এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা পাচার

চেয়ারম্যান এমডির কাঁধে দোষ চাপালেন পরিচালকরা

বর্তমান চেয়ারম্যান ও এক পরিচালককে আজ জিজ্ঞাসাবাদ

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এবি ব্যাংক

এবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৬ পরিচালক দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) বলেছেন, সব দোষ সাবেক চেয়ারম্যান ও এমডির। বিদেশে অফশোর কোম্পানি খুলে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা পাচারের ঘটনা তারা পরে জেনেছেন। লোভে পড়ে সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক অফশোরে বিনিয়োগের বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন। তাকে এ কাজে সহায়তা করেন সাবেক দুজন এমডি ও ট্রেজারি।

বিদেশে ভুয়া কোম্পানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পরিচালনা পর্ষদে বা বোর্ডে উপস্থাপন করা হয়নি। সাবেক চেয়ারম্যান নিজে ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের বাইরে অর্থ সরান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে রোববার এবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা নিজেদের দায় আড়াল করে দুদকের কাছে বক্তব্য দেন। এদিন ব্যাংকের পরিচালক শিশির রঞ্জন বোস, মো. মেসবাহুল আলম, মো. ফাহিমুল হক, সৈয়দ আফজাল হাসান উদ্দিন, রুনা জাকিয়া ও প্রফেসর ড. এম ইমতিয়াজ হোসাইনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন এবি ব্যাংকের ৬ পরিচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

এ সময় তাকে সহায়তা করেন সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। আজ ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান এমএ আউয়াল ও পরিচালক বিবি সাহা রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদকের টিম। সকাল ৯টায় তাদের দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে।

দুদকের কর্মকর্তারা নতুন সেলে এবি ব্যাংকের ৬ পরিচালককে একসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় তারা বলেন, অফশোরে ২০ মিলিয়ন ডলার কথিত বিনিয়োগের আগে একটা চুক্তি হয়েছিল বলে তারা পরে জেনেছেন। তবে চুক্তিতে কী ছিল তা তারা জানতে পারেননি। দুদকও সেই চুক্তির কপি উদ্ধার করতে পারেনি।

পরিচালকেরা তাদের বক্তব্যে আরও বলেন, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এমডি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এমনটি হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক নিজের এখতিয়ারে অনেক কিছুই করেছেন। এবি ব্যাংকের ২ কোটি ডলার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে (এডিসিবি) চেংবাও নামে একটি কোম্পানির অ্যাকাউন্টে গেছে। ব্যাংকে ওই হিসাবটি খোলার আগে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করেন সাবেক চেয়ারম্যান।

এমনকি বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধির স্থলে নিজেই ওই দেশের ব্যাংক হিসাবের ফরমে স্বাক্ষর করতে চেয়েছিলেন। অথচ চুক্তি ছিল ব্যাংকের ডিএমডি পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা ‘সিগনেটরি’ হবেন। হিসাবটি খোলার আগে তিনি (ওয়াহিদুল হক) চারবার দুবাই যান। সেখানে মিটিং করেন। তার কারসাজিতেই টাকা পাচার হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।

দুদকের কর্মকর্তারা পরিচালকদের কাছে জানতে চান, এত কিছু হল আপনারা প্রতিবাদ করেননি কেন। জবাবে তারা বলেন, তাদের অগোচরে অনেক কিছু ঘটেছে। সবকিছু তারা জানতেনও না। পর্ষদকে অন্ধকারে রেখেই চেয়ারম্যান কাজগুলো করেছেন। কিছু কিছু ঘটনায় ওয়াহিদুল হক পর্ষদকে ভুল বুঝিয়ে স্বাক্ষর নিয়েছেন বলেও জানান তারা। তারা বলেন, মূলত চেয়ারম্যানই ব্যাংক চালাতেন।

এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম ফজলার রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। ৩১ ডিসেম্বর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আরেক সাবেক এমডি শামীম আহমেদ চৌধুরীকে।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা টাকা পাচারের বিষয়টি স্বীকারও করেন বলে দুদক সূত্রে জানা যায়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তারা বলেন, এক আন্তর্জাতিক দালালের খপ্পরে পড়ে সিঙ্গাপুর ও দুবাইভিত্তিক পিজিএফ (পিনাকল গ্লোবাল ফান্ড) কোম্পানিতে ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। এবি ব্যাংকের এই অর্থ দেশের বাইরে স্থানান্তরের আগে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেননি।

এমনকি ওই অর্থ দেশে থেকে স্থানান্তরের আগে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনও নেয়া হয়নি। টাকা চলে যাওয়ার পর পর্ষদের অনুমোদন নেয়া হয়েছে। ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক স্বীকার করেন, দালাল খুররম ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলে ৮০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার লোভ দেখিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে ২০ মিলিয়ন ডলার চলে যাওয়ার পর জেনেছে তারা ভুয়া প্রতিষ্ঠানে টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

দুদক সূত্র জানায়, প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল পিজিএফ ৮ কোটি ও এবি ব্যাংক ২ কোটিসহ ১০ কোটি ডলার যৌথভাবে বিনিয়োগ করে ওই অফশোর কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হবে। এজন্য এবি ব্যাংক থেকে পিজিএফের কাছে ২ কোটি ডলার পাঠানো হয়।

২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে ওয়াহিদুল হক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। মো. ফজলুর রহমান ও শামীম আহমেদ চৌধুরী এমডির দায়িত্বে ছিলেন। ওয়াহিদুল হক, ফজলুর রহমান, শামীম আহমেদ চৌধুরী ও আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করেছে করেছে দুদক।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, এবি ব্যাংকের গ্রাহক সাইফুল হকের মাধ্যমে দুবাইয়ের নাগরিক খুররম আবদুল্লাহর সঙ্গে পরিচয় হয় এবি ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হকের। তাদের সঙ্গে তিনি কয়েক দফায় বৈঠকও করেন। সেখানে পিজিএফে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হয় এবং সে অনুযায়ী টাকা চলে যায়।

তারা বলেন, ভুয়া প্রতিষ্ঠান জেনেও এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এমডিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যাংকে গ্রাহকের গচ্ছিত অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও বিষয়টি ধরা পড়ে। দুদক ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করে।

এদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, অর্থ পাচারের অভিযোগ সম্পর্কিত নথিপত্র চেয়ে এরই মধ্যে ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর ও দুবাইভিত্তিক কোম্পানি পিজিএফের বিনিয়োগ প্রস্তাব, চুক্তি ও এ সংক্রান্ত পর্ষদ সভার নথিসহ সংশ্লিষ্ট দলিল। ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে দুদকে হাজির হওয়ার সময় ওইসব নথি সঙ্গে রাখতে হবে।

 
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

gpstar

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter