গভর্নরের কাছে তথ্য চেয়ে দুদকের চিঠি
jugantor
পিকে হালদারের জালিয়াতি
গভর্নরের কাছে তথ্য চেয়ে দুদকের চিঠি

  মিজান মালিক  

০৪ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চারটি লিজিং কোম্পানি থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লুটের ঘটনায় জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদের মধ্যে সাবেক ডেপুটি গভর্নর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন বর্তমান নির্বাহী পরিচালক রয়েছেন। বাকিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন টিমের সদস্য।

গত পাঁচ বছরে পিপলস লিজিংসহ, ইন্টারন্যাশনাল ও এফএএস ফাইন্যান্স লিজিংয়ের দুর্নীতি ধরার নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন টিম কী করেছে সে রহস্য উন্মোচন করতে চায় দুদক। কেন টিমের সদস্যরা পিকে হালদার বা লিজিং প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উদঘাটন করতে পারল না তা নিশ্চিত করা দরকার বলে জানায় দুদক। পাঁচ বছরের এ সংক্রান্ত পরিদর্শন প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দেন দুদকের পরিচালক বেনজীর আহম্মেদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও ইচ্ছাকৃত গাফিলতি বা কুমতলব উদঘাটিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তালিকায় এসকে সুরের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তার স্ত্রী সুপর্ণা, শাহ আলমের দুই স্ত্রী শাহীন আক্তার শেলী ও নাসরিন বেগম এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এভিপি আল মামুন সোহাগ, অতসী মৃধা ও অভিক সিনহা। এই আটজনের বিদেশ গমনের ওপর?ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দুদক।

অপরদিকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্সের থেকে ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মর্টগেজ ছাড়া প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার ঘটনায় পিকে হালদার ও সংশ্লিষ্ট লিজিংয়ের এমডিসহ ৭০ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ২০টি মামলা করা হচ্ছে। জানা গছে, এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ কমিশনের কাছে উপস্থাপন করেছেন দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। তথ্যে বলছে, আরবি এন্টারপ্রাইজ, জিএন্ডজি এন্টারপ্রাইজ, তামিম অ্যান্ড তালহা এন্টারপ্রাইজ, ক্রসরোড করপোরেশন, মেরিন ট্রাস্ট, নিউটেক, এমএসটি মেরিন, গ্রীনলাইন ডেভেলপমেন্ট, মেসার্স বর্ণসহ প্রায় ২০টির মতো অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণের নামে ওই সব অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। পিকে হালদার ছাড়াও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, এমডি নামধারী প্রায় ৭০ জন এ ঘটনায় জড়িত।

দুদকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামান্য একজন কর্মচারী হয়ে পিকে হালদার বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাকে হাত করে কয়েক বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে দেশ ছাড়েন।

২০১৯ সালের অক্টোবরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে তখন হঠাৎ দুদকে ৬০-৬৫ জনের নামের তালিকা ধরে অনুসন্ধান শুরু হয়, সেখানে তার নাম থাকলেও পরিচয় ছিল না।

একজন পরিচালক বলেন, পরে পিকে হালদারের আসল চেহারা দুদকই উন্মোচন করে। এদিকে দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংস্থাটির আরেক টিমের কাছে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর লিখিতভাবে আরেকটি অভিযোগ আসে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউর কাছে তথ্য চেয়ে পত্র দেয় দুদক। এই প্রেক্ষিতে বিএফআইইউ টিম গঠন করে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং এবং এফএএস ফাইন্যান্স পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করে। সেই প্রতিবেদন গত বছরের ৭ জুলাই দুদকের মানি লন্ডারিং শাখার মহাপরিচালকের কাছে পাঠায়। বিএফআইইউর প্রতিবেদন পাওয়ার পরই দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৮৩ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেন। পর্যায়ক্রমে ৫২ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞাও দেন। ইতোমধ্যে পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাতে পাঁচটি মামলা হয়। যেখানে পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান, পরিচালক সামসুল আরেফিন আলামিনসহ প্রায় ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ১১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতে ১৫টি মামলা হয়েছে। যেখানে পিকে হালদারসহ ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের চেয়ারম্যান এমএ হাশেম, বাসুদেব ব্যানার্জি, নওশেরুল ইসলাম, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দীসহ প্রায় ৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পিকে হালদারের ঘটনায় এ পর্যন্ত দুদক পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি রাশেদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত এমডি সৈয়দ আবেদ হাসান, পিকের দুই প্রেমিকা অবন্তিকা বড়াল, নাহিদা রুনাইসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে ৬ জন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। দুদক পিকে হালদারের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ফ্রিজ ও ক্রোক করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা লুট করে, প্রায় একই মালিকানাধীন আরও প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পিপলস লিজিং থেকে একই কায়দায় আরও প্রায় ৭৫০০ কোটি টাকা ঋণের নামে লুটে নেয়। এফএএস ফাইন্যান্স থেকে ২২০০ কোটি টাকা, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে ২৫০০ কোটি টাকা, পিপলস লিজিং থেকে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে।

পিকে হালদারের জালিয়াতি

গভর্নরের কাছে তথ্য চেয়ে দুদকের চিঠি

 মিজান মালিক 
০৪ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চারটি লিজিং কোম্পানি থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লুটের ঘটনায় জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদের মধ্যে সাবেক ডেপুটি গভর্নর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন বর্তমান নির্বাহী পরিচালক রয়েছেন। বাকিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন টিমের সদস্য।

গত পাঁচ বছরে পিপলস লিজিংসহ, ইন্টারন্যাশনাল ও এফএএস ফাইন্যান্স লিজিংয়ের দুর্নীতি ধরার নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন টিম কী করেছে সে রহস্য উন্মোচন করতে চায় দুদক। কেন টিমের সদস্যরা পিকে হালদার বা লিজিং প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উদঘাটন করতে পারল না তা নিশ্চিত করা দরকার বলে জানায় দুদক। পাঁচ বছরের এ সংক্রান্ত পরিদর্শন প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দেন দুদকের পরিচালক বেনজীর আহম্মেদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও ইচ্ছাকৃত গাফিলতি বা কুমতলব উদঘাটিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তালিকায় এসকে সুরের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তার স্ত্রী সুপর্ণা, শাহ আলমের দুই স্ত্রী শাহীন আক্তার শেলী ও নাসরিন বেগম এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এভিপি আল মামুন সোহাগ, অতসী মৃধা ও অভিক সিনহা। এই আটজনের বিদেশ গমনের ওপর?ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দুদক।

অপরদিকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্সের থেকে ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মর্টগেজ ছাড়া প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার ঘটনায় পিকে হালদার ও সংশ্লিষ্ট লিজিংয়ের এমডিসহ ৭০ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ২০টি মামলা করা হচ্ছে। জানা গছে, এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ কমিশনের কাছে উপস্থাপন করেছেন দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। তথ্যে বলছে, আরবি এন্টারপ্রাইজ, জিএন্ডজি এন্টারপ্রাইজ, তামিম অ্যান্ড তালহা এন্টারপ্রাইজ, ক্রসরোড করপোরেশন, মেরিন ট্রাস্ট, নিউটেক, এমএসটি মেরিন, গ্রীনলাইন ডেভেলপমেন্ট, মেসার্স বর্ণসহ প্রায় ২০টির মতো অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণের নামে ওই সব অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। পিকে হালদার ছাড়াও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, এমডি নামধারী প্রায় ৭০ জন এ ঘটনায় জড়িত।

দুদকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামান্য একজন কর্মচারী হয়ে পিকে হালদার বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাকে হাত করে কয়েক বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে দেশ ছাড়েন।

২০১৯ সালের অক্টোবরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে তখন হঠাৎ দুদকে ৬০-৬৫ জনের নামের তালিকা ধরে অনুসন্ধান শুরু হয়, সেখানে তার নাম থাকলেও পরিচয় ছিল না।

একজন পরিচালক বলেন, পরে পিকে হালদারের আসল চেহারা দুদকই উন্মোচন করে। এদিকে দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংস্থাটির আরেক টিমের কাছে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর লিখিতভাবে আরেকটি অভিযোগ আসে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউর কাছে তথ্য চেয়ে পত্র দেয় দুদক। এই প্রেক্ষিতে বিএফআইইউ টিম গঠন করে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং এবং এফএএস ফাইন্যান্স পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করে। সেই প্রতিবেদন গত বছরের ৭ জুলাই দুদকের মানি লন্ডারিং শাখার মহাপরিচালকের কাছে পাঠায়। বিএফআইইউর প্রতিবেদন পাওয়ার পরই দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৮৩ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেন। পর্যায়ক্রমে ৫২ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞাও দেন। ইতোমধ্যে পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাতে পাঁচটি মামলা হয়। যেখানে পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান, পরিচালক সামসুল আরেফিন আলামিনসহ প্রায় ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ১১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতে ১৫টি মামলা হয়েছে। যেখানে পিকে হালদারসহ ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের চেয়ারম্যান এমএ হাশেম, বাসুদেব ব্যানার্জি, নওশেরুল ইসলাম, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দীসহ প্রায় ৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পিকে হালদারের ঘটনায় এ পর্যন্ত দুদক পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি রাশেদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত এমডি সৈয়দ আবেদ হাসান, পিকের দুই প্রেমিকা অবন্তিকা বড়াল, নাহিদা রুনাইসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে ৬ জন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। দুদক পিকে হালদারের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ফ্রিজ ও ক্রোক করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা লুট করে, প্রায় একই মালিকানাধীন আরও প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পিপলস লিজিং থেকে একই কায়দায় আরও প্রায় ৭৫০০ কোটি টাকা ঋণের নামে লুটে নেয়। এফএএস ফাইন্যান্স থেকে ২২০০ কোটি টাকা, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে ২৫০০ কোটি টাকা, পিপলস লিজিং থেকে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন