বিধিনিষেধের মধ্যেই ঈদ আনন্দ
jugantor
আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ
বিধিনিষেধের মধ্যেই ঈদ আনন্দ

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১২ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ...’ এই সুর লহরি এখন ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশ-বাতাস মন্দ্রিত করে। চলমান করোনা মহামারির মধ্যেও মনপ্রাণ উছলে উঠছে ঈদের আনন্দ-রোশনাইয়ে। রমজানের রোজার শেষে খুশির সওগাত নিয়ে আসছে পবিত্র ঈদুলফিতর।

আজ (বুধবার) শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার হবে ঈদ। আর চাঁদ দেখা না গেলে রোজা ৩০টি পূর্ণ হবে, সেক্ষেত্রে ঈদ হবে শুক্রবার। কিন্তু চলমান করোনা মহামারিতে গতবারের মতো এবারও মানুষের জীবনযাত্রায় থাকছে নানা বিধিনিষেধ। ফলে চিরাচরিত রেওয়াজ অনুযায়ী ঈদগাহ মাঠ বা উন্মুক্ত কোনো স্থানেই ঈদের জামাত হচ্ছে না। রাজধানীসহ সারা দেশের মসজিদগুলোতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে ঈদের নামাজ পড়তে হবে। নামাজ শেষে কারও সঙ্গে কোলাকুলি বা হাত মেলানো যাবে না। বন্ধ আছে দূরপাল্লার গণপরিবহণ (বাস, ট্রেন ও লঞ্চ)। সবাইকে ঈদের ছুটিতে ঘরে থাকার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এত বিধিনিষেধের পরও ঈদ আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। সবকিছু উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নাড়ির টানে বিকল্প ব্যবস্থায় গ্রামে ছুটছে লাখো মানুষ। মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি (মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব ও ঘনঘন হাত ধোয়া)। এরপরও এবারের ঈদকে এক ধরনের ঘরবন্দি মানুষের ঈদ বলে আখ্যায়িত করেছেন অনেকেই। তাদের মতে, ঈদের আনন্দ বলতে আমরা যা বুঝি, এর অনেক কিছুই অনুপস্থিত থাকছে করোনা পরিস্থিতির কারণে।

এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বুধবার বিকাল থেকেই শাওয়ালের চাঁদ দেখার জন্য অগণিত মুসলিম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘চাঁদ দেখে রোজা পালন করবে এবং চাঁদ দেখে ঈদ উদ্যাপন করবে।’ তিনি বলেছেন, ‘চান্দ্রমাস ২৯ দিনেও হয় আবার ৩০ দিনেও হয়। যদি আকাশে মেঘ থাকায় চাঁদ দেখা না যায়, তবে ৩০ দিনের গণনা পূর্ণ করবে।’ আজ সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে ঈদুলফিতরের তারিখ নির্ধারণ ও শাওয়ালের চাঁদ দেখার তথ্য পর্যালোচনায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা হবে। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান এতে সভাপতিত্ব করবেন বলে মঙ্গলবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের আকাশে বুধবার শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে বৃহস্পতিবার ঈদ হবে, আর চাঁদ দেখা না গেলে ঈদ হবে শুক্রবার। বাংলাদেশের আকাশে কোথাও শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে ৯৫৫৯৪৯৩, ৯৫৫৫৯৪৭, ৯৫৫৬৪০৭ ও ৯৫৫৮৩৩৭ নম্বরে টেলিফোন এবং ৯৫৬৩৩৯৭ ও ৯৫৫৫৯৫১ নম্বরে ফ্যাক্স করে জানাতে অনুরোধ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

পবিত্র ঈদুলফিতর উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এমপি, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা পৃথক বাণীতে দেশবাসীর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে তারা বিশ্ব মুসলিমের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেছেন।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, যারা এক মাস রোজা রেখে অভুক্ত থাকার কষ্টকে অনুভব করেছেন, নামাজ, তারাবি, ইবাদত-বন্দেগি ও ইসলামের অনুশাসন পালন করেছেন, তাদের জন্য এ ঈদ-আনন্দ বেশি উপভোগের, উচ্ছ্বাসের ও শান্তির। তাদের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের এক মহাপুরস্কার হচ্ছে ঈদ। পবিত্র কুরআনের বর্ণনামতে, এক মাস রোজা রাখার পর মুসলমানরা যখন নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি তথা পছন্দের পোশাক পরেন, দেহে আতর-খুশবু মেখে ঈদগাহে যান, তখন ফেরেশতারা তাদের সংবর্ধনা জানান। স্বর্গীয় সব বাণীতে তাদের অভিনন্দিত করা হয়। ঈদুলফিতর মুসলিম উম্মাহর জন্য এক সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, শাসক-শাসিত ও আবালবৃদ্ধবনিতা সবার জন্য ঈদের আনন্দ যেন সমান ও ব্যাপক হয়, ইসলামে সেই ব্যবস্থা রয়েছে। পবিত্র রমজানে বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এবং দান-খয়রাত করলে, জাকাত ও ফিতরা দিলে দরিদ্ররা ঈদ-আনন্দ উপভোগ করতে পারবে বেশি। তাদের মুখেও হাসি ফুটবে এবং ঈদের ভোর আসবে তাদের জন্য আনন্দবার্তা নিয়ে। মহানবি মুহাম্মদ (সা.) ঈদের খুতবায় দান-খয়রাতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন। তাই ঈদের নামাজের আগেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের নিজ নিজ জাকাত ও সদকাতুল ফিতর (ফেতরা) আদায় করে থাকেন।

বায়তুল মোকাররমে ঈদের ৫ জামাত : প্রতিবছরের মতো এবারও পবিত্র ঈদুলফিতর উপলক্ষ্যে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা, ১০টা ও ১০টা ৪৫ মিনিটে বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে না। প্রথম জামাত হবে সকাল ৭টায়। এতে ইমাম থাকবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মাওলানা মিজানুর রহমান। মুকাব্বির থাকবেন মুয়াজ্জিন হাফেজ কারি কাজী মাসুদুর রহমান। দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। ইমাম থাকবেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মুহিবুল্লাহিল বাকী নদভী। মুকাব্বির থাকবেন মুয়াজ্জিন হাফেজ কারি হাবিবুর রহমান মেশকাত। সকাল ৯টার তৃতীয় জামাতের ইমাম হবেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা এহসানুল হক। মুকাব্বির মুয়াজ্জিন মাওলানা ইসহাক। চতুর্থ জামাত হবে সকাল ১০টায়। এতে ইমাম থাকবেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম মাওলানা মহিউদ্দিন কাসেম। মুকাব্বির থাকবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আতাউর রহমান। পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাত হবে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে। এতে ইমাম থাকবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুহাদ্দিস হাফেজ মাওলানা ওয়ালিয়ুর রহমান খান। মুকাব্বির হবেন বায়তুল মোকাররমের খাদেম হাফেজ মো. শহীদুল্লাহ। পাঁচটি জামাতে কোনো ইমাম অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প ইমাম হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

মানতে হবে যেসব নির্দেশনা : করোনাভাইরাস অতিমাত্রায় সংক্রামক বলে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও সব ধরনের অফিস-আদালত ও গণপরিবহণ বন্ধ রাখা হয়েছে ৫ এপ্রিল থেকে। কয়েক দফায় বাড়িয়ে এ মেয়াদ ১৬ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে এ ছুটির মধ্যেই ঈদের সরকারি বন্ধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সময় সবাইকে বাসায় থাকার, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ার ওপর নির্দেশনা দিয়ে ২৬ এপ্রিল ১২টি শর্ত দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এসব নির্দেশনা না মানলে ‘আইনগত ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অতি জরুরি। ইতোমধ্যে মসজিদে নামাজ আদায়ে কতিপয় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবজনিত কারণে সারা দেশে জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা নির্দেশাবলিসহ বিশেষ সতর্কতামূলক বিষয়াদি অনুসরণ করে ১২টি শর্তসাপেক্ষে ২০২১ সালের পবিত্র ঈদুলফিতরের নামাজের জামাত মসজিদে আদায়ের জন্য অনুরোধ করা হলো। নির্দেশনাগুলো হলো : ১. ইসলামি শরিয়তে ঈদগাহ বা খোলা জায়গায় পবিত্র ঈদুলফিতরের নামাজের জামাত আদায়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সারা বিশ্বসহ আমাদের দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিজনিত কারণে মুসল্লিদের জীবন ঝুঁকি বিবেচনা করে এ বছর ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে ঈদের নামাজের জামাত নিকটস্থ মসজিদে আদায় করার জন্য অনুরোধ করা হলো। প্রয়োজনে একই মসজিদে একাধিক জামায়াত অনুষ্ঠিত করা যাবে। ২. ঈদের নামাজের জামাতের সময় মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের আগে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসতে পারবেন। ৩. করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ নিশ্চিতে মসজিদে ওজুর স্থানে সাবান/হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। ৪. মসজিদের প্রবেশদ্বারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার/হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান-পানি রাখতে হবে। ৫. প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে ওজু করে মসজিদে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। ৬. ঈদের নামাজের জামাতে আসা মুসল্লিকে অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না। ৭. ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। ৮. শিশু, বয়োবৃদ্ধ, যে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। ৯. সর্বসাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর নির্দেশনা অবশ্যই প্রতিপালন করতে হবে। ১০. করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ নিশ্চিতে মসজিদে জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। ১১. করোনাভাইরাস মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পবিত্র ঈদুলফিতরের নামাজ শেষে মহান রাব্বুল আল-আমিনের দরবারে দোয়া করার জন্য খতিব ও ইমামদের অনুরোধ করা যাচ্ছে। ১২. সম্মানিত খতিব, ইমাম এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটি বিষয়গুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট মসজিদের পরিচালনা কমিটিকে উপরিউক্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ

বিধিনিষেধের মধ্যেই ঈদ আনন্দ

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১২ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ...’ এই সুর লহরি এখন ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশ-বাতাস মন্দ্রিত করে। চলমান করোনা মহামারির মধ্যেও মনপ্রাণ উছলে উঠছে ঈদের আনন্দ-রোশনাইয়ে। রমজানের রোজার শেষে খুশির সওগাত নিয়ে আসছে পবিত্র ঈদুলফিতর।

আজ (বুধবার) শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার হবে ঈদ। আর চাঁদ দেখা না গেলে রোজা ৩০টি পূর্ণ হবে, সেক্ষেত্রে ঈদ হবে শুক্রবার। কিন্তু চলমান করোনা মহামারিতে গতবারের মতো এবারও মানুষের জীবনযাত্রায় থাকছে নানা বিধিনিষেধ। ফলে চিরাচরিত রেওয়াজ অনুযায়ী ঈদগাহ মাঠ বা উন্মুক্ত কোনো স্থানেই ঈদের জামাত হচ্ছে না। রাজধানীসহ সারা দেশের মসজিদগুলোতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে ঈদের নামাজ পড়তে হবে। নামাজ শেষে কারও সঙ্গে কোলাকুলি বা হাত মেলানো যাবে না। বন্ধ আছে দূরপাল্লার গণপরিবহণ (বাস, ট্রেন ও লঞ্চ)। সবাইকে ঈদের ছুটিতে ঘরে থাকার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এত বিধিনিষেধের পরও ঈদ আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। সবকিছু উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নাড়ির টানে বিকল্প ব্যবস্থায় গ্রামে ছুটছে লাখো মানুষ। মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি (মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব ও ঘনঘন হাত ধোয়া)। এরপরও এবারের ঈদকে এক ধরনের ঘরবন্দি মানুষের ঈদ বলে আখ্যায়িত করেছেন অনেকেই। তাদের মতে, ঈদের আনন্দ বলতে আমরা যা বুঝি, এর অনেক কিছুই অনুপস্থিত থাকছে করোনা পরিস্থিতির কারণে।

এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বুধবার বিকাল থেকেই শাওয়ালের চাঁদ দেখার জন্য অগণিত মুসলিম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘চাঁদ দেখে রোজা পালন করবে এবং চাঁদ দেখে ঈদ উদ্যাপন করবে।’ তিনি বলেছেন, ‘চান্দ্রমাস ২৯ দিনেও হয় আবার ৩০ দিনেও হয়। যদি আকাশে মেঘ থাকায় চাঁদ দেখা না যায়, তবে ৩০ দিনের গণনা পূর্ণ করবে।’ আজ সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে ঈদুলফিতরের তারিখ নির্ধারণ ও শাওয়ালের চাঁদ দেখার তথ্য পর্যালোচনায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা হবে। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান এতে সভাপতিত্ব করবেন বলে মঙ্গলবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের আকাশে বুধবার শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে বৃহস্পতিবার ঈদ হবে, আর চাঁদ দেখা না গেলে ঈদ হবে শুক্রবার। বাংলাদেশের আকাশে কোথাও শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে ৯৫৫৯৪৯৩, ৯৫৫৫৯৪৭, ৯৫৫৬৪০৭ ও ৯৫৫৮৩৩৭ নম্বরে টেলিফোন এবং ৯৫৬৩৩৯৭ ও ৯৫৫৫৯৫১ নম্বরে ফ্যাক্স করে জানাতে অনুরোধ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

পবিত্র ঈদুলফিতর উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এমপি, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা পৃথক বাণীতে দেশবাসীর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে তারা বিশ্ব মুসলিমের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেছেন।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, যারা এক মাস রোজা রেখে অভুক্ত থাকার কষ্টকে অনুভব করেছেন, নামাজ, তারাবি, ইবাদত-বন্দেগি ও ইসলামের অনুশাসন পালন করেছেন, তাদের জন্য এ ঈদ-আনন্দ বেশি উপভোগের, উচ্ছ্বাসের ও শান্তির। তাদের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের এক মহাপুরস্কার হচ্ছে ঈদ। পবিত্র কুরআনের বর্ণনামতে, এক মাস রোজা রাখার পর মুসলমানরা যখন নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি তথা পছন্দের পোশাক পরেন, দেহে আতর-খুশবু মেখে ঈদগাহে যান, তখন ফেরেশতারা তাদের সংবর্ধনা জানান। স্বর্গীয় সব বাণীতে তাদের অভিনন্দিত করা হয়। ঈদুলফিতর মুসলিম উম্মাহর জন্য এক সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, শাসক-শাসিত ও আবালবৃদ্ধবনিতা সবার জন্য ঈদের আনন্দ যেন সমান ও ব্যাপক হয়, ইসলামে সেই ব্যবস্থা রয়েছে। পবিত্র রমজানে বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এবং দান-খয়রাত করলে, জাকাত ও ফিতরা দিলে দরিদ্ররা ঈদ-আনন্দ উপভোগ করতে পারবে বেশি। তাদের মুখেও হাসি ফুটবে এবং ঈদের ভোর আসবে তাদের জন্য আনন্দবার্তা নিয়ে। মহানবি মুহাম্মদ (সা.) ঈদের খুতবায় দান-খয়রাতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন। তাই ঈদের নামাজের আগেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের নিজ নিজ জাকাত ও সদকাতুল ফিতর (ফেতরা) আদায় করে থাকেন।

বায়তুল মোকাররমে ঈদের ৫ জামাত : প্রতিবছরের মতো এবারও পবিত্র ঈদুলফিতর উপলক্ষ্যে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা, ১০টা ও ১০টা ৪৫ মিনিটে বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে না। প্রথম জামাত হবে সকাল ৭টায়। এতে ইমাম থাকবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মাওলানা মিজানুর রহমান। মুকাব্বির থাকবেন মুয়াজ্জিন হাফেজ কারি কাজী মাসুদুর রহমান। দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। ইমাম থাকবেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মুহিবুল্লাহিল বাকী নদভী। মুকাব্বির থাকবেন মুয়াজ্জিন হাফেজ কারি হাবিবুর রহমান মেশকাত। সকাল ৯টার তৃতীয় জামাতের ইমাম হবেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা এহসানুল হক। মুকাব্বির মুয়াজ্জিন মাওলানা ইসহাক। চতুর্থ জামাত হবে সকাল ১০টায়। এতে ইমাম থাকবেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম মাওলানা মহিউদ্দিন কাসেম। মুকাব্বির থাকবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আতাউর রহমান। পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাত হবে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে। এতে ইমাম থাকবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুহাদ্দিস হাফেজ মাওলানা ওয়ালিয়ুর রহমান খান। মুকাব্বির হবেন বায়তুল মোকাররমের খাদেম হাফেজ মো. শহীদুল্লাহ। পাঁচটি জামাতে কোনো ইমাম অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প ইমাম হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

মানতে হবে যেসব নির্দেশনা : করোনাভাইরাস অতিমাত্রায় সংক্রামক বলে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও সব ধরনের অফিস-আদালত ও গণপরিবহণ বন্ধ রাখা হয়েছে ৫ এপ্রিল থেকে। কয়েক দফায় বাড়িয়ে এ মেয়াদ ১৬ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে এ ছুটির মধ্যেই ঈদের সরকারি বন্ধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সময় সবাইকে বাসায় থাকার, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ার ওপর নির্দেশনা দিয়ে ২৬ এপ্রিল ১২টি শর্ত দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এসব নির্দেশনা না মানলে ‘আইনগত ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অতি জরুরি। ইতোমধ্যে মসজিদে নামাজ আদায়ে কতিপয় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবজনিত কারণে সারা দেশে জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা নির্দেশাবলিসহ বিশেষ সতর্কতামূলক বিষয়াদি অনুসরণ করে ১২টি শর্তসাপেক্ষে ২০২১ সালের পবিত্র ঈদুলফিতরের নামাজের জামাত মসজিদে আদায়ের জন্য অনুরোধ করা হলো। নির্দেশনাগুলো হলো : ১. ইসলামি শরিয়তে ঈদগাহ বা খোলা জায়গায় পবিত্র ঈদুলফিতরের নামাজের জামাত আদায়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সারা বিশ্বসহ আমাদের দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিজনিত কারণে মুসল্লিদের জীবন ঝুঁকি বিবেচনা করে এ বছর ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে ঈদের নামাজের জামাত নিকটস্থ মসজিদে আদায় করার জন্য অনুরোধ করা হলো। প্রয়োজনে একই মসজিদে একাধিক জামায়াত অনুষ্ঠিত করা যাবে। ২. ঈদের নামাজের জামাতের সময় মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের আগে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসতে পারবেন। ৩. করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ নিশ্চিতে মসজিদে ওজুর স্থানে সাবান/হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। ৪. মসজিদের প্রবেশদ্বারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার/হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান-পানি রাখতে হবে। ৫. প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে ওজু করে মসজিদে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। ৬. ঈদের নামাজের জামাতে আসা মুসল্লিকে অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না। ৭. ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। ৮. শিশু, বয়োবৃদ্ধ, যে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। ৯. সর্বসাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর নির্দেশনা অবশ্যই প্রতিপালন করতে হবে। ১০. করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ নিশ্চিতে মসজিদে জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। ১১. করোনাভাইরাস মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পবিত্র ঈদুলফিতরের নামাজ শেষে মহান রাব্বুল আল-আমিনের দরবারে দোয়া করার জন্য খতিব ও ইমামদের অনুরোধ করা যাচ্ছে। ১২. সম্মানিত খতিব, ইমাম এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটি বিষয়গুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট মসজিদের পরিচালনা কমিটিকে উপরিউক্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন