দিনের গুরুত্বপূর্ণ সব কাজই হয় রাতে
jugantor
সুনামগঞ্জে গার্ডার ভেঙে পড়া আলোচিত ব্রিজ
দিনের গুরুত্বপূর্ণ সব কাজই হয় রাতে

  নেসারুল হক খোকন, সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে  

০৪ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের পাগলা-জগন্নাথপুর সড়কে কুন্দানালা খালের ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজের গার্ডার ভেঙে পড়ার ঘটনাটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ঘটেছে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম দায়িত্বহীনতার কারণে। যদিও ঘটনার পর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এটিকে দুর্ঘটনা বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। চলমান তদন্ত রিপোর্টও ওই পথে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। যেখানে দেখা গেছে, ব্রিজ নির্মাণে দিনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজই করা হয়েছে রাতের অন্ধকারে। এলাকাবাসীর চোখ ফাঁকি দিতে মূলত এই পথ বেছে নেওয়া হয়। ব্রিজ নির্মাণের প্রতিটি ধাপে সাগর চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেওয়া হয়েছে সব নিম্নমানের সিমেন্ট ও রড। এমনকি পাইলিংয়ের রিংয়ে ২৪টির পরিবর্তে ১২টি রড দেওয়া হয়। এ রকম নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে এলাকায় যেসব সচেতন শ্রমিক প্রতিবাদ করেছেন তাদের কাজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া টাকা দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনেকের মুখ বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে তারা ব্যর্থ হন। গার্ডার স্থাপনের সময় হাইড্রোলিক জ্যাক ফেটে সেটি ভেঙে পড়লে অনেক শ্রমিক হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সত্যকে আড়াল করে ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দিতে এমন উদ্ভট তথ্য দিচ্ছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের সুনামগঞ্জের কর্মকর্তারা।

এদিকে তদন্ত কমিটির প্রধান যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও অনুবিভাগ) মো. জাকির হোসেন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘গার্ডার স্থানান্তর করতে যে মেশিনটি ব্যবহার করা হয় সেটি শিডিউল অনুযায়ী ছিল না। এই মেশিনের সাহায্যে লিকুইড দেওয়া হয়। একটা পর্যায়ে এসে তার ছিঁড়ে যায়। এ কারণে গার্ডারের একপাশ কাত হয়ে পড়ে। এভাবে একটা আরেকটার ওপর পড়ে সবগুলোই ভেঙে যায়। তিনি বলেন, কাগজপত্রে যন্ত্রটি পাওয়ারফুল বলা হলেও বাস্তবে তা ঠিক ছিল না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গার্ডার স্থাপনের সময় সেখানে সওজের কোনো প্রকৌশলী বা কোনো সদস্য ছিলেন না।’

উল্লেখিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামের মুখোমুখি হলে তিনি যুগান্তরের কাছে অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। তবে রাতে গার্ডার স্থাপনের সময় তার কোনো কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত না থাকার বিষয়টি তিনি এক পর্যায়ে স্বীকার করে নেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মাণাধীন কুন্দানালা সেতুর ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়ে। ওই সময় সাধারণ শ্রমিক ছাড়া কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা কোনো প্রকৌশলী উপস্থিত ছিলেন না। রাতে এ ঘটনা ঘটলেও কর্মকর্তারা সেখানে যান পরদিন দুপুর বেলা। কর্মকর্তারা যাওয়ার ৫ ঘণ্টা আগেই সাংবাদিকরা সকাল ৮টায় সেখানে উপস্থিত হন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার জন্য সব চেষ্টা করেন।

পাগলা-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউসকান্দি আঞ্চলিক সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেতুটি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের নির্বাচনী এলাকার। আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পে সাতটি ব্রিজ নির্মাণে মোট ১১০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। কাজ পেয়েছে যৌথ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরা হলেন- এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি এমএম বিল্ডার্সের মালিক মহিউদ্দিন। এ বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সারা দেননি।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা : ছাতকের ভাতগাঁও গ্রামের শিব্বির আহমদ গার্ডার ভেঙে পড়ার শব্দ শুনেছেন। কুন্দানালা ব্রিজের পাশেই তার এক নিকটাত্মীয়ের ফার্ম রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন রাত পর্যন্ত বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ব্রিজের ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়ে। এ ঘটনার প্রায় এক মাস আগে গার্ডার স্থাপনের কাজ শেষ হয়। ব্রিজের কাজ বলতে ওই সময় দুই পাড়ে অ্যাপ্রোস (ব্রিজের নিচসহ দুই পাড়ে ব্লক বসিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন) রোডের কাজ চলছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে গার্ডারগুলো ভেঙে পড়ে। এর আগে একজন ইঞ্জিনিয়ার এখানে এসে কাজ ভুল হওয়ার কথা বলে ঠিক করতে বলেন। পরদিন ১২টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে সুনামগঞ্জের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। দুপুর ১টার দিকে সওজের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম এসে বলেছেন এটা দুর্ঘটনা।

তিনি বলেন, তখন এলাকাবাসী দুর্ঘটনা শব্দের প্রতিবাদ জানায়। লোকজন প্রতিবাদ করল কেন জানতে চাইলে বলেন, ‘কাজের মান আগে থেকেই খারাপ হওয়ায় কয়েকজন স্থানীয় শ্রমিক প্রতিবাদ করে কাজ হারিয়েছেন। রড সিমেন্টের অধিকাংশ কাজ করা হতো রাতে। পাইলিংয়ে রড কম দেওয়ার প্রতিবাদ করায় শ্রমিককে বিদায় করে দেওয়া হয়। গার্ডার ধসে পড়ার পর পরিদর্শনে আসা শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এসব বিষয়ে মুখ না খুলতে প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন যুবককে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।’

শিব্বির বলেন, যেদিন (৫ মার্চ) সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেন ওইদিন ঠিকাদার ও সুনামগঞ্জের সওজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে এক ধরনের করডন বা ঘিরে রাখেন। যাতে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে না পারেন। ওই অবস্থার মধ্যেই কয়েকজন যুবক সব বাধা ডিঙিয়ে শেষ পর্যন্ত কথা বলতে সক্ষম হন। এ সময় অভিযোগ দিয়ে বলা হয়, ‘এখানকার সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা দুর্নীতিবাজ।’ পাইলিংয়ে রড কম দেওয়ার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে কর্মকর্তাদের বলা হয়, ‘শিডিউল অনুযায়ী যদি রড পান তাহলে যে শাস্তি দেবেন মাথা পেতে নেব। কিন্তু এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘটনা দেখতে এসেই ঠিকাদারের পক্ষে কথা বলা শুরু করেন। এ কারণে প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও এ বিষয়ে কথা বলে কোনো ফল পাওয়া যায়নি।’

রড-সিমেন্ট কম দেওয়ার সাক্ষী : ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের চলমান আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পে সবগুলো ব্রিজের মালামাল দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মাহতাব উদ্দিন নামক একজনকে। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানের সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী ভাতগাঁও গ্রামে। স্বচক্ষে কী দেখেছেন জানতে চাইলে মাহতাব যুগান্তরকে বলেন, এই সড়কে যে কয়টি ব্রিজে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে সবগুলো ব্রিজেই রড কম দেওয়া হয়েছে। আমি এ বিষয়ে প্রতিবাদ করে একদিন বললাম, ‘আপনারা যেভাবে রড কম দিচ্ছেন তাতে তো যে কোনো সময় এই ব্রিজ ভেঙে পড়বে। এলাকার বদনাম হবে। আমার কথা শুনে কাজ থেকেই বিদায় করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো ব্রিজের টেস্ট ফাইল করেছে, কোনোটার করেনি। রড কম দেওয়ার দৃশ্য দেখে প্রতিবাদ করলাম। তখন পাইলিংয়ের গর্তে দ্রুত রডের খাঁচা ভেতরে ঢুকিয়ে ঢালাই দিয়ে দেয়। পাইলিংয়ের সম্পূর্ণ কাজ হয়েছে রাতে।’

কুন্দানালা ব্রিজে কাজ করেছেন এমন আরেক শ্রমিক কামরুল ইসলাম। তার বাড়িও ভাতগাঁও গ্রামে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রায় এক মাস কাজ করেছি ব্রিজে। সেখানে দিনে কোনো কাজ হয় না। দিনের বেলায় সাটারিংয়ের কাজ হয়। সন্ধ্যার পর স্থানীয় শ্রমিকদের বিদায় করে দিয়ে রড-সিমেন্টের কাজ করা হয়েছে। সবগুলো ব্রিজেই একই অবস্থা করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করার পর কাজ থেকেই বিদায় করে দেওয়া হয়।’

ঘটনার পরদিন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তার একটি ভিডিও চিত্র পাওয়া যায়। এ সময় তাকে বলতে শোনা যায়, হাইড্রোলিক জ্যাক ফেইল করায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়নি। এটা ঠিকাদারের ব্যর্থতা। এই দুর্ঘটনায় ঠিকাদারের ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে দাবি করেন একই বিভাগের আরেকজন সহকারী প্রকৌশলী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা বিল পরিশোধ করার তথ্য নির্বাহী প্রকৌশলী গোপন করেন। এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, পাগলা জগন্নাথপুর রোডে ২১৩০০৩নং আইডিতে প্যাকেজভিত্তিকভাবে একসঙ্গে তিনটি ব্রিজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ৫১ কোটি ৮৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৮ টাকায় এই তিনটি ব্রিজ নির্মাণে কার্যাদেশ দেওয়া হয় তিন ঠিকাদারি (জেভি) প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠান তিনটির অনুকূলে ২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে ব্রিজ নির্মাণ সংক্রান্ত দরপত্রে শর্ত পূরণ করতে গিয়ে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে (জেবি) যোগ্যতা অর্জন করে। এই ধারাবাহিকতায় বিলও পরিশোধ করা হচ্ছে প্যাকেজভিত্তিকভাবে। এই বিল পরিশোধ সংক্রান্ত নথিপত্রের ৯নং বিলে দেখা যায়, তিনটি ব্রিজের এই প্যাকেজে ৮৭২ মিটার লম্বা এবং ৭৫০ মি.মিটার ব্যাশ (ডায়া) পাইলিংয়ে ধরা হয় এক কোটি ২২ লাখ টাকা। এই পাইলিংয়ে বিল দেওয়া হয় এক কোটি ২১ লাখ টাকা। রড ধরা হয় ৫২৫ টন, যার দাম ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এই রডেরও সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করা হয়ে গেছে। পাইলিংয়ের ৬টি লোড টেস্ট ধরা হয় ১০ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এটাও পরিশোধ করা হয়। মোট ৫ কোটি ৭৭ লাখ ১৩ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে শুধু পাইলিংয়ে। এরপর ব্রিজের গার্ডার বসানোর উপযোগী করার জন্য তিনটি ব্রিজের ৬টি এভাডমেন্ট (দুই পাড়ে গার্ডার বসানোর উঁচু ডালাই করা স্থান) বাবদ বিল ধরা হয় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিল পরিশোধ করা হয় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা।

নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্যে তথ্য বিভ্রাট : এ বিষয়ে জানতে চাইলে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, একেকটি গার্ডারের ওজন ১৬০ টন। ৫টি গার্ডারের ওজন ৮শ’ টন। খুব সূক্ষ্মভাবে এই গার্ডার বসানোর সময় জ্যাক ফেল করে। তিনি বলেন, একেকটি গার্ডার বসাতেই সময় লাগে ৪-৫ ঘণ্টা। জ্যাক দিয়ে যখন গার্ডার আলগি দেওয়া হয় তখন হাইড্রোলিক লিকুইড পাইপ ফেটে ৫টিই ভেঙে পড়ে। নির্বাহী প্রকৌশলী গার্ডার ভেঙে পড়ার এই বিষয়টি প্রতিবেদককে বোঝাতে সময় নেন অন্তত ১০ মিনিট। ইঞ্জিনিয়ারিং কায়দায় পুরোপুরি ম্যাপ অঙ্কন করে তিনি জটিল করে এই বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন। তার ১০ মিনিটের এই ক্লাসে ধারণা করা হচ্ছে- কোনো সাধারণ ঠিকাদার বা শ্রমিকের পক্ষে এই গার্ডার বসানো কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। গার্ডার বসাতে অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রকৌশলীর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা। নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে জানতে চাওয়া হয় অনেক জটিল এই গার্ডার স্থাপনের সময় সেখানে আপনি বা সওজের কোনো প্রকৌশলী উপস্থিত ছিলেন কিনা? এ সময় তিনি অনেকটা হতভম্ব হয়ে জবাব দেন, ‘আমাদের লোক ওই সময় ছিল না।’ আপনাদের লোক ছাড়া এত জটিল বিষয়টি সাধারণ শ্রমিকরা কীভাবে ফিটিং করল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকরা দেখিয়ে দিয়েছে আর কী।’ সেখানে রাতে কাজ হয় কেন? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না না, রাতে কাজ করে না। ঘটনা তো বিকাল ৫টার দিকে। এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, রাত ৭ থেকে ৮টার মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। আপনি বলছেন বিকালে। এলাকার লোকজন বলছে রাতে কাজ করেছে, আপনি অস্বীকার করছেন কেন? জবাবে জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকার লোকজন রং ইনফরমেশন দিয়েছে। গার্ডার স্থাপনের আগে বুয়েটে টেস্ট করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে বলেন, সব টেস্ট করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলেছেন পাইলিংয়ে রড কম দেওয়া হয়েছে। যদি রড কম দেওয়া হয় তাহলে যাচাই করার উপায় কী? জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, পাইলিংয়ে রড কম দেওয়ার সুযোগ নেই। পাইলিংয়ে রড কম দিলে ভেইজেই ফেল করবে। রড কম দেওয়া হলে গার্ডারে যে লোড আছে সেগুলো তো নিতে পারবে না। অভিযোগ যাচাই করার কোনো সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, অনেকেই তো অনেক কিছু বলে। বললে কী করার আছে। রড-সিমেন্ট ও অন্যান্য সামগ্রীর বুয়েট টেস্ট আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবই করা হয়েছে। এ সময় দেখতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে আমার কাছে এসব কিছুই নেই। কী কী লাগবে বলেন, সব সংগ্রহ করে দিতে পারব। এরপর গত ২৫ মার্চ বিকালে এপ্রোভাল মিক্স ডিজাইন, রড টেস্ট, সিমেন্ট টেস্ট, বালি ও পাথর টেস্টের রিপোর্ট চেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর ই-মেইলে আবেদন করা হয়। এরপর গত এক সপ্তাহেও তা পাওয়া যায়নি। শনিবার এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এসব তথ্য দিতে হলে এখন আবার তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে।’

সুনামগঞ্জে গার্ডার ভেঙে পড়া আলোচিত ব্রিজ

দিনের গুরুত্বপূর্ণ সব কাজই হয় রাতে

 নেসারুল হক খোকন, সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে 
০৪ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের পাগলা-জগন্নাথপুর সড়কে কুন্দানালা খালের ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজের গার্ডার ভেঙে পড়ার ঘটনাটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ঘটেছে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম দায়িত্বহীনতার কারণে। যদিও ঘটনার পর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এটিকে দুর্ঘটনা বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। চলমান তদন্ত রিপোর্টও ওই পথে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। যেখানে দেখা গেছে, ব্রিজ নির্মাণে দিনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজই করা হয়েছে রাতের অন্ধকারে। এলাকাবাসীর চোখ ফাঁকি দিতে মূলত এই পথ বেছে নেওয়া হয়। ব্রিজ নির্মাণের প্রতিটি ধাপে সাগর চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেওয়া হয়েছে সব নিম্নমানের সিমেন্ট ও রড। এমনকি পাইলিংয়ের রিংয়ে ২৪টির পরিবর্তে ১২টি রড দেওয়া হয়। এ রকম নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে এলাকায় যেসব সচেতন শ্রমিক প্রতিবাদ করেছেন তাদের কাজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া টাকা দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনেকের মুখ বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে তারা ব্যর্থ হন। গার্ডার স্থাপনের সময় হাইড্রোলিক জ্যাক ফেটে সেটি ভেঙে পড়লে অনেক শ্রমিক হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সত্যকে আড়াল করে ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দিতে এমন উদ্ভট তথ্য দিচ্ছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের সুনামগঞ্জের কর্মকর্তারা।

এদিকে তদন্ত কমিটির প্রধান যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও অনুবিভাগ) মো. জাকির হোসেন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘গার্ডার স্থানান্তর করতে যে মেশিনটি ব্যবহার করা হয় সেটি শিডিউল অনুযায়ী ছিল না। এই মেশিনের সাহায্যে লিকুইড দেওয়া হয়। একটা পর্যায়ে এসে তার ছিঁড়ে যায়। এ কারণে গার্ডারের একপাশ কাত হয়ে পড়ে। এভাবে একটা আরেকটার ওপর পড়ে সবগুলোই ভেঙে যায়। তিনি বলেন, কাগজপত্রে যন্ত্রটি পাওয়ারফুল বলা হলেও বাস্তবে তা ঠিক ছিল না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গার্ডার স্থাপনের সময় সেখানে সওজের কোনো প্রকৌশলী বা কোনো সদস্য ছিলেন না।’

উল্লেখিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামের মুখোমুখি হলে তিনি যুগান্তরের কাছে অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। তবে রাতে গার্ডার স্থাপনের সময় তার কোনো কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত না থাকার বিষয়টি তিনি এক পর্যায়ে স্বীকার করে নেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মাণাধীন কুন্দানালা সেতুর ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়ে। ওই সময় সাধারণ শ্রমিক ছাড়া কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা কোনো প্রকৌশলী উপস্থিত ছিলেন না। রাতে এ ঘটনা ঘটলেও কর্মকর্তারা সেখানে যান পরদিন দুপুর বেলা। কর্মকর্তারা যাওয়ার ৫ ঘণ্টা আগেই সাংবাদিকরা সকাল ৮টায় সেখানে উপস্থিত হন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার জন্য সব চেষ্টা করেন।

পাগলা-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউসকান্দি আঞ্চলিক সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেতুটি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের নির্বাচনী এলাকার। আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পে সাতটি ব্রিজ নির্মাণে মোট ১১০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। কাজ পেয়েছে যৌথ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরা হলেন- এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি এমএম বিল্ডার্সের মালিক মহিউদ্দিন। এ বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সারা দেননি।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা : ছাতকের ভাতগাঁও গ্রামের শিব্বির আহমদ গার্ডার ভেঙে পড়ার শব্দ শুনেছেন। কুন্দানালা ব্রিজের পাশেই তার এক নিকটাত্মীয়ের ফার্ম রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন রাত পর্যন্ত বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ব্রিজের ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়ে। এ ঘটনার প্রায় এক মাস আগে গার্ডার স্থাপনের কাজ শেষ হয়। ব্রিজের কাজ বলতে ওই সময় দুই পাড়ে অ্যাপ্রোস (ব্রিজের নিচসহ দুই পাড়ে ব্লক বসিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন) রোডের কাজ চলছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে গার্ডারগুলো ভেঙে পড়ে। এর আগে একজন ইঞ্জিনিয়ার এখানে এসে কাজ ভুল হওয়ার কথা বলে ঠিক করতে বলেন। পরদিন ১২টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে সুনামগঞ্জের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। দুপুর ১টার দিকে সওজের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম এসে বলেছেন এটা দুর্ঘটনা।

তিনি বলেন, তখন এলাকাবাসী দুর্ঘটনা শব্দের প্রতিবাদ জানায়। লোকজন প্রতিবাদ করল কেন জানতে চাইলে বলেন, ‘কাজের মান আগে থেকেই খারাপ হওয়ায় কয়েকজন স্থানীয় শ্রমিক প্রতিবাদ করে কাজ হারিয়েছেন। রড সিমেন্টের অধিকাংশ কাজ করা হতো রাতে। পাইলিংয়ে রড কম দেওয়ার প্রতিবাদ করায় শ্রমিককে বিদায় করে দেওয়া হয়। গার্ডার ধসে পড়ার পর পরিদর্শনে আসা শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এসব বিষয়ে মুখ না খুলতে প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন যুবককে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।’

শিব্বির বলেন, যেদিন (৫ মার্চ) সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেন ওইদিন ঠিকাদার ও সুনামগঞ্জের সওজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে এক ধরনের করডন বা ঘিরে রাখেন। যাতে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে না পারেন। ওই অবস্থার মধ্যেই কয়েকজন যুবক সব বাধা ডিঙিয়ে শেষ পর্যন্ত কথা বলতে সক্ষম হন। এ সময় অভিযোগ দিয়ে বলা হয়, ‘এখানকার সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা দুর্নীতিবাজ।’ পাইলিংয়ে রড কম দেওয়ার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে কর্মকর্তাদের বলা হয়, ‘শিডিউল অনুযায়ী যদি রড পান তাহলে যে শাস্তি দেবেন মাথা পেতে নেব। কিন্তু এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘটনা দেখতে এসেই ঠিকাদারের পক্ষে কথা বলা শুরু করেন। এ কারণে প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও এ বিষয়ে কথা বলে কোনো ফল পাওয়া যায়নি।’

রড-সিমেন্ট কম দেওয়ার সাক্ষী : ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের চলমান আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পে সবগুলো ব্রিজের মালামাল দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মাহতাব উদ্দিন নামক একজনকে। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানের সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী ভাতগাঁও গ্রামে। স্বচক্ষে কী দেখেছেন জানতে চাইলে মাহতাব যুগান্তরকে বলেন, এই সড়কে যে কয়টি ব্রিজে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে সবগুলো ব্রিজেই রড কম দেওয়া হয়েছে। আমি এ বিষয়ে প্রতিবাদ করে একদিন বললাম, ‘আপনারা যেভাবে রড কম দিচ্ছেন তাতে তো যে কোনো সময় এই ব্রিজ ভেঙে পড়বে। এলাকার বদনাম হবে। আমার কথা শুনে কাজ থেকেই বিদায় করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো ব্রিজের টেস্ট ফাইল করেছে, কোনোটার করেনি। রড কম দেওয়ার দৃশ্য দেখে প্রতিবাদ করলাম। তখন পাইলিংয়ের গর্তে দ্রুত রডের খাঁচা ভেতরে ঢুকিয়ে ঢালাই দিয়ে দেয়। পাইলিংয়ের সম্পূর্ণ কাজ হয়েছে রাতে।’

কুন্দানালা ব্রিজে কাজ করেছেন এমন আরেক শ্রমিক কামরুল ইসলাম। তার বাড়িও ভাতগাঁও গ্রামে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রায় এক মাস কাজ করেছি ব্রিজে। সেখানে দিনে কোনো কাজ হয় না। দিনের বেলায় সাটারিংয়ের কাজ হয়। সন্ধ্যার পর স্থানীয় শ্রমিকদের বিদায় করে দিয়ে রড-সিমেন্টের কাজ করা হয়েছে। সবগুলো ব্রিজেই একই অবস্থা করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করার পর কাজ থেকেই বিদায় করে দেওয়া হয়।’

ঘটনার পরদিন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তার একটি ভিডিও চিত্র পাওয়া যায়। এ সময় তাকে বলতে শোনা যায়, হাইড্রোলিক জ্যাক ফেইল করায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়নি। এটা ঠিকাদারের ব্যর্থতা। এই দুর্ঘটনায় ঠিকাদারের ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে দাবি করেন একই বিভাগের আরেকজন সহকারী প্রকৌশলী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা বিল পরিশোধ করার তথ্য নির্বাহী প্রকৌশলী গোপন করেন। এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, পাগলা জগন্নাথপুর রোডে ২১৩০০৩নং আইডিতে প্যাকেজভিত্তিকভাবে একসঙ্গে তিনটি ব্রিজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ৫১ কোটি ৮৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৮ টাকায় এই তিনটি ব্রিজ নির্মাণে কার্যাদেশ দেওয়া হয় তিন ঠিকাদারি (জেভি) প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠান তিনটির অনুকূলে ২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে ব্রিজ নির্মাণ সংক্রান্ত দরপত্রে শর্ত পূরণ করতে গিয়ে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে (জেবি) যোগ্যতা অর্জন করে। এই ধারাবাহিকতায় বিলও পরিশোধ করা হচ্ছে প্যাকেজভিত্তিকভাবে। এই বিল পরিশোধ সংক্রান্ত নথিপত্রের ৯নং বিলে দেখা যায়, তিনটি ব্রিজের এই প্যাকেজে ৮৭২ মিটার লম্বা এবং ৭৫০ মি.মিটার ব্যাশ (ডায়া) পাইলিংয়ে ধরা হয় এক কোটি ২২ লাখ টাকা। এই পাইলিংয়ে বিল দেওয়া হয় এক কোটি ২১ লাখ টাকা। রড ধরা হয় ৫২৫ টন, যার দাম ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এই রডেরও সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করা হয়ে গেছে। পাইলিংয়ের ৬টি লোড টেস্ট ধরা হয় ১০ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এটাও পরিশোধ করা হয়। মোট ৫ কোটি ৭৭ লাখ ১৩ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে শুধু পাইলিংয়ে। এরপর ব্রিজের গার্ডার বসানোর উপযোগী করার জন্য তিনটি ব্রিজের ৬টি এভাডমেন্ট (দুই পাড়ে গার্ডার বসানোর উঁচু ডালাই করা স্থান) বাবদ বিল ধরা হয় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিল পরিশোধ করা হয় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা।

নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্যে তথ্য বিভ্রাট : এ বিষয়ে জানতে চাইলে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, একেকটি গার্ডারের ওজন ১৬০ টন। ৫টি গার্ডারের ওজন ৮শ’ টন। খুব সূক্ষ্মভাবে এই গার্ডার বসানোর সময় জ্যাক ফেল করে। তিনি বলেন, একেকটি গার্ডার বসাতেই সময় লাগে ৪-৫ ঘণ্টা। জ্যাক দিয়ে যখন গার্ডার আলগি দেওয়া হয় তখন হাইড্রোলিক লিকুইড পাইপ ফেটে ৫টিই ভেঙে পড়ে। নির্বাহী প্রকৌশলী গার্ডার ভেঙে পড়ার এই বিষয়টি প্রতিবেদককে বোঝাতে সময় নেন অন্তত ১০ মিনিট। ইঞ্জিনিয়ারিং কায়দায় পুরোপুরি ম্যাপ অঙ্কন করে তিনি জটিল করে এই বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন। তার ১০ মিনিটের এই ক্লাসে ধারণা করা হচ্ছে- কোনো সাধারণ ঠিকাদার বা শ্রমিকের পক্ষে এই গার্ডার বসানো কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। গার্ডার বসাতে অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রকৌশলীর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা। নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে জানতে চাওয়া হয় অনেক জটিল এই গার্ডার স্থাপনের সময় সেখানে আপনি বা সওজের কোনো প্রকৌশলী উপস্থিত ছিলেন কিনা? এ সময় তিনি অনেকটা হতভম্ব হয়ে জবাব দেন, ‘আমাদের লোক ওই সময় ছিল না।’ আপনাদের লোক ছাড়া এত জটিল বিষয়টি সাধারণ শ্রমিকরা কীভাবে ফিটিং করল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকরা দেখিয়ে দিয়েছে আর কী।’ সেখানে রাতে কাজ হয় কেন? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না না, রাতে কাজ করে না। ঘটনা তো বিকাল ৫টার দিকে। এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, রাত ৭ থেকে ৮টার মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। আপনি বলছেন বিকালে। এলাকার লোকজন বলছে রাতে কাজ করেছে, আপনি অস্বীকার করছেন কেন? জবাবে জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকার লোকজন রং ইনফরমেশন দিয়েছে। গার্ডার স্থাপনের আগে বুয়েটে টেস্ট করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে বলেন, সব টেস্ট করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলেছেন পাইলিংয়ে রড কম দেওয়া হয়েছে। যদি রড কম দেওয়া হয় তাহলে যাচাই করার উপায় কী? জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, পাইলিংয়ে রড কম দেওয়ার সুযোগ নেই। পাইলিংয়ে রড কম দিলে ভেইজেই ফেল করবে। রড কম দেওয়া হলে গার্ডারে যে লোড আছে সেগুলো তো নিতে পারবে না। অভিযোগ যাচাই করার কোনো সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, অনেকেই তো অনেক কিছু বলে। বললে কী করার আছে। রড-সিমেন্ট ও অন্যান্য সামগ্রীর বুয়েট টেস্ট আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবই করা হয়েছে। এ সময় দেখতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে আমার কাছে এসব কিছুই নেই। কী কী লাগবে বলেন, সব সংগ্রহ করে দিতে পারব। এরপর গত ২৫ মার্চ বিকালে এপ্রোভাল মিক্স ডিজাইন, রড টেস্ট, সিমেন্ট টেস্ট, বালি ও পাথর টেস্টের রিপোর্ট চেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর ই-মেইলে আবেদন করা হয়। এরপর গত এক সপ্তাহেও তা পাওয়া যায়নি। শনিবার এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এসব তথ্য দিতে হলে এখন আবার তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন