কৌশলগত ভুলে টিকার জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা
jugantor
কৌশলগত ভুলে টিকার জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা
আশা-নিরাশার দোলাচলে টিকাদান কার্যক্রম

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে করোনা রোধে টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু জেলায় টিকা শেষ হয়ে গেছে। অনেক স্থনে টিকা না পেয়ে জনগণ বিক্ষোভ করছে। এ পর্যন্ত যত টিকা এসেছে এবং আসবে, তাতে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। বাকিদের কী হবে-এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছে না। আগামীকাল চীনের সিনোফার্ম থেকে ৫ লাখ টিকা আসবে দেশে।

কিন্তু এই টিকা শিগগিরই কেনার সুযোগ পাচ্ছে না বাংলাদেশ। রাশিয়ার টিকাও দরকষাকষির প্যাঁচে পড়ে আটকে আছে। অগ্রিম টাকায় কেনা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকা কবে পাওয়া যাবে, সেটিও অনিশ্চিত। দেশীয় কোম্পানি বঙ্গভ্যাক্সের ট্রায়াল পরিচালনার এখনো অনুমোদন মেলেনি। এই টিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও আশাবাদী নন। সব মিলিয়ে টিকার জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা চলছে। এর শেষ কোথায়, কেউ জানে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশ্লিষ্টদের কৌশলগত ভুলের কারণে আমরা টিকা সংগ্রহে পিছিয়ে পড়ছি। এ সংক্রান্ত সব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাশিয়ার টিকা ৬৪টি দেশে বিক্রি হচ্ছে। অথচ প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন না করে আমাদের দেশের পক্ষ থেকে ৩০টি শর্ত দেওয়া হলো, যা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। যা এই টিকার প্রাপ্যতার সম্ভাবনাকে শঙ্কায় ফেলছে।

চীনের পক্ষ থেকে একাধিকবার ট্রায়াল পরিচালনাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব এলেও সেগুলো গ্রহণ করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত একটি চীনা টিকার অনুমোদন দেওয়া হলেও তা সংগ্রহে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। এমনকি আমাদের তিন বছর মেয়াদি ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট প্ল্যান করা হয়েছে।

যেখানে টিকার কার্যকারিতা থাকে এক বছর, সেখানে ডিপ্লয়মেন্ট প্ল্যান হয়েছে তিন বছর। তারা বলেন, এ ধরনের মহামারির ক্ষেত্রে দেশ রক্ষাকে যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়, তেমনই প্রাণ রক্ষার ক্ষেত্রে একই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে কোনো দরকষাকষি নয়, বরং সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করা উচিত।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, গণটিকাদান কর্মসূচি সফল করতে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সব উদ্যোগই বিঘ্নিত হচ্ছে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে যে খসড়া পাঠানো হয়েছে, সেখানে ৩০টি সংশোধনী দেওয়া হয়েছে, যা টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিতে অন্তরায়। যেহেতু আমাদের প্রয়োজনটা বেশি, তাই আমাদের কিছুটা নমনীয় হতে হবে। সামনে দেখা যাবে হয়তো চীনের সঙ্গেও একই আচরণ করা হবে।

টিকার হিসাব : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে গণহারে করোনা টিকা দেওয়া শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওইদিন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে টিকা দিয়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর আগে ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ জনকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে।

৮ এপ্রিল দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরুর পর এ পর্যন্ত ২৩ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ জন এই টিকা নিয়েছেন। দেশে এ পর্যন্ত কেনা টিকা এসেছে ৭০ লাখ ডোজ এবং উপহার হিসাবে এসেছে আরও ৩২ লাখ। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে প্রায় ৯৪ লাখ। বর্তমানে আর ৮ লাখ ডোজ মজুত রয়েছে। মজুত কমে আসায় এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় ২৬ এপ্রিল থেকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

জুনের আগে সেরামের টিকা আসছে না : ভারতে ক্রমেই কোভিড পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এর মধ্যে জুনের আগে সেরাম থেকে টিকা আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমনকি ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে টিকা আসার সময় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঢাকা ও দিল্লি সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে সেরাম ইনস্টিটিউট প্রতিমাসে ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডোজ টিকা উৎপাদন করছে এবং ভারত বায়োটেক করছে ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন।

এর বিপরীতে প্রতিদিন টিকা নিচ্ছে প্রায় তিন মিলিয়ন। বর্তমানে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে যারা, শুধু তারাই টিকা নিতে পারবেন। তবে ১ মে থেকে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবাইকে টিকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। ২৪ এপ্রিল টিকা বিষয়ে ভারতীয় নোট ভার্বালের বিষয়ে এক কর্মকর্তা জানান, কোনো দিন-তারিখ উল্লেখ না করে দিল্লি থেকে জানানো হয়েছে, এই মুহূর্তে তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে তারা টিকা দিতে পারবে না।

কোভ্যাক্স থেকে আসছে এক লাখ ডোজ : ফাইজার বায়োটেকের এক লাখ টিকা মে মাসে বাংলাদেশে আসবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে টিকা পাওয়ার বিষয়ে সরকার আরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অধিদপ্তরের করোনা সংক্রান্ত মুখপাত্র ও পরিচালক (এনসিডিসি) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন এই তথ্য জানিয়েছেন।

কোভ্যাক্সের সঙ্গে টিকার বিষয়ে অনেক আগে থেকেই চুক্তি ছিল জানিয়ে ডা. রোবেদ বলেন, ‘তারা আমাদের মোট যে টিকা দেবে, এর ১০ ভাগ ফ্রি আসার কথা। প্রথম দফায় সেখান থেকে ফাইজার বায়োটেকের এক লাখ টিকা চলে আসবে বলে তারা জানিয়েছে।

চীনের টিকা পেতে অপেক্ষা : চীনের উপহারের পাঁচ লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা বুধবার নাগাদ দেশে পৌঁছাবে। তবে কেনা টিকা পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হবে। এমনটি জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। সোমবার এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। লি জিমিং বলেন, টিকা নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং বাংলাদেশে টিকা পাঠানোর বিষয়টি চীন ‘খুবই ইতিবাচকভাবে’ দেখছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশ সরকার চীনের সিনোফার্মের টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ আগে। এখন টিকা পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের দীর্ঘ কিউ তৈরি হয়েছে। আর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ টিকার জন্য সেই লাইনের সম্মুখভাগের খুব কাছাকাছি অবস্থানে নেই। ওই লাইন এত বেশি দীর্ঘ যে, ডিসেম্বরের আগে টিকা পাওয়ার আশা না করাই ভালো। তবে সরকারের উপহারে ৫ লাখ ডোজ টিকার চালান ১২ মে বাংলাদেশে আসবে।

রাশিয়ার সঙ্গে দরকষাকষি : সম্প্রতি রাশিয়ার তৈরি করোনাভাইরাসের টিকা ‘স্পুটনিক-ভি’ আমদানি ও জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। মে মাসে এই টিকার ৪০ লাখ ডোজ দেশে আসবে বলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি খসড়া চুক্তিপত্র পাঠানো হয়। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩০টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এসব বিষয়ে সমাধান হলে চূড়ান্ত চুক্তি হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি হলে টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসতে পারে।

সিদ্ধান্ত হয়নি বঙ্গভ্যাক্স নিয়ে : দেশীয় টিকা উৎপাদনকারী কোম্পানি গ্লোব বায়োটেক উদ্ভাবিত বঙ্গভ্যাক্স নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বিএমআরসি (বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল) পক্ষ থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। তবে বিএমআরসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মুদাচ্ছের আলী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিগগিরই গ্লোব বায়োটকের বঙ্গভ্যাক্সকে হিউম্যান ট্রায়েলের অনুমোদন দেওয়া হবে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুমোদন পেলে তারা বছরে এক কোটি ডোজ উৎপাদন করতে সক্ষম। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের পক্ষে টিকা উৎপাদন আসলে খুবই কঠিন। কারণ অ্যানিমেল ট্রায়াল থেকে হিউম্যান ট্রায়ালে গেলেই অনেক টিকা বা ওষুধ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি পেনিসিলিনের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর প্রথম ব্যক্তিকে প্রয়োগ করা হলে তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু হয়। এরপর এটি ডেভেলপ করতে আরও ছয় বছর কেটে যায়।

টিকার অন্যান্য সোর্স : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনা করতে চায় ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল বায়োলজি চাইনিজ একাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্স (আইএমবিসিএএমএস)। ১৯৬০ সালে ওরাল পলিওমাইলেস্টি ভ্যাকাসিন (ওপিভি) এবং ১৯৯২ সালে হেপাটাইটিস এ ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত দুই বিলিয়ন ওপিভি এবং ৫২ বিলিয়ন ডোজ হেপাটাইটিস এ টিকা উৎপাদন ও বাজারজাত করেছে।

এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মনোনীত একটি বৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে সার্সকোভ-২ নামের একটি টিকা উদ্ভাবন করে, যা আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসারে প্রাণীর দেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং মানব দেহে পরীক্ষামূলক ফেজ-১ ও ফেজ-২ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

এ প্রতিষ্ঠানের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনায় দেশের একটি ওষুধ কোম্পানির মাধ্যমে ২৩ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের কাছে আবেদন করে। যেটি পরিচালনায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

এদিকে ভারত বায়োটেক নামে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান একটি করোনা টিকা উদ্ভাবন করেছে। এটিও একটি ‘ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভ্যাকসিন’। ইতোমধ্যে এ টিকার তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনার জন্য বিএমআরসিতে আবেদন করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের ক্লিনিক্যাল রিসার্চ করার জন্য আইসিডিডিআর,বি’র সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তবে এদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, টিকা নিয়ে অনেক সংকট তৈরি হয়েছে। যারা প্রথম ডোজ পেয়েছে, তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৪ লাখ ৪০ হাজার টিকার ঘাটতি রয়েছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় সেদেশে চাহিদা মোটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে যেহেতু আমাদের সঙ্গে একটা চুক্তি রয়েছে, তাই তাদের কাছ থেকে টিকা পেতে চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

তাছাড়া ৭টি দেশ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা মজুত রেখেছে। তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। যদিও সেটি সময়সাপেক্ষ। দু-একদিনে সিনোফার্মের ৫ লাখ টিকা আসবে। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় টিকা পেতে আবেদনে আমরা পিছিয়ে আছি।

রাশিয়া ৩ কোটি ডোজ দিতে চেয়েছে; কিন্তু সেখানে চুক্তি নিয়ে বিলম্ব হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমাদের বিলম্ব হয়েছে। আসলে ডিসেম্বরের আগে আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এনসিডিসি) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, আমাদের দেশে এখন অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট তাদের বর্তমান অবস্থার কারণে আমাদের টিকা দিতে পারছে না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, যাদের মাধ্যমে টিকা আনার কথা, তাদের বলা হয়েছে, অন্তত ২০ লাখ টিকা যেন অতি দ্রুত তাদের মাধ্যমে ব্যবস্থা করা হয়।

কারণ এটি সেরাম ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সরকার এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ছিল। এটা ছাড়াও টিকার জন্য বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, চীন থেকে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এ দেশে প্রস্তুত করতে আলোচনা চলছে। অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ‘কিছুদিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভ্যাক্সের আওতায় বিভিন্ন দেশকে আমন্ত্রণ জানায়।

বাংলাদেশ সরকার সেখান থেকে ১০ কোটি টিকা কেনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। সম্প্রতি জরুরি প্রয়োজনে টিকা পেতে ছয়টি দেশের সমন্বয়ে একটি ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি টু সাউথ এশিয়া ফোরামে যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও চীন এই ফোরামে রয়েছে। আমরা যদি এতে যোগদান করতে পারি, যদি এই ফোরামে অসংখ্য টিকা এসে যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে টিকার সহজলভ্যতা হবে।

কৌশলগত ভুলে টিকার জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা

আশা-নিরাশার দোলাচলে টিকাদান কার্যক্রম
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে করোনা রোধে টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু জেলায় টিকা শেষ হয়ে গেছে। অনেক স্থনে টিকা না পেয়ে জনগণ বিক্ষোভ করছে। এ পর্যন্ত যত টিকা এসেছে এবং আসবে, তাতে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। বাকিদের কী হবে-এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছে না। আগামীকাল চীনের সিনোফার্ম থেকে ৫ লাখ টিকা আসবে দেশে।

কিন্তু এই টিকা শিগগিরই কেনার সুযোগ পাচ্ছে না বাংলাদেশ। রাশিয়ার টিকাও দরকষাকষির প্যাঁচে পড়ে আটকে আছে। অগ্রিম টাকায় কেনা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকা কবে পাওয়া যাবে, সেটিও অনিশ্চিত। দেশীয় কোম্পানি বঙ্গভ্যাক্সের ট্রায়াল পরিচালনার এখনো অনুমোদন মেলেনি। এই টিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও আশাবাদী নন। সব মিলিয়ে টিকার জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা চলছে। এর শেষ কোথায়, কেউ জানে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশ্লিষ্টদের কৌশলগত ভুলের কারণে আমরা টিকা সংগ্রহে পিছিয়ে পড়ছি। এ সংক্রান্ত সব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাশিয়ার টিকা ৬৪টি দেশে বিক্রি হচ্ছে। অথচ প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন না করে আমাদের দেশের পক্ষ থেকে ৩০টি শর্ত দেওয়া হলো, যা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। যা এই টিকার প্রাপ্যতার সম্ভাবনাকে শঙ্কায় ফেলছে।

চীনের পক্ষ থেকে একাধিকবার ট্রায়াল পরিচালনাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব এলেও সেগুলো গ্রহণ করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত একটি চীনা টিকার অনুমোদন দেওয়া হলেও তা সংগ্রহে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। এমনকি আমাদের তিন বছর মেয়াদি ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট প্ল্যান করা হয়েছে।

যেখানে টিকার কার্যকারিতা থাকে এক বছর, সেখানে ডিপ্লয়মেন্ট প্ল্যান হয়েছে তিন বছর। তারা বলেন, এ ধরনের মহামারির ক্ষেত্রে দেশ রক্ষাকে যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়, তেমনই প্রাণ রক্ষার ক্ষেত্রে একই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে কোনো দরকষাকষি নয়, বরং সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করা উচিত।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, গণটিকাদান কর্মসূচি সফল করতে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সব উদ্যোগই বিঘ্নিত হচ্ছে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে যে খসড়া পাঠানো হয়েছে, সেখানে ৩০টি সংশোধনী দেওয়া হয়েছে, যা টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিতে অন্তরায়। যেহেতু আমাদের প্রয়োজনটা বেশি, তাই আমাদের কিছুটা নমনীয় হতে হবে। সামনে দেখা যাবে হয়তো চীনের সঙ্গেও একই আচরণ করা হবে।

টিকার হিসাব : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে গণহারে করোনা টিকা দেওয়া শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওইদিন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে টিকা দিয়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর আগে ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ জনকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে।

৮ এপ্রিল দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরুর পর এ পর্যন্ত ২৩ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ জন এই টিকা নিয়েছেন। দেশে এ পর্যন্ত কেনা টিকা এসেছে ৭০ লাখ ডোজ এবং উপহার হিসাবে এসেছে আরও ৩২ লাখ। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে প্রায় ৯৪ লাখ। বর্তমানে আর ৮ লাখ ডোজ মজুত রয়েছে। মজুত কমে আসায় এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় ২৬ এপ্রিল থেকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

জুনের আগে সেরামের টিকা আসছে না : ভারতে ক্রমেই কোভিড পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এর মধ্যে জুনের আগে সেরাম থেকে টিকা আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমনকি ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে টিকা আসার সময় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঢাকা ও দিল্লি সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে সেরাম ইনস্টিটিউট প্রতিমাসে ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডোজ টিকা উৎপাদন করছে এবং ভারত বায়োটেক করছে ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন।

এর বিপরীতে প্রতিদিন টিকা নিচ্ছে প্রায় তিন মিলিয়ন। বর্তমানে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে যারা, শুধু তারাই টিকা নিতে পারবেন। তবে ১ মে থেকে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবাইকে টিকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। ২৪ এপ্রিল টিকা বিষয়ে ভারতীয় নোট ভার্বালের বিষয়ে এক কর্মকর্তা জানান, কোনো দিন-তারিখ উল্লেখ না করে দিল্লি থেকে জানানো হয়েছে, এই মুহূর্তে তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে তারা টিকা দিতে পারবে না।

কোভ্যাক্স থেকে আসছে এক লাখ ডোজ : ফাইজার বায়োটেকের এক লাখ টিকা মে মাসে বাংলাদেশে আসবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে টিকা পাওয়ার বিষয়ে সরকার আরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অধিদপ্তরের করোনা সংক্রান্ত মুখপাত্র ও পরিচালক (এনসিডিসি) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন এই তথ্য জানিয়েছেন।

কোভ্যাক্সের সঙ্গে টিকার বিষয়ে অনেক আগে থেকেই চুক্তি ছিল জানিয়ে ডা. রোবেদ বলেন, ‘তারা আমাদের মোট যে টিকা দেবে, এর ১০ ভাগ ফ্রি আসার কথা। প্রথম দফায় সেখান থেকে ফাইজার বায়োটেকের এক লাখ টিকা চলে আসবে বলে তারা জানিয়েছে।

চীনের টিকা পেতে অপেক্ষা : চীনের উপহারের পাঁচ লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা বুধবার নাগাদ দেশে পৌঁছাবে। তবে কেনা টিকা পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হবে। এমনটি জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। সোমবার এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। লি জিমিং বলেন, টিকা নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং বাংলাদেশে টিকা পাঠানোর বিষয়টি চীন ‘খুবই ইতিবাচকভাবে’ দেখছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশ সরকার চীনের সিনোফার্মের টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ আগে। এখন টিকা পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের দীর্ঘ কিউ তৈরি হয়েছে। আর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ টিকার জন্য সেই লাইনের সম্মুখভাগের খুব কাছাকাছি অবস্থানে নেই। ওই লাইন এত বেশি দীর্ঘ যে, ডিসেম্বরের আগে টিকা পাওয়ার আশা না করাই ভালো। তবে সরকারের উপহারে ৫ লাখ ডোজ টিকার চালান ১২ মে বাংলাদেশে আসবে।

রাশিয়ার সঙ্গে দরকষাকষি : সম্প্রতি রাশিয়ার তৈরি করোনাভাইরাসের টিকা ‘স্পুটনিক-ভি’ আমদানি ও জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। মে মাসে এই টিকার ৪০ লাখ ডোজ দেশে আসবে বলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি খসড়া চুক্তিপত্র পাঠানো হয়। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩০টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এসব বিষয়ে সমাধান হলে চূড়ান্ত চুক্তি হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি হলে টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসতে পারে।

সিদ্ধান্ত হয়নি বঙ্গভ্যাক্স নিয়ে : দেশীয় টিকা উৎপাদনকারী কোম্পানি গ্লোব বায়োটেক উদ্ভাবিত বঙ্গভ্যাক্স নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বিএমআরসি (বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল) পক্ষ থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। তবে বিএমআরসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মুদাচ্ছের আলী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিগগিরই গ্লোব বায়োটকের বঙ্গভ্যাক্সকে হিউম্যান ট্রায়েলের অনুমোদন দেওয়া হবে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুমোদন পেলে তারা বছরে এক কোটি ডোজ উৎপাদন করতে সক্ষম। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের পক্ষে টিকা উৎপাদন আসলে খুবই কঠিন। কারণ অ্যানিমেল ট্রায়াল থেকে হিউম্যান ট্রায়ালে গেলেই অনেক টিকা বা ওষুধ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি পেনিসিলিনের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর প্রথম ব্যক্তিকে প্রয়োগ করা হলে তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু হয়। এরপর এটি ডেভেলপ করতে আরও ছয় বছর কেটে যায়।

টিকার অন্যান্য সোর্স : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনা করতে চায় ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল বায়োলজি চাইনিজ একাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্স (আইএমবিসিএএমএস)। ১৯৬০ সালে ওরাল পলিওমাইলেস্টি ভ্যাকাসিন (ওপিভি) এবং ১৯৯২ সালে হেপাটাইটিস এ ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত দুই বিলিয়ন ওপিভি এবং ৫২ বিলিয়ন ডোজ হেপাটাইটিস এ টিকা উৎপাদন ও বাজারজাত করেছে।

এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মনোনীত একটি বৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে সার্সকোভ-২ নামের একটি টিকা উদ্ভাবন করে, যা আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসারে প্রাণীর দেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং মানব দেহে পরীক্ষামূলক ফেজ-১ ও ফেজ-২ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

এ প্রতিষ্ঠানের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনায় দেশের একটি ওষুধ কোম্পানির মাধ্যমে ২৩ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের কাছে আবেদন করে। যেটি পরিচালনায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

এদিকে ভারত বায়োটেক নামে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান একটি করোনা টিকা উদ্ভাবন করেছে। এটিও একটি ‘ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভ্যাকসিন’। ইতোমধ্যে এ টিকার তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনার জন্য বিএমআরসিতে আবেদন করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের ক্লিনিক্যাল রিসার্চ করার জন্য আইসিডিডিআর,বি’র সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তবে এদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, টিকা নিয়ে অনেক সংকট তৈরি হয়েছে। যারা প্রথম ডোজ পেয়েছে, তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৪ লাখ ৪০ হাজার টিকার ঘাটতি রয়েছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় সেদেশে চাহিদা মোটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে যেহেতু আমাদের সঙ্গে একটা চুক্তি রয়েছে, তাই তাদের কাছ থেকে টিকা পেতে চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

তাছাড়া ৭টি দেশ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা মজুত রেখেছে। তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। যদিও সেটি সময়সাপেক্ষ। দু-একদিনে সিনোফার্মের ৫ লাখ টিকা আসবে। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় টিকা পেতে আবেদনে আমরা পিছিয়ে আছি।

রাশিয়া ৩ কোটি ডোজ দিতে চেয়েছে; কিন্তু সেখানে চুক্তি নিয়ে বিলম্ব হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমাদের বিলম্ব হয়েছে। আসলে ডিসেম্বরের আগে আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এনসিডিসি) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, আমাদের দেশে এখন অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট তাদের বর্তমান অবস্থার কারণে আমাদের টিকা দিতে পারছে না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, যাদের মাধ্যমে টিকা আনার কথা, তাদের বলা হয়েছে, অন্তত ২০ লাখ টিকা যেন অতি দ্রুত তাদের মাধ্যমে ব্যবস্থা করা হয়।

কারণ এটি সেরাম ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সরকার এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ছিল। এটা ছাড়াও টিকার জন্য বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, চীন থেকে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এ দেশে প্রস্তুত করতে আলোচনা চলছে। অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ‘কিছুদিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভ্যাক্সের আওতায় বিভিন্ন দেশকে আমন্ত্রণ জানায়।

বাংলাদেশ সরকার সেখান থেকে ১০ কোটি টিকা কেনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। সম্প্রতি জরুরি প্রয়োজনে টিকা পেতে ছয়টি দেশের সমন্বয়ে একটি ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি টু সাউথ এশিয়া ফোরামে যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও চীন এই ফোরামে রয়েছে। আমরা যদি এতে যোগদান করতে পারি, যদি এই ফোরামে অসংখ্য টিকা এসে যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে টিকার সহজলভ্যতা হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন