মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি সামান্য
jugantor
মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি সামান্য

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান  

০৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার শুরু থেকেই মধ্যবিত্তরা বিপদে আছেন। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। আবার অনেকের বেতন কমে গেছে। এই শ্রেণি মহাকষ্টে থাকলেও মানসম্মানের ভয়ে না পারে কারও কাছে কিছু চাইতে, না পারে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তা নিতে।

গত বছর করোনার শুরু পর সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এক লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার মোট ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে নিুআয়ের মানুষদের নগদ অর্থ দেওয়া হলেও মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি শূন্য। তাই বাজেট নিয়ে মধ্যবিত্তের মনে একরাশ প্রত্যাশা ছিল।

কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি। বৃহস্পতিবার ঘোষিত বাজেটে করোনায় স্তিমিত অর্থনীতি চাঙা করতে সরকার বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিয়েছে। করপোরেট করে ছাড়সহ নতুন নতুন শিল্পকে কর অবকাশ সুবিধার পাশাপাশি ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছে।

কিন্তু ব্যক্তি করদাতাদের জন্য কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। আগের মতোই বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় হলে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

অথচ সবচেয়ে বেশি রিটার্ন জমা দেন মধ্যবিত্তরা। মধ্যবিত্ত এমন একটি শ্রেণি, যারা সবচেয়ে বেশি কর দেন; কিন্তু সুবিধা পান অন্যদের চেয়ে কম।

সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আহ্লাদ থাকে সন্তানকে সুশিক্ষা দেওয়ার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তান সুযোগ না পেলে মধ্যবিত্তের ভরসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ বিদেশে পড়ানোর মতো অর্থ তাদের থাকে না।

বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হ্রাসকৃত হারে কর আরোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ কারণে সন্তানের শিক্ষার পেছনে খরচ বাড়ার আতঙ্ক শুরু হলো। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে খরচ আরও বাড়বে।

বাজেটে উচ্চ ও অতিউচ্চ স্তরের সিগারেটের মূল্যস্তর বাড়ানোয় এ জাতীয় সিগারেটের দাম বাড়বে। ভালো মোবাইল ব্যবহার করতে চাইলেও বিপদ। দেশে যেসব মোবাইল তৈরি হয় না, সেসব ফোন আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।

তাই বলাই যায়, আগামীতে ভালো মানের মোবাইলের দাম বাড়বে। উৎসব-পার্বণে সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করতেও বেশি খরচ হবে। বিদেশি সুগন্ধি আমদানিতে সরকার ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বসিয়েছে।

পার্টিতে মদ-বিয়ার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করাই ভালো। কারণ মদ-বিয়ারে আমদানিতেও ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বসানোয় দাম বাড়বে।

যেসব মধ্যবিত্তের গাড়ি আছে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়বে। প্রথমত, নিয়মমাফিক অগ্রিম আয়কর পরিশোধ না করলে পরে দ্বিগুণ কর দিতে হবে।

এজন্য বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গাড়ির সুরক্ষা গ্লাসের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ফলে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়বে।

সব মধ্যবিত্তের সাধ থাকে নিজের বাড়ির। তাই দেশের রড-সিমেন্টের বড় ক্রেতা এই শ্রেণি। বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট, সিরামিক বা টাইলস উৎপাদনে সরকার অনেক শুল্ককর ছাড় সুবিধা দিয়েছে।

কিন্তু এ সুবিধার কারণে দাম কতটুকু কমবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) পরিচালিত একটি জরিপের তথ্য বলছে, মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ এখন দরিদ্র।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) আরেকটি জরিপ অনুসারে, মহামারির প্রভাবে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে।

স্পষ্টতই মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা বড় অংশ এর মধ্যে পড়েছে। কারণ মহামারির কারণে অনেকে তাদের চাকরি হারিয়েছেন।

না হয় কর্তিত বেতনে তাদের চলতে হচ্ছে। নগরজীবনের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে না পেরে অনেকে কম খরচের বাসায় উঠেছেন কিংবা স্থায়ীভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।

অবশ্য দেশীয় শিল্পের স্বার্থে হোম এপ্লায়েন্স সামগ্রী যেমন- ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ওভেন, ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার ও প্রেসার কুকার উৎপাদনে কর অবকাশ ও ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দিয়েছে।

এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটারসংশ্লিষ্ট পণ্য যেমন প্রিন্টার, টোনার কার্টিজ, ইনকজেট কার্টিজ, কম্পিউটার প্রিন্টারের যন্ত্রাংশ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, নোটবুক, নেটপ্যাড, ট্যাব, সার্ভার, কিবোর্ড, মাউস, বারকোড ও কিউআর কোড স্ক্যানার, পিসিবিএ/মাদারবোর্ড, পাওয়ার ব্যাংক, রাউটার, নেটওয়ার্ক সুইচ, মডেম, নেটওয়ার্ক ডিভাইস/ হাব, স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম, ইয়ারফোন, হেডফোন, এসএসডি/পোর্টেবল এসএসডি, হার্ডডিস্ক ড্রাইভ, পেনড্রাইভ, মাইক্রো এসডি কার্ড, ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড, সিসিটিভি, মনিটর, প্রজেক্টর, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, ই-রাইটিং প্যাড, ইউএসবি ক্যাবল, ডিজিটাল ঘড়ি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছে। পাশাপাশি মধ্যবিত্তের অন্যতম বাহন কম সিসির মোটরসাইকেল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ছাড় দিয়েছে। ফলে দেশে প্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে। যা এই করোনাকালে কিছুটা হলেও মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেবে।

মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি সামান্য

 সাদ্দাম হোসেন ইমরান 
০৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার শুরু থেকেই মধ্যবিত্তরা বিপদে আছেন। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। আবার অনেকের বেতন কমে গেছে। এই শ্রেণি মহাকষ্টে থাকলেও মানসম্মানের ভয়ে না পারে কারও কাছে কিছু চাইতে, না পারে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তা নিতে।

গত বছর করোনার শুরু পর সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এক লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার মোট ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে নিুআয়ের মানুষদের নগদ অর্থ দেওয়া হলেও মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি শূন্য। তাই বাজেট নিয়ে মধ্যবিত্তের মনে একরাশ প্রত্যাশা ছিল।

কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি। বৃহস্পতিবার ঘোষিত বাজেটে করোনায় স্তিমিত অর্থনীতি চাঙা করতে সরকার বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিয়েছে। করপোরেট করে ছাড়সহ নতুন নতুন শিল্পকে কর অবকাশ সুবিধার পাশাপাশি ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছে।

কিন্তু ব্যক্তি করদাতাদের জন্য কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। আগের মতোই বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় হলে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

অথচ সবচেয়ে বেশি রিটার্ন জমা দেন মধ্যবিত্তরা। মধ্যবিত্ত এমন একটি শ্রেণি, যারা সবচেয়ে বেশি কর দেন; কিন্তু সুবিধা পান অন্যদের চেয়ে কম।

সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আহ্লাদ থাকে সন্তানকে সুশিক্ষা দেওয়ার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তান সুযোগ না পেলে মধ্যবিত্তের ভরসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ বিদেশে পড়ানোর মতো অর্থ তাদের থাকে না।

বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হ্রাসকৃত হারে কর আরোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ কারণে সন্তানের শিক্ষার পেছনে খরচ বাড়ার আতঙ্ক শুরু হলো। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে খরচ আরও বাড়বে।

বাজেটে উচ্চ ও অতিউচ্চ স্তরের সিগারেটের মূল্যস্তর বাড়ানোয় এ জাতীয় সিগারেটের দাম বাড়বে। ভালো মোবাইল ব্যবহার করতে চাইলেও বিপদ। দেশে যেসব মোবাইল তৈরি হয় না, সেসব ফোন আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।

তাই বলাই যায়, আগামীতে ভালো মানের মোবাইলের দাম বাড়বে। উৎসব-পার্বণে সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করতেও বেশি খরচ হবে। বিদেশি সুগন্ধি আমদানিতে সরকার ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বসিয়েছে।

পার্টিতে মদ-বিয়ার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করাই ভালো। কারণ মদ-বিয়ারে আমদানিতেও ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বসানোয় দাম বাড়বে। 

যেসব মধ্যবিত্তের গাড়ি আছে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়বে। প্রথমত, নিয়মমাফিক অগ্রিম আয়কর পরিশোধ না করলে পরে দ্বিগুণ কর দিতে হবে।

এজন্য বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গাড়ির সুরক্ষা গ্লাসের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ফলে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়বে। 

সব মধ্যবিত্তের সাধ থাকে নিজের বাড়ির। তাই দেশের রড-সিমেন্টের বড় ক্রেতা এই শ্রেণি। বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট, সিরামিক বা টাইলস উৎপাদনে সরকার অনেক শুল্ককর ছাড় সুবিধা দিয়েছে।

কিন্তু এ সুবিধার কারণে দাম কতটুকু কমবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) পরিচালিত একটি জরিপের তথ্য বলছে, মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ এখন দরিদ্র।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) আরেকটি জরিপ অনুসারে, মহামারির প্রভাবে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে।

স্পষ্টতই মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা বড় অংশ এর মধ্যে পড়েছে। কারণ মহামারির কারণে অনেকে তাদের চাকরি হারিয়েছেন।

না হয় কর্তিত বেতনে তাদের চলতে হচ্ছে। নগরজীবনের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে না পেরে অনেকে কম খরচের বাসায় উঠেছেন কিংবা স্থায়ীভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।

অবশ্য দেশীয় শিল্পের স্বার্থে হোম এপ্লায়েন্স সামগ্রী যেমন- ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ওভেন, ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার ও প্রেসার কুকার উৎপাদনে কর অবকাশ ও ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দিয়েছে।

এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটারসংশ্লিষ্ট পণ্য যেমন প্রিন্টার, টোনার কার্টিজ, ইনকজেট কার্টিজ, কম্পিউটার প্রিন্টারের যন্ত্রাংশ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, নোটবুক, নেটপ্যাড, ট্যাব, সার্ভার, কিবোর্ড, মাউস, বারকোড ও কিউআর কোড স্ক্যানার, পিসিবিএ/মাদারবোর্ড, পাওয়ার ব্যাংক, রাউটার, নেটওয়ার্ক সুইচ, মডেম, নেটওয়ার্ক ডিভাইস/ হাব, স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম, ইয়ারফোন, হেডফোন, এসএসডি/পোর্টেবল এসএসডি, হার্ডডিস্ক ড্রাইভ, পেনড্রাইভ, মাইক্রো এসডি কার্ড, ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড, সিসিটিভি, মনিটর, প্রজেক্টর, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, ই-রাইটিং প্যাড, ইউএসবি ক্যাবল, ডিজিটাল ঘড়ি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছে। পাশাপাশি মধ্যবিত্তের অন্যতম বাহন কম সিসির মোটরসাইকেল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ছাড় দিয়েছে। ফলে দেশে প্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে। যা এই করোনাকালে কিছুটা হলেও মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন