মামুনুল হক গ্রেফতার, আজ রিমান্ড আবেদন
jugantor
মামুনুল হক গ্রেফতার, আজ রিমান্ড আবেদন

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার দুপুর ১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানার একটি নাশকতা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তেজগাঁও থানায় কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে মামুনুল হককে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মামুনুল হক এখন ডিবি হেফাজতে আছেন। আগামীকাল (আজ) তাকে আদালতে পাঠানো হবে।
পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি মৃত্যুঞ্জয় দে সজল যুগান্তরকে জানান, আদালতে হাজির করে তার ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টকাণ্ডের পর থেকেই মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগরের সেক্রেটারি মামুনুল হক। ঘটনার পর থেকে পুলিশ তাকে নজরদারির মধ্যে রেখেছিল। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মামুনুল হক ওই মাদ্রাসার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে অবস্থান করছিলেন। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা প্রথমে মাদ্রাসাটি ঘিরে ফেলেন। এ সময় মাদ্রাসার ভেতরে দেড় শতাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন। পুলিশের অভিযানে প্রথমে তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে অতিরিক্ত পুলিশ দেখে তারা হাল ছেড়ে দেন। দোতলার ওই কক্ষ থেকে মামুনুল হককে নামিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের ডিসি কার্যালয়ে প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে তেজগাঁও মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে সেখানেই তাকে রাখা হবে। মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর নিজ কার্যালয়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে সারা দেশে হেফাজতের তাণ্ডব দেখেছে সবাই। সরকারি স্থাপনাসহ থানায় হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া মোহাম্মদপুর থানায়ও তার বিরুদ্ধে ভাঙচুরের মামলা রয়েছে। এ মামলার তদন্ত চলছিল। এতে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এ মামলার সঙ্গে মাওলানা মামুনুল হক জড়িত। ওই ঘটনা মামুনুল হক জানেন এবং তিনি স্বীকারও করেছেন।
ডিসি হারুন অর রশিদ আরও বলেন, পল্টন থানাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অধিকাংশ মামলায় মামুনুল হককে আসামি করা হয়েছে। সভা-সমাবেশে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্যও দিয়েছেন। তার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে হামলা করেছে। এসব ঘটনার পর আমরা তাকে নজরদারিতে রেখেছিলাম। নানা ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আমরা সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেসব মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে।
হারুন অর রশীদ বলেন, ২০২০ সালে মোহাম্মদপুরে মামলাটি করা হয়। সে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মামুনুল হক। এছাড়া সম্প্রতি সারা দেশে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় তার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে মামুনুল হককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি নাশকতার মামলা এবং রিসোর্টকাণ্ডে করা মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে।
ডিসি হারুন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাশকতা ও প্রাণহানি এবং ঢাকার পল্টন থানা এলাকায় হামলাসহ বেশকিছু নাশকতার ঘটনায় তদন্ত চলার পাশাপাশি মামুনুলের ওপর নজরদারি করা হচ্ছিল। তদন্তে তার সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশের ওপর পরিকল্পিত হামলার উসকানি, থানা ও রেজিস্ট্রার অফিসে হামলা ও ভাঙচুরসহ অনেক ঘটনায় মামুনুলের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাকে আমরা নজরদারিতে রেখেছিলাম, পাশাপাশি এসব মামলার তদন্ত করেছি। তদন্তে তার সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর যাতে কেউ উত্তেজনা ছড়াতে না পারে সেজন্য বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। মোহাম্মদপুর, বারিধারা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের নভেম্বরে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসেন মামুনুল হক। ভাস্কর্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে একই বছর ডিসেম্বরে কুষ্টিয়া শহরে জাতির পিতার একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ভাস্কর্য বিরোধিতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরী ও যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়।
এ বছর মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায় হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় সংঘাত-নাশকতার ঘটনায় মামুনুল হকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এদিকে, ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে এক নারীসহ আটক হয়ে আবার আলোচনায় আসেন মাওলানা মামুনুল হক। যাকে তিনি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। কয়েকদিন ধরে হেফাজতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মামুনুল হককে আসামি করা হয়। এছাড়া সম্প্রতি মোদিবিরোধী আন্দোলনের সময় সহিংসতা করায় একাধিক মামলা হয়। এসব মামলায়ও মামুনুল হকের নাম রয়েছে।
সোনারগাঁয়ের পৌর কাউন্সিলর ফারুক গ্রেফতার : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মামুনুল হক ইস্যুতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মামলায় কাউন্সিলর ফারুক আহমেদ তপনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার ভবনাথপুর এলাকা থেকে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানান, ৩ এপ্রিল হেফাজতের সহিংস ঘটনায় করা মামলায় পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফারুককে বাড়ির পাশের একটি ঘর থেকে গ্রেফতার করা হয়। হেফাজতের নাশকতায় ফারুক মাস্টারমাইন্ড হিসাবে কাজ করেছেন। চারটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক বর্তমানে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
জরুরি অনলাইন বৈঠকে হেফাজত নেতারা : হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় জরুরি অনলাইন বৈঠকে বসেছেন হেফাজতের শীর্ষ নেতারা। হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়েজী জানান, বৈঠক শেষে সব জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, রাজপথে নয়, আইনিভাবে সব মোকাবিলা করবে হেফাজত। মামুনুল হককে গ্রেফতারের খবরে হেফাজতের দুর্গ বলে খ্যাত হাটহাজারীর পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত ছিল। হেফাজতের নেতাকর্র্মীদের রাজপথে দেখা যায়নি। হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদাৎ হোসেন জানান, পরিস্থিতি খুবই শান্ত। হেফাজতের কোনো তৎপরতা দেখছি না।
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছেন, আলেমে দ্বীনদের আটক করে রিমান্ডে নিয়ে সরকার জুলুম করছে। এ জুলুমের শেষ হবে। এর কঠোর বিচার হবে। রোববার হাটহাজারী মাদ্রাসা মসজিদে এতেক্বাফকারী মুসল্লি, মাদ্রাসার ছাত্র ও সাধারণ মুসল্লিদের উদ্দেশে বয়ানকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাসে গ্রেফতারদের ইফতার সেহরিও করতে দেওয়া হচ্ছে না। এসব জুলুম থেকে প্রতিকারেই দোয়া ইউনুছের পরীক্ষিত আমল শেষে মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
কেরানীগঞ্জ থানার চারপাশে পুলিশের ব্যারিকেড : কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ঘাটারচর এলাকায় মামুনুল হক পরিচালিত একটি মাদ্রাসা রয়েছে। দুপুরে মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর সারা দিন বাড়তি সতর্কতায় ছিল কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। রাত ৯টার দিকে থানার চারপাশের রাস্তায় বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। পুলিশ লাইন থেকে আনা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় ব্যারিকেড দেয়া পয়েন্টগুলোতে। মাইকিং করে আশপাশের বাসিন্দাদের বাসা থেকে বের না হতে বলা হয়। থানায় প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে সেখানে অবস্থান নেয় পুলিশ। থানাসংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আসাদুজ্জামান টিটু বলেন, মামুনুল হকের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে থানায় হামলা হতে পারে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

মামুনুল হক গ্রেফতার, আজ রিমান্ড আবেদন

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার দুপুর ১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানার একটি নাশকতা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 
তেজগাঁও থানায় কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে মামুনুল হককে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মামুনুল হক এখন ডিবি হেফাজতে আছেন। আগামীকাল (আজ) তাকে আদালতে পাঠানো হবে। 
পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি মৃত্যুঞ্জয় দে সজল যুগান্তরকে জানান, আদালতে হাজির করে তার ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টকাণ্ডের পর থেকেই মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগরের সেক্রেটারি মামুনুল হক। ঘটনার পর থেকে পুলিশ তাকে নজরদারির মধ্যে রেখেছিল। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মামুনুল হক ওই মাদ্রাসার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে অবস্থান করছিলেন। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা প্রথমে মাদ্রাসাটি ঘিরে ফেলেন। এ সময় মাদ্রাসার ভেতরে দেড় শতাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন। পুলিশের অভিযানে প্রথমে তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে অতিরিক্ত পুলিশ দেখে তারা হাল ছেড়ে দেন। দোতলার ওই কক্ষ থেকে মামুনুল হককে নামিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের ডিসি কার্যালয়ে প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে তেজগাঁও মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে সেখানেই তাকে রাখা হবে। মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর নিজ কার্যালয়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে সারা দেশে হেফাজতের তাণ্ডব দেখেছে সবাই। সরকারি স্থাপনাসহ থানায় হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া মোহাম্মদপুর থানায়ও তার বিরুদ্ধে ভাঙচুরের মামলা রয়েছে। এ মামলার তদন্ত চলছিল। এতে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এ মামলার সঙ্গে মাওলানা মামুনুল হক জড়িত। ওই ঘটনা মামুনুল হক জানেন এবং তিনি স্বীকারও করেছেন। 
ডিসি হারুন অর রশিদ আরও বলেন, পল্টন থানাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অধিকাংশ মামলায় মামুনুল হককে আসামি করা হয়েছে। সভা-সমাবেশে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্যও দিয়েছেন। তার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে হামলা করেছে। এসব ঘটনার পর আমরা তাকে নজরদারিতে রেখেছিলাম। নানা ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আমরা সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেসব মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে। 
হারুন অর রশীদ বলেন, ২০২০ সালে মোহাম্মদপুরে মামলাটি করা হয়। সে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মামুনুল হক। এছাড়া সম্প্রতি সারা দেশে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় তার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে মামুনুল হককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি নাশকতার মামলা এবং রিসোর্টকাণ্ডে করা মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে। 
ডিসি হারুন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাশকতা ও প্রাণহানি এবং ঢাকার পল্টন থানা এলাকায় হামলাসহ বেশকিছু নাশকতার ঘটনায় তদন্ত চলার পাশাপাশি মামুনুলের ওপর নজরদারি করা হচ্ছিল। তদন্তে তার সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশের ওপর পরিকল্পিত হামলার উসকানি, থানা ও রেজিস্ট্রার অফিসে হামলা ও ভাঙচুরসহ অনেক ঘটনায় মামুনুলের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাকে আমরা নজরদারিতে রেখেছিলাম, পাশাপাশি এসব মামলার তদন্ত করেছি। তদন্তে তার সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর যাতে কেউ উত্তেজনা ছড়াতে না পারে সেজন্য বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। মোহাম্মদপুর, বারিধারা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের নভেম্বরে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসেন মামুনুল হক। ভাস্কর্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে একই বছর ডিসেম্বরে কুষ্টিয়া শহরে জাতির পিতার একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ভাস্কর্য বিরোধিতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরী ও যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়।
এ বছর মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায় হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় সংঘাত-নাশকতার ঘটনায় মামুনুল হকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এদিকে, ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে এক নারীসহ আটক হয়ে আবার আলোচনায় আসেন মাওলানা মামুনুল হক। যাকে তিনি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। কয়েকদিন ধরে হেফাজতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মামুনুল হককে আসামি করা হয়। এছাড়া সম্প্রতি মোদিবিরোধী আন্দোলনের সময় সহিংসতা করায় একাধিক মামলা হয়। এসব মামলায়ও মামুনুল হকের নাম রয়েছে। 
সোনারগাঁয়ের পৌর কাউন্সিলর ফারুক গ্রেফতার : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মামুনুল হক ইস্যুতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মামলায় কাউন্সিলর ফারুক আহমেদ তপনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার ভবনাথপুর এলাকা থেকে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানান, ৩ এপ্রিল হেফাজতের সহিংস ঘটনায় করা মামলায় পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফারুককে বাড়ির পাশের একটি ঘর থেকে গ্রেফতার করা হয়। হেফাজতের নাশকতায় ফারুক মাস্টারমাইন্ড হিসাবে কাজ করেছেন। চারটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক বর্তমানে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। 
জরুরি অনলাইন বৈঠকে হেফাজত নেতারা : হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় জরুরি অনলাইন বৈঠকে বসেছেন হেফাজতের শীর্ষ নেতারা। হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়েজী জানান, বৈঠক শেষে সব জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, রাজপথে নয়, আইনিভাবে সব মোকাবিলা করবে হেফাজত। মামুনুল হককে গ্রেফতারের খবরে হেফাজতের দুর্গ বলে খ্যাত হাটহাজারীর পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত ছিল। হেফাজতের নেতাকর্র্মীদের রাজপথে দেখা যায়নি। হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদাৎ হোসেন জানান, পরিস্থিতি খুবই শান্ত। হেফাজতের কোনো তৎপরতা দেখছি না।
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছেন, আলেমে দ্বীনদের আটক করে রিমান্ডে নিয়ে সরকার জুলুম করছে। এ জুলুমের শেষ হবে। এর কঠোর বিচার হবে। রোববার হাটহাজারী মাদ্রাসা মসজিদে এতেক্বাফকারী মুসল্লি, মাদ্রাসার ছাত্র ও সাধারণ মুসল্লিদের উদ্দেশে বয়ানকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাসে গ্রেফতারদের ইফতার সেহরিও করতে দেওয়া হচ্ছে না। এসব জুলুম থেকে প্রতিকারেই দোয়া ইউনুছের পরীক্ষিত আমল শেষে মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে বলে তিনি জানান। 
কেরানীগঞ্জ থানার চারপাশে পুলিশের ব্যারিকেড : কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ঘাটারচর এলাকায় মামুনুল হক পরিচালিত একটি মাদ্রাসা রয়েছে। দুপুরে মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর সারা দিন বাড়তি সতর্কতায় ছিল কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। রাত ৯টার দিকে থানার চারপাশের রাস্তায় বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। পুলিশ লাইন থেকে আনা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় ব্যারিকেড দেয়া পয়েন্টগুলোতে। মাইকিং করে আশপাশের বাসিন্দাদের বাসা থেকে বের না হতে বলা হয়। থানায় প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে সেখানে অবস্থান নেয় পুলিশ। থানাসংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আসাদুজ্জামান টিটু বলেন, মামুনুল হকের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে থানায় হামলা হতে পারে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন