বাংলাদেশের নীতি নিয়ে চীনের উদ্বেগ অমূলক
jugantor
বিশ্লেষকদের অভিমত
বাংলাদেশের নীতি নিয়ে চীনের উদ্বেগ অমূলক

  মাসুদ করিম  

১২ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশের নীতি সম্পর্কে চীনের উদ্বেগকে অমূলক বলে অভিহিত করেছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীন বা অন্য কোনো দেশের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে কাজ করা মানে ওই বলয়ভুক্ত হওয়া নয়।

বাংলাদেশের ‘নন অ্যালাইন’ নীতির বৈশিষ্ট্যও তাতে অটুট থাকে। তবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হবে না। কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটেও যুক্ত হবে না। ফলে বাংলাদেশের নীতি নিয়ে চীনের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চার জাতির জোট কোয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে ‘আগ বাড়ানো ও দুঃখজনক’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন। যে কোনো দেশ নিজেদের অবস্থান জানাতে পারে; তবে বাংলাদেশ ‘নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত নেবে।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চীনের রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্যে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্যে বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট। ঢাকার ক্ষোভের কথা দু-এক দিনের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীনকে জানানো হবে।

বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং সোমবার কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিকাবের সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় বলেন, ‘চীনবিরোধী ওই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি করবে। কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ (কোয়াড) নামে পরিচিত ওই জোটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া।

চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি জানি, কোয়াড বানানো হয়েছে চীনের কথা মাথায় রেখে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের পক্ষ থেকেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, চীনের কারণেই তারা এ জোটে অংশ নিচ্ছে।

আর সে কারণেই বাংলাদেশকে এরকম কোনো জোটে চীন দেখতে চায় না বলে সতর্ক করেন লি জিমিং। গত মাসের শেষ সপ্তাহে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেঙ্গই ঢাকা সফর করেন। তিনি তখন বলেন, এ অঞ্চলের বাইরের কোনো শক্তি যেন এ অঞ্চলে হেজিমনি সৃষ্টি করতে না পারে সে লক্ষ্যে চীন ও বাংলাদেশের একসঙ্গে কাজ করা উচিত।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, কোয়াডে যোগদান থেকে বাংলাদেশকে বিরত রাখা চীন সরকারের সিদ্ধান্ত। এটা না হলে রাষ্ট্রদূত এভাবে বলতে পারতেন না। তবে প্রটোকল মোতাবেক, চীনের সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সরকারকে জানাতে পারে। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমে সেটা জানিয়েছেন যা কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন। সরকার টু সরকার জানানো রেওয়াজ।

সাবেক এ পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, বাংলাদেশের সরকারকে সম্পর্ক বিনষ্ট হবে বলে রীতিমতো হুমকি দিচ্ছেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমুখী সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এটাকে চীন সরকারের হুমকিস্বরূপ একটি বার্তা। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে চীনের রাষ্ট্রদূতকে বলা যে, এভাবে অযাচিতভাবে মন্তব্য করা শিষ্টাচারবহির্ভূত। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। বিদেশি রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্যে তার দেশের নীতি এভাবে বলার নজির নেই। যদিও চীনের রাষ্ট্রদূত তার সরকারের সিদ্ধান্তই জানিয়ে দিয়েছেন।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশকে কেউ কোয়াডে জয়েন করতে ডাকেনি। বাংলাদেশও বলেনি কোয়াডে যাব। ফলে চীনের রাষ্ট্রদূতের এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে সতর্ক করার প্রয়োজন ছিল না। কেউ হয়তো চীনের রাষ্ট্রদূতকে বুঝিয়েছে যে, বাংলাদেশ ওই জোটে যাচ্ছে।

মুন্সী ফয়েজ অবশ্য একথা বলেন যে, কোয়াড নিয়ে চীনের উদ্বেগজনক চিন্তা করা স্বাভাবিক। কারণ চীনের প্রভাব ঠেকাতে এটা করা হয়েছে। কিন্তু এতে খুব বেশি দেশ যুক্ত না হওয়ায় ওই চার দেশ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে এসেছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে যুক্ত থাকবে। তবে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো জোটে যুক্ত হবে না। এটা চীনকে আশ্বস্ত করতে হবে। তবে চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য নিয়ে রিয়্যাক্ট করা ঠিক হবে না। তারা যে ভুল বুঝেছে সেটা ধরিয়ে দেয়া উচিত। এটা নিয়ে হইচই করা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, কোয়াডের ব্যাপারে চীনের চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে। চীনকে প্রতিহত করা এবং তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য কোয়াড গঠন করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এ জোটে যোগ দেবে না। ফলে এটা নিয়ে চীনের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, কোয়াডে বাংলাদেশ একথা ঢাকার তরফে কখনও বলা হয়নি। ফলে চীনের রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্য আমার কিছুটা অদ্ভুত মনে হয়েছে। তিনি খোলাখুলিভাবে বলেছেন, শক্ত ভাষায় বলেছেন- অনেকটা ওয়ার্নিং।

তিনি অবশ্য এটাও বলেন যে, কোয়াডে বাংলাদেশ যোগ দিলে চীন উদ্বিগ্ন হবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। চীনকে প্রতিহত করার জন্য বড় বড় শক্তিগুলোর এটা একটা জোট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চীনের রাষ্ট্রদূত এটা বলতে গেলেন কেন? চীনের রাষ্ট্রদূত সাধারণত হুট করে কিছু বলেন না। উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদিত হলে বলেন কিংবা তাকে বলার দায়িত্ব দেয়া হলে বলেন। এতে স্পষ্ট যে, তারা আসলেই উদ্বিগ্ন। তারা বিষয়টা বাংলাদেশকে পর্দার আড়ালে গোপনে বলতে পারতে পারতেন। গত কয়েক বছর ধরে চীন বেশি ভোকাল। তারা সূক্ষ্মভাবে না বলে স্থূলভাবে বলছেন। সরাসরি কথা বলেছেন। এটা চীনা রাষ্ট্রদূত এভাবে না বললেই পারতেন।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আজিজুল হক বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে যুক্ত হচ্ছি।

আবার চীনের নেতৃত্বাধীন সাংহাই সহযোগিতা জোটেও আছি। এতে করে বাংলাদেশ যে কোনো বলয়ভুক্ত হতে চায় না সেই চরিত্র বিনষ্ট হবে না। আমাদের কোনো সংস্থায় যুক্ত হওয়া মানে আমরা আমেরিকা কিংবা চীনের বলয়ে চলে গেছি এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে যাওয়া নিয়ে চীনের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া : পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেছেন, কোয়াড নিয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলছে চীন। চীনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি একথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, কোয়াড নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসাবে সিদ্ধান্ত নেবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যে কোনো দেশ নিজেদের অবস্থান জানাতে পারে; তবে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত নেবে। মন্ত্রী বলেন, ‘উনারা বলতে পারেন। উনি একটা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা হয়তো এটা চায় না, তাই তারা বক্তব্য দেবেন। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছেন, সে প্রতিষ্ঠানের লোকজন আমাদের নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। আগ বাড়িয়ে বলা হয়েছে, এটা দুঃখজনক।’

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তার বক্তব্যকে খুব একটা খুব গুরুত্ব দিচ্ছি না। উনি বলেছেন, দ্যাটস ফাইন, এটা নিয়ে আমাদের বিশেষ কিছু বক্তব্য নেই। বাট উই উইল ডিসাইড হোয়াট উই উইল ডু।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা একটা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আমরা নির্ধারণ করি। তবে হ্যাঁ, যে কোনো দেশ তার বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। তো, আমরা কী করব না করব, আমাদের দেশের জনগণের মঙ্গলের জন্য, আমাদের যে পজিশন আছে, তার ভিত্তিতে উই উইল ডিসাইড ইট।’

মোমেন বলেন, ‘দেশের মঙ্গলের জন্য আপনারা প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছেন, বহু সময় বহু লোক বহু কিছু বলেছেন, কিন্তু আমাদের দেশের স্বার্থের ব্যাপারে, দেশের মঙ্গলের জন্য যা যা দরকার তাই করি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি মেনে চলি এবং সেটাই বজায় রাখব।’

বিশ্লেষকদের অভিমত

বাংলাদেশের নীতি নিয়ে চীনের উদ্বেগ অমূলক

 মাসুদ করিম 
১২ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশের নীতি সম্পর্কে চীনের উদ্বেগকে অমূলক বলে অভিহিত করেছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীন বা অন্য কোনো দেশের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে কাজ করা মানে ওই বলয়ভুক্ত হওয়া নয়।

বাংলাদেশের ‘নন অ্যালাইন’ নীতির বৈশিষ্ট্যও তাতে অটুট থাকে। তবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হবে না। কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটেও যুক্ত হবে না। ফলে বাংলাদেশের নীতি নিয়ে চীনের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চার জাতির জোট কোয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে ‘আগ বাড়ানো ও দুঃখজনক’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন। যে কোনো দেশ নিজেদের অবস্থান জানাতে পারে; তবে বাংলাদেশ ‘নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত নেবে।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চীনের রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্যে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্যে বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট। ঢাকার ক্ষোভের কথা দু-এক দিনের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীনকে জানানো হবে।

বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং সোমবার কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিকাবের সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় বলেন, ‘চীনবিরোধী ওই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি করবে। কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ (কোয়াড) নামে পরিচিত ওই জোটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া।

চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি জানি, কোয়াড বানানো হয়েছে চীনের কথা মাথায় রেখে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের পক্ষ থেকেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, চীনের কারণেই তারা এ জোটে অংশ নিচ্ছে।

আর সে কারণেই বাংলাদেশকে এরকম কোনো জোটে চীন দেখতে চায় না বলে সতর্ক করেন লি জিমিং। গত মাসের শেষ সপ্তাহে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেঙ্গই ঢাকা সফর করেন। তিনি তখন বলেন, এ অঞ্চলের বাইরের কোনো শক্তি যেন এ অঞ্চলে হেজিমনি সৃষ্টি করতে না পারে সে লক্ষ্যে চীন ও বাংলাদেশের একসঙ্গে কাজ করা উচিত।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, কোয়াডে যোগদান থেকে বাংলাদেশকে বিরত রাখা চীন সরকারের সিদ্ধান্ত। এটা না হলে রাষ্ট্রদূত এভাবে বলতে পারতেন না। তবে প্রটোকল মোতাবেক, চীনের সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সরকারকে জানাতে পারে। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমে সেটা জানিয়েছেন যা কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন। সরকার টু সরকার জানানো রেওয়াজ।

সাবেক এ পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, বাংলাদেশের সরকারকে সম্পর্ক বিনষ্ট হবে বলে রীতিমতো হুমকি দিচ্ছেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমুখী সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এটাকে চীন সরকারের হুমকিস্বরূপ একটি বার্তা। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে চীনের রাষ্ট্রদূতকে বলা যে, এভাবে অযাচিতভাবে মন্তব্য করা শিষ্টাচারবহির্ভূত। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। বিদেশি রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্যে তার দেশের নীতি এভাবে বলার নজির নেই। যদিও চীনের রাষ্ট্রদূত তার সরকারের সিদ্ধান্তই জানিয়ে দিয়েছেন।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশকে কেউ কোয়াডে জয়েন করতে ডাকেনি। বাংলাদেশও বলেনি কোয়াডে যাব। ফলে চীনের রাষ্ট্রদূতের এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে সতর্ক করার প্রয়োজন ছিল না। কেউ হয়তো চীনের রাষ্ট্রদূতকে বুঝিয়েছে যে, বাংলাদেশ ওই জোটে যাচ্ছে।

মুন্সী ফয়েজ অবশ্য একথা বলেন যে, কোয়াড নিয়ে চীনের উদ্বেগজনক চিন্তা করা স্বাভাবিক। কারণ চীনের প্রভাব ঠেকাতে এটা করা হয়েছে। কিন্তু এতে খুব বেশি দেশ যুক্ত না হওয়ায় ওই চার দেশ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে এসেছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে যুক্ত থাকবে। তবে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো জোটে যুক্ত হবে না। এটা চীনকে আশ্বস্ত করতে হবে। তবে চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য নিয়ে রিয়্যাক্ট করা ঠিক হবে না। তারা যে ভুল বুঝেছে সেটা ধরিয়ে দেয়া উচিত। এটা নিয়ে হইচই করা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, কোয়াডের ব্যাপারে চীনের চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে। চীনকে প্রতিহত করা এবং তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য কোয়াড গঠন করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এ জোটে যোগ দেবে না। ফলে এটা নিয়ে চীনের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, কোয়াডে বাংলাদেশ একথা ঢাকার তরফে কখনও বলা হয়নি। ফলে চীনের রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্য আমার কিছুটা অদ্ভুত মনে হয়েছে। তিনি খোলাখুলিভাবে বলেছেন, শক্ত ভাষায় বলেছেন- অনেকটা ওয়ার্নিং।

তিনি অবশ্য এটাও বলেন যে, কোয়াডে বাংলাদেশ যোগ দিলে চীন উদ্বিগ্ন হবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। চীনকে প্রতিহত করার জন্য বড় বড় শক্তিগুলোর এটা একটা জোট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চীনের রাষ্ট্রদূত এটা বলতে গেলেন কেন? চীনের রাষ্ট্রদূত সাধারণত হুট করে কিছু বলেন না। উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদিত হলে বলেন কিংবা তাকে বলার দায়িত্ব দেয়া হলে বলেন। এতে স্পষ্ট যে, তারা আসলেই উদ্বিগ্ন। তারা বিষয়টা বাংলাদেশকে পর্দার আড়ালে গোপনে বলতে পারতে পারতেন। গত কয়েক বছর ধরে চীন বেশি ভোকাল। তারা সূক্ষ্মভাবে না বলে স্থূলভাবে বলছেন। সরাসরি কথা বলেছেন। এটা চীনা রাষ্ট্রদূত এভাবে না বললেই পারতেন।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আজিজুল হক বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে যুক্ত হচ্ছি।

আবার চীনের নেতৃত্বাধীন সাংহাই সহযোগিতা জোটেও আছি। এতে করে বাংলাদেশ যে কোনো বলয়ভুক্ত হতে চায় না সেই চরিত্র বিনষ্ট হবে না। আমাদের কোনো সংস্থায় যুক্ত হওয়া মানে আমরা আমেরিকা কিংবা চীনের বলয়ে চলে গেছি এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে যাওয়া নিয়ে চীনের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া : পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেছেন, কোয়াড নিয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলছে চীন। চীনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি একথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, কোয়াড নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসাবে সিদ্ধান্ত নেবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যে কোনো দেশ নিজেদের অবস্থান জানাতে পারে; তবে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত নেবে। মন্ত্রী বলেন, ‘উনারা বলতে পারেন। উনি একটা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা হয়তো এটা চায় না, তাই তারা বক্তব্য দেবেন। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছেন, সে প্রতিষ্ঠানের লোকজন আমাদের নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। আগ বাড়িয়ে বলা হয়েছে, এটা দুঃখজনক।’

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তার বক্তব্যকে খুব একটা খুব গুরুত্ব দিচ্ছি না। উনি বলেছেন, দ্যাটস ফাইন, এটা নিয়ে আমাদের বিশেষ কিছু বক্তব্য নেই। বাট উই উইল ডিসাইড হোয়াট উই উইল ডু।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা একটা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আমরা নির্ধারণ করি। তবে হ্যাঁ, যে কোনো দেশ তার বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। তো, আমরা কী করব না করব, আমাদের দেশের জনগণের মঙ্গলের জন্য, আমাদের যে পজিশন আছে, তার ভিত্তিতে উই উইল ডিসাইড ইট।’

মোমেন বলেন, ‘দেশের মঙ্গলের জন্য আপনারা প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছেন, বহু সময় বহু লোক বহু কিছু বলেছেন, কিন্তু আমাদের দেশের স্বার্থের ব্যাপারে, দেশের মঙ্গলের জন্য যা যা দরকার তাই করি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি মেনে চলি এবং সেটাই বজায় রাখব।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন