ঈদে বাড়ি ফিরতে মরিয়া
jugantor
সব বাধা পেরিয়ে মানুষের স্রোত
ঈদে বাড়ি ফিরতে মরিয়া
ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে গাড়ির চাপ * মাওয়া ও শিমুলিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় * যাত্রীর চাপে ফেরির সংখ্যা বাড়ল

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক মহাসড়কে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের স্রোত বইছে। পথে পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে আটকাতে পারেনি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করে মানুষ বাড়ি ফিরতে মরিয়া। দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায়ে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা, পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ ছোট ছোট যানবাহনে চড়ে গেছেন তারা। পথে পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড ও দিনে ফেরি চলাচল সীমিত রেখেও এদের আটকানো যায়নি। উল্টো তাদের উপচেপড়া চাপে ফেরির সংখ্যা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। জরুরি পরিষেবার জন্য চালু রাখা ফেরিতে গাড়ির বদলে গাদাগাদি করে মানুষ যেতে দেখা গেছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে চাপের কারণে থেমে থেমে চলেছে যানবাহন। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মানুষের এক স্থান থেকে আরেক স্থান যেতে নিরুৎসাহিত করতে দিনে ফেরি চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মাওয়া ও পাটুরিয়া দুই ফেরিঘাটেই মানুষের এতই চাপ তৈরি হয় যে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে জরুরি পরিষেবার জন্য চালু রাখা ফেরি দু-একটি বাড়াতে হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ায় দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলার অভ্যন্তরণে বাস চলাচল করলেও আরেক জেলায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তবুও বারবার যানবাহন পরিবর্তন করে ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন জেলায় গেছেন ঘরমুখো মানুষ। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রকোপ থাকলেও কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। এতে সংক্রমণ গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবীদের নিজ কর্মস্থল অধিক্ষেত্রে থাকার অনুরোধ জানিয়ে আসছে সরকার। আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। কিন্তু সেই বিধি-নিষেধকে উপেক্ষা করেই মানুষের স্রোত নামে সড়কে।

আরও দেখা গেছে, রাজধানীর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আব্দুল্লাহপুর, বাবুবাজার চিটাগং রোড, আশুলিয়া ও টঙ্গী এলাকায় বিভিন্ন যানবাহনের চাপ। শত শত মানুষ ব্যাগ নিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে গন্তব্যে যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় ছোট ছোট গাড়িতে কাছাকাছি দূরত্বের পথ পাড়ি দিচ্ছেন যাত্রীরা। পিকআপ, মাইক্রোবাস, সিএনজি, অটোরিকশা বিভিন্ন গন্তব্যে ডেকে ডেকে যাত্রী তুলছেন। রাজধানীর বাবুবাজার ব্রিজে জনপ্রতি তিনশ’ টাকায় যাত্রী তুলছিলেন মাইক্রোবাস চালক সেলিম মিয়া। তিনি বলেন, মাওয়া ও পাটুরিয়ায় ফেরি চালু থাকাবস্থায় এক পরিবারের বা কয়েকজনকে নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ট্রিপ দিতাম। এখন দিনে ফেরি বন্ধ থাকায় বাবুবাজার থেকে মাওয়া পর্যন্ত যাত্রী বহন করছি। তিনি আরও বলেন, পুলিশ ঝামেলা না করলে দিনে ৮-১০টি ট্রিপ দিতে পারি। পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েকদিন ধরেই বাড়িমুখো মানুষের ভিড় ছিল। শবেকদরের বন্ধের দিন সোমবার ভিড় আরও বেড়েছে। শেষ মুহূর্তে মানুষ যেভাবে হোক বাড়ি যাচ্ছেন।

বিজিবি ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে হাজারো যাত্রী ফেরিতে : গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা বাধা উপেক্ষা করে বনলতা ফেরিতে উঠে পড়েন হাজারের বেশি মানুষ। এ ফেরিতে ঠাঁই পায় মাত্র ১টি অ্যাম্বুলেন্স। অথচ শুধুমাত্র অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি যানবাহন পারাপারের জন্যই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এ রুটে চালু রাখা হয়েছে এটিসহ মোট দুটি ফেরি। যাত্রীদের চাপে ফেরিটিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, রোববার থেকে পাটুরিয়া ঘাটের বিভিন্ন পয়েন্টে বিজিবির সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। সব বাধা পেরিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হাজার হাজার ঘরমুখো মানুষ ঘাটে আসছেন। ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে পাটুরিয়া ঘাটে। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ বলেন, দিনে ফেরি বন্ধ। শুধু জরুরি পরিষেবায় বহরের ১৬টি ফেরির মধ্যে ২টি দিয়ে কিছু যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। তাও অ্যাম্বুলেন্স ও রোগী ছাড়া ফেরিতে উঠতে পারবে না। তবে রাতে পণ্যবাহী পরিবহণ পারাপারের জন্য সব ফেরি সচল রাখা হয়।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকার গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ঘাট উথলী পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হলেও যাত্রীদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করা যায়নি। তারা ঢাকা থেকে বিভিন্ন বাইপাস রোডে সিএনজি, অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেলে চড়ে পাটুরিয়া-আরিচা ঘাটে আসছেন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে বাড়ি যাচ্ছেন যাত্রীরা।

এদিকে অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি ও হাজার হাজার যাত্রীর উপচে পড়া ভিড়ের কারণে রজনীগন্ধা, বনলতা, শাপলা শালুকসহ ৪টি ফেরি দিয়ে দুই আড়াই ঘণ্টা পর পর যাত্রী পারাপার করে বিআইডব্লিউটিসি। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রজনীগন্ধা ও সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শাপলা শালুক নামের দুটি ফেরি পাটুরিয়া ঘাট থেকে কয়েকটি প্রাইভেটকার ও যাত্রীদেরকে নিয়ে দৌলতদিয়া উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ফেরিতে শুধু ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষ আর মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফেরির বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন তারা।

শিবালয় থানার ওসি ফিরোজ কবির জানান, যাত্রীরা কোনো বাধানিষেধ মানছেন না। নদীর স্রোতের মতো ঘরমুখো যাত্রীরা ঘাটে এসে ভিড় করছেন। তবে অন্যান্য দিনের চেয়ে সোমবার সকাল থেকে যাত্রীদের চাপ বেশি।

রাতের ফেরিতেও বাঁধভাঙা স্রোত : টেকেরহাট (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথে রোববার রাতে ফেরিতেও ঢাকামুখো যাত্রীদের বাঁধভাঙা স্রোত দেখা গেছে। জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক, পচনশীল পণ্যের ট্রাক, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, লাশের গাড়ি ও প্রাইভেট গাড়ির পাশাপাশি যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। রোববার রাত ৮টা থেকে পর পর ৩টি ফেরি ছেড়ে যায় শিমুলিয়া ঘাটের উদ্দেশে। শিমুলিয়া থেকে ছেড়ে আসা ফেরি বাংলাবাজার ঘাটে এসে আনলোড হওয়ার সাথে সাথে যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে ফেরিতে উঠে পড়েন। এ সময় জরুরি সেবার গাড়ি, রোগীর গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে তুলতে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। যাত্রীরা কৌশলে রাতের ফেরিকেই বেছে নিয়েছে।

বিআইডব্লিউটিসি বাংলাবাজার ফেরি ঘাটের ম্যানেজার সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাতে আমাদের সব ফেরি অর্থাৎ ১৬টির মধ্যে ১৫টি চলে। রোববার রাতে যাত্রী চাপ খুব বেশি ছিল। মানুষ তো এখন করোনা ভয় পায় না। আমরা যেমন ভয় পাই; এরা পায় না। অনেকেই মাস্ক পরে না, পরলেও থুঁতনির নিচে নামিয়ে রাখে।

ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ : টাঙ্গাইল থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের যানবাহন ও ঘরমুখো মানুষের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। গণপরিবহণ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘরমুখো মানুষের। বাধ্য হয়ে গাদাগাদি করে ট্রাক, পিকআপ, সিএনজিতে যেতে দেখা গেছে। গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া। অনেকে পরিবার নিয়ে মোটরসাইকেলেই বাড়ি রওয়ানা হয়েছেন।

সোমবার সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের আশেকপুর, ঘারিন্দা, রাবনা, বিক্রমহাটি, এলেঙ্গা, জোকারচর সরেজমিনের গিয়ে দেখা যায়, রাস্তায় দূরপাল্লার বাস নেই। তবে চাপ রয়েছে ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ব্যক্তিগত গাড়ির। এসব যানবাহনে গাদাগাদি করে মানুষ যাচ্ছে। আবার সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ভেঙে ভেঙে চলাচল করছে মানুষ। রাবনা বাইপাস সড়কে কথা হয় নাটোরের রফিকুল ইসলামের সাথে। তিনি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি জানান, দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে নাগরপুর থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত এসেছেন। এখন নাটোর যাওয়ার জন্য যানবাহনের অপেক্ষায় রয়েছেন। একটি মাইক্রোবাস পেয়েছিলেন ভাড়া চেয়েছে ১২শ টাকা। অথচ স্বাভাবিক সময়ে তিনশ টাকায় টাঙ্গাইল থেকে নাটোর যেতেন।

কালিহাতীর এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকশ মানুষ অপেক্ষা করছে যানবাহনের জন্য। এদের মধ্যে বেশিরভাগই গাজীপুর, সাভার এলাকা থেকে আসা শ্রমজীবী মানুষ। এদের অনেকেই ভেঙে ভেঙে রিকশা, অটোযোগে এ পর্যন্ত এসেছেন। শরিফ হোসেন নামে এক যাত্রী জানান, গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে ভেঙে ভেঙে এ পর্যন্ত আসতে চারশ টাকা খরচ হয়েছে। এখন এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হতে মোটরসাইকেলে চাচ্ছে ৫০০ টাকা। বাধ্য হয়ে এই ভাড়াই তাকে যেতে হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার ভোর ৬টা থেকে সোমবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩১ হাজার ৮৯৯টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। টোল আদায় করা হয়েছে দুই কোটি ২০ লাখ ২৭ হাজার ৬৩০ টাকা, যা অন্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ। এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াসির আরাফাত বলেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

রাজবাড়ীতে নদী পারের অপেক্ষায় ট্রাকের দীর্ঘ সারি : রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় নদী পারের অপেক্ষায় আটকে আছে বহু পণ্যবাহী ট্রাক। সোমবার বিকাল ৫টার দিকে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ওই এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ সেখ যুগান্তরকে বলেন, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি বন্ধ থাকায় গোয়ালন্দ মোড়ে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে পড়েছে। তবে রাতেই এসব ট্রাক নদী পারের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

সব বাধা পেরিয়ে মানুষের স্রোত

ঈদে বাড়ি ফিরতে মরিয়া

ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে গাড়ির চাপ * মাওয়া ও শিমুলিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় * যাত্রীর চাপে ফেরির সংখ্যা বাড়ল
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক মহাসড়কে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের স্রোত বইছে। পথে পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে আটকাতে পারেনি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করে মানুষ বাড়ি ফিরতে মরিয়া। দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায়ে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা, পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ ছোট ছোট যানবাহনে চড়ে গেছেন তারা। পথে পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড ও দিনে ফেরি চলাচল সীমিত রেখেও এদের আটকানো যায়নি। উল্টো তাদের উপচেপড়া চাপে ফেরির সংখ্যা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। জরুরি পরিষেবার জন্য চালু রাখা ফেরিতে গাড়ির বদলে গাদাগাদি করে মানুষ যেতে দেখা গেছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে চাপের কারণে থেমে থেমে চলেছে যানবাহন। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মানুষের এক স্থান থেকে আরেক স্থান যেতে নিরুৎসাহিত করতে দিনে ফেরি চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মাওয়া ও পাটুরিয়া দুই ফেরিঘাটেই মানুষের এতই চাপ তৈরি হয় যে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে জরুরি পরিষেবার জন্য চালু রাখা ফেরি দু-একটি বাড়াতে হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ায় দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলার অভ্যন্তরণে বাস চলাচল করলেও আরেক জেলায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তবুও বারবার যানবাহন পরিবর্তন করে ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন জেলায় গেছেন ঘরমুখো মানুষ। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রকোপ থাকলেও কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। এতে সংক্রমণ গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবীদের নিজ কর্মস্থল অধিক্ষেত্রে থাকার অনুরোধ জানিয়ে আসছে সরকার। আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। কিন্তু সেই বিধি-নিষেধকে উপেক্ষা করেই মানুষের স্রোত নামে সড়কে।

আরও দেখা গেছে, রাজধানীর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আব্দুল্লাহপুর, বাবুবাজার চিটাগং রোড, আশুলিয়া ও টঙ্গী এলাকায় বিভিন্ন যানবাহনের চাপ। শত শত মানুষ ব্যাগ নিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে গন্তব্যে যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় ছোট ছোট গাড়িতে কাছাকাছি দূরত্বের পথ পাড়ি দিচ্ছেন যাত্রীরা। পিকআপ, মাইক্রোবাস, সিএনজি, অটোরিকশা বিভিন্ন গন্তব্যে ডেকে ডেকে যাত্রী তুলছেন। রাজধানীর বাবুবাজার ব্রিজে জনপ্রতি তিনশ’ টাকায় যাত্রী তুলছিলেন মাইক্রোবাস চালক সেলিম মিয়া। তিনি বলেন, মাওয়া ও পাটুরিয়ায় ফেরি চালু থাকাবস্থায় এক পরিবারের বা কয়েকজনকে নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ট্রিপ দিতাম। এখন দিনে ফেরি বন্ধ থাকায় বাবুবাজার থেকে মাওয়া পর্যন্ত যাত্রী বহন করছি। তিনি আরও বলেন, পুলিশ ঝামেলা না করলে দিনে ৮-১০টি ট্রিপ দিতে পারি। পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েকদিন ধরেই বাড়িমুখো মানুষের ভিড় ছিল। শবেকদরের বন্ধের দিন সোমবার ভিড় আরও বেড়েছে। শেষ মুহূর্তে মানুষ যেভাবে হোক বাড়ি যাচ্ছেন। 

বিজিবি ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে হাজারো যাত্রী ফেরিতে : গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা বাধা উপেক্ষা করে বনলতা ফেরিতে উঠে পড়েন হাজারের বেশি মানুষ। এ ফেরিতে ঠাঁই পায় মাত্র ১টি অ্যাম্বুলেন্স। অথচ শুধুমাত্র অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি যানবাহন পারাপারের জন্যই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এ রুটে চালু রাখা হয়েছে এটিসহ মোট দুটি ফেরি। যাত্রীদের চাপে ফেরিটিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, রোববার থেকে পাটুরিয়া ঘাটের বিভিন্ন পয়েন্টে বিজিবির সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। সব বাধা পেরিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হাজার হাজার ঘরমুখো মানুষ ঘাটে আসছেন। ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে পাটুরিয়া ঘাটে। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ বলেন, দিনে ফেরি বন্ধ। শুধু জরুরি পরিষেবায় বহরের ১৬টি ফেরির মধ্যে ২টি দিয়ে কিছু যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। তাও অ্যাম্বুলেন্স ও রোগী ছাড়া ফেরিতে উঠতে পারবে না। তবে রাতে পণ্যবাহী পরিবহণ পারাপারের জন্য সব ফেরি সচল রাখা হয়।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকার গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ঘাট উথলী পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হলেও যাত্রীদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করা যায়নি। তারা ঢাকা থেকে বিভিন্ন বাইপাস রোডে সিএনজি, অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেলে চড়ে পাটুরিয়া-আরিচা ঘাটে আসছেন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে বাড়ি যাচ্ছেন যাত্রীরা।

এদিকে অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি ও হাজার হাজার যাত্রীর উপচে পড়া ভিড়ের কারণে রজনীগন্ধা, বনলতা, শাপলা শালুকসহ ৪টি ফেরি দিয়ে দুই আড়াই ঘণ্টা পর পর যাত্রী পারাপার করে বিআইডব্লিউটিসি। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রজনীগন্ধা ও সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শাপলা শালুক নামের দুটি ফেরি পাটুরিয়া ঘাট থেকে কয়েকটি প্রাইভেটকার ও যাত্রীদেরকে নিয়ে দৌলতদিয়া উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ফেরিতে শুধু ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষ আর মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফেরির বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন তারা। 

শিবালয় থানার ওসি ফিরোজ কবির জানান, যাত্রীরা কোনো বাধানিষেধ মানছেন না। নদীর স্রোতের মতো ঘরমুখো যাত্রীরা ঘাটে এসে ভিড় করছেন। তবে অন্যান্য দিনের চেয়ে সোমবার সকাল থেকে যাত্রীদের চাপ বেশি।

রাতের ফেরিতেও বাঁধভাঙা স্রোত : টেকেরহাট (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথে রোববার রাতে ফেরিতেও ঢাকামুখো যাত্রীদের বাঁধভাঙা স্রোত দেখা গেছে। জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক, পচনশীল পণ্যের ট্রাক, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, লাশের গাড়ি ও প্রাইভেট গাড়ির পাশাপাশি যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। রোববার রাত ৮টা থেকে পর পর ৩টি ফেরি ছেড়ে যায় শিমুলিয়া ঘাটের উদ্দেশে। শিমুলিয়া থেকে ছেড়ে আসা ফেরি বাংলাবাজার ঘাটে এসে আনলোড হওয়ার সাথে সাথে যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে ফেরিতে উঠে পড়েন। এ সময় জরুরি সেবার গাড়ি, রোগীর গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে তুলতে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। যাত্রীরা কৌশলে রাতের ফেরিকেই বেছে নিয়েছে। 

বিআইডব্লিউটিসি বাংলাবাজার ফেরি ঘাটের ম্যানেজার সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাতে আমাদের সব ফেরি অর্থাৎ ১৬টির মধ্যে ১৫টি চলে। রোববার রাতে যাত্রী চাপ খুব বেশি ছিল। মানুষ তো এখন করোনা ভয় পায় না। আমরা যেমন ভয় পাই; এরা পায় না। অনেকেই মাস্ক পরে না, পরলেও থুঁতনির নিচে নামিয়ে রাখে।

ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ : টাঙ্গাইল থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের যানবাহন ও ঘরমুখো মানুষের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। গণপরিবহণ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘরমুখো মানুষের। বাধ্য হয়ে গাদাগাদি করে ট্রাক, পিকআপ, সিএনজিতে যেতে দেখা গেছে। গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া। অনেকে পরিবার নিয়ে মোটরসাইকেলেই বাড়ি রওয়ানা হয়েছেন।

সোমবার সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের আশেকপুর, ঘারিন্দা, রাবনা, বিক্রমহাটি, এলেঙ্গা, জোকারচর সরেজমিনের গিয়ে দেখা যায়, রাস্তায় দূরপাল্লার বাস নেই। তবে চাপ রয়েছে ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ব্যক্তিগত গাড়ির। এসব যানবাহনে গাদাগাদি করে মানুষ যাচ্ছে। আবার সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ভেঙে ভেঙে চলাচল করছে মানুষ। রাবনা বাইপাস সড়কে কথা হয় নাটোরের রফিকুল ইসলামের সাথে। তিনি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি জানান, দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে নাগরপুর থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত এসেছেন। এখন নাটোর যাওয়ার জন্য যানবাহনের অপেক্ষায় রয়েছেন। একটি মাইক্রোবাস পেয়েছিলেন ভাড়া চেয়েছে ১২শ টাকা। অথচ স্বাভাবিক সময়ে তিনশ টাকায় টাঙ্গাইল থেকে নাটোর যেতেন। 

কালিহাতীর এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকশ মানুষ অপেক্ষা করছে যানবাহনের জন্য। এদের মধ্যে বেশিরভাগই গাজীপুর, সাভার এলাকা থেকে আসা শ্রমজীবী মানুষ। এদের অনেকেই ভেঙে ভেঙে রিকশা, অটোযোগে এ পর্যন্ত এসেছেন। শরিফ হোসেন নামে এক যাত্রী জানান, গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে ভেঙে ভেঙে এ পর্যন্ত আসতে চারশ টাকা খরচ হয়েছে। এখন এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হতে মোটরসাইকেলে চাচ্ছে ৫০০ টাকা। বাধ্য হয়ে এই ভাড়াই তাকে যেতে হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার ভোর ৬টা থেকে সোমবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩১ হাজার ৮৯৯টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। টোল আদায় করা হয়েছে দুই কোটি ২০ লাখ ২৭ হাজার ৬৩০ টাকা, যা অন্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ। এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াসির আরাফাত বলেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

রাজবাড়ীতে নদী পারের অপেক্ষায় ট্রাকের দীর্ঘ সারি : রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় নদী পারের অপেক্ষায় আটকে আছে বহু পণ্যবাহী ট্রাক। সোমবার বিকাল ৫টার দিকে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ওই এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ সেখ যুগান্তরকে বলেন, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি বন্ধ থাকায় গোয়ালন্দ মোড়ে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে পড়েছে। তবে রাতেই এসব ট্রাক নদী পারের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন