সতর্ক করলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা

নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে সাত শঙ্কা

টাকার খেলা ও শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ বড় বাধা * বিভিন্ন অজুহাতে পথে গড়াবে আন্দোলন * আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ * প্রবেশপথ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ * বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে আজ বৈঠক

  কাজী জেবেল ২২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে সাত শঙ্কা

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে ওই এলাকার পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানিয়ে তারা বলেছেন, অন্তত সাত মাধ্যমে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। রাজনৈতিক, জাতীয় ও শিল্প ইস্যুতে এ এলাকায় গড়ে উঠতে পারে বড় ধরনের আন্দোলন। এর সুযোগে হতে পারে নাশকতাও।

শনিবার গাজীপুরে বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে রিটার্নিং কর্মকর্তার অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল’-এর বৈঠকে এ শঙ্কা প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা।

সেই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ারও সুপারিশ করেন তারা। বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এ তথ্য।

তারা বলেন, বৈঠকে ঘুরেফিরে ভোট কেনাবেচা ও প্রচারণায় টাকার খেলার বিষয়টি উঠে আসে। এসব টাকার জোগান দিতে এ শিল্প এলাকায় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নামে ব্যাপক চাঁদাবাজির শঙ্কা প্রকাশ করেন একাধিক সদস্য।

আরও যেসব শঙ্কার কথা বলা হয় এর মধ্যে রয়েছে- অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনা, বস্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হলে বহিরাগতদের অবস্থান ও অপতৎপরতা এবং ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে নাশকতার চেষ্টা।

টঙ্গীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। দু’জন সংসদ সদস্যের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে- তাদের বাড়িতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আসা-যাওয়া বাড়তে পারে। এ ছাড়া বৈঠকে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

এসব কারণে মোবাইল কোর্ট জোরদার এবং পুলিশ ও র‌্যাবের টহল বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছি।

বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের কিছু শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। আমরা সেসব মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। নির্বাচনী পরিবেশ ভালো রয়েছে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আমরা সব ধরনের পদক্ষেপ নেব। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আগামী ২৩ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হবে প্রার্থীদের প্রচার। আগামী ১৫ মে গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

রিটার্নিং কর্মকর্তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জীব কুমার দেবনাথ, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার গাজীপুরের উপপরিচালক মো. মোর্শেদ আলম, র‌্যাব-১-এর কোম্পানি কমান্ডার মো. আবদুস সালাম, গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম, গাজীপুর আনসারের সার্কেল অ্যাডজুটেন্ট মো. আলমগীর হোসেন, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সিটি নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. তারিফুজ্জামানসহ কমিটির অন্য সদস্যরা অংশ নেন। বেলা ১১টা থেকে প্রায় ১টা পর্যন্ত এ বৈঠক চলে।

আজ বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী, ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঢাকা বিভাগীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

শনিবারের বৈঠকে এক কর্মকর্তা বলেন, ৩৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে সাত পয়েন্টে প্রবেশ ও বাহির হওয়া যায়।

এগুলো দিয়ে খুব সহজেই বহিরাগতরা সিটি এলাকায় ঢুকে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটাতে পারে। প্রবেশপথগুলো হচ্ছে- আশুলিয়া, কাশিমপুর, রাজেন্দ্রপুর, পূর্বাচল সীমানা, চন্দ্রা, আবদুল্লাহপুর ও কালীগঞ্জ। এসব পয়েন্টে একাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি ও নজরদারি বাড়াতে হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়, তিনটি সরকারি কলেজ ও ২০টির বেশি বেসরকারি কলেজ রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের হলে বহিরাগতরা অবস্থান করছে।

কোটা সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আন্দোলন হলে তার রেশ ধরে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও বহিরাগতরা গাজীপুর সিটিতেও কোটা সংস্কার আন্দোলনে নামতে পারে।

ওই আন্দোলনের নামে নাশকতা চালাতে পারে। এর প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ডুয়েট) কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

আরেক কর্মকর্তা বৈঠকে জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় ২৫ লাখ মানুষের বসবাস। এর ৫০ শতাংশ শ্রমিক। এদের বড় অংশই ভাসমান। নির্বাচনে এসব শ্রমিককে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করবে।

এমনকি তাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা চালাতে পারে। ফলে এ নির্বাচনে টাকার খেলা মুখ্য হয়ে উঠতে পারে, যা আচরণবিধি ও আইনের পরিপন্থী।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রচুরসংখ্যক গার্মেন্ট রয়েছে। ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের পাঁচ বছর পূর্তি ও মহান মে দিবস উপলক্ষে সিটি কর্পোরেশন এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিক সমাবেশ ও আন্দোলন হতে পারে।

ওই সময় নিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া কিছু গার্মেন্টে শ্রমিকদের মধ্যে চাপা অসন্তোষের খবর গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হলে তাতে নির্বাচনী পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে।

বৈঠকে এক কর্মকর্তা জানান, গাজীপুরে দেড় শতাধিক মাদ্রাসা ও এতিমখানা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের টাকার বিনিময়ে ভোটের মাঠে নামানো হতে পারে।

এমনকি ধর্মীয় উসকানি দিয়ে তাদেরকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়, গাজীপুরের বস্তিগুলোয় সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্র মজুদ হতে পারে।

দু’জন স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম উল্লেখ করে বৈঠকে বলা হয়েছে, তাদের বাসায় অন্য এলাকার এমপিরা অবস্থান নিয়ে নির্বাচন প্রভাবিত করতে পারেন। ওইসব এমপির বাসভবনে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

বৈঠকে সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে- টঙ্গী পুলিশ ফাঁড়িকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে। পুলিশ ও র‌্যাবের প্রচুরসংখ্যক সদস্য দৃশ্যমান টহল দেবেন। টহল টিমে যেসব র‌্যাব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের তালিকা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দেয়া হবে।

রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সরাসরি টহলে থাকা র‌্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

বর্তমানে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আচরণবিধি প্রতিপালনে ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন তাদেরকে তৎপরতা আরও বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে বৈঠকে।

সিদ্ধান্ত হয়েছে ২৪ এপ্রিল থেকে ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।

বৈঠকের বিষয়ে গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. তারিফুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এ নির্বাচন ইসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক তাদের দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করবেন- তাদের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা করেছি।

ঘটনাপ্রবাহ : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter