স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত যানজট-দুর্ভোগ
jugantor
লকডাউন’র দ্বিতীয় দিন
স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত যানজট-দুর্ভোগ
রিকশা-অটোরিকশায় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় * গণপরিবহণ ছাড়া সবকিছুই আগের মতো

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৭ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত সাত দিনের বিধিনিষেধের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবারও ছিল ঢিলেঢালা। গণপরিবহণ ও শপিংমল ছাড়া সারা দেশে সবকিছুই চলেছে স্বাভাবিক নিয়মে। রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল ছিল স্বাভাবিক সময়ের মতোই। এ কারণে দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট লক্ষ করা গেছে।

তবে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় কর্মজীবী মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। কাঁচাবাজার, পরিবহণ, দোকানপাট ও ফুটপাতে আগের মতোই মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে চলাচল করতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিু আয়ের মানুষের বাইরে চলাচল ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান, সড়ক ও কাঁচাবাজারে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। মঙ্গলবারও শপিংমল এবং সবধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে নিউমার্কেট, মিরপুরসহ সারা দেশে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা।

অফিস, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবা কার্যক্রম চালু থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বাধ্য হয়েই অফিসে যেতে হয়েছে। গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা এবং মোটরসাইকেলে তারা কর্মস্থলে যান। তবে ভাড়া গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ।

সরকার ঘোষিত ১১ দফা বিধিনিষেধ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের ১৮ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ, র‌্যাব, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় মাঠে থাকলেও তা পরিচালিত হয়েছে নামকাওয়াস্তে। ট্রাফিক পুলিশকে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা আটকে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে দেখা গেছে। অনেককে মামলাও দিয়েছেন তারা। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকায় সংক্ষুব্ধ নগরবাসী।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকার মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, জিগাতলা, নিউমার্কেট, আজিমপুর, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, মগবাজার, মহাখালী, বনানী, কুড়িল প্রগতি সরণিসহ রাজধানীর সড়কগুলোয় বেসরকারি গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা, মোটরসাইকেলের আধিক্য ছিল।

দুপুর দেড়টার দিকে বিজয় সরণি ওভারপাসের মুখে গাড়ির দীর্ঘ জট লক্ষ করা গেছে। এসব এলাকার ফুটপাত সংলগ্ন চায়ের দোকান, ডাব, ফুচকা ও বাদাম বিক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিক্ষাভবন, সচিবালয়, মতিঝিল ক্যাপিটাল মার্কেট, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আশপাশের সড়কের সামনে অফিশিয়াল বাস, মাইক্রোবাস পার্কিং করে রাখতে দেখা গেছে।

কুড়িল চৌরাস্তার চা-কফি শপের স্বত্বাধিকারী ইমরুল কায়েস সরকারি বিধিনিষেধ মেনে সোমবার দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে তিনি দোকান খোলেন। এ দোকানদার জানান, একবার পুলিশ এসেছিল। তিনি তাদের বলেছেন সামনে রমজান। আমাদের ব্যবসা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এখন দোকান বন্ধ রাখলে সংসার চালাতে কষ্ট হবে। পুলিশ তাকে একটি শাটার বন্ধ রেখে দোকান খোলা রাখতে বলেন। কিন্তু তিনি দুটো শাটার খুলেই চা, কফি ও বিস্কুট বিক্রি করছেন।

আরও দেখা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার, কাপ্তান বাজার, গুলশানের কাঁচাবাজারে ক্রেতা-বিক্রেতারা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে কেনাবেচা করছেন। রাজধানীর মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির পণ্য ক্রয়ের দীর্ঘ লাইনে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করতে দেখা যায়। মতিঝিলে লাইনে দাঁড়ানো কামাল হোসেন বলেন, ভাই দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে আছি। ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আপনার এসব কথা আমাদের ভালো লাগছে না। দূরত্ব রেখে দাঁড়ালে মাঝখানে এসে অন্যরা দাঁড়িয়ে যায়। এ কারণে দূরত্ব মানছি না। কারণ, মানুষের অনেক চাপ দ্রুতই পণ্য শেষ হয়ে যাবে।

রামপুরার ইউলুপের নিচে কথা হয় অটোরিকশা চালক রুস্তম ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সরকার কঠোর বিধিনিষেধ (লকডাউন) ঘোষণা করলেও সড়কে যাত্রী কমেনি। আর বসে থাকলে তো কেউ ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে আসবে না। তাই অটোরিকশা নিয়ে বের হয়েছি। স্বাভাবিক সময়ের মতো যাত্রী পাচ্ছি। সড়ক ফাঁকা থাকায় দ্রুত চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে।

রাজধানী বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, শপিংমলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। এসব জায়গায় অলস বসে থাকা শ্রমিকরা আড্ডা দিয়ে, লুডু, দাবা, তাস খেলে সময় কাটিয়েছেন। এ ছাড়া গাবতলী বাস টার্মিনালে গান গেয়ে এবং বাঁশি বাজিয়ে সময় কাটাতে দেখা গেছে শ্রমিকদের।

এ টার্মিনালের সামনের চায়ের দোকানগুলোয়ও পরিবহণ শ্রমিকদের জটলা লক্ষ করা গেছে। এ বিষয়ে সায়েদাবাস বাস টার্মিনালের পরিবহণ শ্রমিক মো. শহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, করোনা প্রতিরোধে সরকারি কঠোর বিধিনিষেধ চলছে, গণপরিবহণ বন্ধ। অলস সময় তাই আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছি।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চাঁদনীচক শপিংমলের সামনে ব্যবসায়ীরা শপিংমল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। তারা বলেন, অফিস, শিল্প-কলকারখানা খোলা থাকলেও দোকানপাট বন্ধ কেন? এখন ব্যবসার মৌসুম, এ সময়ে ব্যবসা করতে না-পারলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।

সকালে মিরপুর এলাকার ব্যবসায়ীরা ১০ নম্বর গোলচত্বরে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় তারা ১০ নম্বর থেকে ১ নম্বর পর্যন্ত মিছিল করেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবিলম্বে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শপিংমল খুলে দেওয়ার দাবি জানান তারা। গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় মঙ্গলবারও বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে প্রাইভেট কার ভাড়া করে গ্রামে যেতে দেখা গেছে অনেককে।

জরিমানা করেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না বিধিনিষেধ : নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নানা ছুতোয় নগরবাসীর বাইরে বেরোনো ঠেকানো যায়নি। ফলে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় দুপুরে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসুর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসে। এ সময় স্বাস্থ্যবিধি না-মানায় ২৫ জনকে ১২ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া প্রায় ৮ শতাধিক মানুষের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয় মাস্ক। দুপুর ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সেখানে অভিযান চলে। অভিযানে সহযোগিতা করে র‌্যাব-৩।

অভিযানের সময় শাপলা চত্বর এলাকায় একটি গাড়ি থামিয়ে কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করেন ম্যাজিস্ট্রেট। গাড়িতে থাকা ব্যক্তির উত্তর, ‘পাখির খাবার আনতে।’ ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, বিধিনিষেধ কথা বলে তো সময় দেওয়া হয়েছিল, তখন কী করেছেন। উত্তরে ওই ব্যক্তি বললেন, অন্য কাজ ছিল বের হতে পারিনি।

পরে ওই ব্যক্তিকে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মো. মামুনুর রশিদ ঢাকার ধানমন্ডি ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, তা দেখা হচ্ছে। সায়েন্সল্যাব মোড়ে বেলা দেড়টার দিকে দেখা যায়, সেখানে আধা ঘণ্টায় তিনটি মামলা হয়েছে।

তিনজনকে জরিমানা করা হয় আট হাজার টাকা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ‘সিএনজিতে বেশি লোক দেখলে তাদের বোঝাচ্ছি, জরিমানার আওতায় আনছি। সিএনজিতে কেউ হাসপাতালে যাচ্ছে, কেউ রক্ত দিতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, তাদের আইনের আওতায় আনছি। জরিমানার শিকার এক সিএনজিচালক বলেন, ‘ব্যক্তিগত সিএনজি চালানোর জন্য তিন হাজার টাকা জরিমানা করেছে। রোগী নিয়ে ঢাকা মেডিকেল থেকে যাচ্ছিলাম। তারপরও জরিমানা করেছে। এর আগে ধানমন্ডিতে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালানো হয়।

শ্রমিকদের খাবার নিশ্চিতের দাবি ইনসাবের : দেশে প্রায় ৮০ ভাগ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে নিু আয়ের দিনমজুর মানুষ। নির্মাণ সেক্টরেই রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ নির্মাণ শ্রমিক। গত বছরের দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনে কর্মহীন হয় এসব শ্রমকি। ক্ষুধার্ত পরিবারের খাবার মেটানোর জন্য তারা বিভিন্ন মহলে ধরনা দিয়ে ত্রাণ ও প্রণোদনা পাননি। নিম্নআয়ের মানুষগুলো সহায়-সম্বল হারিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থায় পুনরায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। তাই চলমান লকডাউনে দিনমজুরদের খাবার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব)। মঙ্গলবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. রবিউল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলী হোসেন এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান।

চট্টগ্রামেও কর্মজীবী মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ : লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রামে কর্মস্থলমুখী লোকজনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। নগরীর সব কটি মোড়ে মোড়ে ছিল ব্যাপক ভিড়। গণপরিবহণ না-থাকায় রিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে করে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।

এদিকে সকাল ১০টার দিকে চান্দগাঁও রাস্তারমাথা এলাকা থেকে দু-একটি বাস ও টেম্পো স্বল্প দূরত্বে ছাড়লেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার মুখে পড়েছে। তবে সড়কে ব্যক্তিগত যানবাহন প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল চলাচল করছে। নগরজুড়ে পর্যাপ্ত রিকশা থাকলেও ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণ। নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন ৯ জন ম্যাজিস্ট্রেট।

ইপিজেডে একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি প্রতিদিন মদুনাঘাট থেকে ইপিজেডে আসা-যাওয়া করে চাকরি করি। এমনিতেই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, তার ওপর লকডাউনের কারণে কারখানা খোলা রাখায় ১২-১৫ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে কাজে যোগ দিতে হচ্ছে। লকডাউনের সঙ্গে অফিস-আদালত বন্ধ রাখলে এ দুর্ভোগ হতো না।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, ‘লকডাউনে সরকারি নির্দেশনা তদারকি করতে ৯ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মঙ্গলবার মাঠে ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর মধ্যে ছয়জন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও তিনজন বিআরটির ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করেন।’

লকডাউন’র দ্বিতীয় দিন

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত যানজট-দুর্ভোগ

রিকশা-অটোরিকশায় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় * গণপরিবহণ ছাড়া সবকিছুই আগের মতো
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত সাত দিনের বিধিনিষেধের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবারও ছিল ঢিলেঢালা। গণপরিবহণ ও শপিংমল ছাড়া সারা দেশে সবকিছুই চলেছে স্বাভাবিক নিয়মে। রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল ছিল স্বাভাবিক সময়ের মতোই। এ কারণে দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট লক্ষ করা গেছে।

তবে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় কর্মজীবী মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। কাঁচাবাজার, পরিবহণ, দোকানপাট ও ফুটপাতে আগের মতোই মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে চলাচল করতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিু আয়ের মানুষের বাইরে চলাচল ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান, সড়ক ও কাঁচাবাজারে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। মঙ্গলবারও শপিংমল এবং সবধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে নিউমার্কেট, মিরপুরসহ সারা দেশে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা।

অফিস, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবা কার্যক্রম চালু থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বাধ্য হয়েই অফিসে যেতে হয়েছে। গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা এবং মোটরসাইকেলে তারা কর্মস্থলে যান। তবে ভাড়া গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ।

সরকার ঘোষিত ১১ দফা বিধিনিষেধ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের ১৮ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ, র‌্যাব, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় মাঠে থাকলেও তা পরিচালিত হয়েছে নামকাওয়াস্তে। ট্রাফিক পুলিশকে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা আটকে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে দেখা গেছে। অনেককে মামলাও দিয়েছেন তারা। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকায় সংক্ষুব্ধ নগরবাসী।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকার মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, জিগাতলা, নিউমার্কেট, আজিমপুর, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, মগবাজার, মহাখালী, বনানী, কুড়িল প্রগতি সরণিসহ রাজধানীর সড়কগুলোয় বেসরকারি গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা, মোটরসাইকেলের আধিক্য ছিল।

দুপুর দেড়টার দিকে বিজয় সরণি ওভারপাসের মুখে গাড়ির দীর্ঘ জট লক্ষ করা গেছে। এসব এলাকার ফুটপাত সংলগ্ন চায়ের দোকান, ডাব, ফুচকা ও বাদাম বিক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিক্ষাভবন, সচিবালয়, মতিঝিল ক্যাপিটাল মার্কেট, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আশপাশের সড়কের সামনে অফিশিয়াল বাস, মাইক্রোবাস পার্কিং করে রাখতে দেখা গেছে।

কুড়িল চৌরাস্তার চা-কফি শপের স্বত্বাধিকারী ইমরুল কায়েস সরকারি বিধিনিষেধ মেনে সোমবার দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে তিনি দোকান খোলেন। এ দোকানদার জানান, একবার পুলিশ এসেছিল। তিনি তাদের বলেছেন সামনে রমজান। আমাদের ব্যবসা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এখন দোকান বন্ধ রাখলে সংসার চালাতে কষ্ট হবে। পুলিশ তাকে একটি শাটার বন্ধ রেখে দোকান খোলা রাখতে বলেন। কিন্তু তিনি দুটো শাটার খুলেই চা, কফি ও বিস্কুট বিক্রি করছেন।

আরও দেখা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার, কাপ্তান বাজার, গুলশানের কাঁচাবাজারে ক্রেতা-বিক্রেতারা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে কেনাবেচা করছেন। রাজধানীর মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির পণ্য ক্রয়ের দীর্ঘ লাইনে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করতে দেখা যায়। মতিঝিলে লাইনে দাঁড়ানো কামাল হোসেন বলেন, ভাই দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে আছি। ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আপনার এসব কথা আমাদের ভালো লাগছে না। দূরত্ব রেখে দাঁড়ালে মাঝখানে এসে অন্যরা দাঁড়িয়ে যায়। এ কারণে দূরত্ব মানছি না। কারণ, মানুষের অনেক চাপ দ্রুতই পণ্য শেষ হয়ে যাবে।

রামপুরার ইউলুপের নিচে কথা হয় অটোরিকশা চালক রুস্তম ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সরকার কঠোর বিধিনিষেধ (লকডাউন) ঘোষণা করলেও সড়কে যাত্রী কমেনি। আর বসে থাকলে তো কেউ ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে আসবে না। তাই অটোরিকশা নিয়ে বের হয়েছি। স্বাভাবিক সময়ের মতো যাত্রী পাচ্ছি। সড়ক ফাঁকা থাকায় দ্রুত চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে।

রাজধানী বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, শপিংমলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। এসব জায়গায় অলস বসে থাকা শ্রমিকরা আড্ডা দিয়ে, লুডু, দাবা, তাস খেলে সময় কাটিয়েছেন। এ ছাড়া গাবতলী বাস টার্মিনালে গান গেয়ে এবং বাঁশি বাজিয়ে সময় কাটাতে দেখা গেছে শ্রমিকদের।

এ টার্মিনালের সামনের চায়ের দোকানগুলোয়ও পরিবহণ শ্রমিকদের জটলা লক্ষ করা গেছে। এ বিষয়ে সায়েদাবাস বাস টার্মিনালের পরিবহণ শ্রমিক মো. শহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, করোনা প্রতিরোধে সরকারি কঠোর বিধিনিষেধ চলছে, গণপরিবহণ বন্ধ। অলস সময় তাই আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছি।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চাঁদনীচক শপিংমলের সামনে ব্যবসায়ীরা শপিংমল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। তারা বলেন, অফিস, শিল্প-কলকারখানা খোলা থাকলেও দোকানপাট বন্ধ কেন? এখন ব্যবসার মৌসুম, এ সময়ে ব্যবসা করতে না-পারলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।

সকালে মিরপুর এলাকার ব্যবসায়ীরা ১০ নম্বর গোলচত্বরে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় তারা ১০ নম্বর থেকে ১ নম্বর পর্যন্ত মিছিল করেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবিলম্বে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শপিংমল খুলে দেওয়ার দাবি জানান তারা। গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় মঙ্গলবারও বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে প্রাইভেট কার ভাড়া করে গ্রামে যেতে দেখা গেছে অনেককে।

জরিমানা করেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না বিধিনিষেধ : নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নানা ছুতোয় নগরবাসীর বাইরে বেরোনো ঠেকানো যায়নি। ফলে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় দুপুরে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসুর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসে। এ সময় স্বাস্থ্যবিধি না-মানায় ২৫ জনকে ১২ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া প্রায় ৮ শতাধিক মানুষের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয় মাস্ক। দুপুর ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সেখানে অভিযান চলে। অভিযানে সহযোগিতা করে র‌্যাব-৩।

অভিযানের সময় শাপলা চত্বর এলাকায় একটি গাড়ি থামিয়ে কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করেন ম্যাজিস্ট্রেট। গাড়িতে থাকা ব্যক্তির উত্তর, ‘পাখির খাবার আনতে।’ ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, বিধিনিষেধ কথা বলে তো সময় দেওয়া হয়েছিল, তখন কী করেছেন। উত্তরে ওই ব্যক্তি বললেন, অন্য কাজ ছিল বের হতে পারিনি।

পরে ওই ব্যক্তিকে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মো. মামুনুর রশিদ ঢাকার ধানমন্ডি ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, তা দেখা হচ্ছে। সায়েন্সল্যাব মোড়ে বেলা দেড়টার দিকে দেখা যায়, সেখানে আধা ঘণ্টায় তিনটি মামলা হয়েছে।

তিনজনকে জরিমানা করা হয় আট হাজার টাকা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ‘সিএনজিতে বেশি লোক দেখলে তাদের বোঝাচ্ছি, জরিমানার আওতায় আনছি। সিএনজিতে কেউ হাসপাতালে যাচ্ছে, কেউ রক্ত দিতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, তাদের আইনের আওতায় আনছি। জরিমানার শিকার এক সিএনজিচালক বলেন, ‘ব্যক্তিগত সিএনজি চালানোর জন্য তিন হাজার টাকা জরিমানা করেছে। রোগী নিয়ে ঢাকা মেডিকেল থেকে যাচ্ছিলাম। তারপরও জরিমানা করেছে। এর আগে ধানমন্ডিতে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালানো হয়।

শ্রমিকদের খাবার নিশ্চিতের দাবি ইনসাবের : দেশে প্রায় ৮০ ভাগ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে নিু আয়ের দিনমজুর মানুষ। নির্মাণ সেক্টরেই রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ নির্মাণ শ্রমিক। গত বছরের দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনে কর্মহীন হয় এসব শ্রমকি। ক্ষুধার্ত পরিবারের খাবার মেটানোর জন্য তারা বিভিন্ন মহলে ধরনা দিয়ে ত্রাণ ও প্রণোদনা পাননি। নিম্ন আয়ের মানুষগুলো সহায়-সম্বল হারিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থায় পুনরায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। তাই চলমান লকডাউনে দিনমজুরদের খাবার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব)। মঙ্গলবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. রবিউল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলী হোসেন এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান।

চট্টগ্রামেও কর্মজীবী মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ : লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রামে কর্মস্থলমুখী লোকজনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। নগরীর সব কটি মোড়ে মোড়ে ছিল ব্যাপক ভিড়। গণপরিবহণ না-থাকায় রিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে করে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।

এদিকে সকাল ১০টার দিকে চান্দগাঁও রাস্তারমাথা এলাকা থেকে দু-একটি বাস ও টেম্পো স্বল্প দূরত্বে ছাড়লেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার মুখে পড়েছে। তবে সড়কে ব্যক্তিগত যানবাহন প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল চলাচল করছে। নগরজুড়ে পর্যাপ্ত রিকশা থাকলেও ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণ। নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন ৯ জন ম্যাজিস্ট্রেট।

ইপিজেডে একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি প্রতিদিন মদুনাঘাট থেকে ইপিজেডে আসা-যাওয়া করে চাকরি করি। এমনিতেই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, তার ওপর লকডাউনের কারণে কারখানা খোলা রাখায় ১২-১৫ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে কাজে যোগ দিতে হচ্ছে। লকডাউনের সঙ্গে অফিস-আদালত বন্ধ রাখলে এ দুর্ভোগ হতো না।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, ‘লকডাউনে সরকারি নির্দেশনা তদারকি করতে ৯ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মঙ্গলবার মাঠে ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর মধ্যে ছয়জন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও তিনজন বিআরটির ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করেন।’
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন