খোলা থাকবে শিল্পকারখানা!
jugantor
আসন্ন কঠোর লকডাউন
খোলা থাকবে শিল্পকারখানা!
প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খোলা থাকবে শিল্পকারখানা!

করোনা নিয়ন্ত্রণে ১৪ এপ্রিল থেকে ৭ দিনের যে ‘কঠোর লকডাউন’ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেই সময়ে শিল্পকারখানা খোলা রাখার চিন্তা করছে সরকার। একইসঙ্গে রপ্তানি সচল রাখার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সব খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহসহ জরুরি সেবা সীমিত আকারে খোলা রাখা হতে পারে।

এর আওতায় রয়েছে ঔষধ শিল্প ও ব্যাংকিং খাত। তবে অতি জরুরি সেবা ছাড়া বন্ধ থাকবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট, গণপরিবহণ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আরও জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনার সংক্রমণ রোধে জরুরি পণ্যসেবা ছাড়া সবকিছুতে দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউন আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সরকার প্রথমে এক সপ্তাহ লকডাউন দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। প্রয়োজনে তা আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হতে পারে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন আরোপের সক্রিয় চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে জরুরি সেবার আওতায় মানুষের জীবন-জীবিকা, চিকিৎসা, রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা হবে।

এ আলোকেই লকডাউন আরোপ করা হবে। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব এলাকা পুরোপুরি লকডাউন বাস্তবায়িত হবে। একইসঙ্গে আন্তঃজেলা ও আন্তঃউপজেলা চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে পণ্য উৎপাদন, পরিবহণ ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় পরিবহণ ও মানুষ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে রপ্তানি শিল্প, নিত্যপণ্য উৎপাদন করে এমন সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য জরুরি পণ্য ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়ক হিসাবে ব্যাংক, বিমা, বন্দর, কাস্টমস সীমিত পরিসরে খোলা থাকতে পারে।

উল্লিখিত বিষয়ে রোববার মন্ত্রিপরিষদ সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে ব্যবসায়ীদের একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা অংশ নেন। এতে ব্যবসায়ীরা আসন্ন লকডাউনের সময় রপ্তানিমুখীসহ সব ধরনের শিল্পকারখানা খোলা রাখার প্রস্তাব করেন। এর আগে আসন্ন লকডাউনের সময় পোশাক ও বস্ত্র কারখানা খোলা রাখার দাবি জানিয়ে রপ্তানি খাতের চারটি সংগঠন রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করেছে।

এদিকে ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউনে জরুরি সেবা ছাড়া সবাইকে বৃহত্তর স্বার্থে ঘরে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউন। আমাদের বৃহত্তর স্বার্থে এ সময় জরুরি সেবা ছাড়া সবাইকে ঘরে অবস্থান করতে হবে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ সরকার সময়মতো প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

এদিকে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন রোববার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে লকডাউনেও পণ্য পরিবহণ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র জানায়, তৈরি পোশাক খাতে এখন রপ্তানির অর্ডার বেড়েছে। বিশেষ টেক্সটাইল খাতে ২০০ কোটি ডলারের অর্ডার রয়েছে। ওভেন গার্মেন্ট ও নিটওয়্যার খাতেও অর্ডার বেড়েছে। আগে ক্রেতারা যেসব অর্ডার দিয়েছেন সেগুলো এখন বাতিল করেননি। বরং গত বছর যেসব অর্ডার বাতিল করেছেন সেগুলো আবার দিতে শুরু করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ যেসব দেশে বেশিরভাগ পণ্য রপ্তানি করে ওইসব বেশিরভাগ দেশেই লকডাউন দেওয়া হয়নি। ফলে দেশে লকডাউনে রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বাজার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া আসন্ন রমজান উপলক্ষ্যে বাজারে সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ ও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সব চেইন সচল রাখতে হবে। এখাতে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হবে না। কেননা, রোজায় পণ্যের চাহিদা আরও বাড়ে। করোনার কারণে ওষুধ রপ্তানির চাহিদা বেড়েছে। এ ছাড়া দেশের বাজারেও চাহিদা বেশি। যে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম খোলা রাখতে হবে। এসব বিবেচনায় সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সূত্র জানায়, রোববার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে লকডাউন বাস্তবায়নের ব্যাপারে একটি কাঠামো প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এটি দেখে আজ বা কাল অনুমোদন করতে পারেন। তিনি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিবর্ধনও করতে পারেন। তিনি অনুমোদন করলে তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম যুগান্তরকে বলেন, বৈঠকে শুধু রপ্তানিমুখী নয়, সব শিল্পকারখানা চালু রাখার প্রস্তাব করেছি। তিনি আরও বলেন, এ সময় গণপরিবহণ, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। তবে শিল্পের কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক এবং পণ্য পরিবহণে কার্গো বিমান চলাচল করবে।

বিজিএমইএর নবনির্বাচিত সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বৈঠকে সব ধরনের শিল্প খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ব্যাংকের জরুরি সেবা কার্যক্রম চলবে।

বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, ১৪ এপ্রিল থেকে পুরো লকডাউন হলেও শিল্পকারখানা চালু থাকবে। বৈঠকে সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

এদিকে অনলাইন ব্যাংকিং বা এটিএম সেবা পুরোটাই এখন ইন্টারনেটনির্ভর। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোর সেবার কার্যক্রমেও ইন্টারনেট ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে তথ্যপ্রযুক্তির সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সময়ের জন্য খোলা থাকবে। তবে ইন্টারনেট সেবা সার্বক্ষণিকভাবে চালু থাকবে।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বন্দরের সেবা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। তবে কাস্টমসের কার্যক্রম চলবে সীমিত সময়ের জন্য।

এ ছাড়াও যথারীতি হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। এসব কাজে ব্যবহৃত পরিবহণ ব্যবস্থাও চালু থাকবে।

রপ্তানিকারকরা বলেছেন, অনেক দেশ এখনো লকডাউন দেয়নি। বিশেষ করে চীনসহ অনেক দেশের বাজার পুরোদমে চালু রয়েছে। এসব বাজার ধরে রাখতে রপ্তানি কার্যক্রম চালাতে হবে।

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত : ১৪ এপ্রিল থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীবাহী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী এক সপ্তাহের জন্য এ স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকবে। সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে এ নির্দেশনার ফলে ঢাকায় আসা-যাওয়ার জন্য নির্ধারিত প্রায় পাঁচশ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত হয়ে যাবে।

রোববার সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোহাম্মদ মফিদুর রহমান সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি বলেন, চার্টার্ড ফ্লাইট, কার্গো ফ্লাইট, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং বিশেষ ফ্লাইট চলাচলের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে না। তিনি বলেন, সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে যাত্রীদের সময়মতো ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছানো খুব কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত থাকবে।

এর আগে, ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী ফ্লাইট স্থগিত করেছিল সংস্থাটি। তারও আগে ৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্য ব্যতীত সব ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বিমান ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। এর পাশাপাশি বিশ্বের আরও ১২টি দেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।

প্রথম দফায় দেওয়া ৭ দিনের লকডাউন রোববার শেষ হয়েছে। ১৪ এপ্রিল থেকে আরও কঠোর লকডাউন শুরু হচ্ছে। প্রথম দফার লকডাউনে বন্ধ ছিল দেশের ভেতরে আকাশপথে যাত্রা। প্রশ্ন ছিল কঠোর লকডাউনের আগের দুদিন ১২ ও ১৩ এপ্রিল কী হবে। বেবিচক জানিয়েছে, আজ এবং কালও বন্ধ থাকবে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। আর ১৪ এপ্রিল থেকে বন্ধ হয়ে যাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের বেশিরভাগ ফ্লাইট। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট বন্ধ সংক্রান্ত সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিংবা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে ঢাকা থেকে সব ধরনের ফ্লাইট স্থগিত করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে জুলাই থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা হয়। তারপর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক রুটে উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে ৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্য ব্যতীত সব ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বিমান ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। এর পাশাপাশি বিশ্বের আরও ১২টি দেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ আছে। ইউরোপীয় দেশ ছাড়াও আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, ব্রাজিল, চিলি, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পেরু, কাতার, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও উরুগুয়েতে বাংলাদেশের ফ্লাইট বন্ধ আছে।

আসন্ন কঠোর লকডাউন

খোলা থাকবে শিল্পকারখানা!

প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
খোলা থাকবে শিল্পকারখানা!
ফাইল ছবি

করোনা নিয়ন্ত্রণে ১৪ এপ্রিল থেকে ৭ দিনের যে ‘কঠোর লকডাউন’ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেই সময়ে শিল্পকারখানা খোলা রাখার চিন্তা করছে সরকার। একইসঙ্গে রপ্তানি সচল রাখার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সব খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহসহ জরুরি সেবা সীমিত আকারে খোলা রাখা হতে পারে।

এর আওতায় রয়েছে ঔষধ শিল্প ও ব্যাংকিং খাত। তবে অতি জরুরি সেবা ছাড়া বন্ধ থাকবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট, গণপরিবহণ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আরও জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনার সংক্রমণ রোধে জরুরি পণ্যসেবা ছাড়া সবকিছুতে দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউন আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সরকার প্রথমে এক সপ্তাহ লকডাউন দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। প্রয়োজনে তা আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হতে পারে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন আরোপের সক্রিয় চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে জরুরি সেবার আওতায় মানুষের জীবন-জীবিকা, চিকিৎসা, রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা হবে।

এ আলোকেই লকডাউন আরোপ করা হবে। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব এলাকা পুরোপুরি লকডাউন বাস্তবায়িত হবে। একইসঙ্গে আন্তঃজেলা ও আন্তঃউপজেলা চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে পণ্য উৎপাদন, পরিবহণ ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় পরিবহণ ও মানুষ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে রপ্তানি শিল্প, নিত্যপণ্য উৎপাদন করে এমন সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য জরুরি পণ্য ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়ক হিসাবে ব্যাংক, বিমা, বন্দর, কাস্টমস সীমিত পরিসরে খোলা থাকতে পারে।

উল্লিখিত বিষয়ে রোববার মন্ত্রিপরিষদ সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে ব্যবসায়ীদের একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা অংশ নেন। এতে ব্যবসায়ীরা আসন্ন লকডাউনের সময় রপ্তানিমুখীসহ সব ধরনের শিল্পকারখানা খোলা রাখার প্রস্তাব করেন। এর আগে আসন্ন লকডাউনের সময় পোশাক ও বস্ত্র কারখানা খোলা রাখার দাবি জানিয়ে রপ্তানি খাতের চারটি সংগঠন রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করেছে।

এদিকে ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউনে জরুরি সেবা ছাড়া সবাইকে বৃহত্তর স্বার্থে ঘরে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউন। আমাদের বৃহত্তর স্বার্থে এ সময় জরুরি সেবা ছাড়া সবাইকে ঘরে অবস্থান করতে হবে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ সরকার সময়মতো প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

এদিকে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন রোববার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে লকডাউনেও পণ্য পরিবহণ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র জানায়, তৈরি পোশাক খাতে এখন রপ্তানির অর্ডার বেড়েছে। বিশেষ টেক্সটাইল খাতে ২০০ কোটি ডলারের অর্ডার রয়েছে। ওভেন গার্মেন্ট ও নিটওয়্যার খাতেও অর্ডার বেড়েছে। আগে ক্রেতারা যেসব অর্ডার দিয়েছেন সেগুলো এখন বাতিল করেননি। বরং গত বছর যেসব অর্ডার বাতিল করেছেন সেগুলো আবার দিতে শুরু করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ যেসব দেশে বেশিরভাগ পণ্য রপ্তানি করে ওইসব বেশিরভাগ দেশেই লকডাউন দেওয়া হয়নি। ফলে দেশে লকডাউনে রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বাজার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া আসন্ন রমজান উপলক্ষ্যে বাজারে সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ ও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সব চেইন সচল রাখতে হবে। এখাতে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হবে না। কেননা, রোজায় পণ্যের চাহিদা আরও বাড়ে। করোনার কারণে ওষুধ রপ্তানির চাহিদা বেড়েছে। এ ছাড়া দেশের বাজারেও চাহিদা বেশি। যে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম খোলা রাখতে হবে। এসব বিবেচনায় সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সূত্র জানায়, রোববার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে লকডাউন বাস্তবায়নের ব্যাপারে একটি কাঠামো প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এটি দেখে আজ বা কাল অনুমোদন করতে পারেন। তিনি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিবর্ধনও করতে পারেন। তিনি অনুমোদন করলে তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম যুগান্তরকে বলেন, বৈঠকে শুধু রপ্তানিমুখী নয়, সব শিল্পকারখানা চালু রাখার প্রস্তাব করেছি। তিনি আরও বলেন, এ সময় গণপরিবহণ, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। তবে শিল্পের কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক এবং পণ্য পরিবহণে কার্গো বিমান চলাচল করবে।

বিজিএমইএর নবনির্বাচিত সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বৈঠকে সব ধরনের শিল্প খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ব্যাংকের জরুরি সেবা কার্যক্রম চলবে।

বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, ১৪ এপ্রিল থেকে পুরো লকডাউন হলেও শিল্পকারখানা চালু থাকবে। বৈঠকে সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

এদিকে অনলাইন ব্যাংকিং বা এটিএম সেবা পুরোটাই এখন ইন্টারনেটনির্ভর। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোর সেবার কার্যক্রমেও ইন্টারনেট ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে তথ্যপ্রযুক্তির সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সময়ের জন্য খোলা থাকবে। তবে ইন্টারনেট সেবা সার্বক্ষণিকভাবে চালু থাকবে।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বন্দরের সেবা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। তবে কাস্টমসের কার্যক্রম চলবে সীমিত সময়ের জন্য।

এ ছাড়াও যথারীতি হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। এসব কাজে ব্যবহৃত পরিবহণ ব্যবস্থাও চালু থাকবে।

রপ্তানিকারকরা বলেছেন, অনেক দেশ এখনো লকডাউন দেয়নি। বিশেষ করে চীনসহ অনেক দেশের বাজার পুরোদমে চালু রয়েছে। এসব বাজার ধরে রাখতে রপ্তানি কার্যক্রম চালাতে হবে।

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত : ১৪ এপ্রিল থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীবাহী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী এক সপ্তাহের জন্য এ স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকবে। সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে এ নির্দেশনার ফলে ঢাকায় আসা-যাওয়ার জন্য নির্ধারিত প্রায় পাঁচশ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত হয়ে যাবে।

রোববার সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোহাম্মদ মফিদুর রহমান সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি বলেন, চার্টার্ড ফ্লাইট, কার্গো ফ্লাইট, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং বিশেষ ফ্লাইট চলাচলের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে না। তিনি বলেন, সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে যাত্রীদের সময়মতো ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছানো খুব কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত থাকবে।

এর আগে, ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী ফ্লাইট স্থগিত করেছিল সংস্থাটি। তারও আগে ৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্য ব্যতীত সব ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বিমান ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। এর পাশাপাশি বিশ্বের আরও ১২টি দেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।

প্রথম দফায় দেওয়া ৭ দিনের লকডাউন রোববার শেষ হয়েছে। ১৪ এপ্রিল থেকে আরও কঠোর লকডাউন শুরু হচ্ছে। প্রথম দফার লকডাউনে বন্ধ ছিল দেশের ভেতরে আকাশপথে যাত্রা। প্রশ্ন ছিল কঠোর লকডাউনের আগের দুদিন ১২ ও ১৩ এপ্রিল কী হবে। বেবিচক জানিয়েছে, আজ এবং কালও বন্ধ থাকবে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। আর ১৪ এপ্রিল থেকে বন্ধ হয়ে যাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের বেশিরভাগ ফ্লাইট। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট বন্ধ সংক্রান্ত সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিংবা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে ঢাকা থেকে সব ধরনের ফ্লাইট স্থগিত করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে জুলাই থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা হয়। তারপর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক রুটে উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে ৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্য ব্যতীত সব ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বিমান ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। এর পাশাপাশি বিশ্বের আরও ১২টি দেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ আছে। ইউরোপীয় দেশ ছাড়াও আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, ব্রাজিল, চিলি, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পেরু, কাতার, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও উরুগুয়েতে বাংলাদেশের ফ্লাইট বন্ধ আছে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন