স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে ‘মাথাব্যথা’ নেই কারও
jugantor
‘লকডাউন’র চতুর্থ দিন
স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে ‘মাথাব্যথা’ নেই কারও
স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করলে চরম খেসারত দিতে হবে -আতিকুল ইসলাম * মানুষ জেনেবুঝে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে -ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী * অর্থ সংকটে বাস জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না -খন্দকার এনায়েতুল্লাহ

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ‘লকডাউন’-এর চতুর্থ দিনেও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পদে পদে লঙ্ঘিত হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি। সবার মধ্যে উদাসীনতা দেখা গেছে। এমনকি এসব দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও ছিলেন একরকম নির্বিকার। এ নিয়ে কারও যেন ‘মাথাব্যথা নেই।

ব্যাপকভাবে গণপরিবহণ চলার কারণে অনেক রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হয়েছে। বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মানুষ রাস্তায় বের হয়েছেন। কাঁচাবাজার, মহল্লার দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষের জটলা দেখা গেছে। সেখানে ছিল না কোনো সামাজিক দূরত্ব। মাস্কও ছিল না অনেকের মুখে।

এদিকে সারা দেশে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে পুলিশ, র‌্যাব, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন মাঠে থাকলেও তারা কঠোর ছিল না। ফলে জনজীবনে এর তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার এসব আয়োজন পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। জনগণের ভয় চলে যাওয়ায় সরকারের সতর্কবাণী ও মোবাইল কোর্ট তেমন কোনো কাজে আসছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও রংপুর মহানগরে বিধিনিষেধ শিথিল করার পর দ্বিতীয় দিনের মতো গণপরিবহণ চলাচল করেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে প্রথম দিনের চেয়ে গণপরিবহণগুলোয় যাত্রীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও বেশিরভাগ গণপরিবহণ যাত্রী সংকটে ছিল। কিছু পরিবহণে বেশি যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে। তবে চট্টগ্রামে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী বহনের নজির দেখা গেছে। প্রশাসন ছিল অনেকটা নির্বিকার।

এদিকে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ মেনে দুই সিটে একজন যাত্রী নেওয়ার নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন বাস মালিকরা। এক্ষেত্রে রাজধানীসহ অন্যান্য মহানগরের বাসগুলোয়ও বিধিবিধানের ব্যত্যয় লক্ষ করা গেছে। আর বাসগুলোয় স্যানিটাইজার রাখার বিধান থাকলেও কোনো বাসে তা দেখা যায়নি। আর্থিক সংকটের কারণে এটি রাখতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন বাস মালিকরা। বাসচালক, কন্ডাকটর, যাত্রীদের হরহামেশা মাস্ক না-পরে গণপরিবহণ পরিচালনা ও চলাচল করতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, গণপরিবহণ দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচল করেছে। যাত্রীর সংখ্যা কম ছিল। বিধিনিষেধ মেনে বাস পরিচালনার চেষ্টা হচ্ছে। এর মধ্যে মাস্ক ও দুই সিটে একজন বসানোর নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। একবার যাত্রী পরিবহণ করে পরিবহণগুলো জীবাণুনাশক ব্যবহার করে পরিষ্কার করার কথা থাকলেও সেটা তারা মানতে পারছে না। কেননা, এখানে অনেক খরচের ব্যাপার। আর এখন তো বাস চালিয়ে খরচই ওঠানো যাচ্ছে না।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু, আমরা এখনো স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে সচেতন হতে শিখিনি। গণপরিবহণ চালুর সময় বাসে জীবাণুনাশক লিকুইড ছিটিয়ে স্টার্ট করার নিয়ম। কিন্তু পরিবহণগুলোয় এটা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ভাড়া আদায়কারী, হেলপারদের হাতে বারবার স্যানিটাইজিং করা খুবই জরুরি।

এদিকে রাজধানীর কাঁচাবাজার, রিকশা, অটোরিকশা, লেগুনা, দোকানপাট, সড়ক, ফুটপাত, চায়ের দোকানসহ প্রায় সর্বত্র নিু আয়ের মানুষ ও কর্মজীবী মানুষের মাস্ক না-পরে চলাচল করতে দেখা গেছে। কেউ মাস্ক পরলেও নাক থেকে সেটা সরিয়ে থুতনির নিচে রাখছেন। স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সরকারি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও সেগুলো খুব একটা কাজে আসছে না। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারছে না।

স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিবিধান প্রয়োগের চেয়ে মানুষকে সচেতন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে অভিমত জানিয়েছেন অনেকে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসের মধ্যেই মানুষের জীবন-জীবিকার সমন্বয়ে ভালো ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এর জন্য মাস্ক পরা জরুরি। এর সঙ্গে অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে। কিন্তু, জনগণ সেটা বুঝতে চাচ্ছে না। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নগরবাসীকে বোঝাচ্ছি, জরিমানা করছি এবং শাস্তিও দিচ্ছি। এরপরও মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি পালনের তেমন আগ্রহ দেখছি না। আমরা চেষ্টা অব্যাহত রাখছি, সবাইকে বিষয়টি বুঝতে হবে। নইলে চরম খেসারত দিতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি থেকে প্রতিদিন ১২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এরপরও মানুষ সচেতন হচ্ছেন না। জরিমানা করা হচ্ছে, বোঝানো হচ্ছে। তাতে খুব কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়, মানুষ জেনেবুঝে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন।

সরেজমিন বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর গাবতলী, কলেজগেট, মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-১০, কালশী, কুড়িল এলাকায় স্বল্পসংখ্যক যাত্রী নিয়ে বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। যাত্রী কম থাকায় মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার প্রধান সড়কের পাশে অনেক বাস পার্কিং করে রাখতে দেখা গেছে। জানতে চাইলে বাসচালকরা বলেন, যাত্রী নেই এজন্য আপাতত বন্ধ করে রেখেছি। পরে আবার যাত্রী পরিবহণ শুরু করা হবে।

বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে রাজধানীতে পর্যাপ্ত গণপরিবহণ ছিল। স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে কঠোরতার কথা বলা হলেও চালক, হেলপারদের হরহামেশা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে চলাচল করতে দেখা গেছে। মাস্ক না-পরার বিষয়ে বিহঙ্গ পরিবহণের হেলপার জাহিদুল ইসলাম বলেন, মাস্ক পরে যাত্রী ডাকা যায় না। তবে পকেটে সবসময়ই মাস্ক থাকে। এ গরমে মাস্ক পরে থাকা সম্ভব নয়।

তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর গণপরিবহণগুলো নিয়ম মেনে বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় গণপরিবহণ না-পেয়ে অনেককে রিকশা, হেঁটে বা বিকল্প পরিবহণে চলাচল করতে দেখা গেছে। সন্ধ্যার পর যারা চলাচল করেছে তাদের বেশিরভাগেরই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস মোটরসাইকেল চালুর দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যানজট, গণপরিবহণ সংকট, পরিবহণে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রীসেবার মান তলানিতে পৌঁছেছে। ফলে সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং চালু হয়। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎস হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এটি। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটি চালু করা জরুরি।

খুলনায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না : খুলনা ব্যুরো জানায়, করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণের মধ্যেও খুলনায় মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা কম। ‘লকডাউন’-এর তোয়াক্কা না-করেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে জনসমাগম। মানুষকে মাস্ক পরতে বা স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সচেতন দেখা যায়নি। স্বাস্থ্যবিধি না-মেনেই সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। স্বাস্থ্যবিধি মানতে জনগণকে সচেতন করতে জেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব দেখা গেছে। নগরীর ডাকবাংলোর মোড়, নিউমার্কেট, শিববাড়ির মোড়, পিটিআই, র‌্যায়েলের মোড়সহ বেশিরভাগ স্থানেই দেখা গেছে মানুষের ভিড়। তবে বেশকিছু সংগঠন মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করতে প্রচারণা চালাচ্ছে।

সকাল থেকেই নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়, ডাকবাংলোর মোড়, শান্তিধাম মোড়ে সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। আর সড়কে ছিল ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা যানজট। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সকাল থেকে প্রশাসনেরও তেমন নজরদারি ছিল না। মোড়ে মোড়ে পুলিশ ছিল। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখায়নি। রিকশা, ইজিবাইক ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেট কারসহ ছোট ছোট যানবাহনের কারণে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়।

খুলনা সদর থানার ওসি মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা চেষ্টা করছি মানুষকে সচেতন করতে।

খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নেওয়াজ মাহামুদ বলেন, বিধিনিষেধ যারা মানছেন না তাদের প্রতি প্রশাসনের কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

সিলেটে ঢিলেঢালা ‘লকডাউন’ : সিলেট ব্যুরো জানায়, ‘লকডাউন’-এর প্রথম তিন দিনের তুলনায় চতুর্থ দিনে সিলেটে আরও বেশি গা-ছাড়া ভাব দেখা গেছে সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের মধ্যে। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না-হওয়ার জন্য সরকারের নির্দেশনা থাকার পরও সিলেটের হাটবাজার, রাস্তাঘাট, বাস টার্মিনালে মানুষের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি।

‘লকডাউন’-এর প্রথম তিন দিন মানুষ আটকে পড়াসহ জরুরি কাজে অনেকে বের হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সিলেট সিটি করপোরেশনের বাস, লেগুনা, অটোরিকশাসহ সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কে স্বল্পসংখ্যক বাসও চলাচল করতে দেখা গেছে। রমজান মাস সামনে রেখে নগরীর কালীঘাট, বন্দরবাজার, জিন্দাবাজারসহ আশপাশ এলাকার শপিংমল বন্ধ থাকলেও নিত্যপণ্যের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা ছিল। ‘লকডাউন’-এর আওতাভুক্ত অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দরজার এক খুলে ব্যবসা করতেও দেখা গেছে। সরকারের নির্দেশনার বাইরে নগরীর যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা ছিল সেগুলো পুলিশ বন্ধ করে দেয়। সিলেট থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে স্বল্পসংখ্যক বাস। এ ছাড়া নগরীর পাইকারি পণ্যের বাজার কালীঘাটে বেচাকেনা ছিল স্বাভাবিক।

‘লকডাউন’র চতুর্থ দিন

স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে ‘মাথাব্যথা’ নেই কারও

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করলে চরম খেসারত দিতে হবে -আতিকুল ইসলাম * মানুষ জেনেবুঝে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে -ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী * অর্থ সংকটে বাস জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না -খন্দকার এনায়েতুল্লাহ
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ‘লকডাউন’-এর চতুর্থ দিনেও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পদে পদে লঙ্ঘিত হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি। সবার মধ্যে উদাসীনতা দেখা গেছে। এমনকি এসব দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও ছিলেন একরকম নির্বিকার। এ নিয়ে কারও যেন ‘মাথাব্যথা নেই।

ব্যাপকভাবে গণপরিবহণ চলার কারণে অনেক রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হয়েছে। বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মানুষ রাস্তায় বের হয়েছেন। কাঁচাবাজার, মহল্লার দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষের জটলা দেখা গেছে। সেখানে ছিল না কোনো সামাজিক দূরত্ব। মাস্কও ছিল না অনেকের মুখে।

এদিকে সারা দেশে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে পুলিশ, র‌্যাব, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন মাঠে থাকলেও তারা কঠোর ছিল না। ফলে জনজীবনে এর তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার এসব আয়োজন পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। জনগণের ভয় চলে যাওয়ায় সরকারের সতর্কবাণী ও মোবাইল কোর্ট তেমন কোনো কাজে আসছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও রংপুর মহানগরে বিধিনিষেধ শিথিল করার পর দ্বিতীয় দিনের মতো গণপরিবহণ চলাচল করেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে প্রথম দিনের চেয়ে গণপরিবহণগুলোয় যাত্রীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও বেশিরভাগ গণপরিবহণ যাত্রী সংকটে ছিল। কিছু পরিবহণে বেশি যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে। তবে চট্টগ্রামে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী বহনের নজির দেখা গেছে। প্রশাসন ছিল অনেকটা নির্বিকার।

এদিকে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ মেনে দুই সিটে একজন যাত্রী নেওয়ার নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন বাস মালিকরা। এক্ষেত্রে রাজধানীসহ অন্যান্য মহানগরের বাসগুলোয়ও বিধিবিধানের ব্যত্যয় লক্ষ করা গেছে। আর বাসগুলোয় স্যানিটাইজার রাখার বিধান থাকলেও কোনো বাসে তা দেখা যায়নি। আর্থিক সংকটের কারণে এটি রাখতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন বাস মালিকরা। বাসচালক, কন্ডাকটর, যাত্রীদের হরহামেশা মাস্ক না-পরে গণপরিবহণ পরিচালনা ও চলাচল করতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, গণপরিবহণ দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচল করেছে। যাত্রীর সংখ্যা কম ছিল। বিধিনিষেধ মেনে বাস পরিচালনার চেষ্টা হচ্ছে। এর মধ্যে মাস্ক ও দুই সিটে একজন বসানোর নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। একবার যাত্রী পরিবহণ করে পরিবহণগুলো জীবাণুনাশক ব্যবহার করে পরিষ্কার করার কথা থাকলেও সেটা তারা মানতে পারছে না। কেননা, এখানে অনেক খরচের ব্যাপার। আর এখন তো বাস চালিয়ে খরচই ওঠানো যাচ্ছে না।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু, আমরা এখনো স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে সচেতন হতে শিখিনি। গণপরিবহণ চালুর সময় বাসে জীবাণুনাশক লিকুইড ছিটিয়ে স্টার্ট করার নিয়ম। কিন্তু পরিবহণগুলোয় এটা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ভাড়া আদায়কারী, হেলপারদের হাতে বারবার স্যানিটাইজিং করা খুবই জরুরি।

এদিকে রাজধানীর কাঁচাবাজার, রিকশা, অটোরিকশা, লেগুনা, দোকানপাট, সড়ক, ফুটপাত, চায়ের দোকানসহ প্রায় সর্বত্র নিু আয়ের মানুষ ও কর্মজীবী মানুষের মাস্ক না-পরে চলাচল করতে দেখা গেছে। কেউ মাস্ক পরলেও নাক থেকে সেটা সরিয়ে থুতনির নিচে রাখছেন। স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সরকারি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও সেগুলো খুব একটা কাজে আসছে না। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারছে না।

স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিবিধান প্রয়োগের চেয়ে মানুষকে সচেতন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে অভিমত জানিয়েছেন অনেকে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসের মধ্যেই মানুষের জীবন-জীবিকার সমন্বয়ে ভালো ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এর জন্য মাস্ক পরা জরুরি। এর সঙ্গে অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে। কিন্তু, জনগণ সেটা বুঝতে চাচ্ছে না। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নগরবাসীকে বোঝাচ্ছি, জরিমানা করছি এবং শাস্তিও দিচ্ছি। এরপরও মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি পালনের তেমন আগ্রহ দেখছি না। আমরা চেষ্টা অব্যাহত রাখছি, সবাইকে বিষয়টি বুঝতে হবে। নইলে চরম খেসারত দিতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি থেকে প্রতিদিন ১২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এরপরও মানুষ সচেতন হচ্ছেন না। জরিমানা করা হচ্ছে, বোঝানো হচ্ছে। তাতে খুব কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়, মানুষ জেনেবুঝে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন।

সরেজমিন বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর গাবতলী, কলেজগেট, মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-১০, কালশী, কুড়িল এলাকায় স্বল্পসংখ্যক যাত্রী নিয়ে বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। যাত্রী কম থাকায় মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার প্রধান সড়কের পাশে অনেক বাস পার্কিং করে রাখতে দেখা গেছে। জানতে চাইলে বাসচালকরা বলেন, যাত্রী নেই এজন্য আপাতত বন্ধ করে রেখেছি। পরে আবার যাত্রী পরিবহণ শুরু করা হবে।

বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে রাজধানীতে পর্যাপ্ত গণপরিবহণ ছিল। স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে কঠোরতার কথা বলা হলেও চালক, হেলপারদের হরহামেশা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে চলাচল করতে দেখা গেছে। মাস্ক না-পরার বিষয়ে বিহঙ্গ পরিবহণের হেলপার জাহিদুল ইসলাম বলেন, মাস্ক পরে যাত্রী ডাকা যায় না। তবে পকেটে সবসময়ই মাস্ক থাকে। এ গরমে মাস্ক পরে থাকা সম্ভব নয়।

তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর গণপরিবহণগুলো নিয়ম মেনে বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় গণপরিবহণ না-পেয়ে অনেককে রিকশা, হেঁটে বা বিকল্প পরিবহণে চলাচল করতে দেখা গেছে। সন্ধ্যার পর যারা চলাচল করেছে তাদের বেশিরভাগেরই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস মোটরসাইকেল চালুর দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যানজট, গণপরিবহণ সংকট, পরিবহণে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রীসেবার মান তলানিতে পৌঁছেছে। ফলে সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং চালু হয়। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎস হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এটি। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটি চালু করা জরুরি।

খুলনায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না : খুলনা ব্যুরো জানায়, করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণের মধ্যেও খুলনায় মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা কম। ‘লকডাউন’-এর তোয়াক্কা না-করেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে জনসমাগম। মানুষকে মাস্ক পরতে বা স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সচেতন দেখা যায়নি। স্বাস্থ্যবিধি না-মেনেই সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। স্বাস্থ্যবিধি মানতে জনগণকে সচেতন করতে জেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব দেখা গেছে। নগরীর ডাকবাংলোর মোড়, নিউমার্কেট, শিববাড়ির মোড়, পিটিআই, র‌্যায়েলের মোড়সহ বেশিরভাগ স্থানেই দেখা গেছে মানুষের ভিড়। তবে বেশকিছু সংগঠন মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করতে প্রচারণা চালাচ্ছে।

সকাল থেকেই নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়, ডাকবাংলোর মোড়, শান্তিধাম মোড়ে সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। আর সড়কে ছিল ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা যানজট। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সকাল থেকে প্রশাসনেরও তেমন নজরদারি ছিল না। মোড়ে মোড়ে পুলিশ ছিল। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখায়নি। রিকশা, ইজিবাইক ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেট কারসহ ছোট ছোট যানবাহনের কারণে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়।

খুলনা সদর থানার ওসি মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা চেষ্টা করছি মানুষকে সচেতন করতে।

খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নেওয়াজ মাহামুদ বলেন, বিধিনিষেধ যারা মানছেন না তাদের প্রতি প্রশাসনের কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

সিলেটে ঢিলেঢালা ‘লকডাউন’ : সিলেট ব্যুরো জানায়, ‘লকডাউন’-এর প্রথম তিন দিনের তুলনায় চতুর্থ দিনে সিলেটে আরও বেশি গা-ছাড়া ভাব দেখা গেছে সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের মধ্যে। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না-হওয়ার জন্য সরকারের নির্দেশনা থাকার পরও সিলেটের হাটবাজার, রাস্তাঘাট, বাস টার্মিনালে মানুষের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি।

‘লকডাউন’-এর প্রথম তিন দিন মানুষ আটকে পড়াসহ জরুরি কাজে অনেকে বের হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সিলেট সিটি করপোরেশনের বাস, লেগুনা, অটোরিকশাসহ সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কে স্বল্পসংখ্যক বাসও চলাচল করতে দেখা গেছে। রমজান মাস সামনে রেখে নগরীর কালীঘাট, বন্দরবাজার, জিন্দাবাজারসহ আশপাশ এলাকার শপিংমল বন্ধ থাকলেও নিত্যপণ্যের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা ছিল। ‘লকডাউন’-এর আওতাভুক্ত অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দরজার এক খুলে ব্যবসা করতেও দেখা গেছে। সরকারের নির্দেশনার বাইরে নগরীর যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা ছিল সেগুলো পুলিশ বন্ধ করে দেয়। সিলেট থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে স্বল্পসংখ্যক বাস। এ ছাড়া নগরীর পাইকারি পণ্যের বাজার কালীঘাটে বেচাকেনা ছিল স্বাভাবিক।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন