পাটকল চালু করতে না পারলে লিজ বাতিল
jugantor
যুগান্তরকে গোলাম দস্তগীর গাজী
পাটকল চালু করতে না পারলে লিজ বাতিল

  মিজান চৌধুরী  

০৫ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন, বন্ধ পাটকলগুলো ২০ বছর মেয়াদে লিজ দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে পিপিপির মাধ্যমে দেওয়ার চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু সেভাবে চালু করতে গেলে মিল হস্তান্তর করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যাবে। সেখান থেকে বেরিয়ে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে লিজ নিয়ে ভালো করতে পারলে মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু চালু করতে না-পারলে তা ফেরত নেওয়া হবে।

রোববার যুগান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী এসব কথা বলেন। তিনি আরও জানান, গত বছরের জুলাইয়ে বিজেএমসির বন্ধ হওয়া ২৫টি পাটকলের মধ্যে জাতীয়, খালিশপুর, দৌলতপুর ও কেএফডি-এই চারটি মিলের শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাকি ২১টি মিলের ৯৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ শ্রমিকের বকেয়া দেওয়া হয়েছে। টাকার অঙ্কে ১৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা মজুরি দেওয়া হয়েছে শ্রমিকদের। সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে পাট শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন গোলাম দস্তগীর গাজী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার- মিজান চৌধুরী

যুগান্তর : বন্ধ ২৫টি পাটকল চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, সেটি কোন প্রক্রিয়ায় করা হবে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : পাটকলগুলো বন্ধ করার সময় আমরা বলেছিলাম দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের পুনরায় চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আমার এ কথার সঙ্গে মত দিয়েছেন। শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়। এর মধ্যে শ্রমিক ও পেনশনভোগীদের মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ বকেয়া টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের ভোটার আইডি কার্ডে নানা ধরনের ত্রুটি, অনেকের বিরুদ্ধে অডিট আপত্তিসহ নানা কারণে ৭ শতাংশ শ্রমিকের বকেয়া টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সেগুলো দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে পাট শ্রমিকদের ভূমিকা রয়েছে। তাদের যেন না-ঠকানো হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে।

যুগান্তর : পাটকলগুলো চালুর ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : এ বিষয়টি নিয়ে আমি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছি। সেখানে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে চালু করার চিন্তা করেছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পিপিপির মাধ্যমে সব কটি মিল হস্তান্তর করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। এই দীর্ঘ সময়ে পাটকলের আগের শ্রমিকরা তাদের কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন। তাদের কথা ভেবেই বিকল্প চিন্তা করেছি।

পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় লিজ বা ভাড়ার ভিত্তিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির কাছে পাটকল ছেড়ে দেওয়া হবে। কারণ, প্রাইভেট মিল মালিকদের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। তারা এসব মিল ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করলে ভালো করতে পারবে। সুতরাং আজ ভাড়া নিলে তারা এক মাসের মধ্যে চালু করতে পারবে। দ্রুত চালু করার ফলে আমাদের শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে। এই আশায় পিপিপিতে না-গিয়ে লিজ ভিত্তিতে চালুর চিন্তা করা হয়। লিজের অর্থ হলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা হবে এবং মালিকানায় থাকবে সরকার। মিলগুলো মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দেবে সরকারকে। এই মিল চালু করে দেশের উৎপাদন খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। স্থানীয় শ্রম নিয়োগ এবং পাটের উৎপাদন পরিপূর্ণ হবে।

যুগান্তর : লোকসানি পাটকল শ্রমিকদের বেসরকারি কোম্পানি কাজে লাগাতে চাইবে কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি মন্ত্রী হতে পারি। কিন্তু আমার উঠে আসা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক হিসাবে। সারা জীবন শিল্প খাতে ছিলাম। সেখান থেকে এখানে আসা। রাজনীতি করে মন্ত্রী হয়ে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছি। আমরা দেখেছি শিল্পখাতে একটি মিল চালু করার ক্ষেত্রে কত দ্রুত সেটি করা যেতে পারে। শিল্পখাত চালু করতে ব্যাংক ঋণ, নগদ অর্থ বিনিয়োগ করে। এতে যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদনে গেলে লাভের মুখ দেখা যাবে।

সুতরাং অভিজ্ঞ লোকছাড়া মিল দ্রুত চালুর কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত পাটকল মালিকরা মিল চালুর সময় এসব অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকদের খুঁজে বের করবে। আমার বিশ্বাস, মিল মালিকরা দক্ষ শ্রমিকদের খুঁজে বের করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেবে। এখানের একেকজন শ্রমিকের ৩০-৪০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের বাইরে অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যাবে না। এই লোকগুলোকে তারা নিয়োগ দিয়েই মিল চালু করবে বলে আমার প্রত্যাশা।

যুগান্তর : পাটকলগুলো লিজ দেওয়ার মেয়াদ কত বছর হবে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : প্রাথমিকভাবে ২০ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হবে। এরপর যদি সরকার চিন্তা করে এই লিজ দেওয়ার ফলে শিল্পখাত এগিয়ে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে নতুনভাবে আরও মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা করা হবে। এ ধরনের অপশন রাখা হবে। লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে সেটি হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে কে মিল চালাতে পারে। তাদের কী ধরনের অভিজ্ঞতা আছে।

এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারী আছে এবং যৌথ অংশীদারত্বের বিনিয়োগকারী আছে। তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিল মালিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ, নতুন কোনো উদ্যোক্তা এসে এত দ্রুত মিলগুলো চালু করতে পারবে কি না, জানা নেই। এজন্য আবেদন জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি দেখা হবে। লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ভাড়া বেশি দিলেই তাকে দেওয়া হবে না। আমরা মনে করি, যে কাজ জানবে তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আমরা চাই মিল চালু করতে হবে। উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে রপ্তানির বাজার পুরোপুরি ধরব।

যুগান্তর : প্রতিটি বন্ধ মিলের অনুকূলে দায়-দেনা আছে-সেগুলো পরিশোধ কে করবে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : দায়-দেনা সরকার পরিশোধ করবে। শোধ করে দিয়েই লিজদাতাদের জমি দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। এ বিষয়ে একটি হিসাব করে রাখা হয়েছে। মিলগুলো বুঝিয়ে দেওয়া সময় সেগুলো পরিশোধ করে দেওয়া হবে।

যুগান্তর : এর আগে অনেকে মিল নিয়ে সেখানে আবাসিক ভবনসহ অন্যান্য কাজ করেছে, আগের অভিজ্ঞতা ভালো নয় সেটি কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?

গোলাম দোস্তগীর গাজী : আপনি ঠিকই ধরেছেন। আগের সরকার এবং বর্তমান সরকারের একটি পরিকল্পনা ছিল মিলগুলো বেসরকারি খাতে বিক্রি করলে সেখানে তারা নতুনভাবে চালু করবে। কিন্তু মালিকানা নিয়ে অনেকে তা ধরে রাখেননি। এজন্য এবার মিলের মালিকানা ছাড়ছি না। যদি কোনো কারণে তারা চালু না-করে, সেক্ষেত্রে সরকার মিলগুলো ফেরত নেবে।

যুগান্তর : পাটশিল্প সম্প্রসারণে আপনার কী পরিকল্পনা আছে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : স্বাভাবিকভাবেই এই শিল্পখাত এগিয়ে যাচ্ছে। প্লাস্টিকের কারণে সারা পৃথিবী দূষিত হয়ে গেছে। সমুদ্রের তলদেশে প্লাস্টিকের বোতল খেয়ে তিমি মাছ মরছে। জাতিসংঘ প্লাস্টিকদ্রব্য বর্জন করতে সারা বিশ্বের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। ফলে বিশ্ব এখন প্রাকৃতিক তন্তুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কমছে প্লাস্টিক নির্ভরতা। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই এ বাজার পেয়েছি আমরা।

এই মিলগুলো ভালোভাবে চালু করতে পারলে বিশ্ববাজারে ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারব। এই করোনার মধ্যেও ২৩ শতাংশ পাট রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যেখানে সবকিছু নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। এক সময় অর্থনৈতিক আয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতা ছিল পাটের ওপর। আমরা আবার সে নির্ভরশীলতার দিকে পৌঁছে যাব।

যুগান্তর : পাট ব্যবসায়ী ও চাষিদের উৎসাহিত করতে কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হবে কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : এ খাতে প্রণোদনা ভালো আছে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে যথেষ্ট খেয়াল রাখেন এবং পাটকে খুব ভালোবাসেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে জানাতে। সেক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হলে তিনি আমাদের দেবেন।

যুগান্তর : এখন বন্ধ মিলগুলো চালু করা হবে; কিন্তু এই মিলগুলো বন্ধ করার পেছনে কাউকে দায়ী বলে মনে করেন কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : প্রতিটি সরকার, বিশেষ করে বিএনপি ও এরশাদ সরকারের সময় পাটকলগুলো লোকসানে ছিল। প্রধানমন্ত্রী চিন্তা করে দেখলেন, আর কতদিন লোকসানে থাকব। প্রতিবছর এক হাজার কোটি টাকা ন্যূনতম লোকসান হচ্ছে। আসলে সরকার সেবাখাত ছাড়া কোনো খাতে ব্যবসা করতে পারে না। যেটা সেবা খাত নয়, সেখানে সরকার ব্যবসা কেন করবে।

যুগান্তর : পাটচাষিদের নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

গোলাম দস্তগীর গাজী : দেখেন চাষিদের নিয়ে আমরা ভাবছি। পাটের চাহিদা যত বাড়বে কৃষক তত উপকৃত হবেন। গত বছর এক মণ পাট দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এ বছর দাম বেড়ে হয়েছে প্রতি মণ সাড়ে তিন হাজার টাকা। পাটের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা মূল্য বেশি পাচ্ছেন। সুতরাং চাহিদা বাড়লেই কৃষক উপকৃত হবেন। কারণ, কাঁচামাল বাহির থেকে আসে না।

যুগান্তরকে গোলাম দস্তগীর গাজী

পাটকল চালু করতে না পারলে লিজ বাতিল

 মিজান চৌধুরী 
০৫ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন, বন্ধ পাটকলগুলো ২০ বছর মেয়াদে লিজ দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে পিপিপির মাধ্যমে দেওয়ার চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু সেভাবে চালু করতে গেলে মিল হস্তান্তর করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যাবে। সেখান থেকে বেরিয়ে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে লিজ নিয়ে ভালো করতে পারলে মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু চালু করতে না-পারলে তা ফেরত নেওয়া হবে।

রোববার যুগান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী এসব কথা বলেন। তিনি আরও জানান, গত বছরের জুলাইয়ে বিজেএমসির বন্ধ হওয়া ২৫টি পাটকলের মধ্যে জাতীয়, খালিশপুর, দৌলতপুর ও কেএফডি-এই চারটি মিলের শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাকি ২১টি মিলের ৯৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ শ্রমিকের বকেয়া দেওয়া হয়েছে। টাকার অঙ্কে ১৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা মজুরি দেওয়া হয়েছে শ্রমিকদের। সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে পাট শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন গোলাম দস্তগীর গাজী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার- মিজান চৌধুরী

যুগান্তর : বন্ধ ২৫টি পাটকল চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, সেটি কোন প্রক্রিয়ায় করা হবে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : পাটকলগুলো বন্ধ করার সময় আমরা বলেছিলাম দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের পুনরায় চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আমার এ কথার সঙ্গে মত দিয়েছেন। শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়। এর মধ্যে শ্রমিক ও পেনশনভোগীদের মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ বকেয়া টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের ভোটার আইডি কার্ডে নানা ধরনের ত্রুটি, অনেকের বিরুদ্ধে অডিট আপত্তিসহ নানা কারণে ৭ শতাংশ শ্রমিকের বকেয়া টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সেগুলো দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে পাট শ্রমিকদের ভূমিকা রয়েছে। তাদের যেন না-ঠকানো হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে।

যুগান্তর : পাটকলগুলো চালুর ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : এ বিষয়টি নিয়ে আমি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছি। সেখানে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে চালু করার চিন্তা করেছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পিপিপির মাধ্যমে সব কটি মিল হস্তান্তর করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। এই দীর্ঘ সময়ে পাটকলের আগের শ্রমিকরা তাদের কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন। তাদের কথা ভেবেই বিকল্প চিন্তা করেছি।

পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় লিজ বা ভাড়ার ভিত্তিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির কাছে পাটকল ছেড়ে দেওয়া হবে। কারণ, প্রাইভেট মিল মালিকদের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। তারা এসব মিল ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করলে ভালো করতে পারবে। সুতরাং আজ ভাড়া নিলে তারা এক মাসের মধ্যে চালু করতে পারবে। দ্রুত চালু করার ফলে আমাদের শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে। এই আশায় পিপিপিতে না-গিয়ে লিজ ভিত্তিতে চালুর চিন্তা করা হয়। লিজের অর্থ হলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা হবে এবং মালিকানায় থাকবে সরকার। মিলগুলো মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দেবে সরকারকে। এই মিল চালু করে দেশের উৎপাদন খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। স্থানীয় শ্রম নিয়োগ এবং পাটের উৎপাদন পরিপূর্ণ হবে।

যুগান্তর : লোকসানি পাটকল শ্রমিকদের বেসরকারি কোম্পানি কাজে লাগাতে চাইবে কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি মন্ত্রী হতে পারি। কিন্তু আমার উঠে আসা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক হিসাবে। সারা জীবন শিল্প খাতে ছিলাম। সেখান থেকে এখানে আসা। রাজনীতি করে মন্ত্রী হয়ে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছি। আমরা দেখেছি শিল্পখাতে একটি মিল চালু করার ক্ষেত্রে কত দ্রুত সেটি করা যেতে পারে। শিল্পখাত চালু করতে ব্যাংক ঋণ, নগদ অর্থ বিনিয়োগ করে। এতে যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদনে গেলে লাভের মুখ দেখা যাবে।

সুতরাং অভিজ্ঞ লোকছাড়া মিল দ্রুত চালুর কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত পাটকল মালিকরা মিল চালুর সময় এসব অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকদের খুঁজে বের করবে। আমার বিশ্বাস, মিল মালিকরা দক্ষ শ্রমিকদের খুঁজে বের করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেবে। এখানের একেকজন শ্রমিকের ৩০-৪০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের বাইরে অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যাবে না। এই লোকগুলোকে তারা নিয়োগ দিয়েই মিল চালু করবে বলে আমার প্রত্যাশা।

যুগান্তর : পাটকলগুলো লিজ দেওয়ার মেয়াদ কত বছর হবে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : প্রাথমিকভাবে ২০ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হবে। এরপর যদি সরকার চিন্তা করে এই লিজ দেওয়ার ফলে শিল্পখাত এগিয়ে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে নতুনভাবে আরও মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা করা হবে। এ ধরনের অপশন রাখা হবে। লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে সেটি হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে কে মিল চালাতে পারে। তাদের কী ধরনের অভিজ্ঞতা আছে।

এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারী আছে এবং যৌথ অংশীদারত্বের বিনিয়োগকারী আছে। তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিল মালিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ, নতুন কোনো উদ্যোক্তা এসে এত দ্রুত মিলগুলো চালু করতে পারবে কি না, জানা নেই। এজন্য আবেদন জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি দেখা হবে। লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ভাড়া বেশি দিলেই তাকে দেওয়া হবে না। আমরা মনে করি, যে কাজ জানবে তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আমরা চাই মিল চালু করতে হবে। উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে রপ্তানির বাজার পুরোপুরি ধরব।

যুগান্তর : প্রতিটি বন্ধ মিলের অনুকূলে দায়-দেনা আছে-সেগুলো পরিশোধ কে করবে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : দায়-দেনা সরকার পরিশোধ করবে। শোধ করে দিয়েই লিজদাতাদের জমি দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। এ বিষয়ে একটি হিসাব করে রাখা হয়েছে। মিলগুলো বুঝিয়ে দেওয়া সময় সেগুলো পরিশোধ করে দেওয়া হবে।

যুগান্তর : এর আগে অনেকে মিল নিয়ে সেখানে আবাসিক ভবনসহ অন্যান্য কাজ করেছে, আগের অভিজ্ঞতা ভালো নয় সেটি কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?

গোলাম দোস্তগীর গাজী : আপনি ঠিকই ধরেছেন। আগের সরকার এবং বর্তমান সরকারের একটি পরিকল্পনা ছিল মিলগুলো বেসরকারি খাতে বিক্রি করলে সেখানে তারা নতুনভাবে চালু করবে। কিন্তু মালিকানা নিয়ে অনেকে তা ধরে রাখেননি। এজন্য এবার মিলের মালিকানা ছাড়ছি না। যদি কোনো কারণে তারা চালু না-করে, সেক্ষেত্রে সরকার মিলগুলো ফেরত নেবে।

যুগান্তর : পাটশিল্প সম্প্রসারণে আপনার কী পরিকল্পনা আছে?

গোলাম দস্তগীর গাজী : স্বাভাবিকভাবেই এই শিল্পখাত এগিয়ে যাচ্ছে। প্লাস্টিকের কারণে সারা পৃথিবী দূষিত হয়ে গেছে। সমুদ্রের তলদেশে প্লাস্টিকের বোতল খেয়ে তিমি মাছ মরছে। জাতিসংঘ প্লাস্টিকদ্রব্য বর্জন করতে সারা বিশ্বের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। ফলে বিশ্ব এখন প্রাকৃতিক তন্তুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কমছে প্লাস্টিক নির্ভরতা। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই এ বাজার পেয়েছি আমরা।

এই মিলগুলো ভালোভাবে চালু করতে পারলে বিশ্ববাজারে ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারব। এই করোনার মধ্যেও ২৩ শতাংশ পাট রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যেখানে সবকিছু নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। এক সময় অর্থনৈতিক আয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতা ছিল পাটের ওপর। আমরা আবার সে নির্ভরশীলতার দিকে পৌঁছে যাব।

যুগান্তর : পাট ব্যবসায়ী ও চাষিদের উৎসাহিত করতে কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হবে কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : এ খাতে প্রণোদনা ভালো আছে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে যথেষ্ট খেয়াল রাখেন এবং পাটকে খুব ভালোবাসেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে জানাতে। সেক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হলে তিনি আমাদের দেবেন।

যুগান্তর : এখন বন্ধ মিলগুলো চালু করা হবে; কিন্তু এই মিলগুলো বন্ধ করার পেছনে কাউকে দায়ী বলে মনে করেন কি না?

গোলাম দস্তগীর গাজী : প্রতিটি সরকার, বিশেষ করে বিএনপি ও এরশাদ সরকারের সময় পাটকলগুলো লোকসানে ছিল। প্রধানমন্ত্রী চিন্তা করে দেখলেন, আর কতদিন লোকসানে থাকব। প্রতিবছর এক হাজার কোটি টাকা ন্যূনতম লোকসান হচ্ছে। আসলে সরকার সেবাখাত ছাড়া কোনো খাতে ব্যবসা করতে পারে না। যেটা সেবা খাত নয়, সেখানে সরকার ব্যবসা কেন করবে।

যুগান্তর : পাটচাষিদের নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

গোলাম দস্তগীর গাজী : দেখেন চাষিদের নিয়ে আমরা ভাবছি। পাটের চাহিদা যত বাড়বে কৃষক তত উপকৃত হবেন। গত বছর এক মণ পাট দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এ বছর দাম বেড়ে হয়েছে প্রতি মণ সাড়ে তিন হাজার টাকা। পাটের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা মূল্য বেশি পাচ্ছেন। সুতরাং চাহিদা বাড়লেই কৃষক উপকৃত হবেন। কারণ, কাঁচামাল বাহির থেকে আসে না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন