পদে পদে হয়রানি দেশীয় উদ্যোক্তাদের
jugantor
ওয়েবিনারে বক্তারা
পদে পদে হয়রানি দেশীয় উদ্যোক্তাদের

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১৮ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করা অত্যন্ত কঠিন। এক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য কিছুটা সহজ হলেও দেশি উদ্যোক্তাদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। ঘুস না দিলে নিয়মের অতিরিক্ত কর আরোপ এবং ফাইল আটকে হয়রানি করা হয়। কোনো অফিসে ফাইল আটকে আছে-এটা কাউকে বললেও বিপদে পড়তে হয়। আর এসব সমস্যার সমাধান না হলে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা করার সূচক নিয়ে এক ওয়েবিনারে সোমবার অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা এসব কথা বলেন।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) যৌথভাবে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস : স্ট্যাটাস অব ২০২১’ শীর্ষক এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।

ওয়েবিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকতে এক রকম দেখেছি। এখন বাইরে থাকায় অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন জায়গায় হয়রানির শিকার হতে হয়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ছিল, ডুইং বিজনেস র‌্যাংকিংয়ে ১৬৮ থেকে ২০২১ সালে ডাবল ডিজিটে চলে আসা। কিন্তু এই অর্জন সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। এখনই বাংলাদেশ ৯৯ নম্বরে উঠে আসবে, বিষয়টি এত সহজ নয়।

আইবিএফবির সভাপতি হুমায়ুন রশিদ ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম হারুন-অর-রশিদ, বিইআই সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির, সাবেক সচিব মতিউর রহমান, আইবিএফবি সহসভাপতি আইনি অর্থনীতিবিদ এমএস সিদ্দিকী, ঠেঙ্গামারা সবুজ সংঘের (টিএমএসএস) নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডার পরিচালক (ওয়ান স্টপ সার্ভিস অ্যান্ড রেগুলেটরি রিফর্ম) জীবন কৃষ্ণ সাহা রায়।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বিনিয়োগ সহজ করার জন্য বিডা গঠন করা হয়েছে। সেখানে দেশীয় উদ্যোক্তারা কী সহায়তা পাচ্ছে, তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগ করতে গেলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন জায়গায় হয়রানির শিকার হতে হয়। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে এক জমি নামজারি করতে ৭২ হাজার টাকা লাগে। কেন চাওয়া হয়, এর কোনো উত্তর নেই। আরজেএসসিতে নিবন্ধন নিতে গেলে সরাসরি কাজ হয় না। সেখানে গেলে বলা হয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসতে হবে। এভাবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চক্র গড়ে উঠেছে।

রাজস্ব বোর্ডের সাবেক এ চেয়ারম্যান বলেন, কর দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানি রয়েছে। আইনে কর আদায়কারীদের অনেক ক্ষমতা দেওয়া আছে। এসব ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন কেউ কেউ। সেখান থেকে বাঁচার জন্য দেশে কর ন্যায়পালের একটি পদ ছিল। করদাতারা সেখানে সমস্যার সমাধানের জন্য যেতে পারতেন। কিন্তু ২০০৯-২০১০ সালে সরকার সেটি বিলুপ্ত করেছে।

এ ছাড়া বর্তমানে এমন কিছু আইন রয়েছে, যেগুলো খুবই অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু এসব আইন ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ড. এম আকবর আলি খানের নেতৃত্বে একটি কমিশন হয়েছিল। আইনগুলো আধুনিকায়নের সুপারিশ করেছিল ওই কমিশন। কিন্তু পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে সেই সুপারিশ বাতিল করে।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসা পরিস্থিতির উন্নতির কথা যতক্ষণ ব্যবসায়ীরা না বলবেন, ততক্ষণ বিশ্বব্যাংক পয়েন্ট দেবে না। আবার ব্যবসায়ীরাও বিশ্বব্যাংকের উপসূচকগুলো সম্পর্কে তেমন একটা সচেতন নন। তিনি বলেন, বিডা তিন-চার বছর ধরে বিশ্বব্যাংকের সূচক ধরে সংস্কার শুরু করেছে।

ওয়েবিনারে ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তার অনৈতিকভাবে টাকা চাওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী আমার কাছে অভিযোগ করেন, তার কাছে অনৈতিকভাবে অর্থ চেয়ে নাজেহাল করা হয়েছে। অনৈতিক অর্থ না দেওয়ায় যা করযোগ্য নয় তা-ও কর দাবি করা হয়েছে। ওই বিদেশি বিনিয়োগকারী বিডার কাছে সমাধান চেয়েছেন। এই ধরনের অনৈতিক লেনদেনের বিষয় আছে, যা ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে বাধা।’ এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কোনো অফিসে ফাইল আটকে থাকলে কাউকে বললেও বিপদে পড়বেন। আপনাকে বলবে, ফাইল তো পাওয়া যাচ্ছে না।’ হুমায়ুন রশিদ বলেন, এমন খাতও আছে, যেখানে ব্যবসা শুরু করতে ২৮টি লাইসেন্স লাগে। প্রতিটি লাইসেন্সের আবেদন নির্দিষ্ট কার্যালয়ে এক মাস পড়ে থাকলে ২৮ মাস লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে কে ব্যবসা করতে আসবে?

হোসনে আরা বলেন, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা মনে করে, তাদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা। তারা ব্যবসা সহজ করায় মনোযোগ দেয় না। ব্যবসা করতে মাঠপর্যায়ে কী সমস্যা হয়, তা নিয়ন্ত্রণকারীরা শোনেন না।

ওয়েবিনারে বক্তারা

পদে পদে হয়রানি দেশীয় উদ্যোক্তাদের

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১৮ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করা অত্যন্ত কঠিন। এক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য কিছুটা সহজ হলেও দেশি উদ্যোক্তাদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। ঘুস না দিলে নিয়মের অতিরিক্ত কর আরোপ এবং ফাইল আটকে হয়রানি করা হয়। কোনো অফিসে ফাইল আটকে আছে-এটা কাউকে বললেও বিপদে পড়তে হয়। আর এসব সমস্যার সমাধান না হলে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা করার সূচক নিয়ে এক ওয়েবিনারে সোমবার অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা এসব কথা বলেন।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) যৌথভাবে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস : স্ট্যাটাস অব ২০২১’ শীর্ষক এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।

ওয়েবিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকতে এক রকম দেখেছি। এখন বাইরে থাকায় অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন জায়গায় হয়রানির শিকার হতে হয়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ছিল, ডুইং বিজনেস র‌্যাংকিংয়ে ১৬৮ থেকে ২০২১ সালে ডাবল ডিজিটে চলে আসা। কিন্তু এই অর্জন সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। এখনই বাংলাদেশ ৯৯ নম্বরে উঠে আসবে, বিষয়টি এত সহজ নয়।

আইবিএফবির সভাপতি হুমায়ুন রশিদ ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম হারুন-অর-রশিদ, বিইআই সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির, সাবেক সচিব মতিউর রহমান, আইবিএফবি সহসভাপতি আইনি অর্থনীতিবিদ এমএস সিদ্দিকী, ঠেঙ্গামারা সবুজ সংঘের (টিএমএসএস) নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডার পরিচালক (ওয়ান স্টপ সার্ভিস অ্যান্ড রেগুলেটরি রিফর্ম) জীবন কৃষ্ণ সাহা রায়।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বিনিয়োগ সহজ করার জন্য বিডা গঠন করা হয়েছে। সেখানে দেশীয় উদ্যোক্তারা কী সহায়তা পাচ্ছে, তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগ করতে গেলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন জায়গায় হয়রানির শিকার হতে হয়। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে এক জমি নামজারি করতে ৭২ হাজার টাকা লাগে। কেন চাওয়া হয়, এর কোনো উত্তর নেই। আরজেএসসিতে নিবন্ধন নিতে গেলে সরাসরি কাজ হয় না। সেখানে গেলে বলা হয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসতে হবে। এভাবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চক্র গড়ে উঠেছে।

রাজস্ব বোর্ডের সাবেক এ চেয়ারম্যান বলেন, কর দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানি রয়েছে। আইনে কর আদায়কারীদের অনেক ক্ষমতা দেওয়া আছে। এসব ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন কেউ কেউ। সেখান থেকে বাঁচার জন্য দেশে কর ন্যায়পালের একটি পদ ছিল। করদাতারা সেখানে সমস্যার সমাধানের জন্য যেতে পারতেন। কিন্তু ২০০৯-২০১০ সালে সরকার সেটি বিলুপ্ত করেছে।

এ ছাড়া বর্তমানে এমন কিছু আইন রয়েছে, যেগুলো খুবই অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু এসব আইন ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ড. এম আকবর আলি খানের নেতৃত্বে একটি কমিশন হয়েছিল। আইনগুলো আধুনিকায়নের সুপারিশ করেছিল ওই কমিশন। কিন্তু পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে সেই সুপারিশ বাতিল করে।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসা পরিস্থিতির উন্নতির কথা যতক্ষণ ব্যবসায়ীরা না বলবেন, ততক্ষণ বিশ্বব্যাংক পয়েন্ট দেবে না। আবার ব্যবসায়ীরাও বিশ্বব্যাংকের উপসূচকগুলো সম্পর্কে তেমন একটা সচেতন নন। তিনি বলেন, বিডা তিন-চার বছর ধরে বিশ্বব্যাংকের সূচক ধরে সংস্কার শুরু করেছে।

ওয়েবিনারে ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তার অনৈতিকভাবে টাকা চাওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী আমার কাছে অভিযোগ করেন, তার কাছে অনৈতিকভাবে অর্থ চেয়ে নাজেহাল করা হয়েছে। অনৈতিক অর্থ না দেওয়ায় যা করযোগ্য নয় তা-ও কর দাবি করা হয়েছে। ওই বিদেশি বিনিয়োগকারী বিডার কাছে সমাধান চেয়েছেন। এই ধরনের অনৈতিক লেনদেনের বিষয় আছে, যা ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে বাধা।’ এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কোনো অফিসে ফাইল আটকে থাকলে কাউকে বললেও বিপদে পড়বেন। আপনাকে বলবে, ফাইল তো পাওয়া যাচ্ছে না।’ হুমায়ুন রশিদ বলেন, এমন খাতও আছে, যেখানে ব্যবসা শুরু করতে ২৮টি লাইসেন্স লাগে। প্রতিটি লাইসেন্সের আবেদন নির্দিষ্ট কার্যালয়ে এক মাস পড়ে থাকলে ২৮ মাস লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে কে ব্যবসা করতে আসবে?

হোসনে আরা বলেন, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা মনে করে, তাদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা। তারা ব্যবসা সহজ করায় মনোযোগ দেয় না। ব্যবসা করতে মাঠপর্যায়ে কী সমস্যা হয়, তা নিয়ন্ত্রণকারীরা শোনেন না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন