পিবিআই হেফাজতে বাবুল আকতার
jugantor
আলোচিত মিতু হত্যাকাণ্ড
পিবিআই হেফাজতে বাবুল আকতার
আদালতে নেওয়া হতে পারে আজ * নতুন মামলার পর গ্রেফতার দেখানো হবে * বাবুলকে নিয়ে দিনভর নানা গুঞ্জন

  যুগান্তর প্রতিবেদন ও চট্টগ্রাম ব্যুরো   

১২ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পাঁচ বছর আগে আলোচিত মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আকতারকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মঙ্গলবার দিনভর চট্টগ্রাম পিবিআই কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

স্ত্রী হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। মামলাটির তদন্তভার পিবিআইর হাতে যাওয়ার পর এই প্রথম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে হেফাজতে আনা হলো।

আজ তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে। বাবুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে মর্মে নানা ধরনের গুঞ্জন আছে। তবে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ স্বীকার করেননি। মিতু হত্যায় বাবুল আকতারের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে পিবিআই।

পাশাপাশি খুনের পরিকল্পনাকারী হিসাবে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আকতারকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা হবে। এরপর তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে। পিবিআইর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পিবিআইর এক কর্মকর্তা মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে যুগান্তরকে বলেন, স্ত্রী হত্যায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পরই বাবুল আকতারকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তিনি মামলার বাদী হওয়ার কারণে আগের মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

পাশাপাশি তাকে প্রধান আসামি করে নতুন করে হত্যা মামলা হবে। এ কারণেই তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে না। হত্যায় জড়িত বাবুল আকতারের সহযোগীদেরও আসামি করা হবে।

এর আগে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, মামলার বাদী হিসাবে বাবুল আকতার চট্টগ্রামে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

এটাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া, যে কোনো কিছুই বলা যেতে পারে। মামলার প্রয়োজনেই তাকে চট্টগ্রামে ডাকা হয়েছে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মামলার বাদী নিজেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে সাধারণত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে নতুন করে হত্যা মামলা করা হয়। মিতু হত্যা মামলার বিষয়েও প্রাথমিকভাবে এমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে এ ধরনের ঘটনায় কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এ বিষয়েও পর্যালোচনা চলছে।

চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার যুগান্তরকে বলেন, কোনো মামলার তদন্তকালে বাদী ওই ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী বিদ্যমান মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে হবে।

তদন্ত কর্মকর্তাকে আরও একটি নতুন মামলা করতে হবে। সেখানে বাদীর জড়িত থাকার বর্ণনা থাকবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ করলেই নতুন মামলায় বাদীকে গ্রেফতার দেখাতে হবে। তবে এ সময়ের মধ্যে বাদীকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে জেলে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাবুলকে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলীর পিবিআই মেট্রো কার্যালয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি স্ত্রী হত্যার পরিকল্পনাকারী- এমন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পরে তাকে পিবিআই হেফাজতে নেওয়া হয়। এর আগে সকালে বাবুল আকতার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসেন। এরপর তাকে পিবিআই কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা মঙ্গলবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, বাদী হিসাবে বাবুল আকতার নিজেই মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে চট্টগ্রাম আসেন।

আমরাও তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি পিবিআই কার্যালয়ে আছেন। তদন্তের স্বার্থে এ কর্মকর্তা এর বেশি কিছু জানাতে রাজি হননি।

এদিকে বাবুল আকতারকে জিজ্ঞাসাবাদের আগে সোমবার মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন পিবিআই। মেয়ে হত্যার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বাবুল আকতারকে দায়ী করে আসছিলেন।

তবে পিবিআইর জিজ্ঞাসাবাদের পর থেকে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। শ্বশুরকে জিজ্ঞাসাবাদের একদিন পরই বাবুল আকতারকে হেফাজতে নেয় তদন্ত সংস্থা।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় খুন হন বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতু। পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দফতরে যোগ দিয়ে ওই সময় ঢাকায় ছিলেন বাবুল।

তার আগে তিনি চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসির দায়িত্বে ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন বাবুল আকতার নিজেই।

ওই বছরের ২৪ জুন ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে বাবুল আকতারকে প্রায় ১৬ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ওই বাসায় পৌঁছে দেয়।

পরে পুলিশ জানায়, বাবুল চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তবে বাবুল দাবি করেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। পদত্যাগ প্রত্যাহারের জন্য তিনি ৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে আবেদন করেন।

নানা গুঞ্জনের মধ্যে ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর বাবুল আকতারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আকতারের জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ হয়ে জঙ্গিরা স্ত্রীর ওপর আঘাত হানতে পারেন বলে মামলায় তিনি দাবি করেন। তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকতারাও একই সন্দেহ প্রকাশ করেন।

তবে এর অল্প কিছুদিন পর পরিস্থিতি দ্রুত পালটাতে থাকে। তদন্তে নেমে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এ ঘটনায় কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুসাসহ চট্টগ্রামের একটি বড় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের জড়িত থাকার তথ্য পায়।

ঘটনার ফ্লাশব্যাক : চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি), জেলা পুলিশে সহকারী পুলিশ সুপার হিসাবে কর্মরত থাকাকালে বাবুল অপরাধ দমনে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। জঙ্গি দমন, সিএমপির আলোচিত ভয়ংকর গামছা পার্টি দমন, চুরি-ডাকাতি রোধসহ নানা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।

চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের কাছে আতঙ্কের নামও ছিলেন এ বাবুল আকতার। এসব কারণে প্রধানমন্ত্রীর পদকও লাভ করেছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম থেকে এসপি হিসাবে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় যাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় চট্টগ্রামে রাজপথে প্রকাশ্য বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতু হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

স্ত্রী হত্যার পর ঢাকা থেকে ফ্লাইটে চট্টগ্রাম ছুটে আসেন বাবুল আকতার। যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে স্ত্রীর লাশ দেখে বাবুল আকতারের বিলাপ আর মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্না এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতরাণা করে।

কিন্তু পরে মামলার নানা মোড়, বাবুল আকতারের চাকরিচ্যুতি ও স্বয়ং স্ত্রী হত্যায় তার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে আসার পর পালটে যায় সব ধারণা। প্রশ্ন উঠে, তাহলে কী সেসবই ছিল বাবুল আকতারের সুনিপুণ অভিনয়! স্ত্রী হত্যায় বাবুল আকতার বাদী হয়ে মামলা করলেও সর্বশেষ তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই মামলার বাদী বাবুল আকতারকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার মধ্য দিয়েই স্ত্রী হত্যায় বাবুল আকতারের জড়িত থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে মিতু খুন হওয়ার পর বাবুল আকতার প্রথমে ঢাকায় তার শ্বশুরবাড়িতে ওঠেন। ওই সময় স্ত্রীকে হারিয়ে তিনি শোকে কাতর হয়ে পড়ার নানা অভিনয় করেছিলেন। কিছুদিন পর তিনি ওই বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যান এবং রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে যোগ দেন।

এরপরই শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। শ্বশুর মোশাররফ হোসেন ও শাশুড়ি সাহেদা মোশাররফ হত্যাকাণ্ডে বাবুল আকতার জড়িত বলে দাবি করতে থাকেন। এরই একপর্যায়ে বাবুল আকতারকে দুই দফা চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

তদন্তে যাদের নাম এসেছে : মিতু হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৮ জনের নাম এসেছে। এরা হলেন- বাবুল আকতারের সোর্স মুসা, এহতেশামুল হক ভোলা, ওয়াসিম, আনোয়ার, মোহাম্মদ রাশেদ, আবদুল নবী ও কালু। এর মধ্যে মুসা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র (পিস্তল) সরবরাহ করে বাবুল আকতারের আরেক সোর্স এহতেশামুল হক ভোলা। যে মোটরসাইকেলে মুসা ঘটনাস্থলে আরেক খুনিকে নিয়ে এসেছিল সেই মোটরসাইকেল সরবরাহ করে মুসার ভাই। এদের মধ্যে ভোলা ছাড়া বাকি ৭ জনের বাড়িই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়।

মিতু হত্যা মামলায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার। জবানবন্দিতে মোট ৮ জনের নাম আসে। তদন্ত চলাকালে পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয় রাশেদ ও নবী। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া মুসা ও কালু নিখোঁজ রয়েছে।

এই দুজনকে ধরিয়ে দিতে সিএমপি ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তবে মুসার স্ত্রী দাবি করে আসছেন তার স্বামীকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর আর তার খোঁজ মিলছে না।

যদিও পুলিশ মুসাকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। মূলত বিশ্বস্ত সোর্স ভোলা ও মুসার মাধ্যমেই বাবুল আকতার তার স্ত্রীকে হত্যার পথ বেছে নেন বলে তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।

আলোচিত মিতু হত্যাকাণ্ড

পিবিআই হেফাজতে বাবুল আকতার

আদালতে নেওয়া হতে পারে আজ * নতুন মামলার পর গ্রেফতার দেখানো হবে * বাবুলকে নিয়ে দিনভর নানা গুঞ্জন
 যুগান্তর প্রতিবেদন ও চট্টগ্রাম ব্যুরো  
১২ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পাঁচ বছর আগে আলোচিত মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আকতারকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মঙ্গলবার দিনভর চট্টগ্রাম পিবিআই কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

স্ত্রী হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। মামলাটির তদন্তভার পিবিআইর হাতে যাওয়ার পর এই প্রথম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে হেফাজতে আনা হলো। 

আজ তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে। বাবুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে মর্মে নানা ধরনের গুঞ্জন আছে। তবে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ স্বীকার করেননি। মিতু হত্যায় বাবুল আকতারের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে পিবিআই।

পাশাপাশি খুনের পরিকল্পনাকারী হিসাবে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আকতারকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা হবে। এরপর তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে। পিবিআইর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পিবিআইর এক কর্মকর্তা মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে যুগান্তরকে বলেন, স্ত্রী হত্যায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পরই বাবুল আকতারকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তিনি মামলার বাদী হওয়ার কারণে আগের মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

পাশাপাশি তাকে প্রধান আসামি করে নতুন করে হত্যা মামলা হবে। এ কারণেই তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে না। হত্যায় জড়িত বাবুল আকতারের সহযোগীদেরও আসামি করা হবে। 

এর আগে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, মামলার বাদী হিসাবে বাবুল আকতার চট্টগ্রামে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

এটাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া, যে কোনো কিছুই বলা যেতে পারে। মামলার প্রয়োজনেই তাকে চট্টগ্রামে ডাকা হয়েছে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মামলার বাদী নিজেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে সাধারণত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে নতুন করে হত্যা মামলা করা হয়। মিতু হত্যা মামলার বিষয়েও প্রাথমিকভাবে এমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে এ ধরনের ঘটনায় কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এ বিষয়েও পর্যালোচনা চলছে। 

চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার যুগান্তরকে বলেন, কোনো মামলার তদন্তকালে বাদী ওই ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী বিদ্যমান মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে হবে।

তদন্ত কর্মকর্তাকে আরও একটি নতুন মামলা করতে হবে। সেখানে বাদীর জড়িত থাকার বর্ণনা থাকবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ করলেই নতুন মামলায় বাদীকে গ্রেফতার দেখাতে হবে। তবে এ সময়ের মধ্যে বাদীকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে জেলে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাবুলকে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলীর পিবিআই মেট্রো কার্যালয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি স্ত্রী হত্যার পরিকল্পনাকারী- এমন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পরে তাকে পিবিআই হেফাজতে নেওয়া হয়। এর আগে সকালে বাবুল আকতার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসেন। এরপর তাকে পিবিআই কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা মঙ্গলবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, বাদী হিসাবে বাবুল আকতার নিজেই মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে চট্টগ্রাম আসেন।

আমরাও তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি পিবিআই কার্যালয়ে আছেন। তদন্তের স্বার্থে এ কর্মকর্তা এর বেশি কিছু জানাতে রাজি হননি। 

এদিকে বাবুল আকতারকে জিজ্ঞাসাবাদের আগে সোমবার মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন পিবিআই। মেয়ে হত্যার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বাবুল আকতারকে দায়ী করে আসছিলেন।

তবে পিবিআইর জিজ্ঞাসাবাদের পর থেকে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। শ্বশুরকে জিজ্ঞাসাবাদের একদিন পরই বাবুল আকতারকে হেফাজতে নেয় তদন্ত সংস্থা।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় খুন হন বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতু। পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দফতরে যোগ দিয়ে ওই সময় ঢাকায় ছিলেন বাবুল।

তার আগে তিনি চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসির দায়িত্বে ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন বাবুল আকতার নিজেই।

ওই বছরের ২৪ জুন ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে বাবুল আকতারকে প্রায় ১৬ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ওই বাসায় পৌঁছে দেয়।

পরে পুলিশ জানায়, বাবুল চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তবে বাবুল দাবি করেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। পদত্যাগ প্রত্যাহারের জন্য তিনি ৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে আবেদন করেন।

নানা গুঞ্জনের মধ্যে ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর বাবুল আকতারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আকতারের জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ হয়ে জঙ্গিরা স্ত্রীর ওপর আঘাত হানতে পারেন বলে মামলায় তিনি দাবি করেন। তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকতারাও একই সন্দেহ প্রকাশ করেন।

তবে এর অল্প কিছুদিন পর পরিস্থিতি দ্রুত পালটাতে থাকে। তদন্তে নেমে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এ ঘটনায় কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুসাসহ চট্টগ্রামের একটি বড় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের জড়িত থাকার তথ্য পায়। 

ঘটনার ফ্লাশব্যাক : চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি), জেলা পুলিশে সহকারী পুলিশ সুপার হিসাবে কর্মরত থাকাকালে বাবুল অপরাধ দমনে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। জঙ্গি দমন, সিএমপির আলোচিত ভয়ংকর গামছা পার্টি দমন, চুরি-ডাকাতি রোধসহ নানা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।

চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের কাছে আতঙ্কের নামও ছিলেন এ বাবুল আকতার। এসব কারণে প্রধানমন্ত্রীর পদকও লাভ করেছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম থেকে এসপি হিসাবে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় যাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় চট্টগ্রামে রাজপথে প্রকাশ্য বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতু হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

স্ত্রী হত্যার পর ঢাকা থেকে ফ্লাইটে চট্টগ্রাম ছুটে আসেন বাবুল আকতার। যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে স্ত্রীর লাশ দেখে বাবুল আকতারের বিলাপ আর মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্না এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতরাণা করে।

কিন্তু পরে মামলার নানা মোড়, বাবুল আকতারের চাকরিচ্যুতি ও স্বয়ং স্ত্রী হত্যায় তার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে আসার পর পালটে যায় সব ধারণা। প্রশ্ন উঠে, তাহলে কী সেসবই ছিল বাবুল আকতারের সুনিপুণ অভিনয়! স্ত্রী হত্যায় বাবুল আকতার বাদী হয়ে মামলা করলেও সর্বশেষ তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই মামলার বাদী বাবুল আকতারকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার মধ্য দিয়েই স্ত্রী হত্যায় বাবুল আকতারের জড়িত থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

এদিকে মিতু খুন হওয়ার পর বাবুল আকতার প্রথমে ঢাকায় তার শ্বশুরবাড়িতে ওঠেন। ওই সময় স্ত্রীকে হারিয়ে তিনি শোকে কাতর হয়ে পড়ার নানা অভিনয় করেছিলেন। কিছুদিন পর তিনি ওই বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যান এবং রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে যোগ দেন।

এরপরই শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। শ্বশুর মোশাররফ হোসেন ও শাশুড়ি সাহেদা মোশাররফ হত্যাকাণ্ডে বাবুল আকতার জড়িত বলে দাবি করতে থাকেন। এরই একপর্যায়ে বাবুল আকতারকে দুই দফা চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

তদন্তে যাদের নাম এসেছে : মিতু হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৮ জনের নাম এসেছে। এরা হলেন- বাবুল আকতারের সোর্স মুসা, এহতেশামুল হক ভোলা, ওয়াসিম, আনোয়ার, মোহাম্মদ রাশেদ, আবদুল নবী ও কালু। এর মধ্যে মুসা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র (পিস্তল) সরবরাহ করে বাবুল আকতারের আরেক সোর্স এহতেশামুল হক ভোলা। যে মোটরসাইকেলে মুসা ঘটনাস্থলে আরেক খুনিকে নিয়ে এসেছিল সেই মোটরসাইকেল সরবরাহ করে মুসার ভাই। এদের মধ্যে ভোলা ছাড়া বাকি ৭ জনের বাড়িই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়।

মিতু হত্যা মামলায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার। জবানবন্দিতে মোট ৮ জনের নাম আসে। তদন্ত চলাকালে পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয় রাশেদ ও নবী। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া মুসা ও কালু নিখোঁজ রয়েছে।

এই দুজনকে ধরিয়ে দিতে সিএমপি ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তবে মুসার স্ত্রী দাবি করে আসছেন তার স্বামীকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর আর তার খোঁজ মিলছে না।

যদিও পুলিশ মুসাকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। মূলত বিশ্বস্ত সোর্স ভোলা ও মুসার মাধ্যমেই বাবুল আকতার তার স্ত্রীকে হত্যার পথ বেছে নেন বলে তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন