মুত্তাকি হওয়ার মাস রমজান
jugantor
রমজানুল মোবারক
মুত্তাকি হওয়ার মাস রমজান

  মাওলানা নূরুল আমীন মাহদী  

১৮ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির একটি রমজানের সিয়াম। সিয়াম শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। কুরআন-হাদিসের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ পানাহার, যৌনসম্ভোগ, অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম। রাসুল (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর আল্লাহর পক্ষ থেকে সিয়াম পালনের বিধান অবতীর্ণ হয়। অবশ্য আগের উম্মতের ওপরও রোজার বিধান ছিল।

হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী, হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত নুহ (আ.) পর্যন্ত প্রত্যেক উম্মতের ওপর চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা পালনের হুকুম ছিল। ইহুদিরা প্রতি সপ্তাহে শনিবার আর মহররম মাসের ১০ তারিখে রোজা পালন করত। মুসার (আ.) তুর পাহাড়ে অবস্থানের স্মৃতিচারণায় তাদের জন্য ৪০ দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। নাসারা তথা খ্রিষ্টানদের ৫০ দিন রোজা পালনের রেওয়াজ ছিল।

পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোয় রোজাকে নানা নামে অভিহিত করা হয়েছে। তাওরাতে রমজানকে বলা হয়েছে ‘হাত’ অর্থাৎ গুনাহ ধ্বংসকারী। যাবুরে বলা হয়েছে ‘কুরবাত’ অর্থাৎ নৈকট্য লাভ করা। কেননা, রোজার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকে। ইঞ্জিলে একে ‘ত্বব’ বলা হয়েছে-যার অর্থ পবিত্র হওয়া। আর পবিত্র কুরআন মজিদে একে বলা হয়েছে ‘রামাদান’, যার অর্থ হলো দাহ, উত্তাপ ও দহন ইত্যাদি। কেননা, রোজা রাখার দরুন ক্ষুধা-পিপাসার তীব্র জ্বালায় রোজাদারের উদর জ্বলতে থাকে। এ দহন ও কষ্টকে বোঝার জন্য আরবি ভাষায় বলা হয়ে থাকে: রোজাদার দগ্ধ হয়, ভস্মীভূত হয়। ক্ষুধা-পিপাসার কী জ্বালা, তা রোজাদার মর্মে মর্মে অনুভব করে বলেই রোজার মাসটির নাম রমজান রাখা হয়েছে।

কুরআন-হাদিসে তাকওয়া অর্জনকে রমজানের মৌলিক উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। যার মনে সব সময় আল্লাহতায়ালার ভয় কাজ করে, যে কখনো অন্যায়-অনিয়ম, মিথ্যা-দুর্নীতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। এমন বান্দাকেই মুত্তাকি বলা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন তাকওয়া দ্বারাই পরিচালিত হন। তাকওয়া মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং সৎকাজে অনুপ্রাণিত করে। বলা হয়েছে: ‘তোমরা যারা ইমান এনেছ, তারা তাকওয়া অর্জন করো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত ৭০)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন: ‘যারা ইমান আনল এবং তাকওয়া লাভ করল, তারা আল্লাহর বন্ধু; তাদের কোনো ভয় নেই, দুশ্চিন্তাও নেই।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত ৬২)।

তাকওয়া মুমিনের জীবনে এক অপরিহার্য অংশ, যা মানুষকে আত্মিক উন্নয়নের পথে পরিচালিত করে এবং নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করে। তাকওয়া অর্থ সাবধান হওয়া, সতর্কতা অবলম্বন করা বা ভয় করা ইত্যাদি। পরিভাষায় তাকওয়া হলো, আল্লাহ ও রাসুল (সা.) যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। তাকওয়ার মূল কথা হলো আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে সদা ভীত ও সতর্ক থাকা এবং নবিজির (সা.) সুন্নত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর মহব্বত লাভের আশায় সদা সচেষ্ট থাকা।

আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদার মাপকাঠি তার তাকওয়া। যার চরিত্রে তাকওয়ার মাত্রা যেমন, আল্লাহতায়ালার কাছে তার মর্যাদা তেমন। অতএব একজন মুমিন বান্দার উচিত, আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভের জন্য তাকওয়ার গুণ অর্জন ও তা উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। রমজান মাস আসে মুমিনের জন্য তাকওয়া অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে। রোজা মানুষকে কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করে। সৎ ও কল্যাণকর কাজে রোজা উদ্বুদ্ধ করে। রোজা রিপুর তাড়নায় কাবু হওয়া প্রবৃত্তির পূজায় ব্যস্ত বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দেয়।

আসুন, তাকওয়া অর্জনের জন্য সর্বাত্মকভাবে সিয়াম সাধনায় মগ্ন হই। কিয়ামুল্লাইল-নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আসগারে আত্মনিয়োগ করি, দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াই। নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা তার একনিষ্ঠ বান্দার কোনো আমলই নষ্ট করেন না।

লেখক : খতিব, লেক ভিউ জামে মসজিদ, ফয়’স লেক, চট্টগ্রাম; ইসলামি চিন্তাবিদ

রমজানুল মোবারক

মুত্তাকি হওয়ার মাস রমজান

 মাওলানা নূরুল আমীন মাহদী 
১৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির একটি রমজানের সিয়াম। সিয়াম শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। কুরআন-হাদিসের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ পানাহার, যৌনসম্ভোগ, অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম। রাসুল (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর আল্লাহর পক্ষ থেকে সিয়াম পালনের বিধান অবতীর্ণ হয়। অবশ্য আগের উম্মতের ওপরও রোজার বিধান ছিল।

হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী, হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত নুহ (আ.) পর্যন্ত প্রত্যেক উম্মতের ওপর চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা পালনের হুকুম ছিল। ইহুদিরা প্রতি সপ্তাহে শনিবার আর মহররম মাসের ১০ তারিখে রোজা পালন করত। মুসার (আ.) তুর পাহাড়ে অবস্থানের স্মৃতিচারণায় তাদের জন্য ৪০ দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। নাসারা তথা খ্রিষ্টানদের ৫০ দিন রোজা পালনের রেওয়াজ ছিল।

পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোয় রোজাকে নানা নামে অভিহিত করা হয়েছে। তাওরাতে রমজানকে বলা হয়েছে ‘হাত’ অর্থাৎ গুনাহ ধ্বংসকারী। যাবুরে বলা হয়েছে ‘কুরবাত’ অর্থাৎ নৈকট্য লাভ করা। কেননা, রোজার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকে। ইঞ্জিলে একে ‘ত্বব’ বলা হয়েছে-যার অর্থ পবিত্র হওয়া। আর পবিত্র কুরআন মজিদে একে বলা হয়েছে ‘রামাদান’, যার অর্থ হলো দাহ, উত্তাপ ও দহন ইত্যাদি। কেননা, রোজা রাখার দরুন ক্ষুধা-পিপাসার তীব্র জ্বালায় রোজাদারের উদর জ্বলতে থাকে। এ দহন ও কষ্টকে বোঝার জন্য আরবি ভাষায় বলা হয়ে থাকে: রোজাদার দগ্ধ হয়, ভস্মীভূত হয়। ক্ষুধা-পিপাসার কী জ্বালা, তা রোজাদার মর্মে মর্মে অনুভব করে বলেই রোজার মাসটির নাম রমজান রাখা হয়েছে।

কুরআন-হাদিসে তাকওয়া অর্জনকে রমজানের মৌলিক উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। যার মনে সব সময় আল্লাহতায়ালার ভয় কাজ করে, যে কখনো অন্যায়-অনিয়ম, মিথ্যা-দুর্নীতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। এমন বান্দাকেই মুত্তাকি বলা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন তাকওয়া দ্বারাই পরিচালিত হন। তাকওয়া মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং সৎকাজে অনুপ্রাণিত করে। বলা হয়েছে: ‘তোমরা যারা ইমান এনেছ, তারা তাকওয়া অর্জন করো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত ৭০)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন: ‘যারা ইমান আনল এবং তাকওয়া লাভ করল, তারা আল্লাহর বন্ধু; তাদের কোনো ভয় নেই, দুশ্চিন্তাও নেই।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত ৬২)।

তাকওয়া মুমিনের জীবনে এক অপরিহার্য অংশ, যা মানুষকে আত্মিক উন্নয়নের পথে পরিচালিত করে এবং নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করে। তাকওয়া অর্থ সাবধান হওয়া, সতর্কতা অবলম্বন করা বা ভয় করা ইত্যাদি। পরিভাষায় তাকওয়া হলো, আল্লাহ ও রাসুল (সা.) যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। তাকওয়ার মূল কথা হলো আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে সদা ভীত ও সতর্ক থাকা এবং নবিজির (সা.) সুন্নত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর মহব্বত লাভের আশায় সদা সচেষ্ট থাকা।

আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদার মাপকাঠি তার তাকওয়া। যার চরিত্রে তাকওয়ার মাত্রা যেমন, আল্লাহতায়ালার কাছে তার মর্যাদা তেমন। অতএব একজন মুমিন বান্দার উচিত, আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভের জন্য তাকওয়ার গুণ অর্জন ও তা উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। রমজান মাস আসে মুমিনের জন্য তাকওয়া অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে। রোজা মানুষকে কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করে। সৎ ও কল্যাণকর কাজে রোজা উদ্বুদ্ধ করে। রোজা রিপুর তাড়নায় কাবু হওয়া প্রবৃত্তির পূজায় ব্যস্ত বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দেয়।

আসুন, তাকওয়া অর্জনের জন্য সর্বাত্মকভাবে সিয়াম সাধনায় মগ্ন হই। কিয়ামুল্লাইল-নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আসগারে আত্মনিয়োগ করি, দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াই। নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা তার একনিষ্ঠ বান্দার কোনো আমলই নষ্ট করেন না।

লেখক : খতিব, লেক ভিউ জামে মসজিদ, ফয়’স লেক, চট্টগ্রাম; ইসলামি চিন্তাবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন