‘মিষ্টি মেয়ে’ কবরীর চিরবিদায়
jugantor
‘মিষ্টি মেয়ে’ কবরীর চিরবিদায়

  আনন্দনগর প্রতিবেদক  

১৭ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তাকেও হার মানতে হলো ভয়ংকর করোনার কাছে। টানা ১৩ দিন করোনার সঙ্গে লড়ে শেষ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে খ্যাত অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তার মৃতুতে দেশের শোবিজ অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে খুসখুসে কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হলে করোনার নমুনা পরীক্ষা করতে দেন কবরী। গত ৫ এপ্রিল দুপুরে জানতে পারেন তিনি পজিটিভ। সেদিন রাতেই তাকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ৭ এপ্রিল রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সেখানকার ডাক্তাররা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তার পরিবার কোথাও আইসিইউ খালি পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুরোধ জানালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহায়তায় ৮ এপ্রিল দুপুরে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। এরপর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় ১৪ এপ্রিল তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হলো না।

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তার আসল নাম মিনা পাল। বাবা শ্রীকৃষ্ণদাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। ছোটবেলা থেকে নাচ করতেন তিনি। নৃত্যশিল্পী হিসাবে মঞ্চেও পারফর্ম করেছেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল তার। চলচ্চিত্রের নাম ‘সুতরাং’। সুভাষ দত্ত পরিচালিত এ চলচ্চিত্রটি ১৯৬৪ সালের ২৪ এপ্রিল মুক্তি পায়। সেই থেকে শুরু। এরপর ‘জলছবি’, ‘বাহানা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘দর্পচূর্ণ, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বিনিময়’ চলচ্চিত্রগুলো দিয়ে পরবর্তী কয়েক বছর দর্শক মাতিয়ে রেখেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।

১৯৭১ সালে দেশে যুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান কবরী। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতে পাড়ি দেন। তাদের সঙ্গে কবরীও চলে যান। সেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করার কথাও তিনি জীবদ্দশায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি আবারও ঢাকায় ফিরে আসেন। কাজ শুরু করেন চলচ্চিত্রে। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্র দিয়ে বাংলাদেশের দর্শকদের আবারও তার মেধা এবং জৌলুসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর জুটি বাঁধেন নায়করাজ রাজ্জাকের সঙ্গে। রাজ্জাক-কবরী অভিনীত ‘রংবাজ’ ছিল সেই সময়ের সুপারহিট চলচ্চিত্র। এ জুটি অনেকগুলো সুপারহিট চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন। একসময় তাদের নিয়ে প্রেম ও বিয়ের গুঞ্জনও প্রচার হয়েছিল। যদিও দুজনের কেউই সেটা কখনও স্বীকার করেননি। নায়ক ফারুকের সঙ্গেও কবরীর জুটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। তাদের অভিনীত ‘সুজন সখী’ এখনও দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে দেখেন। নায়ক সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল এবং বুলবুল আহমেদের সঙ্গেও কবরীর জুটি জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘আগন্তুক’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘সারেং বৌ’, ‘দেবদাস’, ‘হীরামন’, ‘চোরাবালি’, ‘পারুলের সংসার’ ছিল কবরীর ক্যারিয়ারের আরও কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণেও নাম লিখিয়েছেন কবরী। ২০০৫ সালে ‘আয়না’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে পরিচালক হিসাবে তার অভিষেক হয়। সর্বশেষ সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘এই তুমি সেই তুমি’ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছেন। বর্তমানে ছবিটি সম্পাদনার টেবিলে রয়েছে। এরইমধ্যে নতুন ছবি নির্মাণের প্রাথমিক কাজও শুরু করে দিয়েছেন বলে যুগান্তরকে বেশ কয়েকদিন আগে জানিয়েছেন।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও ছিল কবরীর পদচারণা। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ব্যানারে নারায়ণগঞ্জ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭-এ প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’। ব্যক্তিজীবনে কবরী প্রথমে বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সে সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে সে সংসারেও বিচ্ছেদ ঘটে। পারিারিক জীবনে তিনি পাঁচ সন্তানের মা।

সুচিত্রা সেনের ভক্ত ছিলেন কবরী। উত্তম কুমারও ছিলেন তার পছন্দের অভিনেতা। এছাড়া ধর্মেন্দ্র, রাজকাপুর, সোফিয়া লরেন, অড্রে হেপবার্নের মতো শিল্পীরাও ছিলেন তার পছন্দের তালিকায়।

‘মিষ্টি মেয়ে’ কবরীর চিরবিদায়

 আনন্দনগর প্রতিবেদক 
১৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তাকেও হার মানতে হলো ভয়ংকর করোনার কাছে। টানা ১৩ দিন করোনার সঙ্গে লড়ে শেষ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে খ্যাত অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তার মৃতুতে দেশের শোবিজ অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে খুসখুসে কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হলে করোনার নমুনা পরীক্ষা করতে দেন কবরী। গত ৫ এপ্রিল দুপুরে জানতে পারেন তিনি পজিটিভ। সেদিন রাতেই তাকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ৭ এপ্রিল রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সেখানকার ডাক্তাররা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তার পরিবার কোথাও আইসিইউ খালি পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুরোধ জানালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহায়তায় ৮ এপ্রিল দুপুরে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। এরপর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় ১৪ এপ্রিল তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হলো না।

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তার আসল নাম মিনা পাল। বাবা শ্রীকৃষ্ণদাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। ছোটবেলা থেকে নাচ করতেন তিনি। নৃত্যশিল্পী হিসাবে মঞ্চেও পারফর্ম করেছেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল তার। চলচ্চিত্রের নাম ‘সুতরাং’। সুভাষ দত্ত পরিচালিত এ চলচ্চিত্রটি ১৯৬৪ সালের ২৪ এপ্রিল মুক্তি পায়। সেই থেকে শুরু। এরপর ‘জলছবি’, ‘বাহানা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘দর্পচূর্ণ, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বিনিময়’ চলচ্চিত্রগুলো দিয়ে পরবর্তী কয়েক বছর দর্শক মাতিয়ে রেখেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।

১৯৭১ সালে দেশে যুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান কবরী। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতে পাড়ি দেন। তাদের সঙ্গে কবরীও চলে যান। সেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করার কথাও তিনি জীবদ্দশায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি আবারও ঢাকায় ফিরে আসেন। কাজ শুরু করেন চলচ্চিত্রে। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্র দিয়ে বাংলাদেশের দর্শকদের আবারও তার মেধা এবং জৌলুসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর জুটি বাঁধেন নায়করাজ রাজ্জাকের সঙ্গে। রাজ্জাক-কবরী অভিনীত ‘রংবাজ’ ছিল সেই সময়ের সুপারহিট চলচ্চিত্র। এ জুটি অনেকগুলো সুপারহিট চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন। একসময় তাদের নিয়ে প্রেম ও বিয়ের গুঞ্জনও প্রচার হয়েছিল। যদিও দুজনের কেউই সেটা কখনও স্বীকার করেননি। নায়ক ফারুকের সঙ্গেও কবরীর জুটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। তাদের অভিনীত ‘সুজন সখী’ এখনও দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে দেখেন। নায়ক সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল এবং বুলবুল আহমেদের সঙ্গেও কবরীর জুটি জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘আগন্তুক’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘সারেং বৌ’, ‘দেবদাস’, ‘হীরামন’, ‘চোরাবালি’, ‘পারুলের সংসার’ ছিল কবরীর ক্যারিয়ারের আরও কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণেও নাম লিখিয়েছেন কবরী। ২০০৫ সালে ‘আয়না’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে পরিচালক হিসাবে তার অভিষেক হয়। সর্বশেষ সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘এই তুমি সেই তুমি’ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছেন। বর্তমানে ছবিটি সম্পাদনার টেবিলে রয়েছে। এরইমধ্যে নতুন ছবি নির্মাণের প্রাথমিক কাজও শুরু করে দিয়েছেন বলে যুগান্তরকে বেশ কয়েকদিন আগে জানিয়েছেন।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও ছিল কবরীর পদচারণা। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ব্যানারে নারায়ণগঞ্জ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭-এ প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’। ব্যক্তিজীবনে কবরী প্রথমে বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সে সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে সে সংসারেও বিচ্ছেদ ঘটে। পারিারিক জীবনে তিনি পাঁচ সন্তানের মা।

সুচিত্রা সেনের ভক্ত ছিলেন কবরী। উত্তম কুমারও ছিলেন তার পছন্দের অভিনেতা। এছাড়া ধর্মেন্দ্র, রাজকাপুর, সোফিয়া লরেন, অড্রে হেপবার্নের মতো শিল্পীরাও ছিলেন তার পছন্দের তালিকায়।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন