এ শুধু পরিভাষার পরিবর্তন নয়- এ নীতির পরিবর্তন, আদর্শের পরিবর্তন। এত সব পরিবর্তন ও ভাঙাগড়ার মধ্যে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। জননেত্রী শেখ হাসিনা জনবান্ধব বেশকিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। একটি বাড়ি একটি খামার, গৃহহীনে গৃহদান, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গৃহের ব্যবস্থা।

কমিউনিটি হাসপাতাল। বিনা বেতনে ডিগ্রি পর্যন্ত নারী শিক্ষাব্যবস্থা প্রভৃতি কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছেন। এসবই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন, সাম্প্রদায়িক শক্তির মূলোৎপাটন, প্রগতিশীল মানবিক মূল্যবোধ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও নারীর সমধিক ক্ষমতায়ন। নারীর অধিকারের স্বীকৃতি, পুরুষতান্ত্রিকতার অবসান, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমতার বোধ প্রভৃতি যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে, অর্থাৎ মূল ব্যবস্থাটির আমূল পরিবর্তন না হলে, সমতার প্রত্যাশা পূরণ হবে না। সেই লক্ষ্যে সরকারকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থেকে কাজ করতে হবে। জনগণকেও সচেতন করে তুলতে হবে। ছড়িয়ে দিতে হবে শিক্ষা ও সচেতনতার আলো।

তবেই আমরা পূরণ করতে পারব আমাদের প্রত্যাশা। অন্ধকারে জ্বলে উঠবে আলো। এ আলো এমনি এমনি জ্বলে উঠবে না। তার জন্য দরকার সংগ্রাম, দরকার সততা, নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণতা। দরকার বৈষম্যবিলোপের চেতনাপুষ্ট মানবিক মূল্যবোধ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দ্বারা এ চেতনা যাতে জাগ্রত হয়, তার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের প্রাপ্তি কম নয়, কিন্তু তা সর্বগামী হয়নি, এ সত্যটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধু সব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা চিরজাগ্রত রাখতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন সাম্প্রদায়িকতার চিরসমাধি। এসব প্রত্যাশা সর্বাংশে পূরণ হয়নি। এসব প্রত্যাশা পূরণের সনিষ্ঠ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ঘটবে সেই পরম প্রাপ্তি, বঙ্গবন্ধু যা চেয়েছিলেন, এখনো শোষিত-বঞ্চিত দেশবাসী যা চায়। আর এ প্রচেষ্টা, এ আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক নয়, তা এ সংক্রান্ত মূল্যবোধ অর্জনের জন্য এক সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

লেখক : সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক, সংস্কৃতি বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বৈষম্যবিলোপের চেতনাপুষ্ট মানবিক মূল্যবোধ দরকার

 নিরঞ্জন অধিকারী 
২৪ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারী হিসাবে নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করি। আরও সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসরদের কালো হাত এড়িয়ে আজও বেঁচে আছি এবং দেশের জনগণের সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছি।

শুধু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীই নয়, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষ পূর্তিও উদ্যাপন করছি। আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে, ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ, যাকে জাতিসংঘ একটি কালজয়ী এবং বিশেষ স্বীকৃতি দিয়ে তালিকাভুক্ত করেছে- তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে স্বকর্ণে শুনেছি। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি আরও একটি কারণে। তা হলো : আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন শব্দসৈনিক হিসেবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি।

১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেন। দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু সুকৌশলে স্বাধীনতার ডাকটা দিয়েই দেন। এ থেকে বুঝতে হবে- আলোচনা ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাই ২৬-এ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। সে ঘোষণা টেলেক্সের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। আলোচনার টেবিল থেকে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে আটক রাখা হয়।

রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঘোষিত হয় স্বাধীনতা। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের যে চার নীতি ঘোষণা করেন, সেগুলো হলো ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র।

কিন্তু স্বৈরাচারী শোষকগোষ্ঠী ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী বিশ্বমোড়লরা থেমে থাকে না। তারা সুকৌশলে মধ্যম পর্যায়ে কিছু সামরিক কর্মকর্তাদের নানা অজুহাতে উত্তেজিত করে এবং কাজে লাগায়। তারা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্য ও অন্যদের হত্যা করে। জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন বলে বেঁচে যান।

পরে আবার সামরিক শাসন, আবার প্রহসনমূলক গণতন্ত্র- এভাবেই চলতে থাকে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় চার নীতি থেকে বাদ পড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী অবাধে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, এটাই ধর্মনিরপেক্ষতা। সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গৃহীত হয় অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার।

এ শুধু পরিভাষার পরিবর্তন নয়- এ নীতির পরিবর্তন, আদর্শের পরিবর্তন। এত সব পরিবর্তন ও ভাঙাগড়ার মধ্যে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। জননেত্রী শেখ হাসিনা জনবান্ধব বেশকিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। একটি বাড়ি একটি খামার, গৃহহীনে গৃহদান, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গৃহের ব্যবস্থা।

কমিউনিটি হাসপাতাল। বিনা বেতনে ডিগ্রি পর্যন্ত নারী শিক্ষাব্যবস্থা প্রভৃতি কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছেন। এসবই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন, সাম্প্রদায়িক শক্তির মূলোৎপাটন, প্রগতিশীল মানবিক মূল্যবোধ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও নারীর সমধিক ক্ষমতায়ন। নারীর অধিকারের স্বীকৃতি, পুরুষতান্ত্রিকতার অবসান, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমতার বোধ প্রভৃতি যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে, অর্থাৎ মূল ব্যবস্থাটির আমূল পরিবর্তন না হলে, সমতার প্রত্যাশা পূরণ হবে না। সেই লক্ষ্যে সরকারকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থেকে কাজ করতে হবে। জনগণকেও সচেতন করে তুলতে হবে। ছড়িয়ে দিতে হবে শিক্ষা ও সচেতনতার আলো।

তবেই আমরা পূরণ করতে পারব আমাদের প্রত্যাশা। অন্ধকারে জ্বলে উঠবে আলো। এ আলো এমনি এমনি জ্বলে উঠবে না। তার জন্য দরকার সংগ্রাম, দরকার সততা, নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণতা। দরকার বৈষম্যবিলোপের চেতনাপুষ্ট মানবিক মূল্যবোধ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দ্বারা এ চেতনা যাতে জাগ্রত হয়, তার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের প্রাপ্তি কম নয়, কিন্তু তা সর্বগামী হয়নি, এ সত্যটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধু সব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা চিরজাগ্রত রাখতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন সাম্প্রদায়িকতার চিরসমাধি। এসব প্রত্যাশা সর্বাংশে পূরণ হয়নি। এসব প্রত্যাশা পূরণের সনিষ্ঠ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ঘটবে সেই পরম প্রাপ্তি, বঙ্গবন্ধু যা চেয়েছিলেন, এখনো শোষিত-বঞ্চিত দেশবাসী যা চায়। আর এ প্রচেষ্টা, এ আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক নয়, তা এ সংক্রান্ত মূল্যবোধ অর্জনের জন্য এক সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

লেখক : সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক, সংস্কৃতি বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অগ্নিঝরা মার্চ

২১ মার্চ, ২০২১
১৮ মার্চ, ২০২১