দুর্যোগ মোকাবিলার বাজেট জরুরি
jugantor
সাক্ষাৎকার: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী
দুর্যোগ মোকাবিলার বাজেট জরুরি

  দেলোয়ার হুসেন  

১৮ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেছেন, করোনার নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা জরুরি। এতে করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও কৌশলকে গুরুত্ব দিতে হবে জরুরিভিত্তিতে।

একইসঙ্গে নেওয়া পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়নও করতে হবে। দুর্যোগের সময়ে যেটাই করা হোক না কেন, তা দ্রুত করতে হবে। তাহলে দ্রুত সুফল মিলবে। দেরি হলে সুফল পাওয়া যাবে না। বরং আরও বিলম্বিত হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক এ মহাপরিচালক সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেলোয়ার হুসেন

যুগান্তর : করোনার নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে আগামী বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : আগামী বাজেট প্রণয়নে করোনা মহামারি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে প্রথমে গুরুত্ব দিতে হবে স্বাস্থ্য খাতকে। এ খাতে অবকাঠামো উন্নয়নসহ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সচেতনতার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। এসব অর্থের মানসম্পন্ন খরচের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে করোনার মতো মহামারিকে করতে হবে নিয়ন্ত্রণ। করোনার থাবাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে। এজন্য যেসব খাতে ক্ষতি হয়েছে, সেসব খাতে চলতি মূলধনের জোগান বাড়াতে হবে। অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রণোদনার দিয়ে চাঙা করা গেলে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। করোনায় কৃষি খাত বড় সাপোর্ট দিয়েছে অর্থনীতিকে।

কৃষিকে চাঙা রাখার জন্য প্রণোদনা অব্যাহত রাখা জরুরি। এর বাইরে করোনার কারণে যারা দরিদ্র হয়েছেন, যাদের কাজের সুযোগ বন্ধ হয়েছে বা যাদের আয় কমেছে, তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। করোনার গতিবিধি কোনদিকে মোড় নেয়, সেটি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। সব মিলিয়ে করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় এবার বড় বাজেট প্রণয়ন জরুরি।

যুগান্তর : দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : বাজেটে কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের জন্য সহায়তা বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু ছোটরা পাচ্ছে না। তাদের ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। ফলে তারা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন অর্থ সংকটে ভুগছে। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। এজন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থাসহ তাদের পণ্য বিপণনের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তারা ঘুরে দাঁড়ালে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারবে।

বিশেষ করে অদক্ষ ও স্বল্প আয়ের লোকদের কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র ছোট উদ্যোক্তারা। যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের কাজের সংস্থান বা বিকল্প আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। এজন্য সরকারকে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ ও মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। বড় বড় অবকাঠামো নির্মিত হলে সেখানে ছোট ছোট অনেক উদ্যোক্তা কাজের সংস্থান করতে পারবে। এছাড়া বাড়াতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।

যুগান্তর : করোনার মধ্যেই গত বছরের বাজেট হয়েছে। এবারও তা-ই হচ্ছে। এবার কী ব্যতিক্রম থাকা দরকার?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : গত বছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু সেটি খরচ করা সম্ভব হয়নি। এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। খরচ করার সক্ষমতায় ঘাটতি আছে, সেটি চিহ্নিত করে দুর্বলতা নিরসন করতে হবে। কারণ স্বাস্থ্য খাত জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হলে জনস্বাস্থ্য যেমন রক্ষা করা যাবে না, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পুরোমাত্রায় সচল করা সম্ভব হবে না।

এজন্য এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি সচল করার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে এসব বিষয়ে যেসব নীতি গ্রহণ করা হবে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় যা করার দ্রুত করতে হবে। এখানে কোনোভাবে দেরি করার সুযোগ নেই। দেরি হলে সুফল মিলবে না। এজন্য বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পুরো ব্যবস্থাটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। এগুলোর তদারকিও করতে হবে।

যুগান্তর : করোনায় কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। এখন করোনাভাইরাস সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাজনিত সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এ কারণে করোনাকে আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে কর, অবকাঠামো, ঋণসহ নানা খাতে নীতি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এজন্য বাজেটে বিনিয়োগ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট একটি প্যাকেজ কর্মসূচি ঘোষণা করলে ভালো হয়। এগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিও স্পষ্ট করে বলতে হবে। তাহলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হবে।

কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি বেসরকারি খাতে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগকে চাঙা করতে হবে। এজন্য তাদের কম সুদে ঋণ, কর রেয়াত, নীতি সহায়তা, বন্দরের ছাড়-এসব সুবিধা দিলে কম খরচে তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে সরকারি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।

যুগান্তর : বাজেটে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া যায়?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : করোনার কারণে যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে কাদের কী ধরনের সহায়তা দরকার আগে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যেমন দরিদ্রদের আর্থিক ও কাজের সহায়তা। চাকরিহারা নিম্ন-মধ্যবিত্তের নতুন কাজের সুযোগ। শিল্প খাতে প্রণোদনা দেওয়া। এভাবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। এসব সুবিধা টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলে বাজেটের লক্ষ্য সফল হবে।

যুগান্তর : করোনার মধ্যে আপনি কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : আমি সবচেয়ে বেশি জোর দিতে চাই বাজেট বাস্তবায়নের ওপর। প্রতিবছর বাজেটে অনেক ভালো কিছু বিষয় থাকে। কিন্তু বছর শেষে সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। এবারের বাজেটে করোনাকে মোকাবিলা করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেগুলো যাতে বাস্তবায়ন করা হয় সেটির গ্যারান্টি দিতে হবে। তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে। ভালো ভালো উদ্যোগ নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলে বাজেট ফলপ্রসূ হবে না।

যুগান্তর : প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : প্রণোদনা প্যাকেজগুলো ঘোষণা করা হয়েছে এক বছর আগে। এর মধ্যে দুটি প্যাকেজ শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকিগুলো এখনো হয়নি। করোনার প্রভাব মোকাবিলার জন্য দ্রুত প্যাকেজগুলো ঘোষণা করা হয়েছিল। এগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল। দ্রুত বাস্তবায়ন হলে উদ্যোক্তারা যেমন উপকৃত হতেন, তেমনি অর্থনীতিও দ্রুত সচল হতো। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। ফলে প্যাকেজের কার্যকারিতা অনেকটা কমে গেছে। কারণ গত এক বছরে যে টাকা পায়নি, এখন হয়তো তার আর টাকার দরকার নেই। নতুন করে করোনার হানার ফলে এখন আবার যেসব সহযোগিতা দেওয়া হবে, সেগুলো যাতে দ্রুত দেওয়া হয়, সেদিকে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

যুগান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসাবে আপনি মুদ্রানীতি প্রণয়নে বড় ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেমন মুদ্রানীতি হওয়া উচিত?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : করোনার কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ইতোমধ্যে হানা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি আরও থাকবে বলে মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হবে। তাহলে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে। এতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। সেটি মোকাবিলার জন্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তাহলে মূল্যস্ফীতির হার বাড়লেও খুব একটা আঘাত করতে পারবে না স্বল্প আয়ের মানুষদের।

যুগান্তর : টাকা পাচার রোধে বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : টাকা পাচার রোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। তারপরও বলতে হয়, টাকা পাচার ঠেকানো যায়নি। বিশেষ করে দুর্নীতি, কালোবাজারি, চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত টাকা দুর্নীতিবাজরা দেশে রাখা নিরাপদ মনে করে না। এ কারণে তারা দেশে টাকা রাখে না, বিদেশে পাচার করে দেয়। টাকা পাচার রোধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। কালো টাকা সাদা করতে দেওয়া যাবে না। তাহলে কালো টাকার জন্ম কমে যাবে। তখন টাকা পাচারও কমে যাবে। সুশাসন নিশ্চিত করে দুর্নীতি-কালোবাজারি বন্ধ করতে হবে। আইনকে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

যুগান্তর : রাজস্ব আদায় এখন বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে। বিকল্প কী হতে পারে?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকায় রাজস্ব আয়ে গতি কমে গেছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এখন বিকল্প হিসাবে বৈদেশিক সহায়তার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। রাজস্ব আয়েও বিকল্প উৎস সন্ধান করতে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজস্বের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

দুর্যোগ মোকাবিলার বাজেট জরুরি

 দেলোয়ার হুসেন 
১৮ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেছেন, করোনার নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা জরুরি। এতে করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও কৌশলকে গুরুত্ব দিতে হবে জরুরিভিত্তিতে।

একইসঙ্গে নেওয়া পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়নও করতে হবে। দুর্যোগের সময়ে যেটাই করা হোক না কেন, তা দ্রুত করতে হবে। তাহলে দ্রুত সুফল মিলবে। দেরি হলে সুফল পাওয়া যাবে না। বরং আরও বিলম্বিত হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক এ মহাপরিচালক সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেলোয়ার হুসেন

যুগান্তর : করোনার নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে আগামী বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : আগামী বাজেট প্রণয়নে করোনা মহামারি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে প্রথমে গুরুত্ব দিতে হবে স্বাস্থ্য খাতকে। এ খাতে অবকাঠামো উন্নয়নসহ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সচেতনতার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। এসব অর্থের মানসম্পন্ন খরচের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে করোনার মতো মহামারিকে করতে হবে নিয়ন্ত্রণ। করোনার থাবাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে। এজন্য যেসব খাতে ক্ষতি হয়েছে, সেসব খাতে চলতি মূলধনের জোগান বাড়াতে হবে। অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রণোদনার দিয়ে চাঙা করা গেলে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। করোনায় কৃষি খাত বড় সাপোর্ট দিয়েছে অর্থনীতিকে।

কৃষিকে চাঙা রাখার জন্য প্রণোদনা অব্যাহত রাখা জরুরি। এর বাইরে করোনার কারণে যারা দরিদ্র হয়েছেন, যাদের কাজের সুযোগ বন্ধ হয়েছে বা যাদের আয় কমেছে, তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। করোনার গতিবিধি কোনদিকে মোড় নেয়, সেটি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। সব মিলিয়ে করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় এবার বড় বাজেট প্রণয়ন জরুরি।

যুগান্তর : দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : বাজেটে কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের জন্য সহায়তা বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু ছোটরা পাচ্ছে না। তাদের ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। ফলে তারা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন অর্থ সংকটে ভুগছে। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। এজন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থাসহ তাদের পণ্য বিপণনের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তারা ঘুরে দাঁড়ালে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারবে।

বিশেষ করে অদক্ষ ও স্বল্প আয়ের লোকদের কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র ছোট উদ্যোক্তারা। যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের কাজের সংস্থান বা বিকল্প আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। এজন্য সরকারকে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ ও মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। বড় বড় অবকাঠামো নির্মিত হলে সেখানে ছোট ছোট অনেক উদ্যোক্তা কাজের সংস্থান করতে পারবে। এছাড়া বাড়াতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।

যুগান্তর : করোনার মধ্যেই গত বছরের বাজেট হয়েছে। এবারও তা-ই হচ্ছে। এবার কী ব্যতিক্রম থাকা দরকার?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : গত বছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু সেটি খরচ করা সম্ভব হয়নি। এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। খরচ করার সক্ষমতায় ঘাটতি আছে, সেটি চিহ্নিত করে দুর্বলতা নিরসন করতে হবে। কারণ স্বাস্থ্য খাত জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হলে জনস্বাস্থ্য যেমন রক্ষা করা যাবে না, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পুরোমাত্রায় সচল করা সম্ভব হবে না।

এজন্য এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি সচল করার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে এসব বিষয়ে যেসব নীতি গ্রহণ করা হবে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় যা করার দ্রুত করতে হবে। এখানে কোনোভাবে দেরি করার সুযোগ নেই। দেরি হলে সুফল মিলবে না। এজন্য বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পুরো ব্যবস্থাটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। এগুলোর তদারকিও করতে হবে।

যুগান্তর : করোনায় কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। এখন করোনাভাইরাস সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাজনিত সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এ কারণে করোনাকে আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে কর, অবকাঠামো, ঋণসহ নানা খাতে নীতি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এজন্য বাজেটে বিনিয়োগ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট একটি প্যাকেজ কর্মসূচি ঘোষণা করলে ভালো হয়। এগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিও স্পষ্ট করে বলতে হবে। তাহলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হবে।

কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি বেসরকারি খাতে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগকে চাঙা করতে হবে। এজন্য তাদের কম সুদে ঋণ, কর রেয়াত, নীতি সহায়তা, বন্দরের ছাড়-এসব সুবিধা দিলে কম খরচে তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে সরকারি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।

যুগান্তর : বাজেটে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া যায়?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : করোনার কারণে যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে কাদের কী ধরনের সহায়তা দরকার আগে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যেমন দরিদ্রদের আর্থিক ও কাজের সহায়তা। চাকরিহারা নিম্ন-মধ্যবিত্তের নতুন কাজের সুযোগ। শিল্প খাতে প্রণোদনা দেওয়া। এভাবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। এসব সুবিধা টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলে বাজেটের লক্ষ্য সফল হবে।

যুগান্তর : করোনার মধ্যে আপনি কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : আমি সবচেয়ে বেশি জোর দিতে চাই বাজেট বাস্তবায়নের ওপর। প্রতিবছর বাজেটে অনেক ভালো কিছু বিষয় থাকে। কিন্তু বছর শেষে সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। এবারের বাজেটে করোনাকে মোকাবিলা করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেগুলো যাতে বাস্তবায়ন করা হয় সেটির গ্যারান্টি দিতে হবে। তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে। ভালো ভালো উদ্যোগ নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলে বাজেট ফলপ্রসূ হবে না।

যুগান্তর : প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : প্রণোদনা প্যাকেজগুলো ঘোষণা করা হয়েছে এক বছর আগে। এর মধ্যে দুটি প্যাকেজ শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকিগুলো এখনো হয়নি। করোনার প্রভাব মোকাবিলার জন্য দ্রুত প্যাকেজগুলো ঘোষণা করা হয়েছিল। এগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল। দ্রুত বাস্তবায়ন হলে উদ্যোক্তারা যেমন উপকৃত হতেন, তেমনি অর্থনীতিও দ্রুত সচল হতো। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। ফলে প্যাকেজের কার্যকারিতা অনেকটা কমে গেছে। কারণ গত এক বছরে যে টাকা পায়নি, এখন হয়তো তার আর টাকার দরকার নেই। নতুন করে করোনার হানার ফলে এখন আবার যেসব সহযোগিতা দেওয়া হবে, সেগুলো যাতে দ্রুত দেওয়া হয়, সেদিকে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

যুগান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসাবে আপনি মুদ্রানীতি প্রণয়নে বড় ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেমন মুদ্রানীতি হওয়া উচিত?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : করোনার কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ইতোমধ্যে হানা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি আরও থাকবে বলে মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হবে। তাহলে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে। এতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। সেটি মোকাবিলার জন্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তাহলে মূল্যস্ফীতির হার বাড়লেও খুব একটা আঘাত করতে পারবে না স্বল্প আয়ের মানুষদের।

যুগান্তর : টাকা পাচার রোধে বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : টাকা পাচার রোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। তারপরও বলতে হয়, টাকা পাচার ঠেকানো যায়নি। বিশেষ করে দুর্নীতি, কালোবাজারি, চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত টাকা দুর্নীতিবাজরা দেশে রাখা নিরাপদ মনে করে না। এ কারণে তারা দেশে টাকা রাখে না, বিদেশে পাচার করে দেয়। টাকা পাচার রোধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। কালো টাকা সাদা করতে দেওয়া যাবে না। তাহলে কালো টাকার জন্ম কমে যাবে। তখন টাকা পাচারও কমে যাবে। সুশাসন নিশ্চিত করে দুর্নীতি-কালোবাজারি বন্ধ করতে হবে। আইনকে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

যুগান্তর : রাজস্ব আদায় এখন বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে। বিকল্প কী হতে পারে?

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকায় রাজস্ব আয়ে গতি কমে গেছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এখন বিকল্প হিসাবে বৈদেশিক সহায়তার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। রাজস্ব আয়েও বিকল্প উৎস সন্ধান করতে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজস্বের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ

ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : ধন্যবাদ।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন